সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮
সোমবার, ৫ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
জাস্টিশিয়া সামনে থেকে পেছনে গেলেন শিক্ষক শ্যামল ভক্তের কী খবর?
প্রকাশ: ১০:১৮ am ০৭-০৬-২০১৭ হালনাগাদ: ১০:১৮ am ০৭-০৬-২০১৭
 
 
 


শিতাংশু গুহ ||

সুপ্রিমকোর্টের সামনে গ্রিক নারী মূর্তি বা ভাস্কর্য বিতর্কের অবসান হয়েছে। একেবারে অবসান না হলেও স্থিমিত হয়েছে বা হচ্ছে। মূর্তি সামনে থেকে ভাস্কর্য হয়ে পেছনে গেছেন। তবে তিনি কিছুটা অবরুদ্ধ। কারণ চারিদিকে দেয়াল। বাইরে থেকে দেখা কষ্টকর হবে। জাস্টিশিয়া নাটকে সরকার দুই পক্ষকে খুশি রাখতে চেয়েছেন। এটি সরিয়ে হেফাজতকে খুশি করেছেন। আবার পুনঃস্থাপন করে প্রগতিশীলদের খুশি রাখতে চেয়েছেন। শফি হুজুর এতে বাকরুদ্ধ হয়েছেন। স্বাধীনতার পক্ষশক্তিরও বলার কিছু নাই। উভয় পক্ষকে আপাততঃ এতে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু এই নাটকে উভয় পক্ষ খুশি হয়েছেন বা নাখোশ হয়েছেন সেই হিসাব পরে, আপাততঃ জাস্টিশিয়া নাটকের যবনিকা।

শিক্ষক শ্যামল ভক্তের উকিল সাখাওয়াৎ হোসেন খানের সাথে কথা বলেছি রোববার। জানতে চেয়েছি তার মক্কেলের জামিন হবে কবে? তিনি বলেছেন, ৩১ মে বুধবার জামিনের বিষয়ে শুনানি হবে। তার ধারণা জামিন হয়ে যাবে। না হলে কী করবেন? বললেন, হাইকোর্ট যাবেন। শ্যামল কান্তিকে জেলে নেয়ার পর তার আবেগঘন ভিডিও ফুটেজ সামাজিক মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। আমেরিকায় এটর্নি জনি কোকড়ান ফুটবল প্লেয়ার ও জে সিম্পসনের মামলা করে বিখ্যাত হয়ে যান। বিনে পয়সায় মানবিক কারণে শ্যামল ভক্তের মামলা করে সাখাওয়াৎ হোসেন খান ভবিষ্যতে নারায়ণগঞ্জের মেয়র হবেন না তা কে বলতে পারে? এর আগে তিনি দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই, তবু তাকে জেলে যেতে হয়েছে। বাংলাদেশ তো এখন অনুভূতির দেশ। জাস্টিশিয়া সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে পেছনে গেলো, এতে কী কারো অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে? শিল্পী মৃণাল হকের লেগেছে, তিনি দশ পার্সেন্ট শোক কাটাতে পেরেছেন। বাকি নব্বই পার্সেন্ট এখনো বাকি আছে? হুজুরদের অনুভূতি কিছুটা টের পাওয়া গেছে। তবে আপাততঃ মাহে রমজান যাক, তারপর দেখা যাবে? আচ্ছা, এই ভাঙাগড়ার খরচ কে দিলো? মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার হয়েছে যে, শুক্রবার রাতে জয়পুরহাটে শিবমন্দিরের তেরোটি মূর্তি ভাঙ্গা হয়েছে। জাস্টিশিয়া ভাঙার সঙ্গে এর কি কোনো সম্পর্ক আছে? হেফাজত দেখলাম হিন্দুদের মূর্তি ভাঙার নিন্দা করেছে। সাবাস। মারহাবা। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কিন্তু নিন্দা করেনি। এর কারণ হয়তো এটা যে, একবার নিন্দা করলে প্রায় প্রতিদিন তা করতে হতে পারে!

জাস্টিশিয়া সরানোর পর দেশের বিশিষ্টজনেরা বলেছিলেন, ‘নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ’। নতুন করে বসানোর পর তারা এখন কী বলবেন? আম বাগানে কলাগাছ? আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, জাস্টিশিয়া সরিয়ে সকল ধর্মের প্রতি সম্মান দেখানো হয়েছে। বাহ্ কী চমৎকার কথা, জাস্টিশিয়া সুপ্রিমকোর্টের সামনে থাকতে অন্য ধর্মাবলম্বীদের কোনো অসুবিধা হয়েছে বলে তো শুনিনি। জাস্টিশিয়া প্রশ্নে ওবায়দুল কাদের ও মওদুদ আহমেদের বক্তব্য প্রায় একই, বাড়ি নোয়াখালী বলে? তবে ইমরান সরকার বলেছেন, যে দেশে ন্যায় বিচার নেই, সে দেশে ন্যায়ের প্রতীক জাস্টিশিয়া থাকার দরকার কী? যা হোক, এনিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আমরা অনেক কথা শুনেছি। এখন শিক্ষক শ্যামল ভক্ত নিয়ে কথা শুনতে চাই। এই ডামাডোলে গুলশান-বনানীর রেইনট্রি হোটেলের ধর্ষণ মামলা যাতে চাপা পরে না যায় সেটাও কাম্য।

