শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮
শুক্রবার, ২রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
দীনেশচন্দ্র সেনের ‘বৃহৎ বঙ্গ’ অথবা নতুন মহাভারত প্রসঙ্গে
প্রকাশ: ১১:৫৫ am ১৮-০৫-২০১৭ হালনাগাদ: ১১:৫৫ am ১৮-০৫-২০১৭
 
 
 


‘দীনেশ সেনকে আমরা প্রকারান্তরে বাঙালী জাতের সামাজিক ইতিহাসের উদ্ধারকর্তারূপে সম্মান করতাম। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার গবেষণার একদিকে আর দীনেশ সেন আর একদিকে,—এইরূপ ছিল ধারণা। তখনকার দিনে এই দুজনই ছিলেন ঐতিহাসিক গবেষণার পথ-প্রদর্শক।

দীনেশ সেনের সাহিত্য-ব্যাখ্যার ভেতর ধর্ম, দেবদেবী, পূজা-পার্বণ, হাঁচি-টিকটিকি ইত্যাদি অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানের প্রভাব খুব বেশী। কিন্তু সাহিত্যের উপর ধর্মের একচাটিয়া প্রভাব দেখানো সাহিত্য-সমালোচকদের পক্ষে মস্ত দোষ। ঐতিহাসিক ও সাহিত্য-সমজদার দীনেশ সেনের অসম্পূর্ণতা আমি সেকালেও দেখেছি, একালেও দেখে থাকি। তবুও দীনেশ সেনকে তখনকার মতন এখনও বঙ্গবীর, বঙ্গনায়ক, সার্বজনিক বাঙালী ছাড়া আর কিছু ভাবি না।’

—বিনয় কুমার সরকার, ১৯৪২ (মুখোপাধ্যায় ২০০৩ : ১৮৩ ও ২৮৭)

‘পর্দা উঠিবামাত্র ভারতবর্ষের ইতিহাসের প্রথমাঙ্কেই আমরা আর্য-অনার্যের প্রচণ্ড জাতিসংঘাত দেখিতে পাই। এই সংঘাতের প্রথম [পর্বে] প্রবল বেগে অনার্যের প্রতি আর্যের যে বিদ্বেষ জাগিয়াছিল তাহারই ধাক্কায় আর্যেরা নিজের মধ্যে নিজে সংহত হইতে পারিল।... এই সমস্ত ইতিহাসকে ঘটনামূলক বলিয়া গণ্য করিবার কোনো প্রয়োজন নাই, আমি ইহাকে ভাবমূলক বলিয়া মনে করি। ইহার মধ্যে তথ্য খুঁজিলে ঠকিব, কিন্তু সত্য খুঁজিলে পাওয়া যাইবে।’

—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯১২ (ঠাকুর ১৩৯৫ : ১৮ ও ২৮)

ইংরেজি ১৮৬৬ সালের নবেম্বর মাসে-কেহ বলেন মাসের তিন তারিখে, কেহ বা বলেন ছয় তারিখে-দীনেশচন্দ্র সেনের জন্ম। এইভাবে হিশাব কষিতে বসিলে দেখা যাইবে, গত বছর-মানে ২০১৬ সাল নাগাদ-তাঁহার বয়স একশত পঞ্চাশ বছর নিরবে পার হইয়া গিয়াছে। জসীম উদ্‌দীন কিংবা আহমদ ছফা—এই দুইজনের কোন একজনও যদি আজ বাঁচিয়া থাকিতেন এই মহাত্মা পুরুষের বড় দিনটি হয়তো এত নিঃশব্দে পার হইত না।

এই বক্তৃতা দিবার উপযুক্ত মানুষ শহর ঢাকায় একজনই ছিলেন। তাঁহার নাম জসীম উদ্‌দীন। দ্বিতীয় জনের নাম করিতে হইলে আমি আহমদ ছফার নামটা স্মরণ করিব। আমি কোন বিচারেই তাঁহাদের স্থলে অভিষিক্ত হইবার যোগ্য নহি। গত বছর কি ভাবিয়া বা না ভাবিয়াই একবার উচ্চারণ করিয়াছিলাম, তবে কি এতদ্দেশে দীনেশচন্দ্র সেনের নামতা কেহ আর মুখে আওড়াইবেন না! দেখিলাম, দেয়ালেরও কান আছে। বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর তাহাই প্রমাণ করিয়াছেন। বরং বিলম্বে কদাচ নাস্তি নহে! আর দায়টা পড়িবি তো পড়িলি দূতের ঘাড়ে! ‘দূত অবধ্য’ কথাটার আমরা অবাধ্য হইলাম!

দীনেশচন্দ্র সেনের সাধনা বিষয়ে বক্তৃতা লিখিবার কোন যোগ্যতাই আমার নাই। আমি এমনই ভাগ্যবঞ্চিত যে-দীনেশচন্দ্র দূরের কথা-জসীম উদ্দীনেরও দেখা পাই নাই। ভাগ্যের মধ্যে, আহমদ ছফার পদতলে দাঁড়াইয়া দুই চারি বৎসর বিদ্যাভ্যাসের সুযোগ পাইয়াছিলাম। সত্যের অনুরোধে বলিতেছি, আহমদ ছফার বাক্য শ্রবণ না করিলে হয়তো দীনেশচন্দ্রের সহিত আমার পরিচয় আরও বহুদিন পরাহত হইয়াই থাকিত। আজিকার এই বক্তৃতা তাই আমি মহাত্মা আহমদ ছফার নামেই উৎসর্গ করিতে বাঞ্ছা করিয়াছি। দুঃখের মধ্যে, বলিবার মতন তেমন নতুন কথা আমার বিশেষ নাই। আমি শুদ্ধ কয়েকটি কথার তাৎপর্য কি তাহা বিচার করিতে সাহস করিয়াছি। বাকি আপনাদের কৃপা।

