বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৩০শে কার্তিক ১৪২৫
 
 
গণিতজ্ঞ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৭৭তম জন্ম বার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ১২:১০ am ১২-০৩-২০১৭ হালনাগাদ: ১২:১০ am ১২-০৩-২০১৭
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

কবি, সংগীতকার, দার্শনিক, সম্পাদক এবং গণিতজ্ঞ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর (জন্মঃ- ১১ মার্চ, ১৮৪০ – মৃত্যুঃ- ১৯ জানুয়ারি, ১৯২৬)

বাংলা সাহিত্যে তাঁর প্রথম অবদান ছিল ধ্রুপদি সংস্কৃত ভাষায় রচিত কালিদাসের মেঘদূত কাব্যের বঙ্গানুবাদ। ১৮৬০ সালে, নোবেল পুরস্কার-বিজয়ী কনিষ্ঠ ভ্রাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের ঠিক এক বছর আগে, এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল। গ্রন্থ প্রকাশকালে দ্বিজেন্দ্রনাথের বয়স ছিল মাত্র কুড়ি বছর। এই অনুবাদটিই ছিল মেঘদূতের প্রথম বাংলা অনুবাদ। দ্বিজেন্দ্রনাথ এই গ্রন্থ অনুবাদকালে দু-টি ভিন্ন বাংলা ছন্দশৈলী ব্যবহার করেছিলেন।
তাঁর দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ স্বপ্নপ্রয়াণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৭৫ সালে। এই গ্রন্থ প্রকাশকালে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কিশোর মাত্র। এই কাব্যে এক যুবকের ভ্রমণবৃত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে। এই গ্রন্থে বিভিন্ন ছন্দশৈলীর প্রয়োগের উপর তাঁর আশ্চর্য নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। গ্রন্থটি সেই যুগের বাংলা কাব্যের এক দিকনির্দেশক এবং সেই কারণে এর ঐতিহাসিক মূল্যও অনস্বীকার্য।
উচ্চ প্রতিভাবান কবি হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তি দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন অত্যন্ত অগোছালো মানুষ। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, স্বপ্নপ্রয়াণ কাব্যের ছেঁড়া পাণ্ডুলিপির পাতা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির যেখানে সেখানে ছড়িয়ে পড়ে থাকত। এগুলি সংগ্রহ করে প্রকাশ করা গেলে তা উক্ত গ্রন্থের একটি মূল্যবান সংস্করণ হত।

দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ‘এক সত্যকারের দার্শনিক’। তিনি ‘ন্যাশানাল সোসাইটি’ ও ‘বিদ্বজ্জন সমাগম’ নামে দুটি দর্শনচর্চাকারী সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় সহায়তা করেছিলেন। গীতা-দর্শনের প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।
তাঁর প্রধান দর্শনগ্রন্থ হল তত্ত্ববিদ্যা (তিন খণ্ডে, ১৮৬৬-৬৮)। এই বইটি বাংলা দর্শনচর্চার ইতিহাসে একটি পথপ্রদর্শক গ্রন্থ। বাংলা ভাষায় এই জাতীয় বই পূর্বে প্রকাশিত হয়নি। তাঁর অপর দু-টি দর্শন গ্রন্থ হল অদ্বৈত মতের সমালোচনা (১৮৯৬) ও আর্যধর্ম ও বৌদ্ধধর্মের ঘাত-প্রতিঘাত (১৮৯৯)।

১৮৮৪ সাল থেকে সুদীর্ঘ ২৫ বছর তিনি তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তিনি হিতবাদী পত্রিকাটিও প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রকাশ অব্যাহত রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অপর ভ্রাতা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতী নামে একটি নতুন পত্রিকা চালু করার প্রস্তাব দেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ এই পত্রিকার সম্পাদনার ভার গ্রহণ করলেও, পত্রিকাটি চালাতেন মূলত জ্যোতিরিন্দ্রনাথই।
বাংলা সাহিত্যে তাঁর অনবদ্য অবদানের জন্য ১৮৯৭ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত মেয়াদে তাঁকে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল। ১৯১৪ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের অধিবেশনে তিনিই পৌরহিত্য করেছিলেন।

