বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৩০শে কার্তিক ১৪২৫
 
 
গায়ত্রীমন্ত্র ও ষট্চক্রের আলোকে ফিরে এসো চাকা
প্রকাশ: ১০:১৫ pm ২১-০১-২০১৬ হালনাগাদ: ০১:১৫ am ২২-০১-২০১৬
 
 
 


জুবিন ঘোষ।।

“আমার ছেলের নাম কেলো, বৌ রাধা”

কবিতার শহীদ ঈশ্বরীয় ক্ষমতাপ্রদত্ত কবি বিনয় মজুমদার। এহেন কবিকে নিয়ে কী গল্পের ও রটনার শেষ আছে? বিনয় মজুমদার গণিতের মেধার সঙ্গে মিশ্রিত করেছিলেন কাব্যের মনন। নিজের জীবন সম্পর্কে চরম বেহিসেবী হলেও গণিতশাস্ত্রকে তিনি কবিতার মাধ্যমে হয়তো তাঁর গাণিতিক গণ্ডি ছেড়ে কবিতায় উন্মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। শিবপুর বি. ই কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করা ইঞ্জিনিয়ার বিনয় মজুমদারের গণিত ভাবনার ওপর দুটি পাণ্ডুলিপি করেছিলেন। একটি Interpolation Series এবং দ্বিতীয়টি Geometrical Analysis and United Analysis Roots of Calculus. বই দুটি যদিও প্রকাশ করেননি বা যা হয়ে থাকে, এ দেশে চিন্তাশীল ব্যক্তিদের ভাবনা প্রকাশকের অভাবে অতলেই তলিয়ে যাওয়া নিয়ম হয়তো সেই নিয়মেই এখনও এই পাণ্ডুলিপি দুটি রয়েছে কলকাতা জাতীয় গ্রন্থাগারের জিম্মায়। গণিতে রিয়ালিস্ট বলে একটি ধারণা আছে, তাতে রিয়ালিস্টরা মনে করেন যে গণিতের একটা আলাদা পৃথ্বী আছে, সেখানেই সমস্ত সংখ্যা ও জ্যামিতিক সূত্রগুলো দুর্দান্ত সমন্বয়ে বাস করে, গণিতজ্ঞদের কাজ শুধু সেই পৃথিবীর সন্ধান করে তাকে মনুষ্যগোচর করে যোগসূত্রগুলো মিলিয়ে পরবর্তী আবিষ্কারগুলর দিকে ধাবিত হবার। গণিতের প্রতিটা আইডিয়া একেকটা এগজিস্টিং দর্শন, মানে তার অস্তিত্ব বর্তমান। সিম্বলগুলো তার ছবি। বিনয় মজুমদার সেই সিম্বলগুলোকেই রেখায় ও শাব্দিক উপস্থাপনা করলেন, মিশিয়ে দিলেন জীবনদর্শন। অর্থাৎ এতদিন ছিল যা গাণিতিক দর্শন, তা হয়ে গেল কাব্যিক জীবন দর্শন। বিনয় লিখছেন,


"ত্রিভুজ তোমাকে কেউই দেখিনি


ত্রিভুজ দেবতা, তবু ভাবি তিনি


দেখি যে তোমার ছবিই যথা।"


এভাবেই 'যুক্ত সমীকরণ' কবিতায় জীবনদর্শন মিশে যাচ্ছে। এপাশের অঙ্ক ওপাশে আসার ফলে, মানে দুটো জীবন এক জায়গায় হলে যেন জীবনটাও শূন্যে রূপায়িত হয়ে যাচ্ছে দেখি-


"যে কোনো গণিতসূত্র নিয়ে তার পরবর্তীদের


বাঁ পাশে আনার পরে সে সমীকরণে


সমান চিহ্নের পরে- ডান পাশে শূন্য হয়ে যায়।"


