শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
দেব-দেবীদের সাথে বাহন থাকে কেন
প্রকাশ: ০৯:২০ pm ০১-০৪-২০১৮ হালনাগাদ: ০৯:২০ pm ০১-০৪-২০১৮
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


প্রচলিত মতে, আমরা প্রায় সবাই জানি যে, প্রত্যেক দেব-দেবীর একটি করে বাহন আছে এবং আমরা মনে করি যে, সেই সব বাহন ঐ সব দেব-দেবীকে বহন করে এখানে সেখানে নিয়ে যায়।

দেব-দেবীদের এই বাহনের ধারণাটাই একটা মিথ্যা বা ভুল ধারণা। কারণ, প্রত্যেক দেব-দেবী এমনিতেই অসীম শক্তির অধিকারী, তাদের যাতয়াতের জন্য আবার বাহনের প্রয়োজন কী ? দেব-দেবীরা তাদের নিজেদের ইচ্ছামতো সূক্ষ্ম শরীরে যেখানে সেখানে এমনিতেই যাওয়া আসা করতে পারে; এরপরও তাদের চলাচলের জন্য কোনো বাহনের প্রয়োজন আছে কী ?

বাস্তবতা বিবেচনা করলে সিংহ না হয় অনেক বড় ও শক্তিশালী, তাই সিংহের হয়তো দুর্গাকে বহন করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু ময়ূরের কি কার্তিককে বহন করার ক্ষমতা আছে, না ইঁদুরের পক্ষে গনেশকে ? তাহলে ময়ূর ও ইঁদুরকে, কার্তিক ও গণেশের বাহন বলছি কেনো ?  প্রকৃতপক্ষে এই সব জীবজন্তু ঐসব দেব-দেবীর বাহন নয়, তারা দেব-দেবীকে বহন করে না, তারা বহন বা প্রকাশ করে অন্য কিছু।

প্রচলিত মতে সিংহ হলো দুর্গার বাহন, এজন্য যারা দুর্গার মূর্তি বানায়, তারা সিংহের পিঠের উপরই দুর্গাকে স্থাপন করে দেয়, এতে খুব সহজেই বোঝা যায় বা মনে হয় যে, সিংহ দুর্গাকে বহন করে নিয়ে এসেছে; কিন্তু বাস্তব ব্যাপার তা নয়; বাস্তব ব্যাপার এটা হলে যে বলা হয়- দুর্গা এবার গজে বা নৌকায় বা দোলায় বা ঘোটকে চড়ে আসবে- এমন বলা হতো না; সিংহ যদি দুর্গার প্রকৃত বাহন হতো, তাহলে দুর্গা- হাতি, নৌকা বা পালকি বা ঘোড়ায় চড়ে না এসে সিংহের পিঠে চড়েই আসতো। তাহলে এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, সিংহ যদি প্রকৃতই দুর্গার বাহন না হয়, তাহলে সিংহ দুর্গার সাথে থাকে কেনো বা সিংহ আসলে কী প্রকাশ করে ?

সিংহ হলো দুর্গার তেজ, ক্রোধের প্রতীক। হ্যাঁ, একথা ই বলা আছে পদ্মপুরানে। যদিও পদ্মপুরানে আরও বলা আছে যে, দুর্গার ক্রোধ থেকে সিংহের জন্ম হয়। তাই দেব-দেবীদের সাথের এক একটি প্রাণী, এক একটি প্রতীক মাত্র। সিংহ হলো দুর্গার ক্রোধ ও ক্ষিপ্রতার প্রতীক,  দুর্গার সাথে থাকা সিংহ এই তথ্য দেয় যে- দুর্গা, অসুরদের সাথে তার তেজ ও ক্ষিপ্রতা দিয়ে কী ভয়ংকর ধরণের যুদ্ধ করেছে। তাছাড়াও যেকোনো যুদ্ধে জয়ী হতে গেলে যে সিংহের মতো শক্তি, রাগ, ক্ষিপ্রতা ও হিংস্রতার দরকার, সিংহকে সাথে রেখে দুর্গা সেই তথ্যটিও তার ভক্ত বা পূজারীকে দেয়।

গনেশকে বিশ্বাস করা হয় সিদ্ধিদাতা হিসেবে এবং গনেশের সাথে থাকে ইঁদুর। সিদ্ধি মানে সফলতা। তো পৃথিবীর এমন কোনো সফল ব্যক্তি নেই, যাকে নানা রকম বাধা-বিপত্তি ও ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে এগিয়ে যেতে হয় নি। সাফল্যের পথে নানারকম বাধা বিপত্তি একটা সাধারণ ব্যাপার, সেটা মানুষ ধৈর্য ও মনের জোরে দূর করতে পারে; কিন্তু কারো সাফল্যের পথে যদি ষড়যন্ত্রের জাল বিছানো থাকে, তাহলে তার পক্ষে সাফল্য লাভ করা অনেক ক্ষেত্রে শুধু অসম্ভবই নয়, এই ষড়যন্ত্রের জাল তাকে ধ্বংসও করে ফেলে পারে। তাই গনেশের সাথের ইঁদুর, মানুষকে এই বার্তা দেয় যে, সাফল্যের পথের এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে এবং যত ষড়যন্ত্রই হোক, সাফল্য পেতে চাইলে সেই ষড়যন্ত্রের জালকে ছিন্ন করে তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে, ঠিক ইঁদুরের মতো; কারণ, জাল দিয়ে পৃথিবীর প্রায় সব প্রাণীকে আটকানো গেলেও ইঁদুরকে কেউ আটকাতে পারে না, ইঁদুর জালকে কেটে বের হয়ে আসতে পারেই, এজন্যই গণেশের সাথে থাকে ইঁদুর এবং ইঁদুর মানুষকে উপরের এই তথ্যগুলোই শিক্ষা দেয়।

