বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বৃহঃস্পতিবার, ৫ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
২৫শে বৈশাখের শ্রদ্ধাঞ্জলী
খুলনায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রকাশ: ১১:৪৬ pm ০৭-০৫-২০১৭ হালনাগাদ: ১১:৪৬ pm ০৭-০৫-২০১৭
 
 
 


অরুন শীল : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ই মে, ১৮৬১-৭ই আগস্ট,১৯৪১) (২৫বৈশাখ,১২৬৮ - ২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, গীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর,ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক।

তাঁকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনে করা হয়। রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবি অভিধায় ভূষিত করা হয়।

রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয়। তাঁর সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য উনিশ খণ্ডে চিঠিপত্র ও চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত। এছাড়া তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের রচনা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

বিশ্বকবি রবীন্দ নাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যাকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে।

সাহিত্যের এ ধ্রুবতারার আদিপুরুষ ও আদি-আত্মীয়রা ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশের যশোহর-খুলনা অঞ্চলে। ফুল, ফল আর বিচিত্র গাছগাছালিতে ঠাসা শান্ত নিরিবিলি গ্রাম ‘পিঠাভোগ’। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে এক সময়ের খরস্রোতা আঠারোবেঁকি নদী। পাশেই কুশারীবাড়ি। নদীর স্রোতের মতো এক সময় এই কুশারীবাড়িরও জৌলুস ছিল। এই বাড়ির একটি অংশ ব্যবসার কাজে স্থায়ীভাবে পাড়ি জমায় কলকাতার জোড়াসাঁকোয়,পদবি পাল্টে হয় ঠাকুর। সেই পরিবারেরই সন্তান জগোজাড়া খ্যাতিমান পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিশ্বকবির পিতৃপুরুষের আদিভিটা খুলনার রূপসা উপজেলার ঘাটভোগ ইউনিয়নের পিঠাভোগ গ্রামে। সেখানে আজও আছেন তাঁদের জ্ঞাতিস্বজনরা। তবে সেই জৌলুস আর নেই।

আঠারোবেঁকি নদীটি শুকিয়ে যেমন এক চিলতে হয়েছে, তেমনি কুশারীবাড়ির জৌলুসও হারিয়ে গেছে। নুন আনতে পান্তা ফুরায় দশা। তবে জ্ঞাতিস্বজনরা গর্ববোধ করেন,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁদের পূর্বপুরুষদের একজন। রবীন্দ্রনাথের মাতৃকুল আর শ্বশুরকুলের ঠিকানাও কিন্ত এই বাংলাদেশেই। পিঠাভোগ গ্রামের অদূরে খুলনার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রামের রায় চৌধুরীবাড়ি। পিঠাভোগের কুশারীবাড়ি আর দক্ষিণডিহির রায় চৌধুরীবাড়ি দুটি পরিবার অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিল। বন্ধুত্ব, বিয়ে,আত্মীয়তানা না মাধ্যমে দুই বাড়ির যোগাযোগ ছিল গভীরতর। দুই পরিবারের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে অনেকের। দক্ষিণডিহি গ্রামে জন্ম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মা সারদা সুন্দরী দেবীর। রবীন্দ্রনাথের কাকিমা ত্রিপুরা সুন্দরী দেবীও এই গ্রামের মেয়ে।

আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়িও এই গ্রামে। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী ভবতারিণী ওরফে মৃণালিনী দেবীও জন্মেছেন এই দক্ষিণডিহি গ্রামে। মৃণালিনী দেবীর স্মৃতিধন্য বাড়িটি দীর্ঘ প্রায় চার যুগ ধরে অবৈধ দখলে ছিল।

খুলনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক, বর্তমান মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হকের প্রচেষ্টা ও এক তরুন সংবাদকর্মী অরুন শীলের উৎসাহে ১৯৯৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বাড়িটি দখলমুক্ত হয়। প্রায় একই সময়ে উদ্ধার হয় কুশারীবাড়ি। এর মধ্য দিয়ে পিঠাভোগের কুশারীবাড়ি নিয়ে কবি-সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ ও  লেখকদের কৌতূহলের অবসান হয়। তবে ততদিনে কুশারীবাড়ির পুরনো সেই ভবন দখলদাররা বিক্রি করে দিয়েছে। রবিঠাকুরের আদি পুরুষের এই ভিটায় সেই সময়ের দ্বিতল ভবনের ভিত্তি আবিষ্কার করে তা খননের উদ্যোগ নেন খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক প্রয়াত শিহাব উদ্দিন মো. আকবার।

পাশাপাশি তিনি বিশ্বকবির আদিপুরুষের ভিটা সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেতে ও এটি সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের মার্চ মাসে পিঠাভোগের এই স্থানকে ‘সংরক্ষিত পুরাকীর্তি সংরক্ষণ’ হিসেবে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ওই বছরের ২১ এপ্রিল খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সেখানে ‘সংরক্ষিত পুরাকীর্তি সংরক্ষণ’ হিসেবে নোটিশ টানিয়ে দেওয়া হয়। তবে এর আগেই পিঠাভোগে একটি একতলা ভবন নির্মিত হয়।

সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালা। আছে উন্মুক্ত মঞ্চ। মঞ্চের সম্মুখভাগে স্থাপন করা হয়েছে কবিগুরুর আবক্ষ মূর্তি। রবীন্দ্রজীবনী থেকে জানা যায়, বিশ্বকবির পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর পিঠাভোগের কুশারীবাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। কবির বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও দক্ষিণডিহি ও পিঠাভোগের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। কবি নিজে ১৮৮৩ সালে মামাবাড়ি দক্ষিণডিহিতে আসেন। সেই সময় তাঁর বিয়ের কনেও দেখেন। পরে একাধিকবার খুলনা শহরে এসেছেন। তবে তিনি শ্বশুরবাড়ি দক্ষিণডিহি বা পিতৃকুলের ভিটা পিঠাভোগে গেছেন এমন তথ্য পাওয়া যায় না। অবশ্য পিঠাভোগ নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল।

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রনাথের কথা’ গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ তাঁর বন্ধু লোকেন্দ্রনাথ পালিতের কাছে পিঠাভোগ গ্রাম সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। লোকেন্দ্রনাথ পালিত ছিলেন খুলনার ম্যাজিস্ট্রেট। বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক প্রশান্ত কুমার পালের রবি জীবনী গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, বন্ধু লোকেন্দ্রনাথ পালিতের আহ্বানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খুলনায় আসেন। কবে খুলনায় আসেন সে তথ্য অবশ্য নেই।

তবে ঠাকুরবাড়ির ক্যাশ বইতে ১৯০০ সালের ৩১ আগস্টের হিসাবে উল্লেখ ছিল, ‘শ্রীযুক্ত রবীন্দ্র বাবু মহাশয়ের খুলনায় যাতায়াতের ব্যয় ১৬ টাকা।’ প্রশান্ত কুমার পালের রবি জীবনী ষষ্ঠ খণ্ডের মাধ্যমে আরো জানা যায়, ১৯০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে রবীন্দ্রনাথ আরো একবার খুলনায় আসেন। তবে সেবার বেড়াতে আসেননি। একটি মামলায় সাক্ষ্য দিতে খুলনায় আসেন।

১৯০৮ সালের ৩১ জুলাই খুলনার সেনহাটি স্কুলের শিক্ষক হীরালাল সেনগুপ্ত ‘হুঙ্কার’ নামে একটি গীতিগ্রন্থ প্রকাশ করেন। ওই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ লেখাটি সংযোজিত হয়। পরে ইংরেজ সরকার গ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত করে এবং গ্রন্থের লেখককে গ্রেপ্তার করে। তারপর লেখকের বাড়ি তল্লাশি করে পুলিশ রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠি পায়। গ্রন্থটি কবির নামে উৎসর্গ করা হয়েছিল। কিন্তু তা কবি জানতেন না। বইটি হাতে এলে কবি তা পড়ে জানতে পারেন।

আর এর জন্য কবি গ্রন্থকারকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠির কারণে খুলনার ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট থেকে কবিকে সমন পাঠানো হয়। আর সে জন্য কবি খুলনায় আসেন। রবীন্দ্রনাথের আদিপুরুষ জগন্নাথ কুশারী পিঠাভোগ অঞ্চল ছেড়ে খুলনারই ফুলতলার দক্ষিণডিহি গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর অধস্তন পঞ্চম পুরুষ পঞ্চানন কুশারী দক্ষিণডিহি ত্যাগ করে কলকাতায় বসবাস করতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে কুশারীদের এই শাখা ঠাকুর পদবিতে পরিচিত হয়। এই ঠাকুর পরিবারের জোড়াসাঁকোর বাড়ি এক সময় শিল্প-সংস্কৃতির পীঠস্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়। বিশ্বকবির পিতৃপুরুষের এই ভিটায় এখন একটি একতলা ভবন রয়েছে, যেটি রবীন্দ্র সংগ্রহশালা। আছে একটি উন্মুক্ত মঞ্চ। এখানে বসবাসকারী কুশারীরাই এসব দেখভাল করে। সংগ্রহশালা ও উন্মুক্ত মঞ্চ বরাবর একটি রাস্তা করা হয়েছে। আর এখানকার পিচঢালা পথের পাশে তৈরি হয়েছে একটি দৃষ্টিনন্দন গেট। সংগ্রহশালায় রবীন্দ্রনাথের নানা সময়ের ছবি, বংশলতিকা, পূর্বপুরুষের বিবিধ পর্যায়ের সদস্যদের ছবি, পুরনো বাড়িটির ছবি ইত্যাদি সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

প্রতিবছর ২৫ বৈশাখ আর ২২ শ্রাবণ এখানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এখানকার কুশারী পরিবারের প্রবীণ সদস্য ছায়ারানী কুশারী (৮০) বলেন, ‘১৯৯৩ সালে একজন বড় কর্মকর্তা এসে বললেন,‘এটাই রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষের বাসস্থান। আমিও শুনেছিলাম রবীন্দ্রনাথ আমাদের জ্ঞাতিজন।

