রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮
রবিবার, ৪ঠা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
গোবিন্দগঞ্জের আদিবাসীদের জমি ও জীবন : একটি জরুরী আবেদন
প্রকাশ: ০৩:২৮ pm ২৭-১১-২০১৬ হালনাগাদ: ০৩:২৯ pm ২৭-১১-২০১৬
 
 
 


রণেশ মৈত্র::

আগে কোনদিন জানতাম না গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে এত বেশী সংখ্যক হতদরিদ্র আদিবাসী বাস করেন। একদিকে ৬ সেপ্টেম্বরের সরকারী বর্বর হামলা অপরদিকে আমাদের সুপরিচিত টি.ভি. চ্যানেল “সময়” এর সচিত্র প্রতিবেদন বারবার প্রদর্শিত হওয়ার সুবাদে তা জানার সুযোগ হলো। তাই বর্বরতার জন্য সরকারকে এবং দরদী সাংবাদিকতার জন্য “সময়” ও “একাত্তর” টি.ভি. চ্যানেল ও অন্যান্য গণমাধ্যমকে আমার শত সহস্র অভিনন্দন।

একই সাথে আমি জমির লড়াই এ লিপ্ত সুন্দরগঞ্জের বিশেষ করে এবং সাধারণভাবে সারা দেশের আদিবাসীদের জীবন পণ করা লড়াই এর সাথে এই ক্ষুদ্র নিবন্ধের মাধ্যমে সংগ্রামী সংহতি প্রকাশ করছি।

পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই, যেমন দেখছি অস্ট্রেলিয়াতেও, আদিবাসীদের (indigenous) প্রতি নির্মম, বর্বর নির্যাতন সুদূর অতীতে চললেও, সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে সেই কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে এবং ঘটতে চলেছে। এখন তাঁরা তাঁদের অতীতের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য museum আদিবাসীদের গড়ে তুলতে পেরেছেন তাঁদের হস্ত ও কারুশিল্পন প্রভৃতি নানা প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত ও সমাদৃত হচ্ছে- তাঁদেরকে নিয়ে তথ্যবহুল অসংখ্য বই-পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে এবং, এমনকি, তাঁরা নানা রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে রাজ্য সংসদে ও ফেডারেল পার্লামেন্টেও সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলিতে অত্যন্ত সীমিত সংখ্যায় হলেও নির্বাচিত হয়ে আসতেও সক্ষম হচ্ছেন। সর্বোপরি, বিগত ২০০০ সালে নির্বাচিত হয়ে অস্ট্রেলিয়ান লেবর পার্টির নেতা ও তদানীন্তন প্রধান মন্ত্রী কেভিনরাড পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে এখানকার আদিবাসীদের উপর অতীতে যে নির্যাতন চালানো হয়েছে তার জন্যে “SORRY” বলে দুঃখ প্রকাশও করেছেন। এ ঘটনা আমি তখন সিডনীতে বসে টেলিভিশনে লাইভ শোতে দেখেছিলাম।

সত্য বটে, আজও সেই indigenous population বা আদিবাসীদের সকল দাবী দাওয়া পূরণ হয় নি কিন্তু বেশ কিছু দাবী যে পূরণ হয়েছে এ কথা অস্বীকারও করা যাবে না। এখানকার আদিবাসীরা একদিকে তা স্বীকার করেন - অপরদিকে বাদ-বাকী দাবী-দাওয়া নিয়ে তাঁদের নিজস্ব পদ্ধতিতে আন্দোলনও করে চলেছেন।

কিন্তু বাংলাদেশে? এখানে আদিবাসীদের তো সাংবিধানিক স্বীকৃতিই নেই। সরকার এদেশে আদিবাসীর অস্তিত্বই স্বীকার করেন না।

