বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বৃহঃস্পতিবার, ৫ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
চিত্রশিল্পী পরিতোষ সেনের ৯৮তম জন্ম বার্ষিকী আ
প্রকাশ: ০১:২৩ pm ১৮-১০-২০১৬ হালনাগাদ: ০১:২৩ pm ১৮-১০-২০১৬
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

প্যারিসে অবস্থানকালে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেনঃ ’প্যারিসে সবকিছুই নতুন করে শিখতে হলো। যা জানতাম ভুলে যেতে হলো। নতুন চোখ নিয়ে শুরু করতে হলো। প্রথম দুই বছর কোনো ছবি আঁকিনি। গ্যালারি, মিউজিয়াম ঘুরে ঘুরে দেখতাম। আধুনিক শিল্পকলা ব্যাপারটা বুঝতেই দুই বছর চলে গেল।
’তারপর আস্তে আস্তে কাজ শুরু করলাম, যে কাজের সঙ্গে আগের কাজের কোনো মিল হলো না।’...

’পিকাসোর সঙ্গে একনাগাড়ে পাঁচ ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলাম। সে দেখা হওয়াটা আমার জীবনের এক মহৎ অভিজ্ঞতা, যা কোনো দিন ভোলার নয়। আমি ছবি নিয়ে গিয়েছিলাম। তাঁকে আমার ছবি দেখানোই ছিল উদ্দেশ্য। তাঁর কাছ থেকে যে প্রশংসা পেয়েছিলাম, তা আমার সারা জীবনের জন্য অক্ষয় পাথেয় হয়ে রয়েছে।

’দ্বিতীয়ত, পাবলো পিকাসো সম্পর্কে সাধারণ একটা ধারণা ছিল যে তিনি খুব দাম্ভিক প্রকৃতির মানুষ। কিন্তু আমার জন্য তাঁর সচিব মাত্র পনেরো মিনিট সময় নির্দিষ্ট করে দিলেও আমি পিকাসোর স্টুডিওতে পাঁচ ঘণ্টা সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছিলাম। আমার ছবি দেখার পর পিকাসো আমার হাত ধরে নিয়ে তাঁর ছবি, ভাস্কর্য দেখান, যার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এমন ব্যবহার শুধু মহৎ ব্যক্তিরাই করতে পারেন।’

শিল্পী পরিতোষ সেনের জীবনে এই অবি্নরণীয় ঘটনা ঘটেছিল ১৯৫৩ সালের ৩ মে। ১ মের একটি ঐতিহ্যবাহী প্রদর্শনীতে পিকাসোর দেখা পেয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এক দিন পর তাঁকে নিজের স্টুডিওতে যেতে বললেন পিকাসো। নির্দিষ্ট দিনে পরিতোষ সেন পিকাসোর স্টুডিওতে গিয়ে আরও বহু সাক্ষাৎপ্রার্থী দেখতে পান। কিন্তু সবাইকেই একে একে চলে যেতে হয়। সবশেষে পরিতোষ সেন পিকাসোর সচিব জেইম সাবার্তকে পিকাসোর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও পিকাসোর অনুমোদনের কথা বলেন। প্রথমে সচিব আপত্তি জানালেও পরিতোষ সেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেশের মানুষ শুনে পিকাসোর সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
পিকাসোর সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে পরিতোষ সেন বিস্তারিত লিখেছেন তাঁর আবু সিম্বাল, পিকাসো ও অন্যান্য তীর্থ গ্রন্থের ’শিল্পী পিকাসোর মুখোমুখি’ অধ্যায়ে।

তিনি কলকাতা গ্রুপ-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। ফ্রান্সের নামকরা শিল্পকলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে তিনি অধ্যয়ন করেন, যেমন আকাদেমি আঁদ্রে লোত, আকাদেমি দ্য লা গ্রঁদ শমিয়ের, একোল দে বোজাখ এবং প্যারিসের একোল দু লুভ্র্‌। ভারতে ফেরার পর তিনি প্রথমে বিহারে শিক্ষকতা করেন, পরবর্তীতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি ডিজাইনিং ও টাইপফেস শেখার জন্যে ফরাসি ফেলোশিপ লাভ করেন। ১৯৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রকাফেলার ফেলোশিপ জিতেছেন। তিনি বর্তমান ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন।

