রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮
রবিবার, ৮ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
জেনে নিন কুরুক্ষেত্রে জয়দ্রথ বধের রক্তক্ষয়ী ঘটনা
প্রকাশ: ০৮:১৫ pm ১২-০৫-২০১৮ হালনাগাদ: ০৮:১৫ pm ১২-০৫-২০১৮
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


অর্জুন দূর থেকেই সাত্যকির রথ চিনতে পারলেন এবং মোটেই খুশী হলেন না। অর্জুন বললেন কেশবকে, আমি সাত্যকির হাতেই যুধিষ্ঠিরের রক্ষার দায়িত্ব দিতে এসেছিলাম। আর দিন ও তো অস্তগত প্রায়।আমার জয়দ্রথ নিধনের প্রচেষ্টায় আমি নিজেই গুরুতর ভাবে আক্রান্ত। এখন তো দেখছি সাত্যকির অবস্থাও সুবিধের নয়।উনি ক্লান্ত, ওনার সারথি আর ঘোড়ারাও শ্রান্ত। সাত্যকির অস্ত্রও নিঃশেষিতপ্রায়। কিন্তু সাত্যকিকে আক্রমন করছে ভুরিশ্রবা, উনি খুবই উজ্জিবীত। সাত্যকিকে অবিলম্বে সাহায্য করতেই হবে।

এই ভুরিশ্রবার সাথে সাত্যকির শত্রুতা অতি প্রাচীন।বংশ পরম্পরায় প্রাপ্ত এই বৈরীতা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের চতুর্থ দিনে এই ভুরিশ্রবাই সাত্যকির দশ পুত্রকে বধ করেছিলেন। সাত্যকি আর ভুরিশ্রবার লড়াই এমন ভয়ংকর হয়ে উঠলো যে দুজনেরই ঘোড়ারা নিহত ও শরাসন ছিন্ন হল। অতএব দুজনেই ষাঁড়ের চামড়ার ঢাল আর তরোয়াল নিয়েই মুখোমুখী হলেন। অবশেষে দুজনেরই ঢাল আর তরোয়ালও ভগ্ন হল। তারা সাধারন সেনানীদের মতন মল্লযুদ্ধে ব্যাপৃত হলেন। শ্রান্ত সাত্যকি কিন্তু পেরে উঠছিলেন না। ভুরিশ্রবা তাকে মাটিতে ফেলে পদাঘাত করলেন। কৃষ্ণ বিপদ দেখে অর্জুনকে বললেন দেখো, দেখো,ওখানে সত্যকির কী হাল। অর্জুন বললেন আমি তো জয়দ্রথের দিকেই তাকিয়ে আছি,খেয়ালই করি নি সাত্যকির কী অবস্থা।এই বলে অর্জুন দূর থেকে ক্ষুরপ্রবান নিক্ষেপ করে ভুরিশ্রবার দুটি হাতই কেটে ফেললেন।

ছিন্নহস্ত ভুরিশ্রবা খুবই তিরষ্কার করলেন অর্জুনকে।এ কী রকমের ধর্মযুদ্ধ? আমি লড়াই করছি সাত্যকির সঙ্গে আর আপনি তার মধ্যে ঢুকে আমার হাত কেটে দিলেন?

অর্জুন বললেন, এই তো কুরুক্ষেত্র ব্যাপী বিশাল রণাঙ্গন। আমি সমানেই রথী গজ ও অশ্ব নিধন করে চলেছি। আপনাকে শরাঘাত করতে পারবো না এটা কোন আইনে রয়েছে?

ভুরিশ্রবা বললেন, বুঝেছি এই সবই বাসুদেবের পরামর্শের ফল। হবে না কেন? ওদের বংশই ব্রাত্যক্ষত্রিয়। অর্থাৎ নীচু জাতের ক্ষত্রিয়। আমিও অস্ত্রত্যাগ করলাম, এইবার ধ্যানযোগে মৃত্যুবরন করব।

তিনি অস্ত্রত্যাগ করলে সাত্যকি অসি হাতে লাফিয়ে এলেন। সবাই বারন করা স্বত্তেও শুনলেন না, মানলেন না, মৃত্যুপথযাত্রী নিরস্ত্র শত্রুবধের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা। ভুরিশ্রবার মাথা কেটে ফেললেন সাত্যকি।