কবিতায় তিনি গণিত নিয়ে স্বপ্ন দেখেন, 'আমি গণিত-আবিষ্কর্তা'-তে সেই স্বপ্নই যেন সামনে চলে আসে।


"আমি গণিত-আবিষ্কর্তা, আমার নিজের আবিষ্কৃত


ঘনমূল নির্ণয়ের পদ্ধতিটি বিদ্যালয়ের ঐচ্ছিক গণিতে


অন্তর্ভুক্ত আর পাঠ্য হয়ে গেছে, যেটি


ক্রমে ক্রমে পৃথিবীর সব বিদ্যালয়ে


পাঠ্য হবে। এর ফলে কুড়ি কোটি ছাত্রছাত্রী আমার গণিত


পড়ে যাবে যতদিন পৃথিবীতে মানুষ ও দেবদেবী রবে।"


প্রত্যেক পাঠকের কাছে তার জীবনের প্রতিফলনই কবিতা পড়ার মূল রস। পাঠক কবিতার মাধ্যমে তার জীবনের অস্তিত্বকে খোঁজে- তার শোক, আনন্দ, অনুভূতি, বলা, না-বলা কথা, জাগতিক দাহ প্রভৃতির মাধ্যমে কবিতাকে সম্যক যাপন করতে পারলে উপলব্ধি একদিন অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে তার কাছে। কবির সার্থকতা এভাবেই যখন তার অভিজ্ঞতাবোধ বা সংজ্ঞা আর তার ব্যক্তিগত থাকে না। সেই পথেই পাঠকও প্রজ্ঞাবান হয়ে ওঠেন। হয়তো কবিও সেইরকমই। ওই যে গণিতের রিয়ালিস্টিক ধারণার কথা বলছিলাম, সেখানে তাঁরা মনে করেন গণিতের একটা জগৎ আছে, ঠিক সেইভাবেই হয়তো কবি বিনয় মজুমদার গণিতকে উপজীব্য করে যতবার কবিতা লিখেছেন, ততবার তিনি সেই রিয়ালিস্টিক জগতের অন্তঃস্থিত হয়েছেন। সেখানেও তাঁর একটা সমান্তরাল সংসার যেন তৈরি করেছেন, তিনি ততবার উল্লেখ করছেন [কবিতার নাম- ১) 'আমি গণিত-আবিষ্কর্তা'; ২) 'ভারতীয় গণিত'; ৩) 'যুক্ত সমীকরণ'] "আমার ছেলের নাম কেলো, বৌ রাধা।"- এক আলাদা রিয়ালিস্টিক জগৎ, সেই গণিত জগতের পাতানো স্বপ্নের সংসার।


গায়ত্রী কোনও প্রেমের মিথলজি নয়,


পরম সাধিত স্তব-


দৃশ্যায়ন যখন শুধুমাত্র দৃশ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, অপার মুগ্ধতায় দর্শনে রূপান্তরিত হতে থাকে সেই মুহূর্ত থেকে দৃশ্যকল্প ও দর্শনের মাঝামাঝি একধরনের জৌলুস আসে যার বিচ্ছুরণে হৃদয়ঙ্গম হয় আরও কিছুক্ষণ যদি এই কবিতাগুলোর সানি্নধ্যে নাড়া-বাঁধা হয়ে থাকতে পারতাম- এটাই কবিতার তনি্নষ্ঠ গুণ যা নিস্তব্ধ উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে যেন আমাদের বশীকরণের মন্ত্রে বশ করে ফেলে। আর সেই বশীকরণের মন্ত্রটাই হলো হিন্দু শাস্ত্রের বিখ্যাত বেদমন্ত্র তথা স্তব- গায়ত্রী মন্ত্র। আমি সেই বিনয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গায়ত্রী চক্রবর্তীর মিথলজির কথা বলছি না, সত্যিই কি বিনয়ের মত কবি শুধু একটা নামকেই তাঁর কবিতার সমগ্রতা অর্পণ করবেন? নাকি সামগ্রিক সমাজকে? যে সমাজের সঙ্গে একটি সূর্যস্তব, আলোকোজ্জ্বল জীবনের ছটাতে উদ্ভাসিত করবেন।


