শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮
শুক্রবার, ২রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
গ্রেনফেল টাওয়ারের আগুনে পুড়ছেন থেরেসা মে!
প্রকাশ: ০৮:৪৩ am ১৭-০৬-২০১৭ হালনাগাদ: ০৮:৪৩ am ১৭-০৬-২০১৭
 
 
 


আন্তর্জাতিক ডেস্ক::  গ্রেনফেল টাওয়ারের ভয়াবহ আগুনকে নিছক একটি দুর্ঘটনা বলে মানতে পারছেন না ব্রিটিশরা। একে কতৃপক্ষের গাফিলতি হিসেবে দেখছেন তারা।  সেখানকার এক কমিউনিটি ব্লগ ওই ভবনের সম্ভাব্য আগুনের ঝুঁকির ব্যাপারে সতর্ক করেছিল দেড় বছর আগে। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ থাকা এক বস্তু ভবনটির সংস্কাকজে ব্যবহার করা হয়েছে। লন্ডনবাসী মনে করছে, থেরেসা সরকারের আবাসন মন্ত্রণালয় আগুনের ঝুঁকিজনিত নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে । ঘটনাস্থলে  প্রথমবার গিয়ে দুর্গতদের সঙ্গে কথা না বলে ক্ষোভের জন্ম  দেওয়া প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয় দফায় সেখানে গিয়ে জনতার বিক্ষোভের সম্মুখীন হয়েছেন।  তার জনপ্রিয়তায় ধস নামার খবর দিয়েছে স্বনামধন্যএক জরিপ প্রতিষ্ঠান। এই ঘটনা তার সরকার গঠন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করবে বলে আশঙ্কা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। 

বুধবার পশ্চিম লন্ডনের গ্রেনফেল টাওয়ারের তৃতীয় অথবা চতুর্থ তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়।  ভবনটি একদম ছারখার হয়ে যাওয়ায় ৩০নিশ্চিত প্রাণহানির পাশাপাশি কোনও কোনও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম শতাধিক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা জানিয়েছে। শুক্রবার তৃতীয় দিনের মতো ভস্মীভূত ভবনে মরদেহের সন্ধান করেছেন উদ্ধারকারীরা। তবে লন্ডন মেট্রোপলিট্রন পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট স্বীকারোক্তি দেওয়া হয়েছে, সব মরদেহ পাওয়ার ব্যাপারে তারা নিজেরাই নিশ্চিত নন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কমান্ডার স্টুয়ার্ট কান্ডিকে উদ্ধৃত করে এই খবর জানিয়েছে। 

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী প্রথম ধাপে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের সান্তনা দিতে তাদের সঙ্গে দেখা করেননি। এমনকি উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে মে’র ব্রিফিংয়ের সময় সাংবাদিকদেরও সেখানে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়নি।   এতে করে অনেক প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। বাজেটে টাকা বাঁচাতে সারাদেশে ১০ হাজারেরও বেশি দমকলকর্মী কমিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।  বিপরীতে  প্রতিপক্ষ লেবার নেতা জেরেমি করবিন আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে বেশকিছু আবেগঘন মুহূর্ত কাটিয়েছেন।  এতে রাজনৈতিকভাবে থেরেসা মে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

ডেন্ট কোড নামের একজন ব্রিটিশ বিশ্লেষক বলেন, গ্রেনফেল টাওয়ারে অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা দিয়ে অবহেলা আসলে এই অঞ্চলের বঞ্চিত মানুষগুলোর প্রতি কর্তৃপক্ষের অবহেলার কথাই তুলে ধরেছে। কাউন্সিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক সমৃদ্ধ একটি কাউন্সিল রয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য রাস্তা নির্মাণে তারা বছরে ২৬ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করতে পারে। কিন্তু একই সময়ে তারা নার্সারি, ইয়ুথ ক্লাব, বয়স্কদের জন্য লাঞ্চ ক্লাব বন্ধ করে দেয়।’

এইউগভের জরিপ অনুযায়ী গত দুই সপ্তাহে থেরেসা মে’র জনপ্রিয়তা ২৯ পয়েন্ট কমে গেছে। প্রিলে নির্বাচন ডাকার আগে তার রেটিং পয়েন্ট যেখানে ছিলে +১০ সেখান থেকে অগ্নিকাণ্ডের পর এখন -৩৪। এই সময়েই লন্ডনে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। সারাদেশে পুলিশের সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্তে এই হামলা তার জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির সঙ্গে তাদের জোট বাঁধাও পছন্দ করেনি অনেক সমর্থক।  আগুনের ঘটনা জনপ্রিয়তা হ্রাসকে ত্বরান্বিত করেছে বলে ওই জরিপে আভাস মিলেছে।

ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের মে মাসে ভবনটির সংস্কার করার সময় এর বাইরে অ্যালুমিনিয়াম প্যানেল ব্যবহার করা হয়। আগুন ভীতির কারণেই ৪০ ফুটের বেশি উঁচু ভবনে ওই প্রলেপ ব্যবহার করা যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ।  এদিকে ভবনে আগুন লাগার পরেরদিন এবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবারের অগ্নিকাণ্ডের  ১৮ মাস আগেই বসবাসরতদের আগুনের ঝুঁকির ব্যাপারে সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল। ল্যানচেস্টার ওয়েস্ট-ওর কমিউনিটিভিত্তিক ব্লগ গ্রেনফেল অ্যাকশন গ্রুপ। ২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি এক ব্লগের মাধ্যমে তারা জানায়, বাড়ি নির্মাণের সময় ব্যবহৃত রাবিশের কারণে আগুন লাগতে পারে। আর তখন ভেতরে আটকা পড়তে পারেন অনেকে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১২ সালে ভবনটির অগ্নি নিরাপত্তা নিয়ে একটি রিপোর্ট তৈরি করেছিলো গ্রেনফেল অ্যাকশন গ্রুপ। রিপোর্টে বলা হয়, বেসমেন্ট, লিফটের মোটর রুপ ও গ্রাউন্ড ফ্লোরের ইলেক্ট্রিকাল রুমের অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্র এক বছরেরও বেশি পুরাতন ছিলো। আর ২০০৯ সালের পর থেকে সেগুলো পরীক্ষাও করা হয়নি বলে দাবি করে গ্রুপটি। সেসময় তারা আরও জানায় যে টেনান্ট ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশন বাড়ি নির্মাণের সময় রাবিশ ব্যবহারের অনুমতি দেয়।

গ্রেনফেল অ্যাকশন গ্রুপ নিজেদেরকে ল্যাঙ্কাস্টার ওয়েস্ট কমিউনিটর সেবায় নিয়োজিত বলে দাবি করে। ২০১০ সালে গঠিত এই সংস্থাটি এর আগে ল্যাঙ্কাস্টার গ্রিনের নির্মাণের বিরোধীতাও করেছিলো। এবিসিরি প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেনফেল টাওয়ারের বাসিন্দাদের কাছে এটা পরিষ্কার ছিল যে দায়িত্বে অবহেলা ও ব্যক্তিগত শত্রুতা যেকোনও সময় বিপদ ডেকে আনতে পারে। আর জমির মালিকরাও টাওয়ারটিতে প্রবেশ ও বাহিরপথে নিরাপত্তা প্রদান করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

এই সব অব্যবস্থাপনায় মে’র নতুন চিফ অফ স্টাফকে দায়ী করা হচ্ছে। অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার খসড়া যথাযথভাবে প্রয়োগ করা যায়নি বলেই এমনটা ঘটেছে বলে মনে করছেন ব্রিটিশরা। আবাসন মন্ত্রীকেও দায়ী করছেন অনেকে। কেননা আগুন লাগার সঙ্গে ভবন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত অব্যবস্থাপনার যোগ আছে বলে মনে করা হচ্ছে।

গ্রেনফেল টাওয়ারে আগুনের ঝুঁকি শনাক্ত করে থেরেসা সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলেও মনে করছেন সেখানকার মানুষেরা। তবে জনগণ  যেসব প্রশ্নের উত্তর চাইছেন, তাদের সেসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার অধিকার আছে বলে আগেই স্বীকার করেছেন থেরেসা মে। তিনি এ ঘটনায় পাবলিক তদন্তের নির্দেশও দিয়েছেন। তারপরও সরকারপ্রধান হওয়ায় সব দায় দিয়ে তার ওপরই বর্তাচ্ছে।

লন্ডনের গ্রেনফেল টাওয়ারে ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতার দাবিতে বিক্ষোভকারীরা কেনসিংটন ও চেলসির টাউন হলে হামলা চালিয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ন্যায় বিচারের দাবিতে আয়োজিত মিছিল থেকে প্রায় ৫০-৬০ জন বিক্ষোভকারী কাউন্সিল ভবনে প্রবেশ করে এ বিক্ষোভ করেছেন।  এদিকে প্রথমধাপে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে সমালোচিত হওয়ার পর দ্বিতীয়ধাপে দুর্গতদের দেখতে গিয়ে বিক্ষুব্ধদের মুখে পড়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। ব্যাপক সমালোচনার পর শুক্রবার নর্থ কেনসিংটনের ক্লিমেন্ট জেমস সেন্টারে দুর্গতদের দেখতে যান তিনি। এ সময় বিক্ষুব্ধরা বাইরে প্রতিবাদ করেন।  প্রতিবাদে যোগ দেওয়া ক্রন্দনরত এক নারী জানান, প্রধানমন্ত্রী বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কারও সঙ্গে কথা বলতে না চাওয়ার ফলে মানুষ এ বিক্ষোভ করছেন।

এর আগে ব্রিটেনের রানি ও প্রিন্স উইলিয়াম একটি ত্রাণ শিবিরে দুর্গতদের দেখতে যান। 

২০১৬ সালে ভবনটির সংস্কার কাজ করা রাইডন কন্সট্রাকশন অবশ্য দাবি করেছে তারা সবরকম অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ‘আমরা গ্রেনফেল টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের কথা শুনে খুবই মর্মাহত। হতাহত আর তাদের পরিবারের পাশে রয়েছি। রাইডন কোম্পানি সংস্কার কাজ শেষ করেছে ২০১৬ সালের গ্রীষ্মে। সেসময় সকল প্রকার অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।’ তারা আরও জানায়, ‘আমরা এবিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জরুরি সার্ভিসের সঙ্গে একযোগে কাজ করবো। এদিকে গ্রেনফেল অ্যাকশন গ্রুপ অনেকদিন ধরেই দাবি করে আসছিলো যে ভবনটি নিরাপদ নয়। আগুন লাগার পর তারা আক্ষেপের সঙ্গে জানায়, ‘আমরা বারবার সতর্ক করে দেওয়ার পরও কেউ শোনেননি। আমরা সবসময়ই বলে এসেছি যেকোন সময় এমন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71