বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বুধবার, ১১ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
জলাবদ্ধতার ভুলে যাওয়া বাদবাকি গল্প 
প্রকাশ: ০৯:২৩ pm ২১-১১-২০১৭ হালনাগাদ: ০৯:২৬ pm ২১-১১-২০১৭
 
 
 


হাসান হামিদ 

শীত পড়তে শুরু করেছে, আমরা ভুলে গেছি নোংরা জলের ঐতিহাসিক স্নানের গল্প। কিন্তু আগে থেকে ভেবে না রাখলে আবার কিন্তু সুদিন আসবে! জলাবদ্ধতা নিয়ে সবাই যখন অস্তির, আমাদের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন, ‘ঢাকার জলাবদ্ধতা আপনি কী দেখছেন? আপনি কলকাতায় যান, বোম্বেতে যান, পৃথিবীর প্রত্যেকটি ক্রমবর্ধমান সিটিতে এ সমস্যা আছে’!

আমি ভেবেছিলাম জলাবদ্ধতা দেখতে কলকাতা যাবো কেনো, শান্তিনগরে গলা পানি লেগে থাকে, এর চেয়ে বেশি হলে সেটা জলাবদ্ধতা নয়, সাধারণ বন্যাও নয়, ভয়াবহ বন্যা। আমি লক্ষ করে দেখেছি, আমাদের মানুষগুলো কেমন গায়ে সহা হয়ে গেছে। অফিস থেকে বের হয়ে প্যান্ট কাছা করে, জুতো খুলে হনহন করে নোংরা পানির উপর দিয়ে দিব্যি হাসতে হাসতে যাচ্ছে। কী ভয়াবহ! আমাদের মন্ত্রী সেদিন রাজধানীর একটি হোটেলে ‘নির্মল পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবান প্রজন্ম গড়তে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত সেমিনার শেষে ঢাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার সমস্যা নিয়ে এক সাংবাদিকের করা প্রশ্নের উত্তরে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী উপরের কথাগুলো বলেছিলেন। আর এক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসন নিয়ে কথা বলতে গেলে সময় দরকার। ঢাকার জনসংখ্যা হওয়ার কথা ছিল ৭৫ লাখ থেকে ১ কোটি। সেই জায়গায় এখানে তিন গুণ বেশি মানুষ আছে। আর অপরিকল্পিতভাবে বৃদ্ধি হচ্ছে। এই অপরিকল্পনার কারণে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা আর ওয়াসা তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। আমরা সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে সিটি করপোরেশনকে যুক্ত করা হবে এবং তাদের নেতৃত্বে ওয়াসা কাজ করবে। এই জলাবদ্ধতাও পর্যায়ক্রমে নিরসন করতে সক্ষম হব।’ 

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি তখন সবচেয়ে গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলেছিলেন, ‘আইন অনুযায়ী জলাবদ্ধতা দূর করার মূল দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। তবে সিটি করপোরেশন চেষ্টা করছে ওয়াসার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার’।

মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী,  ঢাকার চারপাশে যে খালগুলো আছে, সেগুলো নাকি আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সেগুলো উদ্ধারের কাজ চলছে। এগুলো পুনরুদ্ধার করে এর মুখগুলো ঠিক করে দেওয়া হবে। তখন খালগুলোকে আরও গভীর করে দেওয়া হবে। তবে এই জলাবদ্ধতা কিন্তু রাজধানীর অনেক পুরোনো সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন সময় নেয়া হয়েছে নানা প্রকল্প। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। নগরবাসীর অনেকেই বলছেন রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে বাস্তবমুখী কোন প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে না, আর এ জন্য নগরীর জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করছে। নগর পরিল্পনাবিদরা বলেছেন, দিন দিন ঢাকা শহরের খোলা জায়গাগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে, আর দখল হয়ে যাওয়া জায়গাগুলিতে পাকা দালান গড়ে ওঠায় পানি চুয়ে নিচে যেতে না পারায়, রান অব ওয়াটার বেড়ে যাচ্ছে। এতে করে জলাবদ্ধতা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। 

অন্যদিকে আবহাওয়াবিদরা মনে করেন, প্রতি আট/দশ বছর পর পর এ রকম অতি বর্ষণ হতে পারে, এটাকে মাথায় নিয়েই নগরীর ডেনেজ সিস্টেম করা উচিত। রাজধানীতে জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বৃষ্টির পানি প্রথমত ভূগর্ভে শোষণ করে নেয়, বাকি পানি রান অব ওয়াটার হয়ে খাল বিল ও ড্রেন দিয়ে নদীতে চলে যায়। কিন্তু এখানে এই দুই পথের সবই অকার্যকর। তাছাড়া নগরীতে যে ড্রেনগুলো আছে তাও আবর্জনায় পূর্ণ, পানি যাওয়ার রাস্তায় বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, এ কারণে নগরীর জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করছে।

