শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮
শনিবার, ১লা পৌষ ১৪২৫
 
 
তুতেন খামেনের মমি রহস্য
প্রকাশ: ০২:৫২ am ১৯-১২-২০১৫ হালনাগাদ: ০২:৫২ am ১৯-১২-২০১৫
 
 
 


অদিতি সরকার : মিশরীয় সভ্যতার ইতিহাসে প্রখ্যাত ফারাও রাজাদের মধ্যে তুতেন খামেন ছিলেন তুলনামুলকভাবে কম পরিচিত। তিনি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন তার মমি আবিষ্কারের পর।



পৃথিবীর ইতিহাসে এখন পর্যন্ত যত মমি আবিষ্কৃত হয়েছে তার প্রায় প্রত্যেকটিতেই চোর-ডাকাতদের হাত পড়েছিল। কিন্তু কিশোর ফারাও তুতেন খামেনের সমাধিটি ছিল অক্ষত।

চোরেরা এই সমাধিতে প্রবেশ করলেও মমি পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। ফলে তুতেন খামেনের মমি ও এর সঙ্গে যাবতীয় ধন-সম্পদ থেকে যায় অক্ষত।



পরবর্তীতে ১৯ শতকের প্রথম দিকে ১৯২২ সালে হাওয়ার্ড কার্টার ও তার দল তুতেন খামেনের সমাধিতে পৌঁছতে সমর্থ হন। মাটি খুঁড়ে কার্টার প্রথমেই একটি সিঁড়ির সন্ধান পান তারা । ফারাও তুতেন খামেনের নাম খোঁদাই করা একটি দরজায় গিয়ে সিঁড়িটি শেষ হয়েছে। কারনাভান ও কার্টার সিঁড়ি দিয়ে এগিয়ে গেলেন।



খুলে ফেললেন দরজা। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই আরেকটি দরজা তাদের চোখে পড়ল। দ্বিতীয় দরজাটি পরীক্ষা করে তাদের মনে হলো, অতীতে কোনো এক সময় সেটি একবার খোলা হয়েছিল। তারপর সেটাকে আরও সিল করে দেওয়া হয়। তাদের সন্দেহ হলো, সম্ভবত সেখানে একবার ডাকাতি। অনেক মূল্যবান দ্রব্যই হয়তো লুট হয়েছে। তবুও হতাশ হলেন না তারা। সমাধির মধ্যে, অর্থাৎ এন্টিচেম্বারের ভেতর তখনো যা কিছু ছিল, তা দিয়ে ফারাও তুতেন খামেন সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানা সম্ভব। এ বিষয়ে তারা নিশ্চিত ছিলেন।



১৯২২ সালের ২৬ নভেম্বর কার্টার দ্বিতীয় দরজাটির গায়ে একটা ফুটো করে এন্টিচেম্বারটির ভেতরে কী আছে তা দেখার চেষ্টা করলেন। কী দেখলেন তিনি? দেখলেন সোনার পাত দিয়ে মোড়ানো পালঙ্ক, সোনা-রুপার তৈরি একটি সিংহাসন, খাদ্য সংরক্ষণের অনেক বাক্স এবং আরও মূল্যবোন কিছু জিনিসপত্র। সব কিছুই অগোছালা ছিল। কিন্তু কেন? এর কি কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়? যায় বৈকি। যেমন_ অতীতে সম্ভবত সেখানে লুটতরাজের চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু প্রহরীদের সঙ্গে লড়াইয়ে পরাস্ত হয়ে লুটেরারা পালিয়ে যায় এবং তারপর প্রহরীরা কোনোকিছু গোছগাছ না করেই দরজাটি সিল করে দেয়।



