মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ১০ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
দেশপ্রেমিক কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৭৯তম জন্ম বার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ১২:৩৩ am ১৮-০৪-২০১৭ হালনাগাদ: ১২:৩৩ am ১৮-০৪-২০১৭
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

দেশপ্রেমিক কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্মঃ- ১৭ এপ্রিল, ১৮৩৮ - মৃত্যুঃ- ২৪ মে, ১৯০৩)

বাংলা মহাকাব্যের ধারায় তাঁর বিশেষ দান হল স্বদেশ প্রেমের উত্তেজনা সঞ্চার। জাতীয়তাবাদের আদর্শে তিনি তাঁর রচনায় দেশপ্রেমকে তুলে ধরেন। ১৮৭২ সালের জুলাই মাসে এডুকেশন গেজেট-এ তাঁর ‘ভারতসঙ্গীত’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে ব্রিটিশ সরকার তাঁর প্রতি রুষ্ট হন, এমনকি পত্রিকার সম্পাদক ভূদেব মুখোপাধ্যায়কেও এজন্য জবাবদিহি করতে হয়। এ কবিতায় তিনি স্পষ্ট ভাষায় পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ভারতবাসীদের আহবান জানান। কবিতাটি দীর্ঘকাল বঙ্গের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদায় আসীন ছিল। তাঁর ‘ভারতবিলাপ’, ‘কালচক্র’, ‘রিপন উৎসব’, ‘ভারতের নিদ্রাভঙ্গ’ প্রভৃতি রচনায়ও স্বদেশপ্রেমের কথা ব্যক্ত হয়েছে। 
তাঁর রচনায় নারীমুক্তির বিষয়টিও ব্যক্ত হয়েছে। লেখালেখির মাধ্যমে তিনি তৎকালে বিধবাদের প্রতি সমাজের নির্দয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আঘাত হেনেছিলেন। এ বিষয়ে রচিত তাঁর ‘কুলীন মহিলা বিলাপ’ কবিতাটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বহুবিবাহরোধ আন্দোলনের সহায়ক হয়েছিল। তাঁর রচনায় বাংলাদেশ হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মিলিত বাসভূমিরূপে চিত্রিত হয়েছে। তিনি সাহিত্যের মধ্য দিয়ে অখন্ড ভারতের স্বাধীন ও সংহতিপূর্ণ রূপ কামনা করেছিলেন।

হেমচন্দ্রের প্রথম কাব্যগ্রন্থ চিন্তাতরঙ্গিণী ১৮৬১ সালে প্রকাশিত হয়। কিন্তু তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা ‘বৃত্রসংহার’ (২ খন্ড, ১৮৭৫-৭) মহাকাব্য। মহাভারতের কাহিনী অবলম্বনে রচিত এ কাব্যে মূলত সমসাময়িক সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয় ঘোষিত হয়েছে। একসময় বাংলাদেশে কাব্যটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল এবং কবি হিসেবে হেমচন্দ্রের যা খ্যাতি তা মূলত এ কাব্যের জন্যই। হেমচন্দ্রের অপর বিশিষ্ট কাব্য বীরবাহু কাব্য (১৮৬৪) দেশপ্রেম ও গোত্রপ্রীতির পরিচয় সম্বলিত একখানা আখ্যানধর্মী রচনা। তাঁর অপরাপর উল্লেখযোগ্য রচনা হলো: আশাকানন (১৮৭৬), ছায়াময়ী (১৮৮০), দশমহাবিদ্যা (১৮৮২), চিত্তবিকাশ (১৮৯৮) ইত্যাদি।

হেমচন্দ্রের কবিপ্রতিভার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন কবিতাবলী (২ খন্ড, ১৮৭০-৮০)। এটি তাঁর খন্ডকবিতার সংকলন। ‘জীবনসঙ্গীত’, ‘গঙ্গার উৎপত্তি’, ‘পদ্মের মৃণাল’, ‘ভারতকাহিনী’, ‘অশোকতরু’ প্রভৃতি খন্ডকবিতা তাঁর অপূর্ব সৃষ্টি। এগুলির ভাব-ভাষা-ছন্দ শাশ্বত আবেদনময়। এসব খন্ডকবিতায় ইংরেজি কাব্যের ছায়া থাকলেও মাধুর্য এবং রসসৃষ্টির দিক থেকে তা বাংলা ভাষার নিজস্ব সম্পদে পরিণত হয়েছে।