প্রথমেই আমরা 'গায়ত্রীকে' কাব্যগ্রন্থের ৭ই জুন, ১৯৬১ সালের রচনাকে দেখব যেটা পরে পরিমার্জিত হয়ে 'ফিরে এসো চাকা' কাব্যগ্রন্থের 'আমার আণ্ডর্য ফুল' হয়েছিল, তার শেষ চারটি পঙ্?ক্তি,- "আমি মুগ্ধ; উড়ে গেছ; ফিরে এসো ফিরে এসো চাকা, / রথ হয়ে, জয় হয়ে, চিরন্তন কাব্য হয়ে এসো। / আমরা বিশুদ্ধ দেশে গান হবো, প্রেম হবো, অবয়বহীন / সুর হয়ে লিপ্ত হবো পৃথিবীর সকল আকাশে।"- এবার গায়ত্রী স্তবকে দেখি-


"ওঁ ভূর্ভূবঃ স্বঃ, তৎ সবিতুর্ব্বরেণ্য, ভর্গো দেবস্য ধীমাহি।


ধিয়ো যো নঃ প্রচোদয়াৎ। ওঁ "


গায়ত্রী শুধুমাত্র একটা মন্ত্র না, এটা হিন্দুত্বের একটা পরম সাধিত স্তব। যার সুর অমর। এই প্রসঙ্গে শ্রী রশ্রন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'শান্তিনিকেতন' গ্রন্থস্থ 'ভক্ত' প্রবন্ধটিতে কবিগুরু যে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন সেটাতে দেখি, রবি ঠাকুর বলছেন, "একদিকে ভূলোক, অন্তরীক্ষ, জ্যোতিষ্কলোক, আর একদিকে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি আমাদের চেতনা- এই দুইকেই যদি এক শক্তি বিকীর্ণ করছে তাঁর এই শক্তিকে বিশ্বের মধ্যে এবং আপনার বুদ্ধির মধ্যে ধ্যান করে উপলব্ধি করবার মন্ত্র হচ্ছে গায়ত্রী।" বিনয়ের 'আমার আণ্ডর্য ফুল'-এর শেষ কয়েক পঙ্ক্তির মধ্যে বলছেন, "আমরা বিশুদ্ধ দেশে গান হবো, প্রেম হবো, অবয়বহীন / সুর হয়ে লিপ্ত হবো পৃথিবীর সকল আকাশে।" সেখানে এক অমরতার চিহ্ন পাই সকল আকাশে বিচরণ করার শক্তির মধ্যেই। গায়ত্রী স্তবের সুর যা 'জয় হয়ে, চিরন্তন কাব্য হয়ে' আসে হিন্দুদের কাছে। হিন্দু বলতে এখানে হিন্দবাসীদের কাছে। এই অমরতা যা মন্ত্রের সুরেই সম্ভব। স্বর না থাকলেও সুর থেকে যায় আনাদিকাল, পুনরাবিষ্কার হয় তার। সেই গায়ত্রী মন্ত্রোচ্চারণের সুরেই বিনয় বলেছেন "লিপ্ত হবো পৃথিবীর সকল আকাশে।"