পরবর্তী দুই মাস কার্টার এন্টিচেম্বারে রক্ষিত ওইসব মূল্যবান জিনিসপত্রের প্রচুর ছবি তুললেন। কিন্তু শুধু ছবি তুলেই কারনাভান ও কার্টার সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। বহু চেষ্টা করে ১৯২৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারা দরজাটি ভাঙতে সক্ষম হলেন। এন্টিচেম্বারে সোনার তৈরি একটি বড় বাক্স ছিল। তার ভেতর ছিল একই রকম অপেক্ষাকৃত ছোট আরও তিনটি বাক্স। চতুর্থ বাক্সটি ছিল মূলত হলুদ স্ফটিকমণির তৈরি একটি কফিন। কফিনটির ভেতরে একই রকম আরও তিনটি কফিন পাওয়া গেল। শেষ কফিনটি ছিল সোনার তৈরি এবং তার ওজন ছিল প্রায় ১৩৫ কিলোগ্রাম। চতুর্থ কফিনটির ডালা খুলে প্রত্নতত্ত্ববিদদ্বয় আবিষ্কার করলেন ফারাও তুতেন খামেনের মমিকৃত দেহ। মৃত ফারাওর মাথা ও কাঁধ ঢাকা ছিল একটি চমৎকার স্বর্ণের মুখোশে। তার বুকের উপর পড়ে ছিল কিছু শুকনো ফুল। এ ছাড়াও সম্পূর্ণ সমাধির আশপাশের বিভিন্ন কক্ষে পাওয়া গেল অসংখ্য মহামূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী, যার বেশির ভাগই ছিল স্বর্ণের। এসব সম্পত্তির পরিমাণ এত বেশি ছিল যে, এক কথায় বলতে গেলে তুতেন খামেনের সমাধি আবিষ্কারের পর মানুষ রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে যায়। কারণ তুতেন খামেন ফারাও রাজাদের মধ্যে খুবই অল্পসময় রাজত্ব করেন এবং খুবই অপরিচিত ছিলেন। তার সমাধিতেই যদি এত ধন-সম্পত্তি পাওয়া যায়, তাহলে বড় সমাধিগুলোতে কত সম্পত্তি লুকানো ছিল? বর্তমান যুগে এটি খুবই বড় একটি প্রশ্ন। কিন্তু সেসবের কথা ভেবে লাভ নেই। কারণ চোর-ডাকাতরা বহু আগেই সেসব সম্পদ নিজেদের করে নিয়েছে।



তুতেন খামেন খুবই অপরিচিত ফারাও রাজা ছিলেন বলে চোর-ডাকাতরা তার সমাধি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টাই হয়তো করেনি। এ কারণেই আধুনিক বিশ্বের আবিষ্কৃত একমাত্র অক্ষত সমাধিই হলো তুতেন খামেনের সমাধি।

এখানেই শেষ নয়, মমি আবিষ্কারের পর থেকে একের পর এক রহস্যময় ঘটনা ঘটতে থাকে।

এর সঙ্গে জড়িত প্রায় প্রত্যেকেরই রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। সব নাকি তুতেন খামেনের মমির অভিশাপ। সারা বিশ্বেই এটি এখন তুতেন খামেনের অভিশাপ নামে পরিচিত। প্রাচীন মিসরের ফারাও তুতেন খামেনের অভিশাপে অনেকের জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে। যারাই তার পিরামিডে ধন-সম্পদের লোভে গেছে তাদের জীবনে নেমে এসেছে অভিশাপের থাবা। ঘটেছে করুণ ঘটনা। এ এক রহস্য।



কারনাভানের অর্থায়নে হাওয়ার্ড কার্টারের মমি আবিষ্কারের পিছনে একটি হলুদ ক্যানারি পাখির অবদান ছিল। ইংরেজিতে 'ক্যানারি'র একটি অপ্রচলিত অর্থ হলো গুপ্তচর। এ পাখিটি তাদের গুপ্তধন পাইয়ে দিতে সহায়তা করেছিল। আর মমির অভিশাপের বিষয়টিও তাই হলুদ ক্যানারি পাখিকে দিয়েই শুরু হলো। যেদিন অভিযাত্রী দল প্রথম তুতেন খামেনের মমি আবিষ্কার করল, সেদিনই শুরু হলো অদ্ভুত আর রহস্যময় কাণ্ড-কারখানা



