বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৩০শে কার্তিক ১৪২৫
 
 
ঘন কুয়াশা আর বাতাসে শীতের আগমন ধ্বনি
প্রকাশ: ০৪:১১ pm ১৮-১২-২০১৭ হালনাগাদ: ০৪:১১ pm ১৮-১২-২০১৭
 
চন্দন আচার্য্য:
 
 
 
 


অঘ্রান হলো সারা, স্বচ্ছ নদীর ধারা বহি চলে কলসংগীতে। কম্পিত ডালে ডালে মর্মর-তালে-তালে শিরীষের পাতা ঝরে শীতে।

ও পারে চরের মাঠে কৃষাণেরা ধান কাটে, কাস্তে চালায় নতশিরে। নদীতে উজান-মুখে মাস্তুল পড়ে ঝুঁকে, গুণ-টানা তরী চলে ধীরে। পল্লীর পথে মেয়ে ঘাট থেকে আসে নেয়ে, ভিজে চুল লুণ্ঠিত পিঠে। উত্তর-বায়ু-ভরে বক্ষে কাঁপন ধরে, রোদ্দুর লাগে তাই মিঠে।....................সূর্য নামিয়া গেল ক্রমে। হিমে-ঘোলা বাতাসেতে কালো আবরণ পেতে খড়-জ্বালা ধোঁওয়া ওঠে জ ’মে।

সত্যিই আজ ফুটে উঠেছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিরন্তনবাণী, চারিদিকে ঘন কুয়াশা আর বাতাশে শীতের আগমন ধ্বনি। কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে আবারও শীতকাল। শহরের যান্ত্রিকতার করাল গ্রাসে গিলে খেয়ে নিয়েছে যদিও সেই সকালের খেজুরের রস আর পিঠাপুলির উৎসব তবুও প্রকৃতির আবর্তে এক নতুন সুরব্যাঞ্জনা নিয়ে আবারও হাজির হয়েছে এই শীত।

হিম হিম শীত, হালকা বাতাস জানান দিয়ে এসেছে শীত। খেতে হবে পিঠাপুলি, নিমন্ত্রন বা দাওয়াত দিতে হবে আত্মীয় স্বজনকে। শীতের চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী এখনও গাঁয়েই এর ঐতিহ্য ধরে রেখেছে, শহরে শীতের আগমনের আত্মীয়দের কিভাবে আদর অভ্যর্থনা করতে হয় তা পূর্বেও জানা ছিলনা, এখনও জানতে পারে নাই।

শীত সেতো আবহমান বাংলারই চিরচেনা এক রূপ। কুয়াশা মুড়িয়ে এসে সে হাজির হয় আমাদের সামনে। লাজরাঙা নববধূর মতো ঘোমটা পরে সে আসে। কিশোরী মেয়ের নাকফুলের মতো সে হাসে। নিকষ কালো অন্ধকারের চাদরে ঢাকা তার এক-একটি রাত। শীত জুতসই করে আমাদের আঙিনার আরাম-কেদারায় এসে বসে। নারীর দীঘল চুলের মতোই তার শরীরের বুনন। শ্রাবণের মেঘের মতোই তার ছবি।

জীবনানন্দের কবিতার সুরে বলতে হয়- ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্ত্রীর কারুকার্য।’ সন্ধ্যা নামলেই গুমোট অন্ধকারে ছেয়ে যায় চারদিক। তখন ধোঁয়ার আস্তরণে ঢেকে যায় পুরো দেশ। প্রকৃতির সবুজ গাছপালার চিরচেনা রূপ তখন আর থাকে না। কমনীয় রূপ হারিয়ে সে হয়ে পড়ে রুক্ষ্ণ ও নির্জীব। প্রকৃতির এমন রুক্ষ্ণতা দেখে আমাদের হৃদয় কেঁদে ওঠে। তখন প্রকৃতি প্রেমিকরা মুখে হাত দিয়ে ভাবতে বসে; ভাবে কত সুন্দর সজীব প্রকৃতি কী রকম বিশ্রী হয়ে গেল। অন্যদিকে শীতের এই অপরূপ রূপ মাধুর্য আমাদের আমোদিত করে, আন্দোলিতও করে বেশ। তখন আমাদের কুয়াশার ভেতর দিয়ে বহু দূরে হারিয়ে যেতে মন চায়। ইচ্ছে করে কুয়াশার সাথে যেতে যেতে মেঘের ভেলায় ভেসে যেতে। রূপসী কবির ভাষায় বলতে হয়- ‘একদিন কুয়াশার এই মাঠে আমারে পাবে না কেউ খুঁজে আর, জানি; হৃদয়ের পথ-চলা শেষ হলো সেই দিন-গিয়েছে সে শান্ত হিমঘরে।’