কার্তিকের সাথে থাকে একটি ময়ূর এবং ময়ূরের পায়ের তলে থাকে একটি সাপ। কার্তিক হলো যুবক, যোদ্ধা ও সৌন্দর্যের প্রতীক; ময়ূর, কার্তিকের এই তিনটি গুণেরই প্রতিনিধিত্ব করে। কেননা, কার্তিক যেমন চিরযুবা, তেমনি মৃত্যু পর্যন্ত ময়ূরের সৌন্দর্য ও তারুণ্যও কখনো নষ্ট হয় না। এছাড়াও ময়ূর সকল পাখির মধ্যে ভয়ংকর যোদ্ধা, যেমন ভয়ংকর যোদ্ধা হলো কার্তিক, এজন্যই কার্তিককে দেওয়া হয়েছে দেবতাদের সেনাপতির সম্মান। সাপ হলো গোপন ষড়যন্ত্রের প্রতীক এবং যে কোনো যুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র থাকবেই। ময়ূরের পায়ের নিচে সাপের অর্থ হলো, শুধু যুদ্ধ করলেই হবে না, যুদ্ধের এই গোপন ষড়যন্ত্রকেও দমন করতে হবে, যেমন ময়ূর নিমিষের মধ্যে একটি সাপের দেহকে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলতে পারে।

সরস্বতীর সাথে থাকা রাজহাঁসের এই ক্ষমতা আছে যে, দুধ ও জল মিশিয়ে দিলেও সে শুধু দুধকেই পান করতে পারে বা গ্রহন করতে পারে। বিদ্যার দেবী সরস্বতীর সাথে থাকা রাজহাঁস- সমাজে, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মাঝে এই বার্তা দেয় যে, সমাজে ভালো মন্দ সব ধরণের জ্ঞানই আছে, তার মধ্য থেকে শুধু ভালোটাকেই গ্রহণ করতে হবে। এছাড়াও সরস্বতীর হাতের পুস্তক যে পড়াশোনার মাধ্যমে জ্ঞানার্জনের কথা বলে সেটা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না; তারপর সরস্বতীর হাতের বীণা বলে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার কথা, যে শিল্প সাধনা মানুষকে সাধারণ থেকে অসাধারণ এবং মানুষের মানবতার মাপকাঠিকে এক উচ্চ মাত্রায় নিয়ে গিয়ে মানুষকে মহান করে তুলে।

লক্ষ্মীর সাথে থাকা পেঁচা, রাতের কঠিন অন্ধকারেও দেখতে পায়। অন্ধকার হলো বিপদ আপদের প্রতীক। ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর সাথে থাকা পেঁচা আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে, যদি ধন-সম্পদ বা টাকা-পয়সা থাকে তাহলে বিপদ আপদ যত বড় আর কঠিনই হোক না কেনো, রাতের আঁধার ভেদ করে পেঁচা যেমন তার পথ দেখতে পায়, তেমনি ধন-সম্পদের জোরে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিও ঠিক পথ খুঁজে পাবে এবং তা থেকে উদ্ধার পাবেই। লক্ষ্মী দেবী হচ্ছে ধন সম্পদের দেবী, এর মানে হলো কোনো হিন্দু গরীব বা ভিখারী থাকবে না বা থাকতে পারবে না, আর এজন্যই হিন্দু শাস্ত্রে দারিদ্রতাকে মহাপাপ বলা হয়েছে, যাতে সবাই চেষ্টা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের দারিদ্রতাকে দূর করে; কারণ, যে ব্যক্তি দরিদ্র অর্থাৎ অর্থ ও বিত্তহীন, তার সামনে সবই অন্ধকার এবং তার জীবনে কোনো সুখ নেই। কোনো হিন্দু অর্থ-বিত্তহীন হয়ে সাংসারিক জীবনে অসুখী থাকবে, এটা সনাতন ধর্মের বৈশিষ্ট্য নয়; এজন্যই সনাতন ধর্মে দারিদ্রতাকে দূর করতে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পেঁচার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো গোপনীয়তা; কেননা, সে গোপন থাকার কারণেই দিনের বেলা বের হয় না, লক্ষ্মীর সাথে থাকা পেঁচা মানুষকে এই শিক্ষা দেয় যে, অর্জিত ধন-সম্পদকে রাখতে হবে গোপনে;  না হলে সেই ধন-সম্পদ বা অর্থকড়ি নানারকম সমস্যা বা বিপত্তির সৃষ্টি করবে, তখন অর্থ হয়ে যাবে অনর্থ। এজন্যই প্রবাদ সৃষ্টি হয়েছে অর্থই অনর্থের মূল।

প্রচলিত মতে, শিবের বাহন হলো নান্দী নামের একটি ষাঁড়; এর কারণ কী বা শিবের সাথে থাকা একটি ষাঁড় আসলে আমাদেরকে কী শিক্ষা দেয়?

যে ধ্বংস করবে, তাকে হতে হয়- একগুঁয়ে, জেদি এবং বিশেষ শক্তিসম্পন্ন। একটা প্রাপ্ত বয়স্ক ষাঁড় গরুর দেহে যে পরিমান শক্তি থাকে, তাতে সে একটি পাড়া বা ছোটখাটো গ্রামকে কয়েক মিনিটের মধ্যে লণ্ডভণ্ড করে দিতে পারে; শুধু একজন বা কয়েকজন কেনো, একদল মানুষের পক্ষেও সম্ভব নয় সেই উন্মত্ত ষাঁড়কে রোধ করা, শিবের সাথে থাকা ষাঁড় আসলে শিবের সেই ধ্বংস বা তাণ্ডব রূপেরই বহিঃপ্রকাশ।


আরপি

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71