পরে এখানে রবীন্দ্র সংগ্রহশালা গড়ে তোলা হয়। জন্ম ও প্রয়াণ দিবসে এখানে বড় অনুষ্ঠান হয়। দেশ-বিদেশ থেকে নানা মানুষ আসে। আমরা খুবই গর্বিত যে রবীন্দ্রনাথ আমাদের পূর্বপুরুষদের একজন।’বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বাংলা সাহিত্যাকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে সু-প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি আমাদের আনন্দ আর গর্বের অনন্ত অনুভূতি। সাহিত্যের এ ধ্রুবতারার আদিপুরুষ ও আদি আত্মীয়তা সবকিছু ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশের যশোর-খুলনা অঞ্চলে। তার কতটুকু আমরা বাংলা ভাষাভাষীরা অবগত আছি? সম্প্রতি কবির আদি নিবাস ভূমি খুলনা জেলার পিঠাভোগ ঘুরে   প্রতিবেদনটি তৈরী করা হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি তথা বাঙালি জাতিকে বিশ্বের কাছে উন্নীত করেই ক্ষান্ত হননি। তিনি বস্তুত বাঙালি জাতিসত্তার প্রাণপুরুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাঁর বহুধা বিস্তৃত স্বপ্রতিভায়। স্বাভাবিক কবি রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি ব্যক্তি মানুষ রবীন্দ্রনাথকে সহজ সত্যে ধারণ করতে হয়েছে তাঁর পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকারকে। এই বংশজাত উত্তরাধিকারের ঐতিহাসিক ধারায় অবিচ্ছেদ্যভাবে, ভৌগোলিক সীমার আবর্তে তিনি আবর্তিত না হয়েও,ভৌগলিক অবস্থানের ঐতিহাসিক পরিচয়কে অস্বীকার করতে পারেননি। আর সংগত কারণেই কবি রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাসভূমি, শশুরবাড়ি, মামাবাড়ি এবং জীবনের অনেকটা সময় অতিবাহিত করেছেন খুলনা অঞ্চলে।

আদি পুরুষের বাড়ি : পিঠাভোগ-প্রাচীন যশোর জেলার বর্তমান খুলনা জেলার রুপসা উপজেলার একটি সুপরিচিত গ্রাম। সবুজ শ্যামলিমায় ভরা এ গ্রাম। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আদিপুরুষের বাড়ি এই পিঠাভোগ গ্রামে। এখানকার কুশারী পরিবার কবির আদিপুরুষ। ১৯৯৪ সালে রবীন্দ্রনাথের আদিপুরুষের একটি কারুকার্যময় সুদৃশ্য দ্বিতল ভবন খুলনার জনৈক ব্যবসায়ী ২ লক্ষ ২৪ হাজার টাকায় ক্রয় করে ভেঙ্গে নিয়ে যায়। উল্লেখ্য, যশোর বৃটিশ ভারতের প্রথম ম্যাজিস্ট্রেসী জেলা। ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে প্রাচীন যশোর জেলা সৃষ্টি হয়। ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দে খুলনা যশোর জেলার মহকুমা এবং ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে যশোর জেলা থেকে খুলনা পৃথক জেলায় রুপান্তরিত হয়। ১৯৯৪ সালে পিঠাভোগ গ্রামের বাসিন্দা অধুনালুপ্ত দৈনিক আজকের কাগজ ও দৈনিক জন্মভূমি পত্রিকার সাংবাদিক অরুন শীল (বর্তমানে অনলাইন সংবাদপত্র এই বেলা ডটকমের) কবির আদি পুরুষের বাড়ী শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি সকলের নজরে আসে।

সংবাদটি প্রকাশের পর সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে সে সময় খুলনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক কাজী রিয়াজুল হক কবির আদি নিবাস সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। কিন্ত ইতিমধ্যেই আদি নিবাস পিঠাভোগের বাড়িটি বিক্রি করে দেওয়া হয়। বাড়ি বিক্রির পর সরকারিভাবে অবশিষ্ট অংশ সংরক্ষণ করে ১৯৯৪ সালের ২৪শে নভেম্বর পিঠাভোগে রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। জেলা প্রশাসক রিয়াজুল হকের সাথে হাত লাগিয়েছিলেন অনেকেই।

এলাকার যুব ও ছাত্ররা তখন বাড়ি বাড়ি ঘুরে টাকা সংগ্রহ করে শুরু করেন রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন। ৯৪’র পর দীর্ঘ ১৬ বছর শুধুমাত্র উদ্বোধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এখানকার উন্নয়ন পরিকল্পনা। অতি সম্প্রতি সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয় ও প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তর কবির আদি নিবাসভূমি সংরক্ষণকল্পে ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করেছেন। আজ ২৫ শে বৈশাখ থেকে পিঠাভোগ রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালায় তিনদিন ব্যাপী জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে।

