বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের ১৩২তম মৃত্যূ বার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ১০:৪৯ am ২৩-০৭-২০১৭ হালনাগাদ: ১০:৫০ am ২৩-০৭-২০১৭
 
 
 


স্বাধীনতা সংগ্রামী, আইনজীবী এবং রাজনীতিক দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত (জন্মঃ- ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৮৮৫ - মৃত্যুঃ- ২৩ জুলাই, ১৯৩৩) তাঁর স্মরণে প্রতিষ্ঠিত কলকাতার ‘দেশপ্রিয় পার্ক’ -এর অভ্যন্তরে তাঁর মূর্তি স্থাপিত হয়েছে। ১৯১১ সালে তিনি কংগ্রেসের রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ওই বছর চট্টগ্রামের প্রতিনিধি হয়ে ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত দলীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন। সে সময় পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ সৈন্যদের নৃশংস হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে সারাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। চট্টগ্রামেও আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠে। যতীন্দ্রমোহন কলকাতা ছেড়ে চট্টগ্রাম চলে আসেন। চট্টগ্রামে এসে জনগণের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন জোরদার করার জন্য পুরো দু’বছর তাঁকে পেশার বাইরে থাকতে হয়। ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। এ বছর বার্মা অয়েল কোম্পানি (চট্টগ্রাম) ও আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে ধর্মঘট পরিচালনা করে যতীন্দ্রমোহন গ্রেফতার হন। তাঁর স্ত্রী নেলী সেনগুপ্ত আন্দোলনে যোগ দেন ও গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ করেন। ধর্মঘটী শ্রমিক-কর্মচারীদের পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণের জন্য যতীন্দ্রমোহন চল্লিশ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। তিনি এ সময় ‘দেশপ্রিয়’ উপাধিতে ভূষিত হন। চট্টগ্রামের মানুষ তাকে ‘মুকুটহীন রাজা’ নামে আখ্যায়িত করে। 
১৯৩০ সালে ভারতবর্ষ থেকে বার্মাকে বিচ্ছিন্ন করার প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে যোগ দিতে যতীন্দ্রমোহন রেঙ্গুন যান। সেখানে জনসমাবেশে বক্তৃতা দেয়ার সময় তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন। যতীন্দ্রমোহন ১৯২২ সালে জাতীয় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হন। পরবর্তী সময়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ স্বরাজ পার্টি প্রতিষ্ঠা করলে যতীন্দ্রমোহন স্বরাজ পার্টিতে যোগ দেন। ১৯২৩ সালে তিনি চট্টগ্রাম থেকে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদে সদস্য নির্বাচিত হন। চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর (১৯২৫) যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত স্বরাজ পার্টির বিশেষ অধিবেশনে দলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। একই বছর তিনি বাংলা প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির প্রেসিডেন্ট এবং কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। তিনি পরপর পাঁচ মেয়াদে কর্পোরেশনের মেয়র ছিলেন। সম্প্রদায় নির্বিশেষে যতীন্দ্রমোহন ছিলেন সমগ্র বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। দেশবন্ধু পরিচালিত ফরোয়ার্ড পত্রিকার সাথে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। নিজে অ্যাডভান্স নামে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করেন।


যতীন্দ্রমোহন ১৯৩২ সালে কিছুদিনের জন্য সস্ত্রিক লন্ডন যান। লন্ডন থেকে ফেরার পথে জাহাজ বোম্বে বন্দরে ভিড়তেই ব্রিটিশ পুলিশ ২০ জানুয়ারি তাঁকে গ্রেফতার করে। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহাত্মক কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগে কিছুদিন কলকাতায় বন্দী থাকার পর ১৯৩৩ সালের ৫ জুন যতীন্দ্রমোহনকে বন্দী অবস্থায় রাঁচীতে স্থানান্তর করা হয়। দেড় বছর ধরে জেলে থেকে যতীন্দ্রমোহনের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। ১৯৩৩ সালের ২৩ জুলাই যতীন্দ্রমোহন মৃত্যুবরণ করেন। 
যতীন্দ্রমোহন রাজনীতি ও সমাজসেবার সাথে শিক্ষা ও খেলাধূলার উন্নতি সাধনে ভূমিকা রাখেন। আইনজীবী হিসেবে ছিলেন অসামান্য বাগ্মিতার অধিকারী। বিশেষত ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে তাঁর সমকক্ষ ব্যারিস্টার সমগ্র ভারতে খুব কমই ছিলেন। খেলাধুলাতেও তাঁর আগ্রহ ছিল। কলকাতার লোকেরা তাঁর নাম দিয়েছিলেন ক্রীড়ামোদী মেয়র। 