অতি সম্প্রতি মহাত্মা আহমদ ছফার একটি দুর্লভ কবিতা আমাদের হাতে পড়িয়াছে। প্রথম প্রকাশের সনতারিখ দেখিয়া মনে হয় ইহা তাঁহার বিশ-একুশ বছর বয়সের রচনা। কবিতাটি মহাত্মার জীবদ্দশায় প্রকাশিত কোন কেতাবপত্রে কিংবা তাঁহার মৃত্যুর পরে সম্পাদিত রচনাবলিতে আজ পর্যন্ত স্থান পাইয়াছে বলিয়া আমরা জানি না। ইহাতে দেখা যায় কোন এক সন্তান পায়ে হাঁটিয়া প্রয়াত পিতার কবর জিয়ারতের অভিজ্ঞতা লিখিতেছেন। তাহা সত্ত্বেও আমার কেন জানি মনে হইল, এই কবিতার তাৎপর্য নিতান্ত পরিবার ও ব্যক্তিগত বেদনায় সীমাবদ্ধ নাও থাকিতে পারে। ইহার ছায়া জাতীয় জীবনেও পড়িতে পারে। আহমদ ছফা এখানে যে জনকের কথা বলিতেছেন সেই জনকের সহিত আমাদের ভাষার কোথায় যেন একটা সংযোগ আছে। দীনেশচন্দ্র সেনের স্মৃতির উদ্দেশে আহমদ ছফা ১৯৯৫ সালে একবার ভক্তি নিবেদন করিয়াছিলেন। ১৯৯৭ সালে আরেকবার।

সবিনয় সংযোগ করি, ১৯৬৪ সালে লেখা তরুণ আহমদ ছফার ‘জনকের কবরে’ নামধেয় এই কবিতাটিও দীনেশচন্দ্র সেনের স্মৃতির উদ্দেশে নতুন করিয়া নিবেদন করা যাইতে পারে। দীনেশচন্দ্র সেনকে বাদ রাখিয়া বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লেখা হইবে কি করিয়া! একালের বাংলা সংস্কৃতির জনক জ্ঞান করিয়াই মাত্র আমরা তাঁহার কীর্তির যথোপযুক্ত মূল্য নিরুপণ করিতে পারি। আমেন।

অধরে কথার ঢেউ, চিন্তা আর চাঞ্চল্যের শিখা

দিগন্তে ফেরারী হল, আধবোঁজা পৃথিবীর চোখ—

অচেনা বাঁধনে তার দিব্যরূপরেখা

বেঁধেছে আমারে আহা, স্বপ্নময় যেন দুই তীর

মাঝখানে বয়ে যায় জীবনের বেগবান নদী।

যখন পেছনে চাই জনকের ডাক কানে বাজে

ভেসে আসে সঙ্গীতের সুরেলা ঝঙ্কার,

শিরায় রোমাঞ্চ জাগে, বেতস লতার বনে

ফিরে যাই, শিশু হই-মনে মনে বলি বারবার

অসম্ভব যতো কথা-পিতৃছবি আঁখিকোণে আঁকি।

চলে যাই আরো আগে যখন ফুটেছে ঠোঁটে

আধো আধো বোল, জনকের চোখে চোখ রেখে

যখন কয়েছি কথা, প্রাণ খুলে কত অকপটে।

হাজারো জান্নাত আমি গড়িয়ে দিয়েছি কত

জীবনের যৌবনের স্রোতে-তারপর আমি গেছি

বন্ধুহীন বিয়াবানে প্রাণের পরশ পেতে

মেকীর বাজারে, আব্বাজান, কি আমি পেয়েছি?

তোমার কবরে আজ ধীরে ধীরে সন্তর্পণে এসে

সবুজ দুর্বার সাথে কিছুক্ষণ কথা কয়ে

সজল নিশ্বাসে পুনঃ ফিরে চলে যাই

দুইটি তরল মুক্তা এই দুই আঁখিকোণে লয়ে।

পরলোকগমনের কিছুদিন আগে কবি জসিম উদ্‌দীন কলিকাতার একটি বনিয়াদী পত্রিকাযোগে দীনেশচন্দ্র সেনের স্মৃতিকথা নতুন করিয়া লিখিয়াছিলেন। ১৯৭৬ সাল নাগাদ-আমাদের কবিবর এই ইহলোক ছাড়িবার সামান্য কিছুদিন পর-‘স্মরণের সরণী বাহি’ নামের সেই স্মৃতিকথাটি বই আকারেও ছাপা হইয়াছিল। এই স্মৃতিকথার এক জায়গায় কবি লিখিতেছেন, ‘কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বৎসরগুলিতে দীনেশবাবুর জীবন বড়ই অসহায় ছিল। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের দল তাঁহাকে বড়ই কোণঠাসা করিয়া ফেলিয়াছিলেন। শনিবারের চিঠি ‘শ্রীদীনেশ’ নাম দিয়া ধারাবাহিকভাবে তাঁকে গালাগালি দিতেছিল।’ (জসীম উদ্‌দীন ২০০০ : ৫৭)

এই জায়গায় পৌঁছিয়া কবি জসীম উদ্‌দীন যোগ করিতেছেন, ‘একদিন আমি তাঁকে বলিলাম, ‘আপনার বিরুদ্ধে লোকে এত কিছু লেখে। আমাদের সহ্য হয় না। আপনি এদের ওপর মানহানির মকদ্দমা করেন না কেন?’ তিনি বলিলেন, ‘এরা আর কত শত্রুতা করবে? আমার সবচাইতে বড় শত্রু মরণ আমার সামনে এসে খাড়া হয়ে আছে। এ শত্রুর বিরুদ্ধে কোন আদালতে নালিশ করব বলতে পার?’ (২০০০ : ৫৭-৫৮)

