শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮
শুক্রবার, ২রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
খেলাপিরাও ব্যাংকের টাকা লুট করেছেন
প্রকাশ: ০২:১৮ pm ১৩-০৬-২০১৭ হালনাগাদ: ০২:৫৬ pm ২০-০৬-২০১৭
 
 
 


শওগাত আলী সাগর : সোনালী ব্যাংকের এমডির বরাতে একটা খবর ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। খবরটা বার বার পড়ছিলাম।

পড়ছিলাম—সরকারি খাতের দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংকের এমডির ব্যাংকিং ভাবনা অনুধাবনের মাধ্যমে তার দক্ষতা এবং যোগ্যতা বোঝা যায় কিনা, তার খোঁজ করা। সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেছেন, ‘মামলা করেও খেলাপি ঋণের টাকা আদায় করা যাচ্ছে না। বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছে আমরা অসহায় হয়ে পড়ি।

’ তিনি বলেন, মামলা হলেই রিট হয়, রিটের জাল থেকে বের হতে পারি না। এসব মামলা নিষ্পত্তি করতে রাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে হবে। ” এমডি সাহেব রাজনীতিবিদ না। রাজনীতিবিদরা কোনো দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেন না। অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। সোনালী ব্যাংকের এমডি রাজনীতিক না হলেও খেলাপি ঋণ আদায়ের দায়িত্ব সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন। ঋণ কেন খেলাপি হয়েছে, সেই দায়িত্ব কার—এ ব্যাপারে তিনি কোনো কথা বলেননি।

তিনি বলেছেন, খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণ আদায় কেন করা যাচ্ছে না তা নিয়ে। সাংবাদিকরা বিতরণ করা ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ব্যাংক তথা ব্যাংকারের দায়িত্ব সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করেছিলেন কি-না, পত্রিকায় প্রকাশিত খবর পড়ে সেটা বোঝা যায়নি। এ নিয়ে কথা বলার আগে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের চিত্রটা একটু দেখি। এ চিত্রটা এমডি সাহেব নিজেই দিয়েছেন।

তিনি জানিয়েছেন, ‘বর্তমানের ব্যাংকের আমানত এক লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণ দেওয়া হয়েছে ৩৮ হাজার কোটি টাকা। তবে ঋণের ১৯ হাজার কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। ’ বলে কি! ৩৮ হাজার কোটি টাকা ঋণের ১৯ হাজার কোটি টাকা খেলাপি! মানে অর্ধেক ঋণই খেলাপি। যে প্রতিষ্ঠানের বিতরণ করা ঋণের অর্ধেক খেলাপি হয়ে যায়—সে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় টিকে থাকার কোনো কারণ থাকে কি? তা হলে সোনালী ব্যাংককে কেন রাখতে হবে? এই যে বিতরণ করা ঋণের অর্ধেক খেলাপি হয়ে গেছে, সেটি নিশ্চয়ই একদিনে হয়নি। কাদের ঋণ দেওয়া হবে, ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা সক্ষমতা পরিমাপের নিশ্চয়ই একটি মানদণ্ড আছে। সেই মানদণ্ডটি টিকঠাকমতো কাজ করছে কি-না—সেটি কী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কখনো পর্যালোচনা করে দেখেছে? পশ্চিমে দেখি ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ক্রেডিট হিস্ট্রি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যে লোক নিজের ক্রেডিট কার্ডের বিল সময়মতো পরিশোধ করে না, ব্যাংক তাকে বড় অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রে বিশ্বাস করবে কেন? পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তা করে না। আবার ব্যক্তির ক্রেডিট স্কোরের ওপর ঋণের সুদের হার নির্ভর করে বলে কেউ পারতপক্ষে স্কোর নষ্ট করতে চায় না। টেলিফোনের বিলটা বকেয়া হয়ে গেলেও সেবাপ্রদানকারী কর্তৃপক্ষ পাওনা টাকার পরিমাণটা কালেকশন এজেন্সিতে পাঠিয়ে দেয়। কালেকশন এজেন্সিতে যাওয়া মানেই ক্রেডিট স্কোরে দাগ বসে যাওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি রিপোর্ট না কি যেন এক সময় শুনতাম। এগুলো কি এখনো আছে? ঋণ দেওয়ার সময় এই রিপোর্ট কি বিবেচনায় নেওয়া হয়? আচ্ছা, কাউকে ঋণ দেওয়ার সময় ব্যাংকগুলো কিভাবে অ্যাসেসমেন্ট করে? একটি প্রতিষ্ঠান ঋণ দিয়ে যাচ্ছে, আর সেগুলো আদায় হচ্ছে না, খেলাপি হয়ে যাচ্ছে, তারপরও ওই প্রতিষ্ঠান ঋণ দেয় কিভাবে? সোনালী ব্যাংক তার বিতরণ করা ঋণের অর্ধেক খেলাপি করে ফেলার পরও তাদের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা থাকে কীভাবে?

