সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮
সোমবার, ২৬শে অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
গণতন্ত্রের মাঝেও পরিবারতন্ত্র!
প্রকাশ: ০৯:০৯ am ০৭-০৫-২০১৫ হালনাগাদ: ০৯:০৯ am ০৭-০৫-২০১৫
 
 
 


   ‘যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র চলছে, সেহেতু সেখানে রাজ, পরিবার বা এ রকম যে কোনো তন্ত্রই থাকা উচিত নয়।’ যুক্তরাষ্ট্রের সর্বকালের অন্যতম সেরা ইতিহাসবিদ আর্থার স্লোষিঙ্গার জুনিয়র ঠিক এ রকম একটি কথাই ১৯৪৭ সালে বলেছিলেন। প্রায় ৭০ বছর পর দেশটি যখন আরো একজন নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে, তখনও কিন্তু একটি তন্ত্র আছে। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ নয়টি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দৌড়ের সবক’টিতেই একজন ক্লিনটন, নয় একজন বুশ জিতেছেন। সামনের নির্বাচনে মুখোমুখি অবস্থানে থাকা হিলারি বনাম জেবের লড়াইয়েও তন্ত্রের পরিসংখ্যানে কোনো ভুল নেই।
অবাক হওয়ার মতোই। যে দেশ রাজপ্রথা থেকে মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছিল, সে দেশে আবার এমনতর হয় কী করে? ভুল প্রশ্ন। সারা বিশ্বেই রাজনীতি কিংবা ব্যবসা— দুটোই কিন্তু এখনো নির্দিষ্ট কিছু পরিবারেরই হাতে। সব দেশের বর্তমান শীর্ষ নেতাই কিন্তু অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতায় আছেন। ভারতে ও পাকিস্তানের গান্ধী ও ভুট্টো পরিবার আছে। কেনিয়ায় কেনিয়াটরা এখনো রাজা। পেরুতে এখনো নেতৃত্বে রয়েছে ফুজিমোরি। কানাডায় আছে ট্রুডো। চীনও কিন্তু এ দেশগুলোর তালিকায় আছে। দেশটির কমিউনিস্ট পার্টিতে বড় অঙ্কের অনুদান দেয়া সদস্যদের সন্তানরা কিন্তু প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আশপাশেই থাকেন।
ইউরোপের কথায় আসি। সেখানে রাজনীতি যেন একটা বন্ধ দোকানের মতো। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের ৬৫০ জন সদস্যের ৫৭ জনই কোনো না কোনোভাবে আগের কোনো এমপির সঙ্গে সম্পর্কিত। বেলজিয়ামের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সাবেক এক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ইউরোপীয় কমিশনারের সন্তান। গ্রিসে এখনো পাপানদ্রু এবং কারামানলিস পরিবারের নাম বাতাসে ভাসে।
এত গেল রাজনীতির কথা। ব্যবসার ক্ষেত্রেও চিত্রটা প্রায় একই রকম। বর্তমানে বিশ্বের ৯০ শতাংশেরও বেশি ব্যবসা বংশপরম্পরায় পরিবারই চালিয়ে আসছে। এর মধ্যে নিউজ করপোরেশন আর ভক্সওয়াগনও আছে। দ্য বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের হিসাবে, যেসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আয় ১০০ কোটি ডলারের বেশি, এমন ৩৩ শতাংশ আমেরিকান প্রতিষ্ঠানই একক কিছু পরিবারের মাধ্যমে পথ পাড়ি দিচ্ছে। ফ্রান্সে এ সংখ্যাটা শতাংশে ৪০। জার্মানিতেও ৪০ শতাংশ। আর উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এ হারটা আরো বেশি হওয়ারই কথা।
এই যে কিছু পরিবার শতাব্দীর পর শতাব্দী ক্ষমতা আর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে, তা বিস্মিত করে অনেককেই। এ বিস্মিত হওয়ার তালিকায় আছেন আধুনিক অর্থনীতি আর রাজনৈতিক থিওরির পথিকৃত্রাও। জনগণ ভোট দেয়ার কারণে রাজনৈতিক ক্ষমতা একটি পরিবারের হাতে থাকার তো কথা না। আর পারিবারিক ব্যবসারও তো টিকে থাকার কথা না, যেখানে পাবলিক কোম্পানিগুলো লাখ লাখ ক্ষুদে বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে অর্থ নিয়ে কোম্পানি বড় করতে পারে, সেখানেও আবার পরিবারতন্ত্র কীভাবে থাকে।