বাংলাদেশের একজন প্রায় ‘জাতীয় কবি’ পদবাচ্য কবি প্রণীত এই কাহিনী হইতেও আমরা আজ কিছু পরিমাণে আন্দাজ করিতে পারি, দীনেশচন্দ্র সেন মানুষটা কোন ধাঁচের ছিলেন। তিনি কি জানিতেন, মরণের চেয়েও ঘোর আরেক শত্রু মরণের পর তাঁহার ঘাড় ভাঙ্গিবার অপেক্ষায় বসিয়াছিল? এই বিখ্যাত শত্রুর নাম কাল বা বিস্মৃতি। তাঁহার রচিত ‘বৃহৎ বঙ্গ’ যে একদিন তাঁহাকে বিস্মৃতির অতলে তলাইয়া দিবে তাহা কি তিনি কদাচ ভাবিতে পারিয়াছিলেন? জসীম উদ্‌দীনের উপরোক্ত স্মৃতিকথা প্রকাশের কিছুদিন পর দীনেশবাবুর পুত্রের ঘরে নাতি স্বনামধন্য কবি সমর সেনও ‘বাবুবৃত্তান্ত’ নামক এক বিখণ্ড আত্মকথায় অভিযোগ করিতেছিলেন, ‘ঠাকুর্দা দীনেশচন্দ্র সেন পূর্ববঙ্গ থেকে কলকাতায় আসেন গত শতাব্দীর শেষ দিকে। তাঁর খণ্ড আত্মজীবনী আছে ‘ঘরের কথা ও যুগসাহিত্য’ গ্রন্থে। বঙ্গভাষা ও সাহিত্যে দীনেশচন্দ্রের অক্লান্ত অনুরাগ ও গবেষণায় অসাধারণ (অনেক সময় পদব্রজে) পরিশ্রমের কথা, তাঁর পথিকৃতের ভূমিকা বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছে।’ সমরবাবু সেদিনকার ঐ খণ্ডিত বয়ানে আরও যোগ করিতেছিলেন, ‘তাঁর তথ্যগত ভুলভ্রান্তি পণ্ডিতেরা খুঁজিয়া দেখিয়াছেন, কিন্তু তাঁর অকৃত্রিম অনুরাগের ছিটেফোঁটা এঁদের থাকলে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধতর হতো।’ (সেন ২০০৪ : ১৫)

একই প্রসঙ্গ ধরিয়া জসীম উদ্‌দীন আবার লিখিয়াছেন, ‘দীনেশবাবু বড় ভাবপ্রবণ ছিলেন। তিনি সাহিত্য সমালোচনা করিতেন তাঁর সেই ভাবপ্রবণ অন্তর দিয়া। তাই তাঁর ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ পুস্তকের সন-তারিখে কিছু কিছু ভুল ছিল। সেই তিলকে তাল বানাইয়া তাঁহার বিরুদ্ধপক্ষরা তাঁকে হেয় করিতে চেষ্টা করিতেন। সাহিত্যের ইতিহাস লেখা মানে লেখকদের জন্মের বা আবির্ভাবের সন-তারিখ লইয়া গবেষণা করা নয়। সাহিত্যের ইতিহাস-লেখকের কাজ যুগের সাহিত্যরথীদের রসভাণ্ডারে প্রবেশ করিয়া তাহা পাঠকদিগকে আস্বাদন করাইয়া দেওয়া। তাঁহাদের রচনার মর্মকথাটির সঙ্গে তাঁহাদের প্রকাশভঙ্গিমার বৈশিষ্ট্য বলিয়া দেওয়া। যে যুগে তাঁহারা আবির্ভূত হইয়াছিলেন সেই যুগের ইতিহাস সমাজজীবন প্রভৃতির সঙ্গে তাহার ভাবধারা লইয়া আলোচনা করা। ইংরাজি সাহিত্যের ইতিহাস যাঁহারা লিখিয়াছেন, যতদূর মনে হয় তাঁহারাও উপরোক্ত আদর্শ সামনে রাখিয়া তাঁহাদের পুস্তক রচনা করিয়াছেন। কিন্তু দীনেশবাবুর শেষজীবনে তাঁহার বিরুদ্ধ পক্ষেরা তাঁহার পুস্তকের সামান্য ভুল-ত্রুটি লইয়া তাঁহার জীবন দুর্বিষহ করিয়া তুলিতেছিলেন।’ (জসীম উদ্‌দীন ২০০০ : ৫৮)

বিশ্ববিদ্যালয় হইতে অবসর লইবার পর দীনেশচন্দ্র সেন তাঁহার ‘বৃহৎ বঙ্গ’ বইখানি লিখিতে শুরু করেন। এই গ্রন্থই—বইয়ের উৎসর্গপত্রে তিনি আশংকা প্রকাশ করিয়াছিলেন—সম্ভবত তাঁহার হাতে লিখিত শেষ গ্রন্থ হইতে যাইতেছে। জসীম উদ্‌দীন স্মরণ করিতেছেন : ‘বাংলাদেশের ওপর এ পর্যন্ত যত বইপুস্তক ছাপা হইয়াছে, জেলাওয়ারিভাবে যতগুলি জেলার ইতিহাস লেখা হইয়াছে, হিন্দু-সমাজের নানা বর্ণের যেসব “কুলপরিচয়” গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হইয়াছে সবগুলি সংগ্রহ করিয়া এই জ্ঞানসাধক মহাতপস্যায় সমাসীন হইলেন। সকাল হইতে দুপুর-দুপুর হইতে সন্ধ্যা কি একাগ্রভাবে তাঁহার অধ্যয়ন চলিতে লাগিল! তিনি শুধু পড়িতেন না, পড়িয়া পড়িয়া নোট গ্রহণ করিতেন। খাতার পর খাতা ভর্তি হইয়া চলিল। এইভাবে প্রায় বৎসরখানেক চলিয়া গেল। এইবার তিনি তাঁহার মহাগ্রন্থ রচনা আরম্ভ করিলেন। “বৃহৎ বঙ্গ” তো নয়—বাঙালি জাতির অতীত জীবনের মহাভারত।’ (২০০০: ৫৯)

বলা বাহুল্য নহে, ‘বৃহৎ বঙ্গ’ লিখিবার সময় দীনেশচন্দ্র সেনের বয়স হইয়াছে। কিন্তু তাঁহার পরিশ্রমের যেন বয়স নাই। জসীম উদ্‌দীন সেই দিনের কাহিনী আবারও বলিতেছেন : ‘আবার সেই সকাল হইতে দুপুর-দুপুর হইতে সন্ধ্যা-সন্ধ্যা হইতে অর্ধরাত। অতীতের মহা তিমিরাবরণ ভেদ করিয়া বাঙালি জাতির যেখানে যত গৌরবের কথা, শিল্পকলার অমর অবদানের কথা ভেলকিবাজির মতো দুই হাতে কুড়াইয়া আনিয়া তিনি তাঁর মহাগ্রন্থে শামিল করিতে লাগিলেন।’ (২০০০ : ৫৯)