দ্বিজেন্দ্রনাথ বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা করতেন। তিনি ছিলেন বাংলা সংকেত লিপি বা শর্ট হ্যান্ড প্রবর্তনের এক অগ্রপথিক। তিনি কবিতার আকারে সংকেত লিপিও চালু করেন। বাংলা গানে স্বরলিপির ব্যবহার প্রবর্তনের ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। সেযুগে রাজা সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের সহকারী ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী ছাড়া আর কেউ এই কাজ করেননি। ১৯১৩ সালে বাক্সের গঠন বিষয়ে বাক্সমিতি নামে একটি পুস্তকও রচনা করেছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ। কাগজ মুড়ে নানা রকম আকৃতি দেওয়া ছিল তাঁর শখ।
১৮৬৬ থেকে ১৮৭১ সাল পর্যন্ত তিনি আদি ব্রাহ্মসমাজের আচার্যের পদ অলংকৃত করেন। ব্রজসুন্দর মিত্রের তত্ত্বাবধানে ঢাকা ব্রাহ্মসমাজের সূচনাপর্বে তিনি পিতা দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে ঢাকা পরিভ্রমণ করেছিলেন।
দ্বিজেন্দ্রনাথ হিন্দুমেলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। হিন্দুমেলার জন্য তিনি দেশাত্মবোধক গানও রচনা করেছিলেন। গানরচনা ছিল তাঁর স্বভাবগত। তাঁর রচিত ব্রহ্মসংগীত করো তাঁর নাম গান, যতদিন রহে দেহ প্রাণ বহু বছর ৭ পৌষের প্রার্থনায় গীত হয়েছিল। ব্রাহ্মসমাজের সাধারণ প্রার্থনাতেও তাঁর রচিত ব্রহ্মসংগীতগুলি বহুলভাবে গীত হয়ে থাকে। হিন্দুমেলার জন্য লেখা তাঁর একটি জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গান ছিল মলিন মুখচন্দ্রমা ভারত তোমারি।
শান্তিনিকেতনে
জীবনের শেষ কুড়ি বছর দ্বিজেন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে প্রকৃতির সাহচর্যে জ্ঞানচর্চা ও লেখালিখির মাধ্যমে অতিবাহিত করেন। শান্তিনিকেতনের আশ্রমিকদের নিয়ে তিনি হাস্যোদ্দীপক চতুষ্পদী ছড়া রচনা করতেন। এই ছড়াগুলি প্রকাশিত হত শান্তিনিকেতন পত্রিকায়। তাঁর রসবোধ শান্তিনিকেতনে সকলের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল। শান্তিনিকেতনে চড়াই পাখি, কাঠবিড়ালি আর কাকেদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল প্রবাদপ্রতীম। ঈশ্বরজ্ঞান লাভের পর মানুষের হৃদয় শিশুর তুল্য হইয়া যায় - উপনিষদ্‌ শাস্ত্রের এই শিক্ষা তিনি মেনে চলতেন। তিনি নানা বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেছিলেন। তবে তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল দর্শন। রবীন্দ্রনাথ সহ অন্যান্য বিদ্বান ব্যক্তিদের নিতে তিনি মজলিশ বসাতেন। এই মজলিশে তিনি তাঁর রচনা পাঠ করে শোনাতেন। কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে বিধুশেখর শাস্ত্রী ও ক্ষিতিমোহন সেনের সাহায্য নিতেন।
রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বড়োদাদা বলে ডাকতেন। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে মহাত্মা গান্ধী ও চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজ শান্তিনিকেতনে এসে দ্বিজেন্দ্রনাথের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁরাও তাঁকে বড়োদাদা সম্বোধন করেন। দ্বিজেন্দ্রনাথের লেখা একটি চিঠি সংবাদপত্রে প্রকাশের উদ্দেশ্যে দিয়ে মুখবন্ধ হিসাবে মহাত্মা গান্ধী লেখেন, “আপনারা দ্বিজেন্দ্রনাথকে চেনেন। তিনি শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড়োদাদা এবং তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতোই কার্যত সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করে থাকেন।” 
জন্ম
পারিবারিক পরিচয়ে তিনি ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ঠাকুর পরিবারের জোড়াসাঁকো শাখার দ্বারকানাথ ঠাকুরের পৌত্র এবং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র। তাঁর বাল্যশিক্ষা মূলত গৃহশিক্ষকের নিকট। যদিও তিনি কলকাতার সেন্ট পল’স স্কুল ও হিন্দু কলেজেও (অধুনা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) কিছুকাল পড়াশোনা করেছিলেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ তাঁর পরের ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। যদিও দুই ভাইয়ের মধ্যে প্রকৃতিগত কিছু পার্থক্য ছিল। দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন সমাজের প্রচলিত সংস্কারগুলির একনিষ্ঠ অনুগামী। অন্যদিকে সত্যেন্দ্রনাথ এই সংস্কারগুলিকে ভেঙে নব্য আধুনিক সমাজ গঠনের পক্ষপাতী ছিলেন। অনাড়ম্বর সহজ সরল জীবনযাপনে অভ্যস্থ দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন কাব্যামোদী, জ্ঞানতাপস ও পরীক্ষানিরীক্ষা-প্রিয় মানুষ।

