শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শুক্রবার, ৬ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
দেবী সরস্বতী চেতনা দিয়ে আমাদের বিবেক জাগ্রত করুন
প্রকাশ: ১২:১৭ pm ২২-০১-২০১৮ হালনাগাদ: ১২:২৯ pm ২২-০১-২০১৮
 
ডা. সুব্রত ঘোষ : চিকিৎসক, লেখক।
 
 
 
 


আজ সরস্বতী পূজা। প্রতি বছর মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের শ্রী পঞ্চমী তিথিতে দেবী সরস্বতীর পূজা করা হয়। সরস্বতী হলেন- জ্ঞান, বিদ্যা, সংস্কৃতি ও শুদ্ধতার দেবী। সৌম্যাবয়ব, শুভ্র বসন, হংস-সংবলিত, পুস্তক ও বীণা ধারিণী এই দেবী বাঙালির মানসলোকে এমন এক প্রতিমূর্তিতে বিরাজিত, যেখানে কোনো অন্ধকার নেই, নেই অজ্ঞানতা বা সংস্কারের কালো ছায়া। সরস্বতী দেবীকে হিন্দুরা পূজা করলেও সে কারণেই সব বাঙালির কাছে ‘বিদ্যা’ নামক অব্যাখ্যাত শব্দটির প্রতীক এই সরস্বতী।

দেশ ও জাতির উন্নয়নে শিক্ষার বিকল্প নেই। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত। সনাতন ধর্মে শিক্ষাকে উঁচু স্তরে আসীন করা হয়েছে। এ ধর্মে প্রাচীন ঋষিরা ব্রহ্মের অনন্ত শক্তির অংশকে একেকজন দেবদেবীরূপে কল্পনা করেছেন। আর তেমনিভাবে ব্রহ্মের যে শক্তি আমাদের বিদ্যা শিক্ষাদান করেন তাকে সরস্বতী দেবী নামে পূজা-অর্চনা করা হয়।

পুরাণে সরস্বতী দেবীর উদ্ভব নিয়ে নানা প্রসঙ্গ আছে। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে ঋষি মধুছন্দা গায়ত্রী ছন্দে সরস্বতী দেবীকে বন্দনা করেছেন গতিময় জীবন প্রত্যাশা করে। সংস্কৃত ‘সরস’ হলো পূর্ণতাপ্রদাত্রী বা জ্যোতির্ময়ী অথবা ঐশ্বর্যময়ী। আবার ‘সরস’ অর্থ জল বা জীবনের প্রশান্তি। উভয় অর্থেই (সরস+বতী) সরস্বতী আলোকিত জীবনময়তার প্রতীক।