তিনি কিভাবে কাজ করিতেন তাহার একটা অন্তরঙ্গ ছবিও পাওয়া যাইতেছে জসীম উদ্‌দীনের এই লেখায় : ‘এই সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁহার পাশে বসিয়া থাকিয়াছি। সত্তর বৎসরের বৃদ্ধ যেন নবযৌবনের উদ্যম ও দীপ্তি পাইয়াছেন। বাহিরের কোন কোলাহল-কোন দুর্ঘটনার সংবাদ কিছুই তাঁহাকে এই মৌন তপস্যা হইতে বিরত করিতে পারে নাই। লোকজন আসিয়াছে তাঁহার সঙ্গে দেখা করিতে। তিনি অভ্যাগত কাহাকেও ফিরাইয়া দিতেন না। তাহাদের সঙ্গে কথা বলিতেন, সেই সঙ্গে তাঁহার লেখনীও সমানে চলিয়াছে। তাঁহার সেই ধ্যানময় জগতে তখনও তিনি সমান বিরাজমান। এই সময়ে তাঁহার বড় আদরের নাতনি পরী মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়িল। এই ছোট্ট মেয়েটি সবসময়ই তার দাদুর কাছে থাকিত। কত আপনজনের চিরবিদায়-বার্তা তাঁহার কানে পৌঁছিল। চোখের জল মুছিতে মুছিতে তখনও তিনি সমানে লিখিয়া চলিয়াছেন। কত বড় বিরাট পুস্তক। সুদীর্ঘ দুই বৎসরের মধ্যে তিনি তাঁর জীবনের শেষ দান “বৃহৎ বঙ্গ’ —বাংলাদেশকে যাঁহারা ভালোবাসেন তাঁহাদের জন্য এক নূতন মহাভারত-লিখিয়া শেষ করিলেন। (২০০০: ৫৯-৬০)

কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বৃহৎ বঙ্গ দুই খণ্ডে প্রকাশ পাইল (প্রথম সংস্করণের আখ্যাপত্র অনুসারে বলিতেছি) যথাক্রমে বাংলা ১৩৪১ ও ১৩৪২ সনে। দীনেশচন্দ্রের মাথায় যেন আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল। ঘটনার প্রায় চল্লিশ বছর পরে জসীম উদ্‌দীন চাপা আবেগে স্মরণ করিতেছেন, ‘তিনি ভাবিয়াছিলেন এই পুস্তক প্রচারিত হইলে তিনি আবার তাঁহার সেই পূর্ব-গৌরব ফিরিয়া পাইবেন। [বঙ্গ]ভাষা ও সাহিত্য লিখিয়া একদিন তিনি দেশের বিদ্বজ্জনমহলে যে উৎসাহ ও সম্মান পাইয়াছিলেন আবার তেমনি বাংলার সুধীজন এই পুস্তক পড়িয়া কলরবে মুখরিত হইয়া উঠিবেন, কিন্তু তাহা হইল না।’ (২০০০ : ৬০)

কেন হইল না? জসীম উদ্‌দীন একটা উত্তর দিয়াছেন বটে, তবে তাহাতে তিনিও ঘটনার গোড়ায় হাত দিতে পারেন নাই। একটু পরেই আমরা তাহা দেখিব। এক্ষণে কবির কথায় ফিরিয়া আসি। তিনি লিখিয়াছেন, ‘আজ আর রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী নাই। সেই গ্রিয়ারসন সাহেব নাই। অক্ষয়কুমার [মৈত্রেয়] মহাশয় নাই, বিশ্বকোষের নগেন্দ্র [নাথ] বসু মহাশয় বাঁচিয়া নাই। সেই বিদ্যোৎসাহী ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যও বাঁচিয়া নাই। গগণেন্দ্রনাথ [ঠাকুর] তিরোধান করিয়াছেন। কে আর আন্তরিক দরদ লইয়া এই বিরাট পুস্তকের নান্দী গাহিবেন!’ (২০০০ : ৬০)

অথচ তাঁহার নিন্দুকেরা দিব্য জাগিয়া আছেন। তাঁহারা সমানে দূর্গে তোপ দাগাইতেছেন। অধিক কি, তাঁহারা চারিদিকে পাহারাও বসাইয়াছেন। দীনেশচন্দ্র পলাইবেন কোথায়! জসীম উদ্‌দীন লিখিয়াছেন, ‘তাঁহার বিরুদ্ধপক্ষীয়রা যে চারিদিকে তাঁহার জন্য নির্মম ষড়যন্ত্র-জাল পূর্ব হইতে বিস্তার করিয়া রাখিয়াছিলেন! তাঁহারা নানান পত্রপত্রিকায় শকুনির মতো এই পুস্তকের কোথায় কোন ভুল আছে তাহাই খুঁজিয়া লইয়া তাঁহার প্রতি লোষ্ট্র নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন।’ (২০০০ : ৬০)

এতদিনে তাঁহার আত্মীয়রা তাঁহাকে একপ্রকার ত্যাগই করিয়াছেন। জসীম উদ্‌দীনের বাক্যে বলিতে : ‘যাঁহারা তাঁর স্নেহচ্ছায়ায় নিজদিগকে প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিয়াছিলেন তাঁহারা কেহই তাঁহাকে এই বিরুদ্ধদলের আক্রমণ হইতে রক্ষা করিতে আগাইয়া আসিলেন না। মনীন্দ্রলাল বসু, বিশ্বপতি চৌধুরী, সুবোধ সেনগুপ্ত প্রমুখ তাঁর স্নেহচ্ছায়ায় বর্ধিত বহু সাহিত্যিক তখনও আপনাপন কর্মশক্তি লইয়া প্রসিদ্ধ। তাঁহারা কেহই তাঁহাকে এই সময় শত্রুবূহ্য হইতে রক্ষা করিতে আগাইয়া আসিলেন না। বরং কেহ কেহ যাইয়া অপরপক্ষে যোগদান করিয়া তাঁহাদের বিষোদ্গারণে সাহায্য করিলেন। যে শরৎচন্দ্রকে তিনি একদিন সুদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখিয়া সাহিত্যিক সমাজে প্রতিষ্ঠিত করাইয়াছিলেন তিনিও তাঁহার জন্য এই সময়ে একফোঁটা কলমের কালি খরচ করিলেন না।’ দীনেশচন্দ্রের শত্রুপক্ষ কিন্তু তাঁহাকে মোটেও ক্ষমা করিয়া কথা বলেন নাই। জসীম উদ্‌দীন সেদিনের ভয়াবহতা এভাবে স্মরণ করিয়াছেন : ‘শনিবারের চিঠি এই পুস্তক পড়িয়া লিখিলেন, দীনেশবাবুর মাথায় সুপারি রাখিয়া হাতুড়ি পেটানো উচিত। কেহ কেহ এর চাইতেও কঠোর কথায় এই অমর পুস্তকের নিন্দাবাদ করিলেন।’ (২০০০ : ৬০)