এবার আমরা ফিরে দেখি 'মুকুরে প্রতিফলিত' (২৬. ৮. ৬০) কবিতায়, "মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়।" সারস শব্দের অর্থভেদ এখানে জরুরি, একভাবে দেখতে গেলে সারসন এবং সারস্বত-এর যথাক্রমে ূন এবং ূবত বাদ গেলে সারস পড়ে থাকে। সারসন মানে পুরুষের কটিবন্ধ এবং নারীদের কোমরের চন্দ্রহার। আর শ্বেতশুভ্র সারস হংসপ্রজাতীয় বলে সারস্বত দেবী বাগদেবীর প্রতিরূপ। মানুষ সেখানে কি সত্যিই হিংস্রতার নাকি তা অজ্ঞানতা, যুক্তির ধারক যে ধী ও বোধ উভয়েই সরে যায়। গায়ত্রী স্তবেও বলছে, "ধিয়ো যো নঃ প্রচোদয়াৎ"- ধ্যানের দীক্ষা ধীসূত্রেই সম্ভব, তাকে গোচরে না এনে বিশ্বচরাচরে নিমগ্ন হতে হবে, মানুষের নিকট আগমন সেখানে ধী-সাধনার অন্তরায়, সাধনা ভঙ্গের সূত্রপাত। সারস তো উড়বেই। শৃঙ্গলের সঙ্গে ধী ও বোধ সত্যিই হয়তো যায় না, তা এক মুক্ত চিন্তা যা উড্ডীন, সতত পলায়নরত।


এখন বেদমন্ত্রের আলোকে দেখা যাক, 'ধী' কী! সূর্যের কল্যাণতম তাপ মানবের ব্যক্তি-চৈতন্যের উপরে বেগ সৃষ্টি করে জ্ঞান আত্মা বা 'ধী'-এর পরিস্ফুরণ ঘটায়। এই 'ধী' যা মানুষের আত্মশক্তিকে তেজপূর্ণ করে সূর্যের অমৃতজ্যোতির সঙ্গে সাযুজ্যতা দিয়ে থাকে। ধী প্রসঙ্গে ঋগ্বেদের ২/৪০/৬ ঋক বলছে, 'ধিয় পূষা জিন্বতু বিশ্বামিত্রো রয়ি সোমো রয়িপতির্দাধাতু...'। মানে হল, সব জীবনের ধ্যানে, মননে, চিন্তনে রয়েছেন পূষা, তিনিই ধী যা সবার ধ্যান চোইতন্যের স্ফূরণ করে, সোমলতাকে ধী রসবন্ত করে। গায়ত্রী স্তবেও বলছে, "ধিয়ো যো নঃ প্রচোদয়াৎ"। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন এই ধ্যানকে উপলব্ধি করতে হয়। আবিষ্কার করতে হয়, তাই তো 'আমার আণ্ডর্য ফুল' কবিতায় বিনয় লিখেছেন 'দীর্ঘ তৃষ্ণা ভুলে থাকি আবিষ্কারে, প্রেমে।' গায়ত্রী মন্ত্র একবারে হয় না তাকে ধীরে ধীরে ১০ থেকে ১০৮ বার করতে হয়, বিনয় 'আমার আণ্ডর্য ফুল' কবিতায় লেখেন, "নিমেষেই / গলাধঃকরণ তাকে না ক'রে ক্রমশ রস নিয়ে / তৃপ্ত হই,"- এই ধীর স্বাদ গ্রহণের চমৎকার অবস্থায় প্রকৃত সাধক 'পরাবর ব্রহ্ম' দর্শন করেন। দর্শনের শেষে যা আসে তা দেব দর্শনের মতো মিলিয়েও যায়, শরীর সাকার হয় না, চিত্ররূপ থেকে যায় মনে, "প্রাচীন চিত্রের মতো চিরস্থায়ী হাসি নিয়ে তুমি/ চলে যাবে; ক্ষত নিয়ে যন্ত্রণায় স্তব্ধ হব আমি (ভালোবাসা দিতে পারি- ১৮.৫.৬২)।"