এমডি সাহেব বলেছেন, ‘মামলা করেও খেলাপি ঋণের টাকা আদায় করা যাচ্ছে না। বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছে আমরা অসহায় হয়ে পড়ি। ’ আর্থিক খাতে মামলা-মোকদ্দমা নতুন কোনো তথ্য নয়। ব্যাংক ঋণ, রাজস্ব আদায় বন্ধ করতে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা মামলা ঠুকে দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আটকে রেখেছে। ব্যাংক ঋণ আর বকেয়া রাজস্ব হিসাবে নিলে মামলার কারণে আটকে থাকা টাকার পরিমাণ সরকারের জাতীয় বাজেটের পরিমাণের চেয়ে সম্ভবত কম হবে না। আর্থিক খাতের মামলা পরিচালনার জন্য উচ্চ আদালতে আলাদা একটি বেঞ্চ গঠনের দাবি উঠেছিল অনেক বছর আগে। সেই দাবি এখন আর শোনা যায় কি-না জানি না। তবে কোনো সরকারই এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। এমডি সাহেব যে বললেন, মামলা করেও খেলাপি ঋণের টাকা আদায় করা যাচ্ছে না—কেন যাবে না? ব্যাংকের তো নিজস্ব আইনজীবী প্যানেল আছে। তারা কী করে? সেখানে যদি মামলা লড়ার মতো যোগ্য আইনজীবী না থাকে, তা হলে ব্যাংকের তো উচিত ভালো দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া। যারা ‘লোক দেখানোর জন্য নয়, ব্যাংকের টাকা আদায়ের জন্য মামলা লড়বে’—এমন আইনজীবী কি ব্যাংক নিয়োগ দিতে পারে না? ব্যাংক তো অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সহায়তাও চাইতে পারে এ ব্যাপারে। আইনি লড়াইয়ে ব্যাংকগুলো কতটা মনোযোগ দিচ্ছে—সেটা নিয়েও তো প্রশ্ন করার সুযোগ আছে। আবারও আগের কথায় ফিরে আসি। ব্যাংক কাদের ঋণ দেবে, কাদের দেবে না—সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার গ্রহণযোগ্য একটা মাপাকাঠি থাকা দরকার। নইলে খেলাপি ঋণের নামে ব্যাংকের টাকা লুটপাটই হতে থাকবে। সোনালী ব্যাংকের এমডি ‘হলমার্ক ব্যাংক থেকে টাকা লুট করেছে’ বলে মন্তব্য করেছেন। আমি বলি, খেলাপিরাও ব্যাংকের টাকা লুট করেছে। এই লুটে ব্যাংক ব্যবস্থা, ব্যাংকাররা সহায়কের ভূমিকা পালন করেছেন মাত্র।

লেখক : কানাডার বাংলা পত্রিকা ‘নতুনদেশ’-এর প্রধান সম্পাদক।

এইবেলাডটকম /আরডি

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71