হেমচন্দ্র বেশ কিছু ইংরেজি গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ করেন। সেসবের মধ্যে শেক্সপীয়রের টেম্পেস্ট (নলিনী বসন্ত, ১৮৭০) ও রোমিও-জুলিয়েট (১৮৯৫) উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি বেশ কিছু ইংরেজি কবিতারও বঙ্গানুবাদ করেন।

জন্ম
হুগলির গুলিটা গ্রামে মাতামহের বাড়িতে তাঁর জন্ম। পিতার আর্থিক দৈন্যের কারণে মাতামহের সহায়তায় তিনি কলকাতার খিদিরপুর বাঙ্গালা স্কুলে পড়ালেখা শুরু করেন। কিন্তু মাতামহের মৃত্যুর পর কিছুদিন তাঁর পড়াশোনা বন্ধ থাকে। পরে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ প্রসন্নকুমার সর্বাধিকারীর প্রচেষ্টায় তিনি ইংরেজি শেখেন এবং ১৮৫৩ সালে হিন্দু স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। এখান থেকে জুনিয়র ও সিনিয়র উভয় পরীক্ষায় তিনি বৃত্তি লাভ করেন। বৃত্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে অর্থাভাবে তাঁর লেখাপড়া পুনরায় বন্ধ হয়ে যায় এবং কিছুদিন তিনি চাকরি করতে বাধ্য হন। ১৮৫৯ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে তিনি বিএ পাস করেন। তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ব্যাচের গ্রাজুয়েটদের অন্যতম। ১৮৬১ সালে তিনি এলএল এবং ১৮৬৬ সালে বিএল ডিগ্রি লাভ করেন।

গ্রাজুয়েট হওয়ার আগে মিলিটারি অডিটর-জেনারেল অফিসে কেরানি পদে চাকরির মধ্য দিয়ে হেমচন্দ্রের কর্মজীবন শুরু হয়। পরে তিনি কিছুদিন ক্যালকাটা ট্রেনিং অ্যাকাডেমির প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন এবং ১৮৬২ সালে মুন্সেফ হন। এ পদে কয়েকমাস চাকরি করার পর পুনরায় তিনি ওকালতিতে ফিরে আসেন এবং ১৮৯০ সালে সরকারি উকিল নিযুক্ত হন। কর্মজীবনে হেমচন্দ্র আইনজীবী হিসেবেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

হেমচন্দ্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি যেমন গুরুগম্ভীর আখ্যায়িকা কাব্য রচনা করেছিলেন তেমনি আবার সহজ সুরের খন্ডকবিতা, ওজস্বিনী স্বদেশসঙ্গীত এবং লঘু সাময়িকী কবিতাও রচনা করেছিলেন। শিল্প ও সাহিত্যসহ জ্ঞানের অন্যান্য অনেক বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন গুণী ব্যক্তি হিসেবে সমকালে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর শেষজীবন ছিল খুবই বেদনাময়। তিনি একসময় অন্ধ হয়ে যান এবং অর্থনৈতিক নানা প্রকার অসুবিধার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন অতিবাহিত হয়। ১৯০৩ সালের ২৪ মে খিদিরপুরে নিঃসহায় ও নিঃস্ব অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

ভারত সঙ্গীত
“বাজ রে শিঙ্গা বাজ এই রবে,
শুনিয়া ভারতে জাগুক সবে,
সবাই স্বাধীন এ বিপুল ভবে,
সবাই জাগ্রত মানের গৌরবে
ভারত শুধু কি ঘুমায়ে রবে?”