দুঃখের মধ্যে, ‘এই পুস্তকের কোথায় তিনি তাঁর দরদী অন্তর লইয়া বাঙ্গালির অতীত জীবনের কোন অখ্যাত অজ্ঞাত কাহিনী খুঁজিয়া বাহির করিয়াছেন কেহই তাঁহার সন্ধান করিল না।’ জসীম উদ্‌দীন আক্ষেপ করিতেছেন, ‘এই অশীতিপর বৃদ্ধ বয়সে এত বড় বিরাট পুস্তক লিখিতে কিছু কিছু ভুলভ্রান্তি তাঁহার হইয়াছিল। কোন কোন জায়গায় স্বমতবিরুদ্ধতাও রহিয়াছে। পরবর্তী সংস্করণে তিনি হয়ত তাহা সংশোধন করিয়া লইতেন। কিন্তু কবিতার মতো এমন সুপাঠ্য করিয়া তিনি যে এই ইতিহাস পুস্তক রচনা করিলেন সেদিকে তো কেহই দৃষ্টিপাত করিলেন না।’ (২০০০ : ৬১)

এক্ষণে জসীম উদ্‌দীন স্পষ্টাক্ষরে নিজের মতটি প্রকাশ করিতে আর কসুর করিলেন না। তাঁহার রায় এই: ‘বস্তুত সাহিত্যধর্মী ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এই পুস্তক গিবনের পৃথিবীর ইতিহাসের মতো চিরকাল একটি আদর্শ হইয়া থাকিবে।’ তিনি পশ্চাৎ পশ্চাৎ জিজ্ঞাসাও করিলেন, ‘বাংলা ভাষায় বৃহৎ বঙ্গের মতো এমন সুপাঠ্য ইতিহাস-পুস্তক কি এ পর্যন্ত কেহ রচনা করিতে পারিয়াছেন?’ উত্তর বলাই বাহুল্য—না। জসীম উদ্‌দীন বলিয়াছেন, ‘এই পুস্তকে গঙ্গার মহিমা, বীতপাল-ধীমানের কাহিনী, দীপঙ্কর-চৈতন্যদেবের আবির্ভাব, বৈষ্ণব সাহিত্য, সিরাজদ্দৌলার শেষ জীবন, বাংলার শাড়ি-শিল্পের কথা প্রভৃতি অধ্যায়ে দীনেশবাবু যে অপূর্ব পাণ্ডিত্য আর কবিত্বশক্তির পরিচয় দিয়াছেন তাহা ভাবিয়া বিস্মিত হইতে হয়।’ (২০০০ : ৬১)

দীনেশচন্দ্র সেনের সেদিনকার দুরাবস্থার সামান্য বিবরণ আবারও পাইতেছি জসিম উদ্‌দীনের লেখাতেই। তিনি সাক্ষ্য দিতেছেন : ‘এই গ্রন্থ লিখিয়া তিনি অনেকের কাছে অভিমত চাহিয়া পাঠান। আমাকেও তিনি বারবার আদেশ করেন এই গ্রন্থের উপরে কিছু লিখিতে। নিজে কিছু লিখিয়া যাঁর এতটুকু মতামত পাইলে গৌরবে আত্মহারা হইয়া উঠিতাম, তাঁহার পুস্তকের উপরে আমি আর কি অভিমত দিব! আমি এ বিষয়ে তাঁহাকে এড়াইয়া যাইতাম। একদিন তিনি রাগত হইয়া আমাকে বলিলেন, “বারবার বলিয়াও আমার বইয়ের উপরে তোমার মতামত পাইলাম না।” আমি বলিলাম, “আমাকে আর কদিন সময় দেন। আমি আপনার বইখানা আবার পড়ে ভাল করে একটি সমালোচনা লিখে দেব।” তিনি বলিলেন, “না, এখনই তুমি যা হয় লিখে দাও।”’ (২০০০ : ৬১)

করুণাসিক্ত সজল ভাষায় জসীম উদ্‌দীন লিখিতেছেন, ‘কাগজ-কলম লইয়া কিছু লিখিয়া দিলাম। তিনি অতি যত্নের সঙ্গে তাহা পকেটে পুরিলেন। আমার চক্ষু দুইটি অশ্রুসজল হইয়া উঠিল। সেই মহামহীরূহ হিমাচল আজ তাঁর পুস্তকের উপর আমার মতামতের জন্য—আমার মতো একজন নগণ্য লোকের মহামতের জন্য—এত উদগ্রীব! এ যেন একটি স্রোতেপড়া লোক তৃণখণ্ডের আশ্রয় খুঁজিয়া বেড়াইতেছেন। কিছুদিন পরে দেখিলাম, “বৃহৎ বঙ্গে”র শেষের দিকে আমার সেই লেখাটি ছাপা হইয়াছে।’ (২০০০: ৬১-৬২)