শিল্পী পরিতোষ সেন ঢাকা ছেড়ে ১৯৩৭ সালে মাদ্রাজে সরকারি আর্ট কলেজে পড়তে যান। পরে, ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি প্যারিসে শিল্পকলা অধ্যয়ন করেন। ১৯৬২ সালে ফরাসি সরকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হস্তলিপিভিত্তিক বর্ণমালা (টাইপোগ্রাফি) ডিজাইন করার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন পরিতোষ সেনকে। পরে, ১৯৬৯-৭০ সালে আবার একই কাজের জন্য ফেলোশিপ নিয়ে প্যারিসে যান। ১৯৫৬ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত যাদবপুর প্রিন্টিং টেকনোলজি ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করেন। ১৯৭৯ সালে মস্কোতে তাঁর চিত্র প্রদর্শনী হয়। ১৯৮১-৮২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন চিত্রকলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যান অতিথি শিল্পী হিসেবে। পুনরায়, ১৯৮৬-৮৭ সালে বিভিন্ন মার্কিন শহরে বক্তৃতা কর্মসূচিতে গিয়েছিলেন। ১৯৮৩-৮৪ সালে আহমেদাবাদ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডিজাইনে অতিথি শিল্পী ছিলেন।

দেশ-বিদেশে পরিতোষ সেনের বেশ কিছু একক প্রদর্শনী হয়েছে। দেশের ভেতরে ও বাইরে সম্মিলিত বহু প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। স্বদেশ-বিদেশের বহু বিশিষ্ট আর্ট গ্যালারিতে তাঁর ছবির সংগ্রহ রয়েছে।
১৯৮৫ সালে পরিতোষ সেন ’শিরোমণি’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৮৬ সালে দিল্লির ললিতকলা একাডেমি বিশেষ সম্মানজনক ’আনন্দকুমার স্বামী’ বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। একই বছর তাঁকে ললিতকলা একাডেমির ফেলো নির্বাচন করা হয়। তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ছিলেন।
১৯৬৬-৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁর কাজের ওপর একটি ডকুমেন্টারি ছবি তৈরি করেছিল।
শিল্পচর্চা ছাড়াও পরিতোষ সেন নিয়মিত সমসাময়িক শিল্পকলা ও শিল্প-ইতিহাসের ওপর নিবন্ধ লেখেন। তাঁর প্রকাশিত চারটি বই হলো জিন্দাবাহার; আমসুন্দরী ও অন্যান্য রচনা; আলেখ্য মঞ্জরীঃ আবু সিম্বাল, পিকাসো ও অন্যান্য তীর্থ এবং কিছু শিল্পকথা।
পরিতোষ সেনের চিত্রকলার সর্বশেষ প্রদর্শনী হয়েছে কলকাতায়, ২০০৬-এ। গ্যালারি ৮৮ শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের ৮৮তম জ্নদিন উপলক্ষে তাঁর ৮৮টি শিল্পকর্মের একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল যা খুব প্রশংসিত হয়েছিল। একইভাবে ২০০৬-এ গ্যালারি ৮৮ শিল্পী পরিতোষ সেনের ৮৮তম জন্মদিন উদযাপন করেছে তার ৮৮টি শিল্পকর্মের প্রদর্শনীর আয়োজন করে।

তিনি ভারত ও বহির্বিশ্বে প্রচুর প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছে:
কলকাতা গ্রুপ প্রদর্শনী (১৯৪৪)
লন্ডন, যুক্তরাজ্য (১৯৬২)
সাও পাওলো বিয়েনালে (সাও পাওলো দ্বিবার্ষিক), ব্রাজিল (১৯৬৫)
নয়া দিল্লী ট্রিয়েনালে (নয়া দিল্লী ত্রিবার্ষিক) (১৯৬৮, ১৯৭১, ১৯৭৫)
সুইডেন (১৯৮৪)
হাভানা বিয়েনালে (হাভানা দ্বিবার্ষিক), কিউবা (১৯৮৬)

একানব্বইয়ের এপ্রিলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ের পর পরিতোষ সেন ব্যথিত হয়ে পড়েছিলেন গভীরভাবে। সেই জলোচ্ছ্বাস আর ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতার বহু ছবি দেখেছেন তিনি পত্রপত্রিকায়, দূরদর্শনের পর্দায়। সেসব দৃশ্য মনে রেখে তিনি ’ঘূর্ণিঝড়ের পর’ সিরিজে এঁকেছিলেন বেশ কিছু চিত্রকলা। সেগুলো ’৯১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দিল্লির ভিলেজ গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়। ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন সে প্রদর্শনীর কিছু ছবি।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71