হেফাজতের বিরুদ্ধে ‘মতিঝিল ট্রিটমেন্টের’ মতো রাতের অন্ধকারে সুপ্রিমকোর্টের সামনে থেকে জাস্টিশিয়া ভাস্কর্য বা নারীমূর্তি সরিয়ে ফেলা হয়। হেফাজতের ইচ্ছার পূরণ হয়। দেশ কিছুটা হলেও পাপ মুক্ত হয়! ভাস্কর্যের শিল্পী মৃণাল হককে ওইসময় সময় উপস্থিত থাকতে হয়। এপি-কে তিনি বলেছেন, ‘আমি অসহায়। এটা অবিচার। এতে আমি আমার মায়ের মৃত্যুর মতোই ব্যাথিত।’ লন্ডনের ডেইলি মেইল বলেছে, ইসলামী দলগুলো ভাস্কর্য সরিয়ে সেখানে একটি বড়সড় আকারের কোরআন প্রতিস্থাপনের দাবি করেছে। দেশীয় মিডিয়া বলেছে, দেশের প্রগতিশীলরা মিনমিন কণ্ঠে গ্রিক ভাস্কর্য প্রতিস্থাপনের দাবি জানাচ্ছেন। আমাদের দেশের অতিশয় ‘ধর্মভীরু নিরীহ’ প্রগতিশীল শক্তি এর বেশি আর কিইবা করতে পারেন?

এবার শিক্ষক শ্যামল ভক্ত সমাচার। নারায়ণগঞ্জ পিয়ার সাত্তার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে ২০১৬ তে স্কুলের মাঠে হাজারো জনতার সামনে কানে ধরে ওঠবস করান স্থানীয় এমপি সেলিম ওসমান। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি নবীকে অপমান করেছেন। পরে তদন্তে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তিনি খালাস পান। একই সময় এমপির ইচ্ছায় তাকে স্কুল থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। তিনি চাকরি ফিরে পান। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। তাকে নারায়ণগঞ্জ ছাড়তে বলা হয়। তিনি ছাড়েননি। এবার এলো ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ। একই বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মাহমুদা বেগম মামলা করেন যে, ২০১৪ সালে মপিওভুক্ত হতে তিনি শ্যামল ভক্তকে ১লাখ ৩৫হাজার টাকা ঘুষ দিয়েছেন। এই মামলায় শিক্ষক শ্যামল ভক্ত এখন জেলে। আইনের চোখে নাকি ঘুষ দেয়া ও নেয়া দুটোই সমান অপরাধ, প্রশ্ন হলো, মাহমুদ বেগম তাহলে বাইরে কেন?

আমরা সাধারণ মানুষ আইন বুঝি না। তবে এটুকু বুঝি, ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’। প্রায় একই সঙ্গে জাস্টিশিয়া ও শিক্ষক শ্যামল ভক্ত ঘটনাকে অনেকে হিন্দু ও নারী নির্যাতন হিসাবে দেখতে চাইছেন। কেউ কেউ এটাকে পেশি শক্তির কাছে নারীশক্তির পরাজয় অথবা অসুর শক্তির কাছে দেবী শক্তির পরাজয় হিসাবে বর্ণনা করছেন। দেশের মিডিয়া অজানা কারণে তেমন কঠিন মন্তব্য না করলেও সোশ্যাল মিডিয়াতে ঝড় বইছে। ভাস্কর্য অপসারণে দেশের মানুষ প্রমাদ গুনছেন, এরপর কী? আর শ্যামল মাস্টার তো হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন যে, সবকিছুর পরও তিনি একজন হিন্দু! কেউ কেউ বলছেন, এটা হিন্দু ইস্যু নয়। তাহলে শিক্ষক ইস্যু? মানবাধিকার ইস্যু? কই একজন শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করিয়ে তো এমপি সেলিম ওসমান দিব্যি বহাল তবিয়তে আছেন, তাই না? মাত্র একজন এমপির কাছে দেশের তাবৎ শিক্ষক সমাজ পরাজিত? যিনি মিথ্যা মামলা করেছেন, তিনিও তো শিক্ষক?