আদি ইতিহাস : পিঠাভোগ এবং ঘাটভোগ ভৈরব তীরবর্তী প্রাচীন জনপদ। ভৈরব অববাহিকার স্রোতধারা ধরে যেসব জনপদ গড়ে ওঠে তার অন্যতম প্রাচীন জনপদ পিঠাভোগ-ঘাটভোগ।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় খানজাহান আলীর আগমনের প্রায় দুই শতাব্দী আগেই এখানে জনপদ গড়ে ওঠে। কুশারী বংশের ইতিহাসও বেশ বিস্তৃত। ইতিহাসবিদদের মতে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ যখন বাংলাদেশ ছেড়ে কলিকাতার জোঁড়াসাকোয় বসতি স্থাপন করেন। তখন সেখানকার অধিবাসিরা সম্মানের সাথে তাদেরকে ঠাকুর অভিহিত করতেন। সেই থেকেই রবীন্ত্রনাথের পরিবার/ কুশারীদের পদবী ঠাকুর হিসেবে পরিণত হয়। কবিগুরুর পূর্বপুরুষের ভিটার সন্ধানে সরকার: সরকার প্রত্মতত্ত্ব অধিদফতরকে কবিগুরুর  পূর্বপুরুষের বসতভিটা খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ব পুরুষের ওই বসতভিটা হচ্ছে বাংলাদেশের খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগ গ্রাম । প্রত্মতত্ত্ব অধিদফতরের আঞ্চলিক পরিচালক শীহাবউদ্দিন মো. আকবর এ লেখককে জানান, পিঠাভোগ গ্রামে নোবেল বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষের বসতবাড়ীর চিহ্ন  রয়েছে। প্রাপ্ত স্বীকৃত দলিল-প্রমাণাদি এবং প্রত্মতত্ত্ব নিদর্শনের ভিত্তিতে বাড়ীর অবয়ব, কাঠামো এবং ব্যবহৃত উপকরণ নির্ণয়ের উদ্যোগ নেয়া হবে।

আকবর বলেন, আকাংক্ষা মতো সবকিছু হলে তা হবে এক চমকপ্রদ ঘটনা। কেননা, এই খুলনা জেলায়ই আবার রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ী। খুলনা প্রত্মতত্ত্ব অধিদফতর জানায়, জেলার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রামে অবস্থিত একটি দেড়তলা পাকা বাড়ী ও সন্নিহিত ১ দশমিক ৪০ একর জায়গা জুড়ে রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ী অবস্থিত। ২০০৫ সালে দক্ষিণডিহি গ্রামের বাড়ীটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয়। বাড়ী নির্মাণে কবি স্বয়ং আর্থিক সহায়তা করেছিলেন বলে প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরে তথ্য সংগৃহীত রয়েছে। এদিকে সতীশচন্দ্র মিত্র প্রণীত এতদাঞ্চলের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ‘যশোর-খুলনা ইতিহাসের ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে পয়োগ্রাম কসবা অধ্যায়ে বিশ্বকোষের পীরালী বিষয়ক অংশ এবং টি ডব্লিউ ফ্যাবেলের ‘দি টেগোর ফ্যামিলি’সহ বিভিন্ন গ্রন্থে বলা হয়েছে রবীন্দ্র পরিবারের পূর্ব পুরুষ পঞ্চানন কুশারী পৈত্রিক বাড়ীঘর ছেড়ে কোলকাতা চলে যান। উদ্যমী কুশারী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীতে চাকরি নেন। তিনি ফোর্ট উইলিয়ামে বসত গাড়েন। পঞ্চানন পুত্র জয়রাম ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ নির্মাণের জন্য পৈত্রিক ভিটা  দেন। তার পুত্র দুর্গনারায়ণ ও পৌত্র গোপীমোহন জমিদারী কিনে  জোড়াসাঁকোতে বিখ্যাত ‘ঠাকুর এস্টেট’ পত্তন করেন। তবে কোনো কোনো ইতিহাসে বলা হয়ে থাকে রবীন্দ্র-পূর্ব পুরুষেরা প্রথমে যশোরের নরেন্দ্রপুরের বাসিন্দা ছিলেন। ইতিহাস বলছে, খ্রীষ্টীয় চতুর্দশ শতকে  লিফাতাবাদের প্রতিষ্ঠাতা তুর্কি বংশজাত হযরত খানজাহান (রহ.)-এর সময়ে পীরালী ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ভুক্ত রবীন্দ্র পরিবারের বিকাশ। আরেক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, গভীর সন্তোষের বিষয় যে, কবি রবীন্দ্রনাথের পূর্ব পুরুষ বাংলাদেশের। তার শ্বশুরবাড়িও এখানে। জাতীয় কবি নজরুলের মামাবাড়িও খুলনায়। রবীন্দ নাথ জীবনকে দেখেছিলেন সাহিত্য চেতনার মধ্য দিয়ে।