‘বৃহৎ বঙ্গ’ প্রকাশিত হইয়াছিল ১৯৩৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। প্রকাশিত হইবার পর পরই দীনেশচন্দ্র সেন ইহার দুই খণ্ডের একপ্রস্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে পাঠাইয়া দেন। ঠিক কত তারিখে পাঠান হইয়াছিল তাহা সঠিক জানা যাইতেছে না। তবে ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬ তারিখে লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি পত্রে দেখা যায় এই বৃহৎ বইটি তাঁহার দরবারেও হাজির হইয়াছে বা হইবার আর বেশি দেরি নাই। পত্রপ্রাপকের উদ্দেশে কবি ঐদিন লিখিয়াছিলেন, ‘নন্দলাল এখনো কলকাতায়। ফিরে এলে বৃহৎ বঙ্গে দৃষ্টিক্ষেপ নিশ্চয় করব।’ (ঠাকুর ১৪০২ : ৫৮)

এই চিঠির পরের অংশটুকুতে চোখ বুলাইলেই পরিষ্কার হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি অকারণে জানি ‘বৃহৎ বঙ্গ’ বইটির উপর বড় একটা সদয় নহেন। সজ্জনেরও ছলের অভাব ছিল না : ‘শরীর যে ক্ষণভঙ্গুর আমার দেহ প্রতিদিন তার নিঃসংশয় প্রমাণ নিয়ে উপস্থিত হচ্চে। এতদিন মন তাকে বহন ক’রে জীবযাত্রায় সারথ্য করছিল, কিন্তু বাহন এখন পিছনের দিকে ঘন ঘন লাথি ছুঁড়তে সুরু করেছে-পিঁজরাপোলের অভিমুখে তার সমস্ত ঝোঁক, বোঝা যাচ্চে লাগামটা ফেলে দিয়ে স্বেচ্ছায় যদি না নেমে পড়ি তাহোলে ঝাঁকানি দিয়ে নামিয়ে ফেলবে হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে। এ অবস্থায় আমার কাছে যদি কিছু প্রত্যাশা করো তাহোলে তা পূরণের চেষ্টায় আমার নিঃস্বতা প্রকাশ পাবে। পূর্ব্বকালের তহবিলের মাপে এখনকার দাবী অসঙ্গত হবে।’ (ঠাকুর ১৪০২ : ৫৯)

রবীন্দ্রনাথের ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬ তারিখের চিঠিটি দীনেশচন্দ্রের হাতে আদৌ-অন্তত ৩০ মার্চ পর্যন্ত-পৌঁছিয়াছিল কিনা পরিষ্কার নহে। চিঠিতে প্রযুক্ত সম্বোধন আর ক্রিয়াপদের প্রয়োগ দেখিলে মনে হয় চিঠিটি ঠিক দীনেশচন্দ্র সেন সমীপে লেখা নহে-হইতে পারে তাঁহার পরিবারের অন্য কাঁহারো সমীপে লেখা। প্রায় এক মাসের ব্যবধানে ৩০ মার্চ ১৯৩৬ তারিখে লেখা একটি চিঠিতে দীনেশচন্দ্র সেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পুনশ্চ তাগাদা দিতেছেন, ‘নন্দলালবাবুর সঙ্গে আপনার জন্য এক সেট “বৃহৎ বঙ্গ” (দুই খণ্ড) পাঠাইয়াছিলাম। তাহার প্রাপ্তিস্বীকার করিবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসে তাহা দাখিল করার দরকার হইয়াছে।’ (ঠাকুর ১৪০২ : ৯৭)

রবীন্দ্রনাথের হইয়া তাঁহার ব্যক্তিগত সচিব অনিলকুমার চন্দ ৪ এপ্রিল ১৯৩৬ নাগাদ উপরোক্ত পত্রের উত্তরস্বরূপ প্রাপ্তিস্বীকার করিয়া লিখিলেন, ‘আপনি নিতান্ত অনুগ্রহপরবশ হইয়া যে এক সেট “বৃহৎ বঙ্গ” (১ম ও ২য় খণ্ড) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে পাঠাইয়াছিলেন তাহার প্রাপ্তিস্বীকারপূর্বক তাঁহার পক্ষে আপনাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি।’ (ঠাকুর ১৪০২ : ১৪১)

৩০ মার্চের উপরোক্ত পত্রযোগে দীনেশচন্দ্র অধিক লিখিয়াছিলেন : ‘এই পুস্তক দশ বার বৎসর খাটিয়া লিখিয়াছি, সুতরাং আপনার মত ব্যক্তির নিকট তাহার একটা সমালোচনা চাহিয়া চিঠি লিখিয়াছিলাম, যদি আপনার স্বাস্থ্য ও অনবকাশ বশত আপনি তাহা না লিখিতে পারেন, তবে ক্ষুদ্র একটি মন্তব্যের সৌজন্য হইতে কেন বঞ্চিত হইব, তাহা বুঝিতে পারি না। এই পুস্তকের অনেক স্থলে আপনার কথা বহু সম্মানের সহিত উল্লেখ করিয়াছি। যিনি সমস্ত জগৎ কর্ত্তৃক অভিনন্দিত, আমার মত ব্যক্তির সেইরূপ লেখা তিনি উপেক্ষা করিতে পারেন। আমি যাহা চাহিয়াছি তাহা দাবী নহে, অনুগ্রহ, সুতরাং অনুগ্রহপ্রার্থীর কিছুতেই ক্ষুণ্ণ হইবার অধিকার নাই।’ (১৪০২ : ৯৭)

৪ এপ্রিল ১৯৩৬ নাগাদ এই পত্রের উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখিলেন, ‘দীর্ঘকাল ব্যস্ত ছিলুম এবং স্বস্থানে ছিলুম না। ফিরে এসেছি, কিঞ্চিৎ অবকাশও পেয়েছি। আয়ু অল্পই অবশিষ্ট আছে, অবকাশও যে পরিমাণে দুর্লভ সেই পরিমাণেই স্পৃহনীয়, এ অবকাশ স্বল্প পরিমাণেও নষ্ট করতে ইচ্ছা করি না। গ্রন্থ সমালোচনা আমার ব্যবসা নয়, কাজটা অপ্রিয়। অভিমত প্রকাশ করতে লেশমাত্র উৎসাহ প্রকাশ করিনে। এখন আমার একান্ত প্রয়োজন বিশ্রাম। বৃহত্তর বঙ্গ বইখানি অত্যন্ত বৃহৎ। ঐ রচনা বিচার করবার শক্তি আমার অল্প। অতএব স্তব্ধ থাকাই শ্রেয়।’ (১৪০২ : ৫৯)