তাঁদেরকে “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী” বলে বলা হয়ে থাকে-যে পরিচিতি আদিবাসীদের প্রকৃত পরিচিতি নয় এবং তাঁরা তা মানতে আদৌ রাজী নন। স্মরণে আনুন আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম-রাঙামাটি অঞ্চলের নিকট অতীতের করুণ ও রক্তাক্ত ইতিহাসের কথা বলছি। বছরের পর বছর ধরে চলা ঐ লড়াই এ হাজার হাজার আদিবাসী ও বাঙালি সৈন্যকে অহেতুক প্রাণ হারাতে হয়েছিল।

সমস্যাটির সৃষ্টি হয়েছিল জিয়াউর রহমান যখন আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে বাঙালিদেরকে নানা অঞ্চল থেকে নিয়ে স্থায়ী বসতি গড়তে ঐ অঞ্চলে পাঠান। তখন দ্বন্দ্ব শুরু হয় পাহাড়ী আদিবাসী বনাম নতুন বসতি গড়া বাঙালিদের মধ্যে। ঐ বাঙালিদেরকে রক্ষা করতে ঐ অঞ্চলে গড়ে তোলা হয় ক্যান্টনমেন্ট। সৈন্যদেরকে Settler বাঙালিদের পক্ষভুক্ত করে দেওয়া হয়ে। তা করেও ঐক্যের শক্তিতে বলীয়ান পাহাড়ী আদিবাসীদেরকে পরাজিত করা সম্ভব হয় নি।

অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন পাহাড়িদের পক্ষ থেকে তাঁদের অবিসংবাদিত নেতা সন্তু লারমার সাথে। সীমান্ত চুক্তি বলে খ্যাত ঐ চুক্তি স্বাক্ষরের পর শর্ত অনুযায়ী সন্তু লারমার নেতৃত্বে পাহাড়ী আদিবাসীরা দেশে ফিরে এসে তাঁদের যাবতীয় অস্ত্র বাংলাদেশ সরকারের কাছে ফেরত দেন। এ ঘটনা প্রায় দুই দশক আগের। দেশ-বিদেশে ঐ ঐতিহাসিক চুক্তি সমাদৃত হয়। রক্তপাত বন্ধ হয়।

কিন্তু দুঃখজনক যে বাংলাদেশ সরকার ঐ চুক্তির শর্তগুলির মধ্যেকার প্রধান প্রধান এক বেশীর ভাগ শর্তই আজও পূরণ করেন নি। ফলে দানা বাঁধছে ক্ষোভ। এই ক্ষোভ দীর্ঘকাল ধরে বজায় থাকার ফলে আদিবাসীদের একাংশের মধ্যে উগ্রবাদী প্রবণতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার তার স্বাক্ষরিত চুক্তি শর্তাবলী পুরোপুরি এবং অতি সত্বর পূরণ না করলে ভবিষ্যৎ অনাকাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে যেতে পারে-এমন আশংকা, অমূলক নয়। আশা করি দ্রুততার সাথেই চুক্তির সকল শর্ত উভয় পক্ষ পূরণ করে পার্বত্য এলাকায় স্থায়ী শান্ত নিশ্চিত করবেন।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের আদিবাসীরা সমতলের বাসিন্দা হওয়ায় তাঁরা ‘সমতলের আদিবাসী’ বলেই অভিহিত। এঁরা পাহাড়িদের চাইতে আপাত: দৃষ্টিতে দুর্বল কারণ এঁদের মোট সংখ্যা যাই হোক - এঁরা নানা অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। ফলে অধিকতর দুর্বল ও সুসংগঠিত না হওয়ার সুবাদে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে তাঁদের উপর নিষ্ঠুর নির্যাতন। মূল নির্যাতনটি হলো তাদেরকে ভিটে-মাটি জমি-জমা থেকে যে কোন মূল্যে উৎখাত করা সেগুলি গ্রাস করা। ভূমিগ্রাসীরা সকল অঞ্চলে সক্রিয় কিন্তু তারা কোন কিছুই করার ক্ষমতা রাখে না যদি না তাদের পেছনে সরকার, আমলা বা সরকারী দলের কোন না কোন অংশের প্রকাশ্য বা গোপন মদদ থাকে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের দেড় শতাধিক হতদরিদ্র আদিবাসীদের উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে ভূমিগ্রাসী বলে পরিচিত কোন মহল নয়-সরাসরি সরকারী আমলা, পুলিশ ও সরকারী দলের স্থানীয় নেতারা। সেখানকার আওয়ামী লীগ নেতা যেমন আদিবাসীদের পক্ষভূক্ত হয়ে একদা আন্দোলন করেছিলেন আজও সেই আওয়ামী লীগ নেতাটিই তাঁর দল-বল-সমর্থক গুণ্ডা-পাণ্ডা নিয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সরাসরি সহযোগিতা নিয়ে প্রায় এক সহস্র অসহায় দরিদ্র আদিবাসীদেরকে গত ৬ নভেম্বর তারিখে প্রকাশ্য দিবালোকে উৎখাত করে তাঁদেরকে গৃহহীনে পরিণত করলেন।