সেদিন রাতেই হাওয়ার্ড কার্টার তার বাসায় ফিরে এসে কাজের লোকের হাতে কয়েকটি হলুদ পালক দেখতে পান। সে পালকগুলো ছিল গুপ্তচর ক্যানারি পাখির। ভয়ে আতঙ্কিত কাজের লোকটির কাছে হাওয়ার্ড জানতে পারেন, একটি কোবরা তার ক্যানারি পাখিটিকে খেয়ে ফেলেছে। পরের শিকার লর্ড কারনাভান। যিনি এই খননকার্যে অর্থায়ন করেছিলেন। তিনি জানতেন ফারাওদের অভিশাপের কথা। কিন্তু বিশ্বাস করতেন না। তুতেন খামেনের সমাধিতে প্রবেশ করার অল্প দিনের মধ্যে মারা গেলেন কারনাভান। কায়রোর একটি হোটেলে তার মৃত্যু ঘটে। বলা হয়েছিল, একটি মশার কামড়েই নাকি তার মৃত্যু ঘটে। লর্ড কারনাভানের মৃত্যুর মাত্র দুই দিন পর তুতেন খামেনের মমিকৃত দেহটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, মমিটির বাম গালে কারনাভানের মতো ঠিক একই জায়গায় একটি ক্ষত রয়েছে।



যারা মমির অভিশাপে বিশ্বাস করত তাদের ধারণা মমির অভিশাপেই এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একের পর এক মানুষের জীবনাবসান হচ্ছে। লর্ড কারনাভানের মৃত্যুর কিছু দিন পর এ অভিযানের আরেক নেতৃস্থানীয় প্রত্নতত্ত্ববিদ আর্থার ম্যাক একই হোটেল কন্টিনেন্টালে প্রচণ্ড ক্লান্তি অনুভব করতে থাকেন।



প্রথমে বিষয়টিকে কেউ আমলে নেয়নি। বরং অভিযাত্রী দলের ডাক্তার এবং স্থানীয় ডাক্তারকে হতবাক করে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন তিনি। কারনাভানের এক বন্ধু তার মৃত্যুর কথা জানতে পেরে মিসরে যান সমাধি দেখতে।

কিন্তু তার দুর্ভাগ্য, সমাধিটি দেখার পর দিনই তিনি প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হলেন। আর এর মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে তারও মৃত্যু হয়। তখন অনেকেই তুতেন খামেনের সমাধির বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এভাবে সমাধিটি উন্মোচনের সময় কয়েকজন লোক উপস্থিত ছিলেন, তার মধ্যে ১২ জনই অস্বাভাবিকভাবে পরবর্তী ছয় বছরের মধ্যে মারা যান।



পরবর্তীতে ধীরে ধীরে খনি খননের কাজে বিভিন্নভাবে জড়িত প্রায় ২১ জনই মৃত্যুবরণ করেন। একজনই কেবল রক্ষা পেয়েছিলেন। তিনি প্রত্নতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টার। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে তুতেন খামেনের অভিশাপ নামে পরিচিত।

বর্তমানে তুতেন খামেনের মৃত মুখের ছাঁচে তৈরি মুখোশটি কায়রো জাদুঘরের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের একটি। গত বছর আগস্টে  জাদুঘরেরই এক কর্মীর ধাক্কায় ভেঙে যায় মুখোশের দাঁড়ির অংশটি। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত সাধারণ আঠা দিয়ে তাড়াহুড়ো করে সেটি জোড়া লাগানো হয়। মিসরীয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানতে পারে অনেক পরে। মুখোশের কোনো ক্ষতি না করে সেই আঠা তুলে ফেলাটাই এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা পরবর্তী ধাপে স্থায়ীভাবে দাঁড়ির অংশটি পুনর্স্থাপন করবেন। মূলত এ প্রকল্পের দুটি বড় অংশ রয়েছে, যার একটি হলো দাঁড়ির অংশটি খোলা এবং আবার তা পুনর্স্থাপন করা।



দ্বিতীয়তটি হলো, যে উপাদান দিয়ে এবং যে পদ্ধতিতে এটি তৈরি তার পূর্ণাঙ্গ গবেষণা। মাস দুয়েকের মধ্যেই এটি সম্পন্ন করা যাবে বলে আশা করছে মিসরীয় কর্তৃপক্ষ। এদিকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের পুরনো তুতেন খামেনের মমি আরেকটি কারণেও আলোচিত। সেটা হলো সমাধি আবিষ্কারের সাথে জড়িত একাধিক প্রত্নতাত্ত্বিকের রহস্যময় মৃত্যু। অনেকেরই ধারণা, মমিকৃত তুতান খামেনকে যে বিরক্ত করবে, ফারাও বংশের অভিশাপে মৃত্যুই তার শেষ পরিণতি।


এইবেলা ডটকম
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71