এই চেতনাকে ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মানবিক। একারণেই বৈশ্বিক পরিমন্ডলে মানবতার মুক্তির দার্শর্নিক আর এক রবীন্দ নাথকে আমরা খুঁজে পাই বাঙালির চিত্তে। প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় রবীন্দ জীবনী গ্রন্থের প্রথম খন্ডে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন তার পূর্বপুরুষদের কাহিনী। বহু রবীন্দ  গবেষক তার পূর্বপুরুষদের পীরালি ব্রাহ্মণ বলে অভিহিত করেছেন।

এসকল বিষয়ে আমরা বাংলা ভাষাভাষীরা জানতে আগ্রহী। সম্প্রতি রবীন্দ নাথের আদিনিবাস খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার নিভৃতপলী পিঠাভোগ ঘুরে সরজেমিনে তৈরি করা হয়েছে এ প্রতিবেদনটি। কবি রবীন্দ নাথের পাশাপাশি ব্যক্তি রবীন্দ নাথকে সহজ সত্যে ধারণ করতে হয়েছে তার পূর্বপরুষের উত্তরাধিকারকে। তার পূর্বপুরুষদের আদি নিবাসভ‚মি, শশুরবাড়ি,মামাবাড়ি যেখানে ছিল সেখানে তারও জীবনের অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়েছে সেই খুলনায়। আদি পুরুষের বাড়ি: পিঠাভোগ প্রাচীন যশোহর জেলার বর্তমান খুলনা জেলার রুপসা উপজেলার একটি সুপরিচিত গ্রাম। রবীন্দ নাথের আদিপুরুষের বাড়ি এই পিঠাভোগ গ্রামে।

এখানকার কুশারী পরিবার কবির আদিপুরুষ। ১৯৯৪ সালে রবীন্দ নাথের আদিপরুষের একটি কারুকার্যময় সুদৃশ দ্বিতল ভবন খুলনার জনৈক ব্যবসায়ী ২ লক্ষ ২৪ হাজার টাকায় ক্রয় করে ভেঙ্গে নিয়ে যায়। উলেখ্য, যশোহর বৃটিশ ভারতের প্রথম ম্যাজিস্ট্রেসী জেলা। ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে প্রাচীন যশোহর জেলা সৃষ্টি হয়। ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দে খুলনা যশোহর জেলার মহকুমা এবং ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে যশোহর জেলা থেকে খুলনা পৃথক জেলায় রূপান্তরিত হয়। খুলনা জেলার পিঠাভোগ গ্রাম এবং ঘাটভোগ ভৈরব তীরবর্তী প্রাচীন জনপদ। ভৈরব অববাহিকার স্রোতধারা ধরে যেসব জনপদ গড়ে ওঠে তার অন্যতম প্রাচীন জনপদ পিঠাভোগ-ঘাটভোগ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় খানজাহান আলীর আগমনের প্রায় দুই শতাব্দী আগেই এখানে জনপদ গড়ে ওঠে। কুশারী বংশের ইতিহাসও বেশ বিস্মৃত। রবীন্দ  গবেষকদের মতে, রবীন্দ নাথ ঠাকুরের পিতামহ যখন বাংলাদেশ ছেড়ে কলিকাতার জোড়াসাঁকোয় বসতি স্থাপন করেন তখন সেখানকার অধিবাসিরা সম্মানের সাথে তাদেরকে ঠাকুর নামে অভিহিত করতেন। সেই থেকেই রবীন্দ নাথের পরিবার কুশারী পদবী বদলে ঠাকুর হিসেবে পরিণত হয়। রবি ঠাকুরের পূর্বপুরুষের আদি নিবাস খুলনার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগ  গ্রামে। একথা ১৯৫২ সালের আগে কারও জানা ছিল না। পিঠাভোগ নামক গ্রামটি ঘাটভোগ ইউনিয়নভূক্ত। নওয়াপায়া বিশ্ব রোড থেকে ৮ কি. মি. দক্ষিণে

আলাইপুর সেতু পার হয়ে ১ কি.মি. পূর্বে ভৈরব নদের ৪শ’ ফুট উত্তরে কবিগুরুর পূর্বপুরুষের বসতভিটে পিঠাভোগের কুশারীবাড়িতে।কুশারীরা ছিলেন ব্রাহ্মণ। তাদেরকে পীরালী ঠাকুর বলা হতো। কুশারীদের একাংশ এখনও পিঠাভোগ গ্রামে বসবাস করছেন।

বিশ্বকবির পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর জমিদারির প্রয়োজনে হোক আর রক্তের টানেই হোক পিঠাভোগের কুশারীবাড়ির সাথে যোগাযোগ রাখতেন। পিঠাভোগ রবীন্দ্রনাথের আদি পুরুষের কারুকার্যময় সুদৃশ্য দ্বিতল ভবনের ১৯৯৪ সাল পযর্ন্ত অস্তিত্ব ছিল। উল্লেখ্য, যশোর বৃটিশ ভারতের প্রথম ম্যাজিস্ট্রেসি জেলা। ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে যশোর জেলার যাত্রা শুরু হয়। তখন রূপসার পিঠাভোগ গ্রামসহ এ অঞ্চল ছিল যশোর জেলার অধীনে। ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে খুলনা মহাকুমা তার ৪০ বছর পর ১৮৮২ সালে জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পিঠাভোগ ও ঘাটভোগ ভৈরব নদের তীরবর্তী প্রাচীন জনপদ। ভৈরব অববাহিকার স্রোতধারা ধরে যে সব জনপদ গড়ে ওঠে তারই অন্যতম প্রাচীন জনপদ পিঠাভোগ।