স্বভাবের অনুরোধে প্রশ্ন উঠিবে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি কারণে এই বিশেষ বহিটির বিষয়ে সমালোচনা দূরে থাকুন ‘ক্ষুদ্র একটি মন্তব্যের সৌজন্য’ অর্থাৎ একবাক্য সামান্য অভিমত প্রকাশে পর্যন্ত রাজি হইলেন না? ‘বৃহৎ বঙ্গ’ বইটির নাম লিখিতে প্রয়াস পাইয়া তিনি যে উহার নাম হাত ফসকাইয়া ‘বৃহত্তর বঙ্গ’ লিখিয়া বসিলেন তাহাও অকারণ হইতে পারে না। আসল ঘটনা আমরা একটু পরেই দেখিতে পাইব। এয়ুরোপ খণ্ডের মহাত্মা ফ্রয়েড এই ধরনের অনিচ্ছাপ্রসূত ভ্রমেরও কারণ আছে বলিয়া নির্দেশ করিয়াছিলেন। কি হইতে পারে সেই কারণ?

‘বৃহৎ বঙ্গ’ বইটির সমালোচনা না করিবার কিংবা অভিমত না দিবার সপক্ষে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গোটা দুই কারণ বাতলাইয়াছিলেন। এক নম্বরে, তাঁহার তখন বিশ্রাম প্রয়োজন। ইহাতে অন্য কোন কথা চলিতে পারে না। দুই নম্বর কথা, ‘বৃহৎ বঙ্গ’ বইখানি অত্যন্ত বৃহৎ। অত বড় বইয়ের বিচার তাঁহার সাধ্যাতীত। এই জায়গায় আমাদের একটুখানি সংশয় ঘটিবার কারণ আছে। তিনি ছকেবাঁধা সত্য কথা বলিতেছেন, না নিছক সৌজন্যের আশ্রয় মাগিতেছেন? অন্তর্যামী এই সত্যে সংশয় করিতেছেন বলিয়াই হয়তো ‘বৃহৎ বঙ্গ’ স্থলে ‘বৃহত্তর বঙ্গ’ কথাটা হাত ফসকাইয়া বাহির হইয়াছে।

আমাদের এই কল্পনাতরু যে একান্ত মূলবিহীন শিকড়ছুট নহে তাহাও নানা প্রমাণে সিদ্ধ হইতে পারে। ঐযুগে বাংলাদেশে লেখাপড়ার জগতে ‘বৃহত্তর ভারত’ কথাটি অনেক লেখকের কলমেই সহজে যোগাইতেছিল। বাংলাদেশের উচ্চবর্ণ হিন্দু সমাজে একটা বিবাদ ততদিনে দানা দানা দাঁড়াইতেছিল। সেই বিবাদের ছিল দুই মেরু-‘বৃহত্তর ভারত’ বনাম ‘বৃহত্তর বা বৃহৎ বঙ্গ’। সত্যের অনুরোধে আমাদের কবুল করিতে হইবে, এই বিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও দীনেশচন্দ্র সেন ঠিক এক মেরুতে দাঁড়াইয়াছিলেন—এমন কথা বলা যাইবে না।

দীনেশচন্দ্র সেনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে যাঁহারা সেনাপতির ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন তাঁহাদের অনেকেই নিজেদের বলিতেন রবীন্দ্রনাথের দলের লোক। রবীন্দ্রনাথও তাঁহাদের একান্ত স্নেহে আপন দলের লোক বলিয়া কখনও কখনও স্বীকার করিয়া থাকিবেন। দীনেশচন্দ্র সেন বরাবর লিখিত ৪ এপ্রিল ১৯৩৬ সালের পত্রে রবীন্দ্রনাথ যে কলম ফসকাইয়া ‘বৃহত্তর বঙ্গ’ লিখিয়াছিলেন তাহার এক কারণ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যে পাওয়া যাইবে। ১৩৪১ বাংলা সনের ভাদ্র মাসে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘উদয়ন’ নামক এক মাসিক পত্রের পাতায় ‘বৃহত্তর বঙ্গ’ নামে এক প্রবন্ধ প্রকটিত করেন। ঐ প্রবন্ধে সুনীতিবাবু তাঁহার মনের কথাটা বেশ খোলামেলা বলিয়া ফেলিয়াছিলেন। তাঁহার বিচারে যাঁহারা বৃহত্তর ভারতের দেখাদেখি বৃহত্তর বঙ্গের ধ্বনি তুলিতেছেন তাঁহারা বড় একটা ভুল করিতেছেন। (চট্টোপাধ্যায় ১৩৪১ : ৫২৫-৫৩৮; চট্টোপাধ্যায় ১৪১৭ : ২৪২-২৫৭)

চট্টোপাধ্যায় লিখিয়াছেন, ‘কথাটা কিন্তু বেশীদিনের নহে; আমার মনে হয়, ১৯২৬ সালে ভারতের বাহিরের দেশে ভারতীয় সভ্যতার প্রচারের ইতিহাস আলোচনার উদ্দেশ্যে যখন কলিকাতায় “বৃহত্তর ভারত পরিষৎ” স্থাপিত হয়, তাহার পরে “বৃহত্তর ভারত”-এই সংযুক্ত পদ দুইটির দেখাদেখি “বৃহত্তর বঙ্গ” কথাটীও ব্যবহৃত হইতে থাকে। আগে আমরা “বঙ্গের বাহিরে বাঙ্গালী’ জানিতাম, “প্রবাসী বাঙ্গালী” জানিতাম। ১৯০০ সালে শিক্ষিত বাঙ্গালীর কাছে ‘বৃহত্তর বঙ্গ” শব্দদ্বয় ও তাহাদের অন্তর্নিহিত ভাব দুর্ব্বোধ্য হইত; ১৮৫০ সালের বাঙ্গালীর পক্ষে কথাটী ও তাহার অর্থ উভয়ই অবোধ্য লাগিত। অথচ এই কয় বৎসরে এই কথাটী হালের বাঙ্গালীর স্বাতন্ত্র্যবোধ ও গৌরববোধ, আত্মপ্রসাদ ও শক্তিসংগ্রহ (এবং সঙ্গে সঙ্গে আত্মবঞ্চনার) একটা মস্ত বড় সহায়ক হইয়া পড়িতেছে।’ (চট্টোপাধ্যায় ১৩৪১: ৫২৫; চট্টোপাধ্যায় ১৪১৭: ২৪২)