সরস্বতী দেবীর স্বরূপ সম্পর্কে সরস্বতী স্তোত্রে বর্ণিত আছে, ‘শ্বেত পদ্মাসনা দেবী শ্বেত পুষশোভিতা/শ্বেতাম্বর ধরা নিত্যেমবেত গন্ধানু লেপনা/ মানসে রমতাং নিত্যং হংসেব হংস বাহিনী/ বাচং দদাতি বিপুলাং যা চ দেবী সরস্বতী।’ সরস্বতী শ্বেত পদ্মের ওপর উপবিষ্টা। সাধকদের মতে, দেহে ছয়টি পদ আছে। বিশুদ্ধ পদে আরোহণ করলে সারস্বত জ্ঞান লাভ হয়। সরস্বতীকে পদ্মাসীনা দেখিয়ে দেহস্থ প্রাণবায়ুকে উত্তোলন করার কৌশল নির্দেশ করা হয়েছে। তিনি শুভ্রবর্ণা। তার এই শুভ্রবর্ণ শুচিতা, শুভ্রতা, শুদ্ধতা ও পবিত্রতার প্রতীক; যা আমাদের মনকে শুচি, শুভ্র ও শুদ্ধ রাখার নির্দেশ দিচ্ছে। কারণ মন শুদ্ধি না হলে চিত্ত শুদ্ধি হয় না আর চিত্ত শুদ্ধি ছাড়া জ্ঞান লাভ করা যায় না। সরস্বতী দেবী হংসবাহনা। হংসের একটি বিচিত্রতা আছে। হংসকে দুধ ও জলের মিশ্রণ খেতে দিলে সে অনায়াসে জল রেখে সারবস্তু দুধ গ্রহণ করে। সার ও অসার মিশ্রিত এই জগৎ সংসারে মানুষ যেন সারবস্তু গ্রহণ করে এ নির্দেশই হংসবাহনতায় প্রকাশিত। দেবীর হাতের পুস্তক জ্ঞানচর্চার প্রতীক। জ্ঞানের মতো পবিত্র এ জগতে আর কিছুই নেই। এই জ্ঞান সব যোগের পরিপক্ব ফল। সংযতেন্দ্রিয় ও তৎপর হয়ে তত্ত¡ জ্ঞানে শ্রদ্ধাবান ব্যক্তি এই জ্ঞানলাভ করেন এবং অচিরেই তিনি পরাশাস্তিপ্রাপ্ত হন। সরস্বতী মায়ের হাতের বীণা সঙ্গীতবিদ্যার প্রতীক। মনের ভাব প্রকাশ হয় ভাষায় আর প্রাণের ভাব প্রকাশ পায় সুরে। সুর মানুষকে বিমোহিত করে। প্রাণে আনন্দের সঞ্চার ঘটায়।

শব্দ বিজ্ঞানের ভাষায়, কম্পনের ফলে সৃষ্টি হয় স্বর আর স্বরের সম্মিলিত রূপই হলো শব্দ। ঋগে¦দে বলা হয়েছে, ‘শব্দ ইতস্ততে ব্রহ্ম।’ অর্থাৎ শব্দই ব্রহ্ম। আর ব্রহ্মকে নিয়ে যে বিজ্ঞান তা-ই শব্দবিজ্ঞান। শব্দহীন দেহ অসার, তাই দেহে যতক্ষণ শব্দ থাকে অর্থাৎ ব্রহ্ম থাকেন ততক্ষণই জীবন আছে বলা যায়। শব্দ নিঃশেষ হলে দেহ অকেজো। অতএব ব্রহ্মহীন বিজ্ঞানও তখন অর্থহীন। আবার যোগতত্ত¡ অনুসারে, বীণা মেরুদণ্ডের প্রতীক। দেবীর বীণায় তিনটি তার। সেই তার তিনটি জরা প্রকৃতিজাত সত্তা, রজঃ ও তমো গুণকে নির্দেশ করে যা দ্বারা জীব আবদ্ধ থাকে। তেমনি মেরুদণ্ডের রয়েছে তিনটি তার, যাদের বলা হয় ঈড়া, পিঙ্গলা ও সুষমা। পরিশেষে বলা যায়, সরস্বতী দেবীর পদধর্মিতা, হংসধর্মিতা, বীণাধর্মিতা, জ্ঞানধর্মিতা জীবনে অনুশীলন করলে জীবন হয় সার্থক ও সুন্দর।