ঐতিহাসিকদের তথ্য সূত্র অনুযায়ী, পীর খানজাহান আলী (রহ.) বাগেরহাটে আগমনের প্রায় কয়েক শ বছর আগে ভৈরব অববাহিকায় এই প্রাচীন জনপদ গড়ে ওঠে। ঐতিহাসিক যোগসূত্র থেকে পিঠাভোগ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ব পুরুষ কুশারীদের আর্বিভাব ও গোড়াপত্তন এবং প্রাচীন আদিবসতি বিন্যাসের চিত্র থেকে গ্রামটির প্রাচীনত্ব সম্পর্কে তথ্য মেলে।

খ্রি. অষ্টম থেকে একাদশ শতকের মধ্যে আদিশুরের রাজস্বকারে বৌদ্ধ প্রভাবাচ্ছন্ন বঙ্গদেশে হিন্দু ধর্মের বিশুদ্ধতা ফিরিয়া আনতে এ প্রাধান্য বিস্তারের অভিপ্রায়ে কান্যকুঞ্জ থেকে যে পঞ্চ ব্রাহ্মণের আবির্ভাব ঘটে তাদের মধ্যে শাল্ল্যি গোত্রীর ক্ষিতিশ ছিলেন অন্যতম। পিঠাভোগের কুশারীরা ও শাল্ল্যি গোত্রীয় ক্ষিতিশের বংশজাত ব্রাহ্মণের ধারাবাহিক উত্তর পুরুষ দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিকে পিঠাভোগের সন্তান খুলনার জন্মভূমি নামক স্থানীয় দৈনিকের তৎকালীণ  রূপসা উপজেলা প্রতিনিধি অরুণ শীল (বর্তমানে  রাজশাহীতে কর্মরত) কুশারীর বাড়ি রবী ঠাকুরের আদি সম্পর্কিত তথ্য দিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ১৯৯৫ সালের মে মাসে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন থেকে পিঠাভোগ ও কুশারী বংশ সম্পর্কে অবহিত হয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও প্রত্মতত্ত্ব বিভাগ পদক্ষেপ নেয়ার জন্য জেলা প্রশাসককে দাপ্তরিক পত্র পাঠায়।

জেলা প্রশাসক কাজী রিয়াজুল হক, রূপসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পি বি রায়, উপজেলা প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম পিঠাভোগের কুশারী বাড়ি পরিদর্শন করেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রতিবেদন পাঠায়। কুশারী বাড়ির অট্টালিকা অক্ষত ছিল। অভাব অনটনের কারণে কবির বর্তমান বংশধরেরা সেই ভবনটি বিক্রি করে দেয়। খুলনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক কাজী রিয়াজুল হকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এং অর্থায়নে পিঠাভোগের গৌরন্দ্র কুশারী ও বরুন কুমার কুশারীর কাছ থেকে ১৯৯৫ সালের ১৫ নভেম্বর ২৬ হাজার টাকা পোনে দশমিক ১৫ একর জমি রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালার পক্ষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ক্রয় করে। ওই বছরের ২৪ নভেম্বর সরকারিভাবে পিঠাভোগ নির্মিত হয় রবি ঠাকুরের ভাস্কর্য ও রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালা। সেই থেকে পিঠাভোগে ঘটা করে পালিত হচ্ছে কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ডঃ মসিউর রহমান পিঠাভোগ রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে অন্তর্ভুক্তকরণসহ উন্নয়নের জন্য তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন।

২০১১ সালের এপ্রিল মাসে কবির বাস্তুভিটা অনুসন্ধানে পরীক্ষামূলক প্রত্মতাত্ত্বিক খনন হয়। কবির পূর্ব পুরুষের বসত ভিটে সংরক্ষণের কোন পদক্ষেপ মন্ত্রণালয় গ্রহণ করেনি। কথিত আছে ভট্ট নারায়ণের পুত্র দ্বীননাথ শাল্ল্যি গোত্রীয় শ্রেণীয় ব্রাহ্মণ মহারাজ্য ক্ষিতিশুরের অনুগ্রহে বর্ধমান জেলার ‘কুশ’ নামক গ্রামে দানস্বত্ব লাভ করে কুশারী গোত্রভুক্ত হন (বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস, ব্রাহ্মণ কাণ্ড, পৃ. ১২১) সেখান থেকে রবী ঠাকুরের পূর্ব পুরুষের উপাধি কুশারী উদ্ভব হয়। (রবীন্দ্র জীবনী, ১ম খণ্ড, প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়)। কালক্রমে ঢাকা,ঠাকুড়া ও খুলনার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগ গ্রামে কুশারীদের আবাসভূমি হিসেবে গড়ে ওঠে।

