মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ১০ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
জাকারবার্গের প্রতিদ্বন্দ্বী বাবা রামদেব
প্রকাশ: ১০:৩৭ am ০৯-০৬-২০১৮ হালনাগাদ: ১০:৩৭ am ০৯-০৬-২০১৮
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


বাবা রামদেব টেলিভিশনে যোগব্যায়ামের শো করতেন। যোগব্যায়ামের আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবেই তাঁর পরিচিতি বেশি।সেখান থেকেই পরিচিতি বাড়ে। ধীরে ধীরে ব্যবসা করার বুদ্ধি আসে মাথায়। কোম্পানি খুলেও ফেলেন। তাঁর কোম্পানির নাম পতঞ্জলি আয়ুর্বেদ। সেই কোম্পানির পণ্যের তালিকায় কী নেই! আছে ঘি, মধু চ্যাবনপ্রাশ। পাবেন সাবান, শ্যাম্পু ও ফেসওয়াশ। আবার ওষুধও বানায় পতঞ্জলি আয়ুর্বেদ।

২০১৪ সালে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের পর বাবা রামদেবের পতঞ্জলি আয়ুর্বেদের ব্যবসার পালে লাগে উত্তাল হাওয়া। এবার ফেসবুকের সঙ্গে টক্কর দিয়ে প্রযুক্তি খাতে দুপয়সা কামানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। এরই মধ্যে বাবা রামদেব নিয়ে আসেন নতুন চমক। ফেসবুকের জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপের আদলে নতুন একটি অ্যাপ্লিকেশন বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দেন তিনি। এর নামা রাখা হয়েছে ‘কিমভো’। সংস্কৃত এই শব্দের ইংরেজি পরিভাষা হলো, ‘হোয়াটস আপ’। কিমভো শব্দের বাংলা তর্জমা কারও কুশল জিজ্ঞাসা করা। অর্থাৎ জাকারবার্গের হোয়াটসঅ্যাপের সঙ্গে যুদ্ধ করবে বাবা রামদেবের হোয়াটস আপ!

কিন্তু কিমভো অ্যাপের গোড়াতেই হয়েছে গলদ। প্রায় এক সপ্তাহ আগে অ্যাপটি প্লে স্টোরে উন্মুক্ত করে পতঞ্জলি। ডাউনলোডও হয়েছে বেশ। এরই মধ্যে প্লে স্টোর থেকে তা তুলে নিয়েছে বাবা রামদেবের প্রতিষ্ঠান। ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, অ্যাপটির নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। কেউ কেউ আবার একে ‘কৌতুক’ বলে অভিহিত করেছেন। আবার কিছু ব্যবহারকারী বলছেন, ‘বলো’ নামের ভিন্ন একটি অ্যাপের অনেক ফিচার স্রেফ কপি-পেস্ট করেছে কিমভো।

হোয়াটসঅ্যাপ বনাম হোয়াটস আপ

গত মে মাসে প্লে স্টোরে উন্মুক্ত হওয়ার পর কিমভো ডাউনলোডের ধুম পড়ে যায় ভারতে। এতে খুব অল্প ফিচার ছিল। স্রেফ টেক্সট মেসেজ আদান-প্রদান, ভিডিও কল ও স্টিকার পাঠানোর সুবিধা। কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অ্যাপটির ডাউনলোড-সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে যায়। পতঞ্জলির কর্মকর্তারা একে নিজেদের সাফল্য বলেই মনে করছেন। কোম্পানিটির শীর্ষ কর্তা আচার্য বালকৃষ্ণ ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি যে এত সাড়া পাব। এতেই আমাদের ক্লাউড সার্ভার ক্র্যাশ করেছে।’

বিজনেস ইনসাইডার ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, কিছুদিন আগেই ‘সমৃদ্ধি স্বদেশি সিমকার্ড’ চালু করেছে পতঞ্জলি। এরই উন্মাদনার মধ্যে চালু করা হয় কিমভো। প্লে স্টোরে উন্মুক্ত করার পর এক ফরাসি নিরাপত্তা গবেষক হাতে-কলমে দেখিয়ে দিয়েছেন যে এই অ্যাপে আদতে কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থাই নেই।

আচার্য বালকৃষ্ণ নিজেও জাকারবার্গের হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা হোয়াটসঅ্যাপের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষের সংখ্যা কোটি কোটি এবং তাঁদের মধ্যে অনেক মেধাবী সফটওয়্যার প্রকৌশলী আছেন। আমরা কেন নিজেদের একটি মেসেজিং অ্যাপ তৈরি করব না? কেন আরও উন্নত অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করব না, যাতে মানুষ আস্থা রাখতে পারবে এবং মানুষের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভারতের মধ্যেই থাকবে?’ তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের বিকল্প প্রয়োজন।’