জন্মভূমি
মাগো ওমা জন্মভূমি !
আরো কত কাল তুমি,
এ বয়সে পরাধীনা হয়ে কাল যাপিবে |
পাষণ্ড যবনদল
বল আর কত কাল,
নির্দয় নিষ্ঠুর মনে নিপীড়ন করিবে ||
কতই ঘুমাবে মাগো,
জাগো গো মা জাগো জাগো,
কেঁদে সারা হয় কন্যা পুত্র সকলে |
ধুলায় ধূসর কায়,
ভূমি গড়াগড়ি যায়,
একবার কোলে কর, ডাকি গো মা, মা বলে ||
কাহার জননী হয়ে,
কারে আছ কোলে লয়ে,
স্বীয় সুতে ঠেলে ফেলে কার সুতে পালিছ ?
কারে দুগ্ধ কর দান,
ও নহে তব সন্তান,
দুগ্ধ দিয়ে গৃহমাঝে কালসর্প পুষিছ ||
মোরে দিলে বনবাস,
প্রিয়ে আছে কার পাশ,
হায় কত পীড়া পাও, হে সুধাংশু-বদনে !
কোথা বসো, কোথা যাও,
কিবা পর কিবা খাও,
হায় পুনঃ কতদিনে জুড়াইব নয়নে ||

পরশমণি
কে বলে পরশমণি অলীক স্বপন ?
অই যে অবনীতলে পরশমাণিক জ্বলে
বিধাতা-নির্মিত চারু মানব-নয়ন।
পরশমণির সনে লৌহ-অঙ্গ-পরশনে,
সে লৌহ কাঞ্চন হয় প্রবাদ-বচন,---
এ মণি পরশ যায়, মানিক ঝলসে তায়,
বরিষে কিরণধারা নিখিল ভূবন।

কবির কল্পিত নিধি মানবে দিয়াছে বিধি,
ইহার পরশগুণে মানব-বদন
দেব তুল্য রূপ ধরি' আছে ধরা আলো করি',
মাটির অঙ্গেতে মাখা সোনার কিরণ |

পরশমণি যদি অলীক হইত,
কোথা বা এ শশধর, কোথা বা ভানুর কর,
কোথা বা নক্ষত্র-শোভা গগনে ফুটিত ?
কে রাখিত চিত্র করে চাঁদের জোছনা ধ'রে

তরঙ্গে মেঘের অঙ্গে এমন মাখায় ?
কে বা এই সুশীতল বিমল গঙ্গার জল
ভারত-ভূষণ করি রাখিত ছড়ায়ে ?
কে দেখা'ত তরুকুল, নানা এঙ্গে নানা ফুল,

মরাল, হরিণ,মৃগে পৃথিবী শোভিয়া ?
ইন্দ্রধনু-আলো তুলে সাজায়ে বিহঙ্গ-কুলে,
কে রাখিত শিখি পুঞ্জে শশাঙ্ক আঁকিয়া ?
দিয়াছে বিধাতা যাই এ পরশমণি---

স্রগের উপমাস্থল হয়েছে এ মহীতল,
সুখের আকর তাই হয়েছে ধরণী !
কি আছে ধরণীর অঙ্গে, নয়নমণির সঙ্গে
না হয় মানব চিত্তে আনন্দদায়িনী !

নদীজলে মীন খেলে, বিটপীতে পাতা হেলে,
চরে বালুকণা ফুটে, তৃণেতে হিমানী,
পক্ষী পাখে উড়ে যায়, কীটেরা শ্রেণীতে ধায়,
কঙ্করে তুষার পড়ে, ঝিনুক চিক্কণী |

তাতেও আনন্দ হয়--- অরণ্য কুজ্ঝটিময়,
জ্বলন্ত বিদ্যুত্লতা, তমিস্রা রজনী |
অপূর্ব মাণিক এই পরশ-কাঞ্চন !
জননী-বদন-ইন্দু জগতে করুণা-সিন্ধু

দয়াল পিতার মুখ, জায়ার বদন |
শত শশি-রশ্মিমাখা চারু ইন্দীবর-আঁকা
পুত্রের অধর-ওষ্ঠ, নলিন আনন ;
সোদরের সুকোমল, স্বসা-মুখ নিরমল,

পবিত্র প্রণয়পাত্র, গৃহির কাঞ্চন---
এই মণি পরশনে হয় সুখ দরশনে,
মানব-জনম সার, সফল জীবন |---
কে বলে পরশমণি অলীক স্বপন ?

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71