বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
দার্শনিক মানবেন্দ্রনাথ রায়ের ১৩০ জন্ম বার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ০১:২৬ am ২২-০৩-২০১৭ হালনাগাদ: ০১:৫০ am ২২-০৩-২০১৭
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

স্বাধীনতা সংগ্রামী, তাত্ত্বিক লেখক এবং দার্শনিক মানবেন্দ্রনাথ রায় (জন্মঃ- ২১/২২ মার্চ, ১৮৮৭ - মৃত্যুঃ- ২৫ জানুয়ারি, ১৯৫৪) ("সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান" অনুযায়ী)

অমৃতবাজার পত্রিকা তাঁকে ‘সারা বিশ্বে বিচরণকারী নিঃসঙ্গ সিংহ’ বলে উল্লেখ করত। ভারতীয় উপমহাদেশকে স্বাধীন করার জন্য তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। শুধু সর্বভারতীয় কমিউনিষ্ট পার্টির রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক কমিউনিষ্ট রাজনীতিতেও তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমৃত্যু লড়াই করেছেন মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। রাজনৈতিক দর্শনের আলোকে গড়ে তুলেছিলেন নিজেকে। মানবমুক্তির জন্য সারা জীবন কাজ করে গেছেন তিনি। তিনিই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। তার আসল নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। বিপ্লবী কাজ করতে গিয়ে তিনি অসংখ্য ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। মি. মার্টিন, মানবেন্দ্রনাথ, হরি সিং, ডা. মাহমুদ , মি. হোয়াইট, মি. ব্যানার্জী ইত্যাদী।এর মধ্যে মানবেন্দ্রনাথ রায় নামটি বেশি পরিচিত হয়ে উঠেছিল। তিনি ১৯২০ সালের ১৭ই অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। নানা অভিযোগে মানবেন্দ্রনাথ রায়কে ১৯২৯ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল থেকে বহিস্কার করা হয়। ১৯৩৭ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে গঠন করেন "লীগ অব র্যা ডিক্যাল কংগ্রেসমেন" । ১৯৪০ সালে গঠন করেন র্যা ডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। ১৯৪০ সালে তিনি কংগ্রেসের সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। সেই সময় তিনি ও সুভাস চন্দ্র বসু প্রভাত রঞ্জন সরকারের কাছ থেকে দীক্ষা (আধ্যাত্মিক সাধনা)নেন। মানবেন্দ্রনাথ রায চাইতেন ভারতের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা । অর্থনৈতিক দিক থেকে ভারত যদি স্বাধীন হয়, তাবেই ভারত প্রকিত স্বাধীনতা পাবে , এই ছিল তার উপল্বধি । কিন্তু সুভাস চাইত কোন ভাবে ভারত আগে স্বাধীন হোক। তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে ইন্ডিয়ান ট্রানজিশন (১৯২২), নিউ হিউম্যানিজম (১৯৪৭) , মাই মেমোয়ার্স ( ১৯৫৪) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

নরেন আড়বেলিয়ায় প্রাথমিক শিক্ষালাভ করেন। ১৮৯৮ সালে তাঁর পরিবার আড়বেলিয়া থেকে কোদালিয়ায় স্থানান্তরিত হয়। এখানে তিনি হরিনাভি অ্যাংলো-সংস্কৃত বিদ্যালয়ে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। সমাজসেবার প্রতি আগ্রহ থেকে তিনি মহামারী ও দুর্ভিক্ষপীড়িতদের পরিচর্যার জন্য একটি স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও স্বামী বিবেকানন্দের রচনা তাঁকে উৎসাহিত করে। বঙ্গভঙ্গের সূচনাকালে তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদীদের সংস্পর্শে আসেন। ১৯০৫ সালে প্রধান শিক্ষকের আদেশ অমান্য করে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর সংবর্ধনা সভায় উপস্থিতি এবং মিছিলে অংশগ্রহণের অপরাধে নরেন কয়েক জন সহপাঠীসহ স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হন। পরবর্তীকালে তিনি অরবিন্দ ঘোষের অনুশীলন সমিতির সংস্পর্শে আসেন। 
নরেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (অরবিন্দ ঘোষ কতৃক প্রতিষ্ঠিত) থেকে এন্ট্রান্স পাস করেন। তারপর তিনি বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনষ্টিটিউটে প্রকৌশল ও রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন। সে সময়ে তিনি তাঁর গুপ্ত বিপ্লবী দলসহ সুন্দরবন এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে বোমা তৈরি এবং গুলি চালানো চর্চা করেন। 