বালকৃষ্ণের কথায় যুক্তি আছে। তবে বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলছেন বাজারে আসার ধরন নিয়ে। কিমভো প্রথমেই হোয়াটসঅ্যাপের মতো একটি প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের সঙ্গে যুদ্ধে নামার ঘোষণা দেয়। কিন্তু ভারতের বাজারে এখন ফেসবুকের এই মেসেজিং অ্যাপের রাজত্ব একচেটিয়া। শুধু ভারতেই এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৩ কোটি। সম্প্রতি এই অ্যাপ দিয়ে অর্থ লেনদেনের সুবিধা চালুর ঘোষণাও এসেছে। এহেন পরিস্থিতিতে পতঞ্জলি যেভাবে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে বাজারে আসার ঘোষণা দিয়েছিল, তাকে ‘অদূরদর্শী’ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

আর এর ফলও খুব ভালো হয়নি। এনডিটিভিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ কিমভোকে ‘কৌতুক’ বলে অভিহিত করেছেন। ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ নেহা ধারিয়া বলেন, ‘ওই অ্যাপে ব্যবহার করা প্রযুক্তিটি এখনো উন্নয়নের পর্যায়ে আছে। পতঞ্জলি ও বাবা রামদেবের ব্র্যান্ডের কারণেই এটি এতবার ডাউনলোড হয়েছে। কিন্তু এর চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করবে, অ্যাপে কোন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, তার ওপর। অ্যাপটির টেকসই প্রবৃদ্ধি টিকিয়ে রাখাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’

প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ত্রুটি শোধরাতেই কিমভোকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আচার্য বালকৃষ্ণ বলছেন, কিমভোর নিরাপত্তা ত্রুটি সারাতে একদল তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ কাজ করছেন। ত্রুটি সারানোর আগে এই অ্যাপ ব্যবহার না করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

বাবা রামদেব: সন্ন্যাসী, নাকি ব্যবসায়ী?

বাবা রামদেব নিজেকে ‘সন্ন্যাসী’ বলে পরিচয় দেন। তবে তাঁর কার্যকলাপ দেখে প্রশ্ন জাগতে বাধ্য। আর রামদেবের এই ব্যবসা আরও ফুলেফেঁপে উঠেছে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর। তখনই যোগব্যায়ামকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষণা করা শুরু হয়। ওই সময় ‘স্বদেশি’ পণ্য ব্যবহারের প্রচারণা শুরু করেন বাবা রামদেব। আলোড়ন ওঠে তখন, যখন তাঁর নেতৃত্বে পতঞ্জলি আয়ুর্বেদ বাজারে আনে ইনস্ট্যান্ট নুডলস।

পতঞ্জলি আয়ুর্বেদের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কোম্পানিটি। এটি নানা ধরনের পণ্য তৈরি করে। এর মধ্যে রয়েছে খাদ্যপণ্য, কসমেটিকস, ওষুধ, বই, সিডি-ডিভিডিসহ অনেক কিছু। পতঞ্জলি আয়ুর্বেদ লিমিটেডের চেয়ারম্যান হলেন আচার্য বালকৃষ্ণ। কোম্পানির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে আছেন রামভরত।

ইকোনমিক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, রামদেবের ছোট ভাই হলেন রামভরত। পতঞ্জলি আয়ুর্বেদ লিমিটেড চালান মূলত তিন ব্যক্তি। বাবা রামদেবের চেহারাতেই এই কোম্পানি মানুষের কাছে পরিচিত। কোম্পানির পণ্য উদ্ভাবনে আচার্য বালকৃষ্ণের ভূমিকা অনেক বড়। আর প্রতিষ্ঠানের প্রতিদিনের কাজের দেখভাল করেন রামভরত। তবে কলকাঠি নাড়েন রামদেব ও বালকৃষ্ণ।

ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পতঞ্জলি আয়ুর্বেদের বার্ষিক আয়ের পরিমাণ প্রায় ১৬০ কোটি ডলার। কোম্পানির বেশির ভাগ শেয়ারই আচার্য বালকৃষ্ণের দখলে। আর যেহেতু বাবা রামদেব নিজেকে ‘সন্ন্যাসী’ দাবি করেন, তাই জাগতিক বস্তুর ওপর তাঁর মোহ নেই! কোম্পানিতে তাঁর শেয়ারের পরিমাণও সামান্য।

যোগাসন শিখিয়ে পাওয়া সুনামকে কাজে লাগিয়ে দ্রুতই পঞ্জলি আয়ুর্বেদ লিমিটেডকে ব্যবসাসফল বানিয়ে ফেলেছেন বাবা রামদেব। এবার নেসলে ও ইউনিলিভারের মতো আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে চান তিনি। স্লোগান সেই একটাই, ‘স্বদেশি পণ্য’। বাবা রামদেবের প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাক ব্যবসায় নামার ঘোষণা দিয়েছে। ম্যাকডোনাল্ডসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো স্বদেশি খাবারের একটি চেইন শপ চালুর কথাও সম্প্রতি বলেছেন তিনি।

ভারত বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই দেশের বাজারও বিশাল। মানুষের মধ্যে আছে আধ্যাত্মিক গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা। সেই শ্রদ্ধাকে কাজে লাগিয়েই নিজের কোম্পানিকে শক্তিশালী করছেন বাবা রামদেব। 

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71