কিন্তু থাকছে। আত্মীয়তার উপকারিতা অনেক! কিছু পরিবারের হাতে ক্ষমতা থাকার মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে ব্যক্তিগত যোগাযোগ আর ব্র্যান্ড। আবার পারিবারিকভাবে যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠে, সেগুলো অনেক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে আর পাবলিক কোম্পানির চেয়ে অনেক বেশি দূরদর্শী হয়ে থাকে। পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো চায় তাদের ব্যবসা যুগ যুগ ধরে টিকে থাকুক। এ কারণে তারা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করতে ভয় পায় না। সামনের বছর শেয়ারহোল্ডারদের কীভাবে মুনাফা দিতে হবে, এ চিন্তায় থাকতে হয় না তাদের।
রাজনৈতিক ক্ষমতায় থাকা পরিবারগুলো বড় থেকে আরো বড় হয়ে উঠতে পারে। সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনকে তারা স্বাগত জানায়। আর নারীমুক্তির কারণে পরিবারগুলোর পরিধি আরো বেড়েছে। এ কারণে পৃথিবী পরিচিত হয়েছে পার্ক জিন, কেইকো ফুজিমোরি আর মিসেস ক্লিনটনের সঙ্গে। একইভাবে নারীদের হাতে রয়েছে স্পেনের সানতান্দর ব্যাংক, অস্ট্রেলিয়ার হ্যাংকক প্রসপেক্টিং এমনকি সৌদি আরবের ওলায়ান ফিন্যান্সিং কোম্পানির লাগাম।
নিউইয়র্ক টাইমসের হিসাব অনুযায়ী, একজন গভর্নরের সন্তানের গভর্নর হওয়ার সম্ভাবনা একজন সাধারণ মানুষের তুলনায় সন্তানের চেয়ে ৬ হাজার গুণ বেশি। একজন সিনেটরের ক্ষেত্রে এটি সাড়ে ৮ হাজার গুণ। অবশ্য ক্ষমতা আর অর্থ এভাবে একটি ছোট জায়গায় আবদ্ধ থাকার বিষয়টি কিন্তু অনেক প্রশ্নও তোলে।
নেতিবাচক কয়েকটি দিকের কথা বলা যাক। যেসব জায়গায় ব্যবসা আর রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেখানে বিষয়টির নেতিবাচক প্রভাব খুব বেশি হওয়ার কথা। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের উদাহরণ দেয়া যাক। ক্ষমতায় আসার আগে প্রায় সব ধরনের মানুষই ক্লিনটনের পারিবারিক ফাউন্ডেশনে বেশ কয়েক কোটি ডলার অনুদান দিয়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, এর মাধ্যমে তারা ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্টের ওপর এক ধরনের প্রভাব খাটাতে পারবেন।
যারা সহজে অর্থ আয় করতে চান, তারা কিন্তু এভাবে রাজনৈতিক শীর্ষ ব্যক্তিদের অর্থ দিয়ে প্রতিযোগিতা না করেই অনেক আয় করতে পারেন। সোজা ভাষায় দুর্নীতি করতে পারেন। এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৩ সালে বিশ্বের বাজারে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ৮ শতাংশের মালিক ছিল রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজনরা। আত্মীয়তা না থাকলে অর্থের মাধ্যমেও আত্মীয়তা গড়ে নেয়া সম্ভব। পিরামিড পদ্ধতিতে এর ফলে অল্প কিছু মানুষের হাতেই বেশির ভাগ অর্থ চলে আসে।
আরেক গবেষণা অনুযায়ী, পর্তুগালের শীর্ষ ১০ ধনী পরিবারের হাতে দেশটির ৩৪ শতাংশ সম্পদ রয়েছে। ফ্রান্স আর সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে এটি ২৯ শতাংশ।

প্রতিযোগিতার মাধ্যমে টিকে থাকা সবচেয়ে ভালো। উন্মুক্ত বাজারে যেখানে সঠিক নিয়ম রয়েছে আর সংবাদের স্বাধীনতা রয়েছে, সেখানে আত্মীয়তা থাকলেও অবশ্য খুব একটা লাভ হয় না। তবে স্বচ্ছতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল নির্বাচনী প্রচারণার দিকে আর এ পদ্ধতির দিকে লক্ষ রাখা প্রয়োজন। পিরামিড পদ্ধতি অর্থ আটকে ফেলে। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৩০ সালে এ ধরনের ব্যবস্থা বন্ধ করেছে। যুক্তরাজ্যও এর পরে এ পথে হাঁটা শুরু করেছে। ইসরায়েলও একই পথে হাঁটছে। অন্যান্য দেশেরও বিষয়টিতে লক্ষ রাখা প্রয়োজন। কারণ প্রতিযোগিতা ছাড়া উঠে আসা কোনো কিছুকেই স্বাগত জানানো উচিত নয়।

এইবেলা.কম/এইচ আর

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71