দ্বীননাথ কুশারীর অক্ষম পুরুষ তারানাথ কুশারী ভৈরব তীরবর্তী পিঠাভোগ গ্রামে বসতি স্থাপন করেনে। তারানাথ কুশারীর দুই পুত্র রামগোপাল ও রামনাধ কুশারী। রামগোপালের পুত্র পিঠাভোগের জমিদার জগন্নাথ কুশারীই ছিলেন ঠাকুর পরিবারের আদি পুরুষ। ফুলতলা থানার দক্ষিণডিহি গ্রামের শুকদেব রায় চৌধুরীর কন্যার জন্য ব্রাহ্মণপাত্র পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রচুর অর্থ ব্যয় করে তিনি রূপসা থানার পিঠাভোগ গ্রামের জগন্নাথ কুশারীর সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দেন। জগন্নাথ কুশারী পীরালি ব্রাহ্মণ পরিণত হয়। ভিন্ন জাতের কন্যা বিয়ে করে জাতিচ্যুত হন।

শেষাবধি তাকে পিঠাভোগ ত্যাগ করে শ্বশুরবাড়ি দক্ষিণডিহিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে হয়। এভাবেই রবি ঠাকুরের দক্ষিণডিহির মাতৃকূল ও শ্বশুরকুলের রায় চৌধুরী বংশের সাথে কবির আদিপুরুষ পিঠাভোগের কুশারী বংশের প্রাচীনকালে আত্মীয়তার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সম্পর্কটি ষোড়শ শতাব্দীর কোন এক সময়ের। এই জগন্নাথ কুশারীর দ্বিতীয় পুত্র পুরুষোত্তম থেকেই ঠাকুর ধারা প্রবাহমান। জগন্নাথ কুশারীর পরবর্তী বংশধর পঞ্চানন কুশারী পারিবারিক মত পার্থক্যের কারণে দক্ষিণডিহি ত্যাগ করে। গঙ্গাঁ তীরে কালিঘাটে কলকাতা শহরে গোবিন্দপুর গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। কলকাতায় শহরের গোবিন্দপুরে খুলনার পিঠাভোগ গ্রাম থেকে আগত পঞ্চানন কুশারীকে স্থানীয়রা ভক্তি ভরে গ্রহণ করে। ইংরেজরা তখন আজকের ঐতিহাসিক কলকাতা শহরের গোড়াপত্তন করে। স্থানীয়রা তাদের মুখপাত্র হিসেবে পঞ্চানন কুশারীকে ইংরেজদের সাথে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রাখতে অনুরোধ করে।

কুশারীরা দিন ব্রাহ্মণ। স্থানীয় রুচিবান মানুষেরা ব্রাহ্মণ পঞ্চানন কুশারীকে সম্মান করে ঠাকুর বলে ডাকত। এভাবেই পিঠাভোগের কুশারী কলকাতায় ঠাকুর হিসেবে পরিচিতি পান। এ সময়ে ভাগীরক্ষী নদীতে ইংরেজদের বাণিজ্য তরী ভীড়ত। সেই বাণিজ্য তরীর মাল ওঠানো এবং নামানোর ঠিকাদারী এবং খাদ্য সামগ্রী সরবরাহের ব্যবসা করেন পঞ্চানন কুশারী। এ কাজে নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের শ্রমিক ঐ শ্রমিকেরা পঞ্চানন কুশারীকে ঠাকুর বলে ডাকায় জাহাজের ক্যাপ্টেনদের কাছেও তিনি ঠাকুর বলে পরিচিত পান। তাদের কাগজপত্রে TAGORE বা TAGOURE লেখা দেখা যেত। 

এখান থেকে ঠাকুর উপাধির প্রচলন (রবীন্দ্র জীবনী ১ম/পৃ. ৩)।কলকাতার গোবিন্দপুর গ্রামের পঞ্চানন ঠাকুরের পরবর্তী বংশধর নীলমনি ঠাকুর অর্থ সম্পদের মালিক হয়ে জোড়া সাঁকোয় যেয়ে বসবাস শুরু করেন। জোড়া সাঁকোয় ঠাকুর বংশেই ১৮৬১ সালে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র নোবেল বিজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পঞ্চানন ঠাকুরের দুই পুত জয়রাম ও রামসন্তোষ এবং শুকদেব এর একপুত্র কৃষ্ণচন্দ্র। এরা তিনজনেই ইংরেজ বণিকদের সহায়তায় ইংরেজি শেখেন এবং ফারসি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় জরিপকাজ শুরু হলে জয়রাম ও রামসন্তোষ আমিন পদে নিযুক্ত হন। সে জন্যে খুলনার পৈত্রিক বাসভূমি পিঠাভোগ আমিনের ভিটা বলে খ্যাত। অবশ্য উত্তরপাড়া নরেন্দ্রপুরের আবাসনও আমিনের ভিটা বলে পরিচিত। আমিনের কাজ করে প্রভূত ধন সম্পদ অর্জন করেন এবং জয়রাম আমিন ঠাকুর কলকাতায় ধন সায়রে বাড়ি, জমাজমি ও গঙ্গাতীরে বাগানবাড়ি নির্মাণ করেন।