এইভাবে একটা স্তব বা বেদমন্ত্র গায়ত্রী একটা জীবন্ত মানবী হয়ে ওঠে। ঠিক যেভাবে গায়ত্রী মন্ত্রের মধ্যে অন্তর্নিহিত আছে এক অপূর্ব আলোর পরিস্ফূরণ, স্রোতের তরঙ্গশীর্ষে রয়েছে উত্তরণের সাংকেতিক লিপি। লক্ষ কোটি মুহূর্তের প্রবাহে যিনি নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে এই শক্তিকে আত্মস্থ করতে পারেন তিনিই যোগী। ধী অর্থাৎ বোধ আমাদের রক্ষা করছে, বোধের পূজারী হলেন বিনয় মজুমদার। তিনি যে এখানে সাধনা করেছেন এ কথা বলছি না, তিনি গায়ত্রীর মূল রসকে বারবার সেই স্তবের ব্যখ্যায় অন্তস্থিত মর্মে পদার্পণ করেছেন। ধী ও গায়ত্রীকে মিশিয়ে দিয়েছেন কাব্যের আধ্যাত্মিকতায়। এখানেই কাব্য রস, যা সরস, যা সারস তাই সারস্বত।


ষট্চক্রের আলোকে ফিরে এসো চাকা তথা চক্র


'ফিরে এসো চাকা' তো সভ্যতার প্রধান চক্র, যার মাধ্যমে সভ্যতা গড়িয়ে ছিল, আর চক্র মানেই ষট্?চক্র। সেখানে দেখুন রয়েছে- ১) মূলাধারচক্র, ২) সাধিষ্ঠানচক্র, ৩) মণিপুরচক্র, ৪) আনাহতচক্র, ৫) বিশুদ্ধি চক্র, ৬) আজ্ঞাচক্র। তবে এই চক্রের পুনঃসাধনার কথাই বলেছেন কবি বিনয় মজুমদার। এত চরম আধ্যাত্মিক গভীরতার দিকে এগুচ্ছে বিনয়ের ফিরে এসো চাকা, যাকে বলতে পারি ফিরে এসো চক্র- সভ্যতার সাবলীল গতিসমূহ, মানব দেহের সাবলীল সাধনাসমূহ। মূলাধারচক্র-সাধনায় মানবের বাসনাসিদ্ধ হয়- সে মুক্তিলাভ করে। বিনয় 'আমার আণ্ডর্য ফুল'-এ বলছেন- "কাকে বলে নির্বিকার পাখি। / অথবা ফড়িং তার স্বচ্ছ ডানা মেলে উড়ে যায়। / উড়ে যায়, শ্বাস ফেলে যুবকের প্রাণের উপরে। /... / আমি মুগ্ধ; উড়ে গেছ; ফিরে এসো ফিরে এসো চাকা,", এই মুগ্ধ উড়ে যাবার মধ্যে মুক্তির স্বাদ, মুগ্ধের অর্থ বাসনা পরিতৃপ্তির ফল। এই মুগ্ধ উড়ান আমরা বার বার পাই ফিরে এসো চাকার প্রথম কবিতাতেই, 'একটি উজ্জ্বল মাছ' যা ১৯৬০, ৮ই মার্চের লেখায় আশ্রিত- "একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে / দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে পুনরায় ডুবে গেল- এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে / বেদনার গাঢ় রসে অপক্ব রক্তিম হল ফল/... বিপন্ন মরাল ওড়ে, অবিরাম পলায়ন করে..."- আবার 'কাগজ কলম নিয়ে' (১৪.১০.৬০) কবিতায় বিনয় লিখছেন, "তবু কী আণ্ডর্য, দ্যাখো উপবিষ্ট মশা উড়ে গেলে / তার সেই উড়ে যাওয়া ঈষৎ সংগীতময় হয়।" - এই ওড়াটাই হল মুক্তির আর্কিটাইপ, উড়ে যেতে চাইছে সব ছিন্ন করে, মুক্তি পেতে চাইছে বাসনা তৃপ্ত করে, যা মূলাধারচক্র-সাধনার মূল রস যা আমার ফিরে আসছে 'মুকুরে প্রতিফলিত' (২৬ আগস্ট, ১৯৬০) কবিতায়, "মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়।" যাক এখানে মুক্তিটাই দেখানোর কথা ছিল, সেটাই দেখালাম, যা আরও একবার উপস্থিত ছিল 'ভালোবাসা দিতে পারি' (১৮.০৫.১৯৬২) কবিতায়, "পারাবত, বৃক্ষচূড়া থেকে/ পতন হলেও তুমি আঘাত পাও না, উরে যাবে। / প্রাচীন চিত্রের মতো চিরস্থায়ী হাসি নিয়ে তুমি / চ'লে যাবে;"। এভাবেই পরস্পর একটা ঐচ্ছিক মুক্তির পথে বার বার তাঁর কলম অজান্তে লিখে চলেছে 'ফিরে এসো চাকা'-তে সেই ষট্চক্রের মুলাধারচক্রের সার কথা।