রচনাবলি
বাংলা: ভ্রাতৃভাব (১৮৬৩), তত্ত্ববিদ্যা (১৮৬৬-৬৮), সোনার কাঠি রূপার কাঠি (১৮৮৫), সোনায় সোহাগা (১৮৮৫), আর্যামি এবং সাহেবিয়ানা (১৮৯০), সামাজিক রোগের কবিরাজি চিকিৎসা (১৮৯১), অদ্বৈত মতের সমালোচনা (১৮৯৬), ব্রহ্মজ্ঞান ও ব্রহ্মসাধনা (১৯০০), বঙ্গের রঙ্গভূমি (১৯০৭), হারামণির অন্বেষণ (১৯০৮), গীতাপাঠের ভূমিকা (১৯১৫) এবং প্রবন্ধমালা (১৯২০)।
ইংরেজি: বক্সোমেট্রি (বাক্সমিতি) (১৯১৩), অন্টোলজি (১৮৭১) এবং জ্যামিতি-সংক্রান্ত একটি বই।
জ্ঞানাঙ্কুর, প্রতিবিম্ব, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, ভারতী, সাধনা, নবপর্যায় বঙ্গদর্শন, মানসী, সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা, শান্তিনিকেতন, বুধবার, শ্রেয়সী, প্রবাসী, সবুজপত্র ও সুপ্রভাত পত্রিকাতে তাঁর অজস্র রচনা প্রকাশিত হয়েছিল।
উত্তরপুরুষ
দ্বিজেন্দ্রনাথের পাঁচ পুত্র ছিল — দীপেন্দ্রনাথ, অরুণেন্দ্রনাথ, নীতীন্দ্রনাথ, সুধীন্দ্রনাথ ও কৃপেন্দ্রনাথ। এঁদের মধ্যে সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬৯-১৯২৯) ছিলেন একজন বিশিষ্ট লেখক। তিনি একাধিক কবিতা, উপন্যাস ও ছোটোগল্প রচনা করে গিয়েছেন। ১৮৯১ সালে সাধনা নামে তিনি একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। তিনিই ছিলেন এই পত্রিকার সম্পাদক। পরে এই পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব রবীন্দ্রনাথ নিজের হাতে তুলে নেন। কালক্রমে পত্রিকাটি ভারতী পত্রিকার সঙ্গে বিলীন হয়ে যায়।
তাঁর পৌত্রদের মধ্যে দীপেন্দ্রনাথের পুত্র দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৮২-১৯৩৫) ছিলেন বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ। তিনি একবার গান শুনেই তা তুলে নিতে পারতেন। রবীন্দ্রনাথ স্বরচিত গানে সুরারোপ করলেও, সেই সুর মনে রাখতে বা তার স্বরলিপি রচনা করতে গিয়ে তাঁকে সমস্যায় পড়তে হত। এই কাজ করতেন দিনেন্দ্রনাথ। তিনি রবীন্দ্রসংগীতের প্রধান স্বরলিপিকারেদের মধ্যে অন্যতম। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে “সকল গানের কাণ্ডারী” বলতেন।
দ্বিজেন্দ্রনাথের অপর পুত্র সুধীন্দ্রনাথের পুত্র সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯১০-১৯৭৪) ছিলেন বিশিষ্ট বাগ্মী। ১৯৬০-এর ও ১৯৭০-এর দশকে সাংস্কৃতিক জগতে তাঁর নাম সুপরিচিত ছিল। প্রথম জীবনে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বঙ্গের রঙ্গের কথা কত আর ক'ব।
নিত্য হয় অভিনয় দৃশ্য নব নব॥
এলে'ন বিলাত-ফের্তা গায়ে কোর্ত্তাকুর্ত্তি।
অর্দ্ধ গোরা, অর্দ্ধ কালা, বর্ণচোরা মূর্ত্তি॥
কুর্দ্দয় দর্দ্দর, যেন শার্দুলের নাতি।
দর্পে হ্যালে কেঁচো, যেন সর্পের স্বজাতি॥
পায়রা তোলে পাখম, শিখীর দেখি শিখি।
ঠোকর দিয়ে বলে কাক, “কেকা ডাকো-দিখি”?
নাসিকা বর্দ্ধন করি, মূষিকা-সুন্দরী,
কী সরেস করিণী সেজেছে, আহা মরি॥
জালা-মিছরি ফেলি থুয়ে খুদে পিঁপড়েগুলি,
ঝোলা-গুড়ের সঙ্গে করে মরণ-কোলাকুলি॥
এই সব দৃশ্য দেখি, বনি গিয়া জড়্।
কলির চতুর্থ-পাদে করিলাম গড়॥

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71