ঘটনাটি ভয়াবহ এক বর্বরতার একবিংশ শতাব্দীর এ যাবত সকল বর্বরতাকে যেন ম্লান করে দিল। এই ১৫০ সাঁওতাল পরিবার সেখানে বহুকাল ধরে বাপ-দাদার আমল থেকে বাড়িঘর নির্মাণ করে শান্তিপূর্ণভাবে ভোগ দখল করে আসছিলেন। এঁরাও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের জীবন বাজী রেখে অপরাপর মুক্তিযোদ্ধাদের মত রণাঙ্গনে লড়াই করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনে এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছিলেন। এঁরা বাংলাদেশের সম-অধিকার সম্পন্ন নাগরিক।

অতীতে সরকার যখন ঐ এলাকায় একটি চিনি কল প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেন তখন স্বভাবত:ই মিল স্থাপন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস ও আবাসন নির্মাণ, ইক্ষু উৎপাদন প্রভৃতির জন্য যথেষ্ট পরিমাণ জমির প্রয়োজন হলে এই সাঁওতালেরা সে জমি দিতে তো কার্পণ্য করেন নি। তখন সরকার যে জমি গ্রহণ করেন তখন যে সকল শর্ত ছিল ঐ জমিতে যদি কদাপি আখ চাষ না করা হয় তবে ঐ জমি তার মালিক সাঁওতালেরা ফিরে পাবেন-সরকার ও ঐ জমি তাঁদেরকে ফিরিয়ে দেবেন-তাঁরা মালিকানা ফিরে পাবেন। এটি ছিল ঐ চুক্তির ৫ নং শর্ত-যা আজ লঙ্ঘিত।

এখন দেখা যাচ্ছে, অতীতে সেখানে আখ চাষ করা হলেও বেশ কিছুদিন যাবত সেখানে আখ চাষ না করে ধান-পাট প্রভৃতি চুক্তি-বহির্ভূত ফসল বেআইনিভাবে উৎপাদন করা হচ্ছে। তাই চুক্তি-ভঙ্গকারী হেলা সরকার বা মিল কর্তৃপক্ষ। যখন দাবী করতে করতে হয়রান হয়েও সাঁওতালেরা জমি ফেরত পাচ্ছিলেন না তখনর তাঁরা প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলেন এলাকার এক তরুণ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। সেই আন্দোলনের সাফল্যের ফলে তাঁরা ঐ এলাকায় বসতি স্থাপন করে আসছিলেন। এক অবৈধভাবে জমি দখল কোনক্রমে বলা যাবে না।