অন্তত আমার মনে হয়েছে ষট্চক্রের প্রত্যেকটা চক্রের কথাই লিখে গেছেন কবি বিনয় মজুমদার, আমার কথা প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে পুনরায় আমি ফিরে যাচ্ছি 'আমার আণ্ডর্য ফুল' কবিতায়, সেখানে বিনয় লিখছেন, "আমি রোগে মুগ্ধ হয়ে দৃশ্য দেখি, দেখি জানালায় / আকাশের লালা ঝরে বাতাসের আশ্রয়ে আশ্রয়ে" এবং একই সঙ্গে দেখব 'আমিই তো চিকিৎসক' (৬. ৩. ৬২)-এর পঙ্ক্তিগুলি, "আমিই তো চিকিৎসক, ভ্রান্তিপূর্ণ চিকিৎসায় তার / মৃত্যু হলে কী প্রকার ব্যাহত আড়ষ্ট হয়ে আছি। / আবর্তনকালে সেই শবের সহিত দেখা হয়; / তখন হৃদয়ে এক চিরন্তন রৌদ্র জ্ব'লে ওঠে।" কী অসাধারণ রোগমুক্তির আর্তি। মৃত্যুচেতনার মধ্যে দিয়ে রোগমুক্তির সাধনা, শব যেন তান্ত্রিক ভাবাপন্নতা, আর সেখানেই লুকিয়ে রয়েছে স্বাধিষ্ঠান চক্র যার সাধনায় শরীর ব্যাধিমুক্ত ও রূপবান হয়। এবার একটু পূর্ণাঙ্গ ও আরও গভীরতায় যাই এই স্বাধিষ্ঠান চক্রের। সেখানে বলছে ষড়দল হচ্ছে একটা পদ্ম। যা মূলাধারচক্রের যা মানবের মাতৃগর্ভাবাসকালের অষ্টম মাসে মূলাধার চক্র গঠিত হয়, ৩২টি জ্ঞানগম্য সূক্ষ্মগ্রন্থিযুক্ত নাড়ী মলদ্বার থেকে মেরুদণ্ডের সমান্তরাল অবস্থান করে, যেখানে নাভিপদ্মকে কেন্দ্র করে ঊর্দ্ব ও অধঃ দুইভাবে বিভক্ত, এই মূলাধারচক্রের ঊধর্ে্ব বিদ্যুদ্বর্ণ ষড়দলপদ্ম উপস্থিত। সেখানে একটি বরুণমণ্ডল আছে। বরুণ মানে জলাধিপতি বারি বর্ষণকারী দেবতা, বৃষ্টির প্রতীক যা আকাশ থেকে লালার মতো ঝরে। এবার ঐ বরুণমণ্ডলের মধ্যে একটি অর্দ্ধচন্দ্রাকৃতি যন্ত্রে 'বং' বীজের উপর শুভ্র মকরবাহনে বরুণদেবতার ক্রোড়ে লক্ষ্মীরূপা নীলবর্ণা রাকিনী-শক্তিসহ নারায়ণ বিদ্যমান। এবার একটু দেখাই যাক বিনয় মজুমদার 'আমার আণ্ডর্য ফুল' কবিতায় কী বলেছেন, "আমি রোগে মুগ্ধ হয়ে দৃশ্য দেখি, দেখি জানালায় / আকাশের লালা ঝরে বাতাসের আশ্রয়ে আশ্রয়ে"- আকাশের লালা যা বারি বর্ষণের প্রতীকী। অর্থাৎ বরুনের কৃপা লাভ। সেই বারি বর্ষণে মুগ্ধতার মাধ্যমে কবির রোগমুক্তি স্বাধিষ্ঠানচক্রের সমর্থন এবং আমরা জানি বরুণ দেবতার প্রধান অস্ত্র বাণ হল বারির বা বৃষ্টির তীক্ষ্ন ফলা, তাতেই তিনি বিদীর্ণ করেন, সেখানে বিনয় 'আমার আণ্ডর্য ফুল'-এ পঞ্চম পঙ্?ক্তিতে লিখছেন, "জেনেছি বিদীর্ণ হওয়া কাকে বলে, কাকে বলে নীল / আকাশের হৃদয়ের; কাকে বলে নির্বিকার পাখি।" একটু আগেই দেখলাম লক্ষ্মীরূপা নীলবর্ণা রাকিনী-শক্তিসহ নারায়ণ ষড়দলপদ্ম উপস্থিত। বিনয়ও লিখছেন, যে তিনি জেনেছেন, "কাকে বলে নীল- / আকাশের হৃদয়ের;"- এই নীল সেই লক্ষ্মীরূপা নীলবর্ণা নারায়ণ যা 'বরুণদেবতার ক্রোড়ে' অর্থাৎ বিনয়ের কবিতায় "আকাশের হৃদয়ে" ("কাকে বলে নীল- / আকাশের হৃদয়ের;") অবস্থান করে। এবং সর্বোপরি, 'আমার আণ্ডর্য ফুল' কী তবে সেই অ-অগি্নস্পর্শা নাভীপদ্ম, ষড়দলপদ্ম। এরপর আশা করি 'ফিরে এসো চাকা'-তে স্বাধিষ্ঠান চক্র তথা ষট্?চক্রের উপস্থিতি নিয়ে সংশয় থাকা উচিত না।