আমরা জানি, বাংলাদেশে মৌসুমী আবহাওয়ার কারণে প্রতিবছর মে, জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে গড়ে প্রতিমাসে ১২-১৮ দিন বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। এই সময় প্রতিমাসে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ গড়ে ৩০০ মিলিমিটারের বেশি হয়ে থাকে। সুতরাং দেশের উন্নয়ন পরিক্রমায় এই ধরনের বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও পরিকল্পনার বাস্তবায়ন থাকা প্রয়োজন। বিশেষত: বড় শহরগুলোতে পানি নিষ্কাশনে বিশেষ যতশীল হওয়া প্রয়োজন যেখানে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। ঢাকা শহরে ২০০৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বরে একদিনে বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ৩৪১ মিলিমিটার যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। ওই সময় ঢাকা শহরের দুই-তৃতাংশ পানির নিচে ডুবে গিয়েছিল। এ বছর যে কয়েকবার ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে কোনবারেই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দৈনিক ৮০ মিলিমিটার অতিক্রম করেনি। এমনকি কমবেশি ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে ঢাকা শহরের অনেক এলাকা পানির নিচে চলে যেতে দেখা গেছে। বর্তমানে ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। রাজউক তাদের প্রণীত ঢাকা মহানগর উন্নয়ন পরিকল্পনা (ডিএমডিপি) ও ড্যাপ অনুযায়ী ভূমি ব্যবহার বাস্তবায়ন নিশ্চিত না করতে পারার কারণে ঢাকা শহরের আশপাশের জলাভূমি, নিম্নভূমি, নদী-খাল বেদখল হয়েছে এবং বর্ষা মৌসুমে পানি ধারণের স্থান কমে গেছে।

ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে (সিএস) ম্যাপ অনুযায়ী, ঢাকা শহরের ৫৪টি খাল থাকলেও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়নের কারণে ওয়াসা বর্তমানে মাত্র ২৬টি খাল চিহ্নিত করতে পারে। ডিসিসি কর্তৃক নির্মিত ভূ-উপরিস্থ ড্রেন এবং ওয়াসা কর্তৃক নির্মিত ভূ-গর্ভস্থ ড্রেন ও প্রাকৃতিক খালগুলোর সঙ্গে যথাযথ সংযোগের অভাব রয়েছে। তাছাড়া বর্জ্য অব্যবস্থাপনা ও জনগণের অসচেতনতার কারণেও ড্রেন ও খাল বন্ধ হয়ে গিয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

আসলে ঢাকার পানি নিষ্কাশন পদ্ধতি ও ড্রেনেজ নিয়ে কথা বলতে হলে শুধুমাত্র উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১৫১ বর্গ কিলোমিটার নিয়ে চিন্তা করলে চলবে না। পানি নিষ্কাশনে ৩১৮ বর্গ কিলোমিটারের ঢাকাকে বিবেচনায় এনে ঢাকাকে মূলত ৩টি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যথা- ঢাকা পশ্চিম অংশ (১৪৩ বর্গকিমি), ঢাকা পূর্ব অংশ (১১৮ বর্গকিমি) এবং ডিএনডি (৫৭ বর্গ কিমি) এলাকা। এর মধ্যে ঢাকা পশ্চিম অংশ ১৯৮৮ সালের বন্যার পর চারপাশে বাঁধ দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছে। ফলে নদীর স্ফীতজনিত বন্যার পানি থেকে এই অংশ বহিস্থ বন্যা থেকে মুক্ত হয়। আর অন্তঃস্থ বৃষ্টির পানি ধোলাই খাল, কল্যাণপুর ও গোরানচাঁদ বাড়িতে অবস্থিত পাম্পের সাহায্যে ঢাকা পশ্চিম অংশের পানি তুরাগ ও বুড়িগঙ্গাতে পাম্প করে ফেলে দেয়া হয়। এই অংশের প্রধান প্রধান খালগুলো হলো দিগুণ খাল, দিয়াবাড়ি খাল, আব্দুল্লাহপুর খাল, বাউনিয়া খাল, কল্যাণপুর খাল ও তার শাখা খাল, হাজারীবাগ খাল, ধোলাই খাল ইত্যাদি। ঢাকা পূর্ব অংশের প্রধান খালগুলো হলো গোবিন্দপুর খাল, বাওথার খাল, বোয়ালিয়া খাল, সুতিভোলা খাল, শাহজাদপুর খাল, বেগুনবাড়ি খাল, মেরাদিয়া খাল, জিরানি খাল, মান্ডা খাল, নড়াইল খাল এবং তাদের শাখা প্রশাখা। এই অংশের পানি প্রাকৃতিক প্রবাহে এই সকল খালের মাধ্যমে বালু নদীতে গিয়ে পড়ে।

আমার মনে হয়, বন্যার হাত থেকে বাঁচার জন্য তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নদী-খাল দখল বন্ধ করতে হবে। ইতোপূর্বে ঢাকার চারপাশের নদী বাঁচানোর জন্য হাইকোর্টকে পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। কিন্তু দখল বন্ধ হচ্ছে না। একদিকে উচ্ছেদ অভিযান চলে অন্যদিকে নতুন করে দখল হয়। এই সাপলুডু খেলায় শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় দখলকারীরাই। অথচ নদী দখল বন্ধ করতে না পারলে এর পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। পরিবেশ সচেতনতার এ যুগে নদীর অপমৃত্যু হবে আর সকলে চেয়ে চেয়ে দেখবে এটা হতে পারে না। দখলকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া নদী দখল বন্ধ করা যাবে না। নদী দখলে একটি দুষ্টচক্র অত্যন্ত ক্রিয়াশীল। এ চক্র ভাঙতে হবে। প্রশাসনের কোন গাফিলতি থাকলে সে ব্যাপারেও ব্যবস্থা নিতে হবে। আর আগে থেকে ভাবতে হবে। আমরা আগামী বর্ষায় আর নোংরা পানিতে হাঁটু ভিজাতে চাই না।

লেখক- হাসান হামিদ, গবেষক ও কলামিস্ট। 

 

 

 

আরপি
 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71