কিছু সময় তিনি বাঘা যতীনের সঙ্গে অনুশীলন সমিতির মুখপত্র যুগান্তর এ কাজ করেন। তিনি তাঁর দলসহ হাওড়া-শিবপুর এলাকায় গুপ্ত কর্মকান্ডে লিপ্ত ছিলেন। ১৯১০ সালে তিনি গ্রেফতার হন এবং তাকে ‘হাওড়া-শিবপুর ষড়যন্ত্র মামলা’র আসামি করা হয়। দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মামলার বিচার চলাকালে যতীন ও নরেন আটকাবস্থায় সারা ভারতে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেন। কারামুক্তির পর নরেন ১৯১৪ সাল পর্যন্ত সন্ন্যাসী বেশে বিভিন্ন স্থানে বিপ্লবী সংগঠন স্থাপন করেন। বিপ্লবী সংগঠনসমূহ দূরপ্রাচ্য, পশ্চিম আমেরিকা ও জার্মানিতে ছড়িয়ে পড়ে। বার্লিনে ভারতীয় বিপ্লবী কমিটিও গঠন করা হয়। 
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে বাঘা যতীন ও নরেন জার্মান সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। তারা জার্মান সরকারের কলকাতাস্থ প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি জার্মান সামরিক ও অর্থ সাহায্যের নিশ্চয়তা প্রদান করেন। তদনুযায়ী নরেন চার্লস মার্টিন ছদ্মনামে বাটাভিয়ায় জার্মান কনসাল জেনারেলের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রেরিত হন। অস্ত্রের চালান ও গোলা-বারুদ সুন্দরবন এলাকায় পাঠানোর বন্দোবস্ত হয়। নরেন যতীনকে লুকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে বালেশ্বেরে নিয়ে যান। 
অস্ত্রের চালান না পৌঁছায় নরেন বাটাভিয়ায় ফিরে যান হরি সিং ছদ্মনামে এবং জার্মান কূটনীতিকদের অসহযোগিতা লক্ষ্য করেন। তিনি অস্ত্র ছাড়া ভারতে না ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। তাই মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইন্দো-চীন, ফিলিপাইন, কোরিয়া এবং জাপানে বিপ¬বীদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁর অভিযান অব্যাহত রাখেন। 
নরেন মি. হোয়াইট নামে টোকিওতে সহকর্মী বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য জাপান গমন করেন। সেখানে নির্বাসিত চৈনিক প্রেসিডেন্ট ডা. সান ইয়াৎ-সেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁদের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয় যে, আসাম সীমান্তের নিকটে নরেন দুই চৈনিক গভর্নরের নিকট থেকে জার্মান সরকার কর্তৃক মূল্য পরিশোধিত গোলা-বারুদ গ্রহণ করবেন। নরেন চীন গমন করেন এবং পিকিং-এ জার্মান রাষ্ট্রদূত জার্মান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য নরেনকে বার্লিনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নরেনের জন্য ফাদার চার্লস মার্টিন নামে একটি পাসপোর্টের ব্যবস্থা করেন, যিনি নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য আমেরিকা হয়ে ফ্রান্স যাবেন। 
১৯১৬ সালের ১৪ জুন নরেন সানফ্রান্সিসকো পৌঁছান। পরের দিন প্রভাতী সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় যে, ‘একজন বিপজ্জনক হিন্দু বিপ¬বী, জার্মান গুপ্তচর, আমেরিকায় পদার্পণ করেছে।’ নরেন অনতিবিলম্বে হোটেল পরিত্যাগ করে স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। সেখানে তাঁর প্রখ্যাত বিপ্লবী সহকর্মী যদুগোপাল মুখোপাধ্যায়ের অনুজ অধ্যাপক ধনগোপালের আশ্রয় গ্রহণ করেন। ধনগোপাল অবিলম্বে তাঁর নাম পরিবর্তন করার উপদেশ দেন। তাঁরই উপদেশে নরেন, মানবেন্দ্রনাথ রায় (এম.এন রায়) নাম গ্রহণ করেন। সানফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টের মেয়েকে তিনি বিয়ে করেন। মানবেন্দ্র দম্পতি নিউইয়র্কে লালা লাজপত রায়ের আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরিতে মার্কসবাদ অধ্যয়ন করেন। 
১৯১৭ সালের এপ্রিল মাসে আমেরিকা জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং আমেরিকার পুলিশ ভারতীয় বিপ্লবীদের জার্মান চর হিসেবে গ্রেফতার করা শুরু করে। গ্রেফতার এড়াতে ড. জর্ডনের নিকট থেকে একখানি পরিচয়পত্র নিয়ে মানবেন্দ্র মেক্সিকো যান। এই পত্রের বরাতে তিনি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি কারাঞ্জা ও সমর মন্ত্রিসহ উচ্চ পর্যায়ের অফিসারবৃন্দ ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ পান। রাষ্ট্রপতি তাঁকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেন এবং একটি সম্মানজনক আবাস প্রদান করেন। 
