শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শুক্রবার, ৬ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির ৩ রোমাঞ্চকর ঘটনা
প্রকাশ: ১০:৩৭ am ১০-১১-২০১৬ হালনাগাদ: ১২:০৭ pm ১০-১১-২০১৬
 
 
 


প্তচরবৃত্তি নিয়ে কত ঘটনার কথা শোনা যায়। গল্প-উপন্যাসেও এ নিয়ে কত রোমাঞ্চকর ঘটনা পড়েছেন হয়ত। কিন্তু বাস্তবে এরকম রোমাঞ্চ ও রোমহর্ষক ঘটনা যে ঘটে থাকে তা কি জানেন?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কয়েকটি সত্যিকারের গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনা রয়েছে যা গল্পকেও হার মানায়। রোমাঞ্চকর সেসব ঘটনার মধ্যে ৩টি ঘটনা পাঠকদের জন্য রইল।

একটি মৃতদেহ যা হিটলারকেও বোকা বানিয়েছিল : ১৯৪৩ সাল। মিত্রশক্তি তখন ইতালির সিসিলি আক্রমণের ছক কষছিল। তারা জানত যে, সিসিলি আক্রমণ করলে হিটলারের নাজি বাহিনী খুব দ্রুতই সেখানে তাদের শক্তি বর্ধিত করার ক্ষমতা রাখে। তাই সেখানে আক্রমণের জন্য ব্রিটিশরা কিছু ফন্দী বের করতে থাকে। আর এ জন্যই সাজানো হলো এক মিথ্যা নাটক। এ নাটকের ধারণাটি দিয়েছিলেন বিখ্যাত স্পাই চরিত্র জেমস বন্ডের স্রষ্টা ইয়ান ফ্লেমিং।

ব্রিটিশ নাভাল ইন্টেলিজেন্সের একটি কক্ষে জেমসের বন্ডের স্রষ্টা ইয়াং ফ্লেমিং

নাটকের প্লট অনুসারে মিত্রবাহিনী গ্লিনডোর মিশেল নামের এক ভবঘুরে মানুষের মৃতদেহ খুঁজে বের করেন। মিত্র বাহিনী লাশটির নাম দেয় ক্যাপ্টেন উইলিয়াম বিল মার্টিন। এই কাল্পনিক চরিত্রটির জন্ম সাল বানানো হয় ১৯০৭ সাল। তার জন্ম হয়েছিল ওয়েলসের কার্ডিফে। মার্টিন নামটি পছন্দ করা হয়েছিল কারণ ব্রিটিশ রয়্যাল মেরিন বাহিনীতে ক্যাপ্টেন বা, মেজর পদে মার্টিন নামের অনেক সেনা ছিল সে সময়। তার পরিচয় পত্রে যে মানুষটির ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল তিনি ছিলেন এম আই ফাইভ অফিসার রনি রিড। তার চেহারা অনেকটাই মৃতদেহটির মত ছিল।

রয়্যাল মেরিনের কাল্পনিক চরিত্র মেজর উইলিয়াম মার্টিনের পরিচয়পত্র

মিত্র বাহিনীর পোশাক পরানো হয় লাশের গায়ে। তার কোমরের বেল্টের সাথে এক ধরণের বিশেষ শিকলের সাহায্যে একটি ব্রিফকেস বেঁধে দেওয়া হয়। সেই ব্রিফকেসে ছিল গ্রীসে মিত্রবাহিনীর এক মিথ্যা কিন্তু বিশাল আক্রমণের নকশা। তারা একটি নষ্ট প্যারাসুট মৃতদেহটির গায়ে লাগিয়ে দিয়ে মৃতদেহটিকে সমুদ্রের স্রোতের সাথে ভাসিয়ে দিল যাতে হিটলারের নাজি বাহিনী তা খুঁজে পায়।

মৃতদেহটির কাছ থেকে জার্মানরা যা যা খুঁজে পেয়েছিল।

ব্রিটিশ বা, মিত্র বাহিনী যেরকম আশা করেছিল ঠিক সেরকমই ঘটল। নাজিরা মৃতদেহসহ ব্রিফকেসটি খুঁজে পেল। আসলে মৃতদেহটি স্পেন খুঁজে পেয়েছিল, কিন্তু তাদের ইন্টেলিজেন্স বাহিনীর সাথে জার্মান ইন্টেলিজেন্স বাহিনীর যোগাযোগ ছিল। তারা ভাবল কোন বিমান দুর্ঘটনায় মিত্র বাহিনীর এই সৈনিকটি মারা গেছে। তারা আক্রমণের নকশাটিকে আসল ভেবে বসল। হিটলার নিজেও এ বিষয়ে জানতেন এবং তিনি নিজেও ঘটনাটিকে সত্য বলেই মনে করলেন। ফলাফলস্বরুপ জার্মানরা তাদের সেনাবাহিনীর এক বড় অংশকে (প্রায় ৯০ হাজার সৈন্যকে) সেই মিথ্যা আক্রমণের জায়গায় পাঠিয়ে দিল। ফলে মিত্র বাহিনী খুব সহজেই সিসিলি আক্রমণ করে বসল। কারণ, সেখানে সৈন্য সংখ্যা কমে গিয়েছিল এবং বাইরে থেকে সৈন্য আনার মত অবস্থাও ছিল না নাজিদের। যার ফলে মিত্রবাহিনীর হাজার হাজার সৈনিকের জীবন বেঁচে যায়। ব্রিটিশদের এ আক্রমণের আরো ২ সপ্তাহ পর পর্যন্ত জার্মানরা বিশ্বাস করে বসে ছিল যে, মূল আক্রমণটি গ্রীসেই হবে। কিন্তু সেই আক্রমণটি আর কখনই হয়নি।