আর ভীম? সূচীব্যুহের কাছে পৌঁছে ভীম কিন্তু তখনই অর্জুনের পাশে যাওয়ার চেষ্টা করলেন না। ভীমের তীরের আঘাতে কর্ণের বর্ম্মভেদ করে রক্তধারা বইতে লাগলো। এরপরে ভীম কর্ণের সারথি আর চারটি ঘোড়াকেই নিধন করলে কর্ণ আরেকটি রথে উঠলেন। ভীমের সিংনাদ কৃষ্ণ আর অর্জুন তো শুনতে পেলেনই,যুধিষ্ঠিরও শুনতে পেলেন।পান্ডবেরা শংখধ্বনি করে ভীমকে উৎসাহ দিলেন।

মহাভারতকার দুইবার উল্লেখ করেছেন যে কর্ণ "মৃদুভাবে শরবর্ষণ" করছিলেন,কিন্তু এর কারনটি উল্লেখ করেন নি। ভীমের শরজাল শব্দ করা পাখীর ঝাঁকের মতন কর্ণকে আচ্ছন্ন করল। ভীম দ্বিতীয়বার কর্ণের সারথি আর ঘোড়াদের বিনষ্ট করলে কর্ণ স্রেফ পালিয়ে গেলেন।

ইতিমধ্যে দুর্য্যোধন আবার পিরে গেছেন দ্রোণের কাছে। তার কাছে নিশ্চয়ই খবর পৌঁছেছে যে শুধু অর্জুনই নয়,সাত্যকি আর ভীম ও সুচীব্যুহে প্রবেশ করেছেন।এবারে কী হবে?

দ্রোণ এইবারে যাচ্ছেতাই ভাবে দুর্য্যোধনকে তিরষ্কার করলেন। বললেন, মনে নেই, রাজসভায় দ্যুত ক্রীড়া? এইখানেও জয়দ্রথকে খুঁটি করে আমরা সর্বস্ব পণ করেছি। ওহে দুর্য্যোধন,তুমি জয়দ্রথের কাছেই ফিরে যাও আর তাকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হও। আমি এইখানেই ,ব্যুহদ্বারেই থাকবো আর পান্ডব আর পাঞ্চালদের নিবারন করব। আর অপরাপর সৈন্যদের না হয় পাঠিয়ে দেবো ব্যুহের ভিতরে।

এইবার ভীম আর কর্ণের দ্বিতীয় রাউন্ড। কর্ণ আবার এক নতুন রথে এসেছেন। দুইজনেই ক্রুদ্ধ।দুইজনের রথই একেবারে এ ওর ঘাড়ে এসে পরলো। কর্ণের ঘোড়াগুলি সাদা রঙের আর ভীমের ঘোড়াগুলি ভাল্লুকের মতন, কালো রংএর। 

"তাহারা কখনো গাভীলাভার্থী মত্ত বৃষদ্বয়ের ন্যায় চিৎকার, কখনো আমিষলোলুপ শার্দ্দুলযুগের ন্যায় তর্জনগর্জন, কখন পরষ্পরের প্রতি প্রহারে উদ্যত। ভীম আবার কর্ণের শরাসন ছিন্ন করে তৃতীয়বার তার ঘোড়া আর সারথিকে নিধন করলেন।কর্ণ একেবারে হতাশ হয়ে পড়লেন।

দুর্য্যোধন তার ভাই দুর্জ্জয়কে বললেন, যাও,যাও। কর্ণকে সাহায্য কর আর ঐ মাকুন্দ ভীমটাকে সংহার করে এসো।ভীম এবারে শুধু সারথি আর ঘোড়াই নয়,দুর্জ্জয়কেও যমালয়ে পাঠিয়ে দিল।মহাবীর কর্ণ কেঁদেই ফেললেন। কিন্তু ভীম আর কর্ণের লাগাতার লড়াই চলতেই থাকলো। কর্ণ কিছুতেই এঁটে উঠতে পারছিলো না। দুর্য্যোধনও বারবার তার ভাইদের পাঠাচ্ছিলেন কর্ণকে সাহায্য করতে।প্রথমে এক জন, তার পরে দুই, এর পরে পাঁচ ও পরে একসাথে সাতজন। এইভাবে একত্রিশজনকে ভাইকে পাঠালেন,কিন্তু সকলেই ভীমের হাতে নিহত হলেন। মারা গেলেন বিকর্ণও। এই সেই কৌরব যিনি সদাই পান্ডবদের সমর্থন করে এসেছিলেন। যুদ্ধে তাকে নিহত করে ভীমও বিচলিত হয়ে পড়লেন। শোকে আকুল হয়ে বিলাপ করে বললেন এই তো ক্ষত্রিয়ের ধর্ম।