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় পরিষ্কার বলিয়া দিয়াছিলেন ‘বৃহৎ বঙ্গ’ জাতীয় কথার আড়ালে যদি বাংলাদেশকে ভারত হইতে পৃথক ভাবিবার কোন প্রয়াস লুকাইয়া থাকে তবে তাহা হইবে মারাত্মক। তিনি দক্ষিণে-বাঁয়ে ঘাড় না ঘুরাইয়া সোজাসুজি লিখিয়াছিলেন, ‘বাঙ্গালা দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি আলোচনা করিতে গেলে, তিনটি কথা আমাদের ভুলিলে চলিবে না। সে তিনটি কথা এই—’

[১] বাঙ্গালা-দেশ ভারতেরই অংশ।

[২] বাঙ্গালী জাতি ভারতীয় জাতি-মণ্ডলীরই অন্তর্ভুক্ত, ভারত-বহির্ভুত সত্তা তাহার নাই।

[৩] বাঙ্গালার সংস্কৃতি ভারতীয় সংস্কৃতিরই অংশ-ভারত-বিরোধী পৃথক বাঙ্গালী-সংস্কৃতি নাই।

অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে তিনি একথাও যোগ করিতে ভোলেন নাই : ‘এই রূপে ভারতের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন যোগসূত্রে সংযুক্ত হইলেও, বাঙ্গালা-দেশের সংস্কৃতিতে দুই একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য বা স্বাতন্ত্র্য আসিয়া গিয়াছে। কিন্তু এই স্বাতন্ত্র্যকে আশ্রয় করিয়া, সংস্কৃতি-বিষয়ে “বাঙ্গালা-বনাম-ভারত” এইরূপ প্রশ্ন উঠিতেই পারে না।’ (চট্টোপাধ্যায় ১৩৪১ : ৫২৭; চট্টোপাধ্যায় ১৪১৭ : ২৪৪)

সেদিন সুনীতিকুমারের শেষ সিদ্ধান্ত ছিল :‘ “বৃহত্তর বঙ্গ”, “বৃহত্তর বঙ্গ” বলিয়া চীৎকার করিয়া কোনও লাভ নাই। ইংরেজের [মিডলম্যান] হইয়া, ইহাদের ফড়িয়াগিরি করিয়া যে বৃহত্তর বঙ্গের প্রতিষ্ঠা, তাহার কোনও স্থায়ী ফল দেখা যাইতেছে না। উৎকট বাঙ্গালীয়ানা লইয়া বাঙ্গালী ভারতে প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে পারবে না।’ তাঁহার বিশ্বাস, ‘সমগ্র ভারত এক, ভারতের অখণ্ড ও অচ্ছেদ্য একত্ব-এই বোধ আমাদের হিন্দু সংস্কৃতিতে ওতঃপ্রোত ভাবে বিদ্যমান; ইংরেজ শাসনের নূতন যুগে এই কথাই বাঙ্গালী ভারতবর্ষকে শুনাইয়াছেন—ইহাতেই তাহার প্রধান গৌরব, বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, ভূদেব, রবীন্দ্রনাথের বাণী, স্বদেশী আন্দোলনের যুগে, ভারতের একতাবোধকে দৃঢ় করিতে সাহায্য করিয়াছিল; তাই ১৯০৫ হইতে ১৯২০ পর্যন্ত বাঙ্গালীর নেতৃত্ব সমস্ত ভারত একরকম মানিয়াই লইয়াছিল।’ (চট্টোপাধ্যায় ১৩৪১ : ৫৩৮; ১৪১৭ : ২৫৭)

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় একদিন যাহা বলিয়াছিলেন তাহার প্রতিধ্বনি শোনা গেল গোটা দুই বছর পর ছাপা ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার একটি বেনামা নিবন্ধে। নিবন্ধের নাম ‘ইতিহাস নয়’। এই নিবন্ধটির—এতদিনে আমরা নিরূপণ করিয়াছি—লেখক নীরদচন্দ্র চৌধুরী। এই নিরূপণের সহজ একটা পদ্ধতি আছে। কেননা ‘ইতিহাস নয়’ প্রবন্ধের মূল মূল প্রত্যেকটি প্রস্তাব নীরদচন্দ্র চৌধুরীর নামে ইতিপূর্বে প্রকাশিত দুই দুইটি প্রবন্ধে প্রায় হুবহু পাওয়া গিয়াছে।

নীরদচন্দ্র চৌধুরী মনে করেন সুপ্রাচীনকাল হইতে বাংলাদেশ ও বাঙ্গালীকে সমগ্র ভারতবর্ষ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেখিবার কোন উপায় নাই। অথচ দীনেশচন্দ্র সেন কিনা ঠিক এই অসম্ভব কাজটিই করিয়াছেন! নীরদবাবুর ধারণা, ‘আজ আমরা ভারতবর্ষকে কতকগুলি প্রাদেশিক জাতি ও সংস্কৃতির সমষ্টি বা “ফেডারেশ্যন”রূপে দেখিতে অভ্যস্ত হইয়া উঠিয়াছি। কিন্তু ইতিহাসে তাহার কোন সাক্ষ্য নাই। ভারতবর্ষের স্থাপত্যে, চিত্রকলায়, সাহিত্যে, ধর্ম্মসাধনায়, ব্রিটিশ আধিপত্যের পূর্ব্বে বহু বৈষম্য ছিল বটে, কিন্তু উহাতে প্রাদেশিকতার কোন অনুভূতি ছিল না। এমন কি যে বাংলাদেশ ভৌগোলিক সংস্থানের জন্য উত্তরাপথের কেন্দ্রীয় সভ্যতা

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71