কবি সরদার ফারুক শিক্ষক শ্যামল ভক্তকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছেন, বলা যায় এটাই বাস্তবতা। তিনি লিখেছেন, ‘ও হে নাদান মাস্টার চলে যাও মাসীদের দেশে/ এই নাও রাহা খরচার টাকা/ এখনো যে বেঁচে আছো- শোকরগুজার করো/ এই দেশ বখতিয়ারের, এই দেশ বিদেশী ঘোড়ার/ এখানে চলবে শুধু উসমানী খেলাফত/ ভিটেমাটি দুহাতে আঁকড়ে রেখে কেন গুস্সা বাড়াও?/ পুরানো দিনের কথা থাক/ ভুলে যাও ‘দেশমাতা’ সকলের….।’ কবিকে চিনি না, তাকে সালাম, তার কথার ওপর আর কথা চলে না। তবে এটুকু বলা যায়: একজন শ্যামল কান্তি ভক্ত বাংলাদেশের দুই কোটি হিন্দু বা সংখ্যালঘুর দুর্দশার দৈনন্দিন চিত্র। কবিগুরু হয়তো দুঃখে তাই গেয়েছেন: ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান! ’

শ্যামল ভক্তের স্ত্রী সবিতা হালদার বলেছেন, ‘আগে এমন অভিযোগ ছিল না। তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে’। বেচারা শিক্ষক!, আগেকার অপমানের বিচার তো পেলেনই না, বরং মিথ্যা অপবাদ নিয়ে জেলে গেলেন। অভিযোগ উঠেছে, সাংসদ সেলিম ওসমান একটি সমঝোতার প্রস্তাব দিয়ে শিক্ষক-মুক্তিযোদ্ধা শ্যামল কান্তি ভক্তকে ৫০লাখ টাকা নিয়ে নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এটি দেন নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানার এসআই মোখলেসুর রহমান। অবশ্য এসআই তা অস্বীকার করেছেন। স্মর্তব্য যে, নারায়ণগঞ্জ পুলিশ কিন্তু শিক্ষককে কান ধরে ওঠবস করানোর ন্যাক্কারজনক ঘটনার তদন্ত করে সাংসদ সেলিম ওসমানের কোনো দোষ খুঁজে পায়নি। উচ্চ আদালত গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন পেয়েছে। আদালতের নির্দেশই মামলা হয়েছে। সেই মামলায় এমপি সেলিম ওসমান জামিনে আছেন। পুলিশ আমাদের ‘ফুলিস’ বানাচ্ছে?

শিক্ষক শ্যামল ভক্তের দণ্ডের সাথে নন্দ কুমারের ফাঁসির অনেক মিল? নন্দ মহারাজ ব্রিটিশ রাজ্যে থেকে জনৈক ইংরেজের বিরুদ্ধে ফাইট করে জিততে চেয়েছিলেন। শ্বেতাঙ্গ বিচারক তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেন। অনেক পরে অবশ্য প্রমাণ হয়েছিল যে নন্দরাজ নির্দোষ। কিন্তু ততদিনে নন্দরাজ পরপারে চলে গেছেন। শিক্ষক শ্যামল ভক্ত নারায়ণগঞ্জে ওসমান সা¤্রাজ্যে থেকে এমপি সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে ফাইট করতে চাইলে তার কপালে দুর্ভোগ ছাড়া আর কী থাকতে পারে? হয়তো একদিন প্রমাণ হবে বেচারা শিক্ষক বিনা দোষে গুরুদণ্ড ভোগ করেছেন, কিন্তু ততদিনে তিনি উপরে বা ওপাড়ে চলে যাবেন? কবি শামসুর রাহমান যতই লিখুন না কেন, ‘সুধাংশু যাবে না’; শ্যামল ভক্ত, যেতে তোমায় হবেই। তবে তোমার একটি চয়েস আছে: তুমি উপরে যাবে না ওপাড়ে?

মাত্র সেদিনের কথা: সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জনৈক আজম জে চৌধুরী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একটি ঘুষের মামলা দিয়েছিলেন। সেই মামলায় শেখ হাসিনাকে জেলে নেয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনা ও শ্যামল ভক্তের ঘুষ মামলায় মিল-অমিল দুটোই আছে। মিল হলো, প্রথম মামলার মতো দ্বিতীয় মামলাও ভুয়া। উভয় মামলার বাদী কারো ইঙ্গিতে মামলাটি করেছেন? দুটো মামলাই হয় তথাকথিত ঘুষ আদান-প্রদানের অনেক দিন পর? দুটো মামলাই ক্ষমতার অপব্যবহার? দুই মামলায় তফাৎ হচ্ছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলার কারণ ছিল ক্ষমতার দ্ব›দ্ব; যে কোনোভাবে তাকে ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখার নিমিত্ত। আর বেচারা শ্যামল ভক্তের বিরুদ্ধে মামলা কারণ তিনি ‘মালাউন’ ও সামান্য শিক্ষক হয়েও ওসমান সা¤্রাজ্যের কাছে মাথা নত করছেন না? এই দম্ভ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শেষ কোথায়?

 

শিতাংশু গুহ : কলাম লেখক।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71