এরপর আসা যাক মণিপুরচক্রে। মণিপুরচক্রে বলছে যে এই সাধনার ফলে সাধক অন্য শরীরেও প্রবেশ করতে পারেন, যেভাবে "আমার আণ্ডর্য ফুল, যেন চকোলেট"-এর মতো এক বস্তুস্থিত অবস্থান থেকে অন্য বস্তুস্থিত অবস্থানে চলে যাচ্ছেন। একটু প্রক্ষীপ্ত উদাহরণ মনে হতে পারে পাঠকের, যেন জোর করে ঢোকানো, কিন্তু কবিতায় এক দেহ থেকে আরেক দেহ মিশে যাওয়ার কোনও সুস্পষ্ট উদাহরণ হয় না, মিশে যাওয়াটাই অনুভব করতে হয়, একটা চিত্র বারবার অন্য চিত্রের সঙ্গে অন্য আর্কেটাইপের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। "একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে / দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে পুনরায় ডুবে গেল"- এই যে দৃশ্যত সুনীলের সঙ্গে স্বচ্ছ জলে মিশে যাওয়াটাই তো মণিপুরচক্র। এইরকম প্রায় প্রত্যেক কবিতাতেই এই বৌদ্ধিক সাধকের মিশে যাওয়ার প্রবণতা ধরা যায়। 'একটি উজ্জ্বল মাছ' কবিতায় সেই মিশে যাবার আকাঙ্ক্ষা শেষ দুই পঙ্ক্তিতে, "তবু সব বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জ যে যার ভূমিতে দূরে দূরে/ চিরকাল থেকে ভাবে মিলনের শ্বাসরোধী কথা"- এ যেন সেই প্রজাপতি বা মক্ষিটি কিংবা অলির অন্য বসে থাকা, যারা পায়ে পায়ে এনে দেবে দূরবর্তী পরাগ মিলন। গায়ত্রী চক্রবর্তীর মতো মিথ সেখানে আসবে দূরবর্তী প্রেমের মিলন সুখের ভাবনায়। যেমন 'আরো কিছু দৃশ্যাবলী' কবিতার শেষ কয়েক পঙ্ক্তিতে দেখি, "বাতাসে বিধৌত দেহমন/ কার জন্য সুরক্ষিত, হায় কাল, জলের মতন/ পাত্রের আকার পাওয়া এ বয়সে সম্ভব হবে কি?" - এসবই তো মণিপুরচক্রের এক দেহ থেকে অন্য দেহ/ আকার পাওয়ার বাসনা, নিরাকার থেকে সাকার হবার বাসনা। কিছু না থেকে থিতু, স্থির ও ধারক-আধার হবার বাসনা। বিশুদ্ধিচক্রে পরমযোগী হবার সাধনা বারবার তাঁর কাব্যে এসেছে। "কী উৎফুল্ল আশা নিয়ে সকালে জেগেছি সবিনয়ে।" কিংবা "উপবিষ্ট মশা উড়ে গেলে/ তার সেই উড়ে যাওয়া ঈষৎ সংগীতময় হয়।" এমন তো একজন প্রকৃত ঋষিই পারেন, পরম সাধকেই তো তিনি উত্তীর্ণ।