সম্প্রদায়গত ধর্মীয় পূজা-অনুষ্ঠানের বাইরে সরস্বতী পূজার বিশেষ সামাজিক গুরুত্ব আছে। দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ পূজা হয়ে আসছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষ করে স্কুলে যেহেতু কোমলমতি শিশু-কিশোরদের পদচারণা, সেহেতু তাদের মনে আন্তঃধর্মীয় সুসম্পর্ক বৃদ্ধিতে এর গুরুত্ব অস্বীকার করার অবকাশ নেই। সরস্বতী পূজা শুধুই বিশুদ্ধ পূজা নয়। পূজার শাস্ত্রীয় কাজটুকুর বাইরে এর রয়েছে সম্প্রদায়-উত্তীর্ণ সার্বজনীন আবেদন। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক কর্ম বা অনুষ্ঠান যখন এর সঙ্গে সম্পৃক্ত তখন শ্রীপঞ্চমীর ওই দিবসটি এক মহামিলনের দিন হিসেবেই উঠে আসে। অন্য ধর্মের শিক্ষার্থীরাও যুক্ত হয় এ প্রাণবন্যার সঙ্গে, ধর্মীয় বিভেদ তুচ্ছ হয়ে যায় এ জোয়ারে। বিগত দিনে যখন সরস্বতী পূজা প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হতো, তখন বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ছাত্রছাত্রীদের পরস্পরের ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান ও শ্রদ্ধা ছিল ব্যাপক। এ দেশের সংস্কৃতি বহু ধর্ম ও মতের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। আন্তঃধর্মীয় জ্ঞানচর্চা রুদ্ধ হলে এক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পায় এবং তা অন্যের জন্য অমর্যাদাকর ও রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক হয়ে ওঠে। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আজ আর সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয় না। এমনকি রাজধানী ঢাকাতেও নয়। যদিও বহু প্রতিষ্ঠানেই সরস্বতী পূজারিরা আছে, অর্থের সংস্থানও হবে, তবু তা অনুষ্ঠিত হয় না। এর মূল কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও পরিচালনা পরিষদের অনাগ্রহ এবং পূজারিদের অগ্রবর্তী হওয়ার সাহসের অভাব। কিন্তু এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ধর্ম নির্বিশেষে ওই প্রতিষ্ঠানের সব ছাত্রছাত্রী। বৃহৎ অংশের ছাত্রছাত্রী তার সহপাঠী, বন্ধু বা প্রতিবেশীর ধর্মচর্চা সম্পর্কে থেকে যাচ্ছে সম্পূর্ণ অন্ধকারে। এ অন্ধকার সারা জীবন তার পিছু ছাড়বে না।

আবার একটি জিনিস গত কয়েক বছর ধরে লক্ষ করা যাচ্ছে। সরস্বতী পূজাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজিতে মেতে উঠছে একটি গোষ্ঠী। যত্রতত্র সরস্বতী পূজার নাম করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তারা মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বিদ্যার দেবীকে আরাধনা করতে নিজের কষ্টার্জিত আয়ই যথেষ্ট- এর জন্য মানুষের কাছে টাকা ভিক্ষার প্রয়োজন পড়ে না। চাওয়া পয়সায় সাড়ম্বরে না হোক সাদামাটাভাবে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দেবীকে আরাধনা করলেই দেবী তুষ্ট হবেন- এটাই সত্য। সরস্বতী পূজার সংখ্যা বাড়ুক এটা যেমন আমাদের কাম্য তেমনি পূজাকে কেন্দ্র করে কেউ যেন চাঁদাবাজি করে আমাদের সনাতন ধর্মের সুনামকে ক্ষুণ্ন না করে সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

তারপরও আমরা নতুন আশায় স্বপ্ন বুনি। যে যার অবস্থানে থেকে যার যার প্রতিষ্ঠানে বিদ্যার দেবীকে আরাধনার চেষ্টা করি। আর এখানে মিলিত হয় জনতার স্রোত। সংহতি ও সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত, সার্বজনীন মিলনমেলার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে ওঠে প্রতিটি আনন্দময় পূজা প্রাঙ্গণ। সরস্বতী তখন শুধুই বিশেষ ধর্মের দেবী থাকেন না, হয়ে ওঠেন প্রশান্তির আলোকস্লাত অনাবিল ঋদ্ধির নাম। সরস্বতী মাতা জ্ঞান-বুদ্ধি-চেতনা দিয়ে আমাদের বিবেক জাগ্রত করুন, আমরা যেন সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব হানাহানি-ভেদাভেদ ভুলে মানবতা আর মনুষ্যত্বের জয়গান গেয়ে এই পৃথিবীতে আমাদের জন্মকে সার্থক করতে পারি। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা- জগতের সকল জীব সুখী হোক, কেউ যেন দুঃখ ভোগ না করে।

বিএম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71