শেষ রাউন্ডে কিন্তু ভীমের সার্বিক পরাজয়। এইবারে ভীমের তুনীর আর ধনুক বিনষ্ট হল। অশ্বরাও বানবিদ্ধ হয়ে প্রানত্যাগ করলো কিন্তু সারথি বিশোক জীবিত ছিলেন। তিনি ভীমকে নিয়ে যুধামন্যুর রথে উঠে বসলেন।কর্ণ সেই রথের উপরেও হামলা চালালে ধনুক ও শরশুন্য ভীম ঢাল আর তরোয়াল "গ্রহন" করলেন। কর্ণ অবলীলাক্রমে ভীমের ঢাল ছিন্ন করে দিলে ভীম জলসন্ধের মতনই তরোয়াল ছুঁড়ে মারলেন। সেই নিক্ষিপ্ত অসির আঘাতে কর্ণের ধনুক ছিন্ন হল।

রথহীন ভীম রথের ধ্বজা নিয়েই মাটিতে নেমে কর্ণকে যুদ্ধে আহ্বান জানালেন।কর্ণ কিন্তু তাকে রথে চড়েই তাড়া করলেন।অস্ত্রহীন ভীম দৌড়ে পালালেন, কিন্তু লুকোবেন কোথায়? অর্জুনের বানে নিহত হাতীদের স্তুপ পরে আছে, তো তারই মধ্যে ঢুকলেন। ভাবলেন কর্ণ তো আর রথে নিয়ে এই খানে আসতে পারবে না। কিন্তু কর্ণ হাতীদের মৃতদেহ শরাঘাতে ছিন্ন ভিন্ন করে দিলেন। ভীমসেন অগত্যা সেই হাতীদের দেহাবশেষ ছুঁড়েই যুদ্ধ করতে লাগলেন। সে ও শেষ হয়ে গেলে, রনাঙ্গনে পরে থাকা রথের চাকা, মৃত অশ্ব– যা কিছু পেলেন হাতের কাছে তাই ছুঁড়ে মারলেন। এই সবই বিফলে গেলে ভীম ঘুঁষি পাকিয়ে কর্ণের দিকে অগ্রসর হলেন। কর্ণ এই সময়ে ভীমকে বধ করতে পারতেন কিন্তু কুন্তীর কাছে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
কর্ণ তাই ধনুকের ছিলা দিয়ে ভীমের গাত্রস্পর্শ করলেন। অপমান?? ভীম তখনই সেই ধনুক কেড়ে নিয়ে কর্ণের মাথায় ধাই ধপা ধপ।

কর্ণ ক্রোধে আরক্তলোচন হয়ে বললেন "হে তুবরক (মানে মাকুন্দ)! তুমি মুঢ়, উদরপরায়ন,সংগ্রামকাতর ও বালক"। আরো বললেন এই রণাংগন তোমার পক্ষে উপযুক্ত স্থান নয়। আমার মতন বীরের সংগে লড়াই করতে আসাটাও তোমার উচিৎ হয় নি। আরে, যে খানে প্রচুর খাবার দাবার আছে সেখানেই বরং চলে যাও। ভীমও ছাড়বার পাত্র নন। বললেন য্যা য্যা। তোমাকে তো আজই কতোবার হারিয়ে দিয়েছি। খামখাই কেনো বড়াই করছ?এসো,আমরা কুস্তী লড়ি। বলাই বাহুল্য কর্ণ তাতে মোটেও রাজী ছিলেন না।

ভীমের দুর্দশা দেখে অর্জুন, সেই অর্জুনকেই ছুটে আসতে হল। তেমন জমাটি লড়াই কিন্তু হল না। কেশবএর নির্দেশ অনুসারে অর্জুন শরক্ষেপন করলে কর্ণ নিদারুন আহত হলেন। কর্ণ "এক্ষনে অর্জুনশরে দৃঢ়তর আহত হইয়া রথারোহনে সত্বর ভীমের নিকট হইতে পলায়ন করিতে লাগিলেন”। অর্জুন এতই পরাক্রান্ত যুদ্ধ করতে লাগলেন যে অশ্ব্ত্থামা কর্ণকে সাহায্য করতে এসে নিজেই দৌড়ে পালিয়ে গেলেন।