রাতভর বৃষ্টির মতো টপটপ শব্দ করে ঝরে পড়ে কুয়াশা। কুয়াশা পড়ার সে শব্দে সকলের কানে বাজে। গভীর রাতে লক্ষ্মীপেঁচার ডানা ঝাঁপটানিতে হঠাৎ ঘুম ভাঙে। সুবহে সাদিক হতেই বাড়ির খোয়াড় হতে রাতা মোরগটি ডাক দিয়ে ওঠে। ভোর হলে গাঁয়ের ছেলেরা আশায় থাকে একটু সোনা রোদ্দুরের জন্য। কিন্তু বিধি বাম-সকালেও দেখা যায় টপটপ কুয়াশা পড়ছে ঝরঝর করে। চলে কাঁথা বা লেপের তলে। শীতের সকালে দেখা যায় ধানগাছের ডগায় জমে থাকে ছোট ছোট শিশিরবিন্দু। ঘাসের ডগার ওপর সূর্যের কিরণ এসে খেলা করে। নরম রোদের সাথে পাল্লা দিয়ে আলোর দ্যুতি ছড়ায় শিশিরবিন্দু। ফুলের ওপর মৌমাছি আর প্রজাপতি খেলা করে। ফুলের গন্ধে আমোদিত হয় চারদিক। শিশিরবিন্দু কখনোবা মায়ের নাকফুলের মতো হেসে ওঠে আবার কখনোবা হিরার টুকরোর মতো জ্বলে ওঠে।

শীতে বৃদ্ধ ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়। শিশুরা মায়ের কোলে ওম খোঁজে আর বৃদ্ধরা আগুন পোহায় মাটির বাসনে। আগুন পোহানোর জন্য মানুষ অভিনব সব কৌশল আবিষ্কার করেছে। সকালে গাছের পাতা ভেদ করে সূর্যিমামা উঁকি দিতেই মানুষ দলবেঁধে ঘর থেকে বের হয়। খড়ের বিছালি জড়ো করে আগুন লাগিয়ে দেয়। তখন বৃদ্ধ-বণিতা চারপাশে গোল হয়ে বসে আগুন পোহায়, কেউবা দাঁড়িয়ে থাকে। দুষ্টু ছেলেরা লাফ দিয়ে আগুন পার হয়ে তাদের কৃতিত্ব জাহির করে। অনেকে কেরোসিন তেল মুখে পুরে চেরাগের ওপর দিয়ে এক ধরনের উল্কা সৃষ্টি করে। আর অন্যরা আশ্চর্য হয়ে তা প্রত্যক্ষ করে। নানী দাদীরা মাটির বাসনে করে আগুন পোহায়। বৃদ্ধদের আগুন পোহানোর কাজে ছোটরা সহযোগিতা করে।

এ সময় নদী, নালা, খাল, বিল, পুকুর, ডোবার পানি শুকিয়ে যায়। এ যেন শীতের চিরচেনা এক রূপ। পুরো প্রকৃতিকে রুক্ষ করাই যেন তার ধর্ম। নদীর পানি শুকিয়ে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। সে সময় মানুষ পায়ে হেঁটে নদী পার হয়। ধানকাটা জমির খালি মাঠে ছেলেরা খেলা করে। দলবেঁধে হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট, কানামাছি, সাতঝিক্কা খেলায় মেতে ওঠে। পুকুরে, ডোবায়, নালায় জমে থাকা পানিতে মাছ এসে আশ্রয় নেয়। জেলেরা সে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে। গাঁয়ের মেয়েরা টাকি মাছ আর শিং মাছের (ঝোল) তরকারি করে। টাকি মাছের ভর্তা কিংবা শিং মাছের মরিচ গুড়া দিয়ে ভাত খাবার মজাইতো আলাদা। এ সময় কিশোর-কিশোরীরা জমিতে মাছ ধরতে নামে। অনেকে মাছ ধরতে গিয়ে ঝগড়াও বেঁধে দেয়। কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করে। বড়রা এসে সে ঝগড়া মিটিয়ে দেন।

অপর দিকে বর্ষাকালে লাগানো ফুলের পরিচর্চা শুরু হয় হেমন্তে। শীতের শুরুতে গাছে ফুল ফুটতে শুরু করে। তখন বাগানগুলোতে গাঁদা, গোলাপ, কসমস, ডালিয়া আর নয়টার ফুল ফোটে। বাগানে এসে নানান রঙের মৌমাছি আর প্রজাপতি এসে খেলা করে। মৌমাছিরা দলবেঁধে মধু খেতে আসে। ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে যায় পুরো বাড়ি। বাড়ির শিশুরা ফুল ছিঁড়তে বাগানের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে থাকে।
শহুরে জীবনে আর গ্রামীণ জীবনে শীত ভিন্ন ভিন্নভাবে ধরা দেয়। শহরের অবস্থাসম্পন্ন মানুষ অনেক বেলা পর্যন্ত শুয়ে থাকে। শীতের সকালে কুয়াশা মোড়া শহরের উঁচু দালানগুলোকে পাহাড়ের মতো দেখায়। শহরের অবস্থা সম্পন্ন লোকদের কাছে শীত তার আসল রূপ নিয়ে আসতে পারে না। রাস্তার পাশে ফুটপাতে থাকা কিংবা বস্তিতে বসবাস করা অসহায় মানুষের ওপরই কেবল শীত তার আসল রূপ নিয়ে হাজির হয়। অনেকে শীতের প্রকোপ সহ্য করতে না পেরে মারা যায়। শীতের আগমন ধ্বনিতে অনেক রাজনৈতিক দলের নেতা এবং স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষ থেকে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়।

সি/এসএম

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71