অত:পর ঐ আওয়ামী লীগ নেতা যিনি তখন ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে দাঁড়ান-আওয়ামী লীগ তাঁকে মনোনয়ন না দিয়ে অপর একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেন ও তার অনুকূলে নৌকা প্রতীকও বরাদ্দ করা হয়। তখন ছাত্রলীগ নেতা শাকিল স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে নৌকা প্রতীক-ধারী প্রার্থীকে পরাজিত করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন। ঐ সাঁওতালদের ভোটেই তাঁর বিজয় নিশ্চিত হয়।

পরিহাস, আজ উচ্ছেদ অভিযানের নায়কও এ চেয়ারম্যান শাকিল। এবং তার পেছনে প্রশাসন , মিল-মালিক ও পুলিশ। তারা ৬ নভেম্বর ঐ গরীব সাঁওতাল পরিবারগুলিকে উচ্ছেদ করতে যখন মিলিত ভাবে এসে ঘর দুয়ার ভেঙ্গে ফেলতে প্রবৃত্ত হন-তখন বাধ্য হয়েই আত্মরক্ষার নিমিত্তে তাঁদের সম্বল তীর ধনুক হাতে তুলে নিলে কয়েকজন পুলিশ কর্মী আহত হন। অত:পর পুলিশ গুলি ছোঁড়েন-চার চার জন নিহত ও অনেক সাঁওতাল নর-নারী আহত হন। উচ্ছেদ ঠেকাতে অসমর্থ হয়ে আজ তাঁরা গৃহহীন আশ্রয়হীন মানুষে পরিণত হয়েছেন।

আহতদের মধ্যে যাঁদের অবস্থা ছিল গুরুতর-তাঁদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় কিন্তু হাসপাতালের বেড এ অবস্থান কালেও তাদের কোমরে দড়ি এবং হাতে হাত কড়া লাগিয়ে বর্বরতার চূড়ান্ত নজির স্থাপন করা হয়। পুলিশ থাকে প্রহরায়।

ঘটনা সাংবাদিকদের কল্যাণে ব্যাপকভাবে দেশে-বিদেশে জানাজানি হয়। ছুটে যান বাম-পন্থী, মধ্যপন্থী নানা রাজনৈতিক দলের নেতারা , মানবাধিকার সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও। তাঁরা ঐ আশ্রয়হীনের সাঁওতালদের সাথে সংহতি স্থাপন করে অবিলম্বে তাঁদের পুনর্বাসনের দাবী জানান।

ছুটে যান নানা সংবাদ মাধ্যমের ক্যামেরা নিয়ে ফটো সাংবাদিক সহ অন্যান্য সংবাদ কর্মীরা। ঐ করুন দৃশ্য ধারণ করেন এবং তা অনেকদিন ধরে নানা টিভি চ্যানেলে দেখানো হয়।

সরকারীদলের নেতারও সেখানে যান-সহানুভূতি জানান তবে এই চেয়ারম্যান বা পুলিশ প্রভৃতির ভূমিকা সম্পর্কে তাঁরা বোধগম্যভাবেই মুখ খোলেন নি।

যাহোক দেখা গেল, সাঁওতালদের বিরুদ্ধে দুতিনটি মামলা পুলিশ দায়ের ও অনেককে গ্রেফতার করলো কিন্তু চার চার জনকে গুলি করে হত্যা করা স্বত্বেও পুলিশের বিরুদ্ধে কোন মামলা বা শান্তিমূলক বা ডিপার্টমেন্টাল ব্যবস্থাও গৃহীত হয়ে নি।

অপরপক্ষে ক’দিন আগে কিছু খাবার দাবার নিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউ.এন.ও পুলিশ প্রভৃতি গেলে ঐ অভুক্ত দরিদ্র গৃহ-আশ্রয়হীন সাঁওতাল নারীপুরুষ একবাক্যে সরকারী ঐ সাহায্য নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আগে তাদের জমি-জমা ফেরতের দাবী জানান। এই সাহসিকতার জন্য গোবিন্দগঞ্জের আদিবাসী সাঁওতালদের অভিনন্দন জানাই।

 

লেখক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। ইমেইল : raneshmaitra@gmail.com

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71