এইবারে অর্জুনের ফাইনাল এনকাউন্টার। সাথে রয়েছেন ভীম,সাত্যকি, যুধামন্যু আর উত্তমৌজা। বিপক্ষে জয়দ্রথকে ঘিরে রয়েছেন কৃপ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, বৃষসেন, দুর্য্যোধন আদি কৌরবেরা।

জয়দ্রথবধের আগে কর্ণ আর অর্জুনের শেষবারের মতন ডুয়েল হল। কর্ণ দাঁড়াতেই পারলেন না।অর্জুনের নিক্ষিপ্ত ভল্লাস্ত্রে (লম্বা তীর। আবার বল্লমের মতন হাতে ছুঁড়েও মারা যায়। ফলার ছিলো চওড়া আর ধারালো) কর্ণের সারথি আর ঘোড়ারা নিহত হল। কর্ণ একেবারে ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন। অবশেষে অশ্বত্থামার রথে উঠে তিনি যুদ্ধে ক্ষান্ত দিলেন।
এর আগেই অবশ্য কর্ণ স্বয়ং দুর্যোধনকে বলেছেন ভীমের শরাঘাতে আমার শরীর ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে। নেহাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে থাকতেই হবে তাই এখনো রয়েছি। তার আর লড়াই করবার মতন শারীরিক বা মানসিক ক্ষমতা ছিলো না।

অর্জুন যেনো একেবারে ক্ষেপে গেছেন। তিনি সাক্ষাত কৃতান্তের মতন রণস্থলীতে।"চতুর্দিকেভ্রমন করিয়া কখন মহাস্ত্রনিক্ষেপ, কখন রথমার্গে নৃত্য, কখন জ্যাশব্দ, কখন তলধ্বনি করিতে লাগিলেন"। অবশেষে অর্জুন জয়দ্রথের মুখোমুখী হলে। জয়দ্রথ কিছুটা যুঝলেন।অর্জুন প্রথমেই তার সারথির শিরশ্ছেদ করে তাকে অচল করে দিলেন। কৃপাচার্য্য একবার শেষচেষ্টা করলেন অর্জুনকে প্রতিহত করতে। ততক্ষনে কৌরব সেনারা জয়দ্রথকে একলা ফেলে পালিয়ে যেতে শুরু করেছে।

কৃষ্ণ বললেন, "হে অর্জুন! দিবাকর অস্তাচলশিখরে আরোহন করিতেছেন; অতএব তুমি শীঘ্র দুরাত্মা জয়দ্রথের শিরশ্ছেদন কর"। কোনো নাটক নয়, দীর্ঘ বর্ননা নয়, ব্রহ্মাস্ত্র, ঐন্দ্রাস্ত কিছুই নয়। একবার নিজের শুকনো ঠোঁটটা জিভে চেটে অর্জুন একটি "ভীষণ" শর নিক্ষেপ করলেন। "শ্যেনপক্ষী যেমন বৃক্ষাগ্র হইতে শকুন্তকে হরণ করিয়া থাকে, তদ্রূপ সেই গান্ডীবমুক্ত অশনিসদৃশ শর জয়দ্রথের মস্তক হরণ করিল"। উৎফুল্ল কৃষ্ণ পাঞ্চজন্যধ্বনিতে রণস্থলী মুখরিত করলেন।

এইবারে পান্ডব শিবিরে শুধু অভিনন্দনের পালা। যুধিষ্ঠির আনন্দাশ্রুপুর্ণলোচনে কৃষ্ণ আর অর্জুনকে আলিঙ্গন করলেন। অভিনন্দন জানালেন ভীম আর সাত্যকিকেও। যুধামন্যু আর উত্তমৌজার কথা উল্লেখিত হয় নি, কিন্তু তারাও যে পান্ডব শিবিরে বীরের সম্মান পেয়েছিলে সেটি অনুমান করতে দ্বিধা হয় না।

এই দিনে আট অক্ষৌহিনী সেনা ঘায়েল হয়েছিলো- মানে সতেরো লক্ষ। এটিই সবথেকে রক্তাক্ষয়ী দিন।


বিডি

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71