বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮
বৃহঃস্পতিবার, ১লা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
ছুটির দিনে শ্রেণিকক্ষে ক্লাস, কর্মদিবসে জমজমাট কোচিং
প্রকাশ: ০৬:৩৫ pm ০৩-০৩-২০১৫ হালনাগাদ: ০৬:৩৫ pm ০৩-০৩-২০১৫
 
 
 


রাজধানীর হলিক্রস কলেজের ফটকের সামনে গতকাল শুক্রবার বিকেলে কলেজপড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে মণিপুরিপাড়ার বাসায় ফিরছিলেন হাসি রানী সাহা। হরতাল-অবরোধের কারণে এই কলেজে এখন শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনে ক্লাস হচ্ছে। বাকি দিনগুলোতে বন্ধ থাকে।

হাসি রানী জানান, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে মেয়ের প্রথম বর্ষ পরীক্ষা। কিন্তু ঠিকমতো ক্লাস করাতে পারছে না স্কুল কর্তৃপক্ষ। এ জন্য মেয়েকে নিয়ে কোচিং সেন্টারে দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে। পাশেই দাঁড়ানো মেয়ে হিমু সাহার বক্তব্য ‘ক্লাস কম হওয়ায় এগোতে পারছি না। খুব সমস্যা হচ্ছে।


এ রকম চিত্র এখন রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতেও। মফস্বল এলাকায় হরতাল-অবরোধে ক্লাস হলেও বড় শহরের পড়াশোনা এখন শুক্র ও শনিবারকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। সপ্তাহে মাত্র দুই দিন ক্লাস যথেষ্ট না হওয়ায় বেশির ভাগ অভিভাবক সন্তানের পড়াশোনার জন্য কোচিং ও প্রাইভেটের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
রাজধানীর গ্রিন রোড, মতিঝিল ও বেইলি রোড এলাকার তিনটি স্কুলে খোঁজ নিয়ে কোচিং না করা শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই সুযোগে একশ্রেণির শিক্ষকও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া করে জমজমাট বাণিজ্য করছেন। ইংরেজি ও গণিত পড়ানোর ক্ষেত্রে নামডাক থাকা শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীর চাপে ব্যাচ বাড়িয়েও কূলকিনারা পাচ্ছেন না।
স্কুল-কলেজগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শ্রেণিকক্ষে লেখাপড়া না হলেও দরজায় কড়া নাড়ছে বিভিন্ন নামের পরীক্ষা। শ্রেণি-পরীক্ষা (সিটি), বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন (এসবিএ) পরীক্ষা শুরু হয়েছে বা হচ্ছে। স্কুলভেদে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হবে। অথচ বছরের প্রথম দুই মাস চলে যাচ্ছে শ্রেণিকক্ষে ঠিকমতো লেখাপড়া ছাড়াই।

শিক্ষকেরা বলছেন, এখনকার লেখাপড়ার ধরন হচ্ছে, ক্লাস টেষ্ট থেকে শুরু করে সব পরীক্ষার নম্বর বার্ষিক পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রস্তুত করার সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর ফলে ১০ নম্বরের ছোট পরীক্ষাও শিক্ষার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।


রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁরা খুব সমস্যায় পড়েছেন। তিনি বলেন, এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র থাকার পরও শুক্র ও শনিবার তাঁদের স্কুলে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির ক্লাস হচ্ছে। কেন্দ্র থাকায় শ্রেণিকক্ষের সমস্যায় অন্যান্য শ্রেণির ক্লাস শুক্র ও শনিবারে নেওয়া যাচ্ছে না। তবে আগামী সপ্তাহ থেকে শুক্র ও শনিবার দশম শ্রেণিরও ক্লাস নেওয়া হবে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ক্লাস ও পরীক্ষা চালু রাখতে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালত নির্দেশ দিলেও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটির দিনেও ক্লাস নেওয়ার সাহস পাচ্ছে না। নিরাপত্তার কারণে এসএসসি পরীক্ষাও সেই শুক্র ও শনিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। গতকালও অনুষ্ঠিত হয়েছে এসএসসির গণিত পরীক্ষা, এ নিয়ে এসএসসির পাঁচটি পরীক্ষাই হলো শুক্র ও শনিবারে।


এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাও এক প্রকার অনিশ্চয়তার মুখে আছে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উচ্চ আদালতের নির্দেশ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সার্বিকভাবে বিষয়টি সরকারের। আমরা হয়তো পরীক্ষার হল, শ্রেণিকক্ষে পুলিশ দিয়ে নিরাপত্তা দিতে পারি। কিন্তু যাওয়া-আসার পথের নিরাপত্তাটি বড় বিষয়। এ জন্য হরতাল-আহ্বানকারীদের প্রতি অনুরোধ করে বলছি, অন্তত পরীক্ষার আগে ও পরের দুই ঘণ্টা হরতালের আওতামুক্ত রাখুন।’


এদিকে রাজধানীর অভিজাত ও নামকরা কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এখন কয়েক দিনের বাড়ির পড়া একসঙ্গে দিয়ে দিচ্ছেন। এতে বাসায় ফিরে শিক্ষার্থীর মধ্যে বাড়ছে অস্থিরতা।
এই অবস্থার মধ্যে অসহায় মা-বাবা সন্তানকে প্রাইভেট শিক্ষক বা কোচিং সেন্টারের দিকেই ঠেলে দিচ্ছেন। স্বাভাবিক সময়ে বছরের মধ্যভাগে কোচিং সেন্টার ও গৃহশিক্ষকের কদর বাড়ে। কিন্তু এবার শ্রেণীকক্ষে পড়া না থাকায় বছরের শুরুতেই উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দিকেই ঝুঁকছেন।
শিক্ষকেরাই এখন বলতে শুরু করেছেন, পরীক্ষার ভারে প্রায় ন্যুয়ে পড়া শিক্ষাব্যবস্থায় এখন পাঠ্যবই শেষ করার মতো সময় পাওয়া যাচ্ছে না। এমনিতেই চারটি পাবলিক পরীক্ষা উপলক্ষে দেশের বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকছে প্রায় দুই থেকে আড়াই মাস। তার ওপর ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে চেপে বসেছে অবরোধ-হরতাল।

সরকারি হিসাবে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী রয়েছে ৪ কোটি ৪৪ লাখ। এর বাইরে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে শিক্ষার্থী আরও প্রায় ৩০ লাখ। চলমান সহিংস রাজনৈতিক কমর্কাণ্ডে প্রায় পৌনে পাঁচ কোটি শিক্ষার্থী সংকটের মুখে পড়েছে।


রাজধানীর ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইনছান আলী বলেন, ‘অবরোধে ঢিলেঢালাভাবে ক্লাস চলছিল। কিন্তু হরতাল ও সহিংসতা শুরুর পর মা-বাবারা সন্তানকে পাঠাচ্ছেন না। বিষয়টি এতটাই অমানবিক, ভীতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ যে আমরা শিক্ষার্থীদের এমন পরিস্থিতিতে স্কুলে আসতে বাধ্য করতে পারি না।’
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ছুটির দিন ঘিরে শিক্ষার্থীর থাকে নানা পরিকল্পনা। গান বা আঁকার ক্লাস, বেড়ানো, সিনেমা-নাটক বা খেলা দেখার সেসব পরিকল্পনায় ভাটা পড়েছে। তিন সপ্তাহ ধরে ছুটির দিনেই ক্লাস বা পরীক্ষা হচ্ছে, আর ক্লাসের দিনে শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা থাকছে।

গতকাল রাজধানীর দিলু রোডে স্কুলপড়ুয়া ছোট মেয়েকে নিয়ে বাসায় আসার পথে কথা হয় শীবানি সেনের সঙ্গে। জানালেন তাঁর মেয়ে দেবস্মীতা ইস্কাটনের এজি চার্চ স্কুলে পড়ে। গতকাল ছিল সিটি টেস্ট (সিটি) পরীক্ষা।


ওই স্কুলের উপাধ্যক্ষ শিখা বিশ্বাস জানান, এখন ছুটির দিনই কর্মদিবস হিসাবে গণনা করা হচ্ছে। কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গেই বললেন, এভাবে আর চলে না।
মতিঝিল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের অভিভাবিকা শিরিনা হক জানালেন, ‘স্কুল না থাকায় প্রাথমিকে পড়া তাঁর দুই সন্তান প্রায় দিনভর টেলিভিশনে কার্টুনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখে। কাজ খুঁজে পায় না। এটা যে কতটা যন্ত্রণার, তা বিবেকহীন রাজনীতিবিদদের বোঝানো যাবে না।’
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71