চট্টগ্রামের নিজ গ্রামে পিতা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁর ব্যাপক অবদান রয়েছে। যাত্রামোহনের মৃত্যুর পর যতীন্দ্রমোহন বরমা ত্রাহি-মেনকা মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়কে উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে উন্নীত করেন।
জন্ম চট্টগ্রাম জেলার বরমা গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা যাত্রামোহন সেনগুপ্ত ছিলেন আইনজীবী ও বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য। যতীন্দ্রমোহন কলকাতার হেয়ার স্কুল থেকে ১৯০২ সালে এন্ট্রান্স পাস করেন। এরপর ভর্তি হন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। যতীন্দ্রমোহন ১৯০৪ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য বিলাত যান। তিনি বিলাতের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাউনিং কলেজে ভর্তি হন। ১৯০৮ সালে তিনি স্নাতক ও পরের বছর আইন বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেন। বিলাতে থাকাকালে তিনি খেলাধুলা ও সামাজিক ক্রিয়াকর্মে জড়িত হন এবং ইন্ডিয়ান মজলিসের বিতর্ক সভা ও ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট সোসাইটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। যতীন্দ্রমোহন ১৯০৯ সালে ব্যারিস্টারি পাস করেন। দেশে ফিরে এসে যতীন্দ্রমোহন চট্টগ্রাম জেলা আদালতে আইন পেশায় নিয়োজিত হন। এক বছর পর তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় যোগ দেন। এসময় কিছুদিন তিনি কলকাতা রিপন ল’ কলেজে অধ্যাপনা করেন। ক্রমে কলকাতা হাইকোর্টে তাঁর সুনাম ও প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে।

 

১৯৫৩ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম পরিষদ প্রতিবছর দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ও নেলী সেনগুপ্তর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করে। দক্ষিণ কলকাতায় স্থাপিত হয়েছে ‘দেশপ্রিয় পার্ক’ ও পার্কের অভ্যন্তরে এই দুই কৃতি ব্যক্তিত্বের যুগল মূর্তি। জন্মস্থান চট্টগ্রামের বরমা গ্রামে বাড়ির সামনে স্থাপিত হয়েছে যাত্রামোহন সেনগুপ্ত, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ও নেলী সেনগুপ্তর আবক্ষ মূর্তি।
 

যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত - প্রবন্ধ- ব্যক্তিপ্রসঙ্গ -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বদেশের মঙ্গলের জন্য যে-সমস্ত সাহসী সংগ্রাম করিয়া গিয়াছেন, যতীন্দ্রমোহন তাঁহাদের অন্যতম। মাতৃভূমির উন্নতি সাধনের জন্য কোনো প্রকার ত্যাগ স্বীকারেই তিনি কুন্ঠিত ছিলেন না। তিনি তাঁহার লাভজনক আইন ব্যাবসা পরিত্যাগ করেন এবং স্বয়ং আন্দোলনের আবর্তে ঝাঁপাইয়া পড়িয়া সমগ্র পরিবারের সহিত অপরিসীম দুঃখের জীবন বরণ করিয়া লন। আচরণে মহৎ এবং সৌজন্যে সর্বজয়ী যতীন্দ্রমোহন সমগ্র ভারতের একজন সর্বজনপ্রিয় রাষ্ট্রনৈতিক নেতা ছিলেন, ভারতের জাতীয় জীবনের এই সংকট মুহূর্তে এরূপ একজন নেতাকে হারাইয়া দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হইল। দীর্ঘকাল রাজনৈতিক বন্দীরূপে আবদ্ধ থাকার জন্যই যে তাঁহার মৃত্যু এত ত্বরান্বিত এবং এত অসময়ে সংঘটিত হইল, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। তিনি রুচিসম্পন্ন এবং শান্তিপ্রিয় লোক ছিলেন। কিন্তু যখন তাঁহার স্বদেশের আহ্বান আসিল, তখন তিনি স্বাধীনতার বেদিমূলে স্বীয় জীবন উৎসর্গ করার মধ্যেই আনন্দ উপভোগ করিলেন। যে জীবন মহৎভাবে উদ্‌যাপিত এবং অকুন্ঠিতচিত্তে উৎসর্গীকৃত, তাঁহার স্মৃতি ভারতের পক্ষে গৌরবের ও বেদনার।


 

প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71