এ ঘটনাটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এ ঘটনার ফলে জার্মানরা পরবর্তিতে অনেক আসল ঘটনা কাকিতালিয়ভাবে আগেই জেনে যাওয়ার পরও ব্রিটিশদের পাতা ফাঁদ ভেবে এড়িয়ে গিয়েছিল এবং ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছিল।

দ্যা ম্যান হু নেভার ওয়াজ বইয়ের প্রচ্ছদ

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেখা বই ‘দ্যা ম্যান হু নেভার ওয়াজ’ প্রকাশের পরপরই বেস্ট সেলার বই হয়ে যায়। দুই বছর পর এই একই নামে একটি সিনেমাও মুক্তি পায়।

 

পোল্যান্ডের এক স্পাইয়ের সাহসিকতার গল্প : ক্রিস্টিনে গ্রানভিলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বেশ কিছু সাহসী অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু তার সবচেয়ে সাহসী অভিযান ছিল এক উদ্ধার অভিযান।

ঘটনাটি ফ্রান্সের। ১৯৪৪ সালের আগস্ট মাস, ক্রিস্টিনে ফ্রান্সের এক গেস্টাপো নিয়ন্ত্রিত জেলখানায় ঢুকে পড়েন। গেস্টাপো হচ্ছে তৎকালিন জার্মানদের পুলিশ বাহিনীর নাম। সেই জেলে বন্দী থাকা ৩ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত স্পাইকে মুক্ত করে আনেন ক্রিস্টিনে।

বামে ক্রিস্টিনে গ্রানভিলে এবং ডানে তার জীবনের উপর ভিত্তি করে লেখা বই দ্যা স্পাই হু লাভডেরপ্রচ্ছদ।

এ ঘটনার আগে থেকেই সারা ফ্রান্সে ক্রিস্টিনের মুখ সহ ধরিয়ে দিন লেখা পোস্টার দেয়ালে দেয়ালে লাগানো ছিল। কিন্তু ক্রিস্টিনে এমনভাবে সেখানে গিয়েছিলেন যে কেউই তাকে চিনতে পারেনি। তিনি কারারক্ষীদের এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, তিনি একজন ব্রিটিশ স্পাই এবং একজন ব্রিটিশ জেনারেলের ভাগ্নী। সে ক্যাপ্টেন আলবার্ট শেঙ্কের সাথে দেখা করতে সক্ষম হন।

তিনি আলবার্ট শেঙ্ককে এই বলে হুমকি দেন যে, মিত্র বাহিনী খুব শিগগিরই তাদের আক্রমণ করতে যাচ্ছে। যদি ধরা পড়া ৩ জন স্পাইয়ের কোনো রকম ক্ষতি করা হয়, তবে তাদের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ করে দেওয়া হবে। ক্রিস্টিনে তাকে আরো বলেন, তারা যদি ধরা পড়া ৩ স্পাইকেই ছেড়ে দেয়, তাহলে তাদেরকে পরবর্তীতে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেওয়া হবে এবং মিত্র বাহিনী তাদের কোনো ক্ষতি করবে না।

ক্রিস্টিনে কারারক্ষীদের ২০ লাখ ফ্রাঙ্ক দেওয়ার লোভ দেখিয়েছিল। ক্রিস্টিনে প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে তাদের সাথে কথা কাটাকাটি করেন। তিনি তাদের সাথে আপোষ করারও চেষ্টা করেন। নিজের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে তাদেরকে বিভ্রান্ত করে দেন ক্রিস্টিনে। তিনি তাদের বলেছিলেন মিত্রবাহিনী যেকোন সময় চলে আসবে এবং তার সাথে তাদের তারবিহীন যোগাযোগ রয়েছে। তিনি স্পাইদের একজনকে নিজের স্বামী হিসেবে (যা সত্য ছিল না) এবং অন্যান্যদের তার স্বামীর বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

ক্রিস্টিনের ব্যক্তিত্ত্ব, অর্থের লোভ এবং মিত্র বাহিনীর আক্রমণের ভয়ে জার্মান পুলিশরা তার প্রস্তাবে রাজি হয় এবং ৩ জন স্পাইকেই ছেড়ে দেয়। ক্রিস্টিনেকে তার সাহসের জন্য আজও ইতিহাসের পাতায় স্মরণ করা হয়।

বিখ্যাত গায়িকা যিনি মিউজিক শিট  অন্তর্বাসের ভেতরে করে তথ্য পাচার করতেন : জোসেফাইন বেকার। আমেরিকাই তার জন্ম। বেশ জনপ্রিয় গায়িকা ছিলেন তিনি। নাচতেনও বেশ ভাল। তিনি ১৯৩৭ সালে ফ্রান্সের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকেই যখন জার্মানদের দখলে চলে যায় ফ্রান্স, তখন বেকার জার্মানদের বোঝাতে সক্ষম হন যে তিনি আসলে তাদেরই দলের লোক। জোসেফাইন বেকার পরবর্তীতে বেশ কয়েক বছর মিত্র শক্তির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেন। তিনি উচ্চবিত্তদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে উচ্চ পদের সেনাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতেন।

গায়িকা জোসেফাইন বেকার

তিনি তথ্য পাচারের সময় তার মিউজিক শিটে স্বাভাবিকভাবে দেখা যায় না এমন ধরণের অদৃশ্য কালি দিয়ে তথ্যগুলো লিখতেন। যখন কোনো গোপন ছবি পাচার করার প্রয়োজন পড়ত তিনি তা তার অন্তর্বাসের ভেতরে পিন দিয়ে আটকিয়ে নিতেন।

এইবেলাডটকম/এএস

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71