মানবেন্দ্র রায় অসংখ্য বক্তৃতা ও প্রবন্ধের মাধ্যমে ভারতের পক্ষে জনমত গঠন করেন। এ সময় তিনি স্প্যানিশ, ফরাসি ও জার্মান ভাষা শেখেন। রাষ্ট্রপতির আমেরিকা বিরোধী অবস্থানে রায় ছিলেন একজন বেসরকারি উপদেষ্টা। ১৯১৮ সালের আগস্ট মাসে মানবেন্দ্র রায় সাড়ম্বরে সোশ্যালিস্ট পার্টির সম্মেলন আয়োজন করেন। এ সময় বহু আমেরিকান সাংবাদিক, শিল্পি, কবি, বিজ্ঞানী ও দার্শনিক বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ এড়াবার জন্য মেক্সিকো পাড়ি জমান। রাষ্ট্রপতি কারাঞ্জা রায়ের জনপ্রিয়তায় খুশি হন। রায় এতো জনপ্রিয় ছিলেন যে, রাষ্ট্রপতি সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রতিনিধিরূপে একজন শ্রমমন্ত্রী মনোনয়নের জন্য রায়কে অনুরোধ করেন। 
সে সময় লেনিনের দূত মাইকেল বরোডিন (১৮৮৪-১৯৫৩) মেক্সিকো গমন করেন। তিনি রায় দম্পতির অতিথি হিসেবে মেক্সিকোর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পরিচিত হন। এর ফলে মেক্সিকো এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ফলশ্রুতিতে বরোডিন মেক্সিকোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন এবং লেনিনের নিকট রায়ের কর্মকান্ডের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। লেনিন ১৯২০ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে মস্কোয় অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় বিশ্ব কংগ্রেসের অধিবেশনে যোগদানের জন্য রায়কে আমন্ত্রণ জানান। মস্কোর পথে বার্লিনে অবস্থানকালে রায় বিশেষ করে মার্কসবাদের আদর্শগত দ্বন্দ্ব সম্পর্কে মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির ব্যর্থতা ও সামরিক শক্তির উত্থান প্রত্যক্ষ করেন। 
মস্কোতে রায় লেনিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর ‘On National and Colonial Question’ শীর্ষক তত্ত্বের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। লেনিন রায়কে তাঁর নিজস্ব তত্ত্ব প্রদানের আহবান জানান। উভয় তত্ত্ব নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং কংগ্রেস কর্তৃক উভয় তত্ত্বই একত্রে গৃহীত হয়। কংগ্রেস অধিবেশনের পর রায় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের এশিয়ান ব্যুরোর দায়িত্ব পান। এর সদর দফতর স্থাপিত হয় তাসখন্দে। তিনি গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের খোরাশান প্রদেশের রাজধানী মাশাদ থেকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে বিতাড়িত করেন। রক্তপাতহীন বিপ্লবের মাধ্যমে বোখারায় সোভিয়েট সরকার গঠন করেন। খিলাফত আন্দোলনে ভারতীয় মোহাজেরদের পুনর্বাসিত করেন। তাদের মধ্য থেকে শিক্ষিতদেরকে সমাজতান্ত্রিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাদের জন্য একটি সামরিক বিদ্যালয়ও স্থাপন করেন। তিনি ১৭ অক্টোবর ১৯২০ সালে তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। 
১৯২১ সালের আগস্টে রায় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের তৃতীয় বিশ্ব সম্মেলনে যোগ দেন। ১৯২২ সালে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক রায়ের India in Transition নামক গ্রন্থ চার ভাষায় প্রকাশ করে। রায় মস্কোতে শ্রমিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৩ সালে তিনি তাঁর সদর দফতর বার্লিনে স্থানান্তর করেন এবং ভারতের জন্য লেখনী বিপ্লব শুরু করেন। তিনি The Vanguard of Indian Independence পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং ভারতে পাঠান। ভারত সরকার তাৎক্ষণিকভাবে এ পত্রিকা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তিনি Advanced Guard শিরোনামে এটি পুনঃপ্রকাশ করেন। এটিও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। সর্বশেষে তিনি The Masses পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং সেটিও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। 