১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে জয়রামের মৃত্যু হয়। এ প্রসঙ্গে স্মরণীয় জয়রাম ঠাকুরের বিয়ে হয় দক্ষিণডিহির রায় চৌধুরী বংশের পীরালি ব্রাহ্মণ কন্যা গঙ্গাদেবীর সাথে।সে অর্থে জয়রামের শ্বশুরবাড়ি দক্ষিণডিহি (রবীন্দ্র জীবনী ১ম/পৃ. ৪)। জয়রাম ঠাকুরের তিন পুত্র নীলমনি, দর্পনারায়ণ ও গোবিন্দরাম। জয়রামের মৃত্যুর পর নীলমনি ও দর্পনারায়ণ ধন সায়রের সম্পত্তি বিক্রি করে নগদ পাঁচ হাজার টাকা পান এবং পলাশীর যুদ্ধের পর ক্ষতিপূরণ হিসেবে ছয় হাজার টাকা প্রাপ্ত হন এবং জয়রামের নগদ দুই হাজার টাকাসহ তারা মোট তেরো হাজার টাকার মালিক হন। পরে পাথুরেঘাটায় জমি ক্রয় করে তারা বসবাস শুরু করেন। নীলমনি এবং দর্পনারায়ন সাহেবদের সেক্রেটারীর কাজ শুরু করে প্রভূত ধন অর্জন করেন। অতঃপর জমিদারী কিনে জমিদার হন।

নীলমনি এই অভিজাত্যের প্রতিষ্ঠাতা। কিছুদিনের মধ্যেই নীলমনি ও দর্পনারায়ণের মধ্যে সম্পদ নিয়ে মনোমালিন্য দেখা দেয়। নীলমনি পাথুরিয়া-ঘাটের সমস্ত সম্পত্তি এক লক্ষ টাকার বিনিময়ে দর্পনারায়ণকে ছেড়ে দিয়ে জোড়াসাঁকোয় এসে আবাস গড়ে তোলেন। নীলমনি থেকেই কুশারী পরিবর্তিত ঠাকুর বংশের নিজস্ব ধারা প্রবাহিত। নীলমনি তার পুত্র কন্যাদের মধ্যে কন্যাদের বিয়ে নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ঘরে দিলেও, পুত্রদের বিয়ে দিয়ে ছিলেন খুলনার পীরালি বংশে।(পীরালী বংশ; বিশ্বকোষ ১১/পৃঃ ৪৮৫)। নীলমনির মৃত্যুর পর ঠাকুর পরিবারের প্রধান রামলোচন ধণাঢ্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হন। রামলোচনের কোন পুত্র সন্তান না থাকায় তিনি ভ্রাতা রামমনির পুত্র দ্বারকানাথকে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। রামলোচনের যখন মৃত্যু হয় তখন দ্বারকানাথের বয়স মাত্র বারো-তেরো বছর। এ সময়ে রামমণি জীবিত থাকলেও যাবতীয় ভূ-সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন রামলোচনের স্ত্রী নরেন্দ্রপুরের মেয়ে অলকাদেবী। অলকাদেবী দ্বারকানাথের সাথে স্বীয় গ্রামের কন্যা দিগম্বরী দেবীর বিয়ে দেন।(পীরালী বংশ; বিশ্বকোষ ১১/পৃ.৪৮৫)। দ্বারকানাথ ইংরেজি ভাষা ভালোভাবে শিখেছিলেন। এ কারণে ইংরেজদের সহায়তা তিনি লাভ করেন।

যৌবনেই তিনি ব্যবসা শুরু করেন, প্রথমে রেশম ও নীল ক্রয়ের ব্যবসা করলেও পরে তিনি বিলাতে অর্ডার সরবরাহ শুরু করেন। তার পৈতৃক জমিদারি বিরাহিমপুর থাকলেও তিনি ২৪ পরগনার কালেক্টর ও লবণ অধ্যক্ষের দেওয়ান পদে নিযুক্ত হন। ইংরেজদের সহচর্যে তিনি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত করেন। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে দ্বারকানাথ ঠাকুর কোম্পানী নামে কুঠিস্থাপন করেন, শিলাইদহ ও অন্যান্য নীলকুঠিও কিনে নেন। রানীগঞ্জে কয়লার খনি ও রামনগরে চিনির কারখানা ইজারা নিয়ে পরিচালনা, তার অন্যান্য প্রতিভার বৈশিষ্ট্য। দ্বারকানাথ এই সময় জমিদারি ক্রয় করেন। নাটোরের জমিদারি তার অধীনে চলে আসে। সুদূর উড়িষ্যা পর্যন্ত দ্বারকানাথের জমিদারি বিস্তৃত হয়। প্রথম বাঙালি দ্বারকানাথ সামাজিক সব বাধা অতিক্রম করে বিলেতে যান। প্রথম জীবনে নিষ্ঠাবান থাকলে তিনি ঐশ্বর্য বৃদ্ধির সাথে সাথে সংস্কার ত্যাগ করেন।

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71