একটা কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলির রসায়ন কতটা সার্থক বা অসার্থক, প্রথাগত ভাবনা বা প্রথাহীন অন্যভাবনা- এইসব পাঠককে খুব একটা প্রভাবিত করে না। শৈলী-প্রকরণ-কারিগরির আলোচনার বাইরেও পাঠকের জন্য অপেক্ষা করে থাকে কবির সম্পর্কে আলোচকের দৃষ্টিভঙ্গির প্রাথমিক অনুসন্ধিৎসা। সর্বক্ষেত্রে তাই সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গি অন্য পাঠকের সঙ্গে সমান্তরাল নাও হতে পারে- বহুবর্ণের আলোকের বিচ্ছুরণ তার পরেও থেকে যায়। প্রতিটা কবিতা এই বহুবর্ণের আলোকের বিচ্ছুরণে ব্যাখ্যা সম্ভব, উৎসাহী পাঠক এই সূত্র ও ঋক সুক্ত ধরে বিনয়ের কবিতা পাঠে আনন্দ লাভ করতে পারেন। শুধু প্রয়োজন এটাই যে গায়ত্রী চক্রবর্তীর মিথ থেকে সরে এসে আরও গভীর মর্মে বিনয়ের কবিতার আস্বাদ নিতে হবে, সূর্যমন্ত্রে, পূষার আহ্বানে, গায়ত্রী স্তবের অন্তর্নিহিত জৈবনিক ও লৌকিক তুল্য ব্যাখ্যায়। দেখতে হবে বিনয়ের মতো কবি কি শুধু লৌকিক প্রেমেই আটকে থাকবেন, নাকি তার থেকেও বেশি অন্তস্থিত বিশ্বাসগুলোকে পারলৌকিক ব্যাখ্যায় ও সুত্রে বাঁধবেন, যেখানে দেহতত্ত্বেরও সূক্ষ্মতা নির্মিত হয় ষট্চক্রের যোজনায়। হয়তো সেটাই হয়ে ওঠে ফিরে এসো চক্রের মূল মন্ত্র।

উৎস: দৈনিক সংবাদ


এইবেলাডটকম/এমআর
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71