লেনিনের জীবদ্দশায় রায় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সকল উচ্চপদ লাভ করেন। ১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যুর পর তিন বছর তা বজায় থাকে। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের চৈনিক কমিশনের যুগ্ম-সচিব হিসেবে রায়কে কমিউনিস্টবাদী ও কু মিন তুং-এর মধ্যে বিবাদ নিরসনে আলোচনার জন্য চীনে প্রেরণ করা হয়। বিবাদ নিষ্পত্তিতে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও বরোডিনের মতের সঙ্গে রায়ের মতভেদ হয়। ফলে চিয়াং কাই শেক কমিউনিস্ট আন্দোলনকে নির্মমভাবে দমন করেন। মস্কো ফিরে রায় অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার জন্য তাঁকে বার্লিনে নেওয়া হয়। ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাসে রায়ের অনুপস্থিতিতে বিরোধী কমিউনিস্ট সংবাদপত্রে রচনা প্রকাশ করার অপরাধে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। রায় বার্লিনে অবস্থানকালে Revolution and Counter-Revolution in China এবং Decline and Fall of British Empire রচনা করেন। 
এম.এন রায় ১৯৩০ সালে ড. মাহমুদ নামে ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৩১ সালের জুলাই মাসে তিনি বোম্বাই শহরে গ্রেফতার হন এবং রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে কানপুর জেলে বিচারে ১২ বছর সশ্রম কারাদন্ড হয়। আপিল করে কারাদন্ডের মেয়াদ ৬ বছর কমানো হয়। কারাগারে বসে তিনি Philosophical Consequences of Modern Science নামে একটি বিশাল গ্রন্থ রচনা করেন। জেলখানায় রচিত গ্রন্থের তথ্য অবলম্বনে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে তাঁর নিম্নলিখিত গ্রন্থগুলি প্রকাশিত হয়: Materialism, The Historical Role of Islam, Heresies of 20th Century, Science and Superstition, Man and Nature, From Savagery to Civilization, Nationalism: An Antiquated Cult, The Philosophy of Fascism, The Ideal of Indian Womanhood, Letters from Jail, Memoir of a Cat, Science and Philosophy এবং India’s Message। 
১৯৩৬ সালে কারামুক্তির পর রায় ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং ‘দি লীগ অব র্যা ডিক্যাল কংগ্রেসম্যান’ গঠন করেন। তিনি সুভাষচন্দ্র বসুকে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সভাপতি হতে সমর্থন জানান। কংগ্রেসের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে যুদ্ধনীতি নিয়ে তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের মতানৈক্যের কারণে তিনি কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৪০ সালে তিনি গঠন করেন র্যােডিক্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি প্রবলভাবে মিত্র শক্তিকে সমর্থন করেন, কারণ তিনি অনুধাবন করেন যে, ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যবাদ ফ্যাসিবাদের চেয়ে কম ক্ষতিকর। 
১৯৪০ থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যে রায় কিছু গ্রন্থ রচনা করেন: India and War, Alphabet of Fascist Economy, Draft Constitution of Free India, People’s Freedom, Poverty or Plenty, The Problems of Freedom, INA and the August Revolution, Jawaharlal Nehru: The Last Battle for Freedom। তিনি দেরাদুনে ১৯৪০ সালে পাঠচক্র পরিচালনা করেন এবং The Scientific Politics নামক গ্রন্থ রচনা করেন। ১৯৪৬ সালে অন্য একটি পাঠকক্র পরিচালনা করে তিনি New Orientation রচনা করেন। Constituent Assembly গঠনের জন্য তিনি অরাজনৈতিক ভিত্তিতে নির্বাচনের সুপারিশ করেন। এই নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচনায়কারী হবেন। তিনি ক্ষমতার পূর্ণবিকেন্দ্রীকরণ এবং দুর্নীতি দমনের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। 
রায় মার্কসবাদের সংশোধিত রূপ প্রকাশ করেন তাঁর Beyond Marxism ও New Humanism গ্রন্থে। ১৯৪৭ সালে রায় ১৯১৭ সাল থেকে রাশিয়ার ঘটনাক্রমসমূহ যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করেন। ১৯৪৮ সালে র্যাuডিক্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির বিলোপ সাধন করে তিনি ইন্ডিয়ান রেনেসাঁস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। Reason, Romanticism and Revolution তাঁর যুগান্তকারী রচনা। এরপর তিনি তাঁর জীবনস্মৃতিমূলক গ্রন্থ রচনা আরম্ভ করেন, যা তিনি সম্পন্ন করে যেতে পারেন নি। 
মানবেন্দ্রনাথ রায়ের ১৯৫৪ সালের ২৫ জানুয়ারি মধ্যরাতে দেরাদুনে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়। অমৃতবাজার পত্রিকা তাঁকে ‘সারা বিশ্বে বিচরণকারী নিঃসঙ্গ সিংহ’ বলে উল্লেখ করে।

 

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71