সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোমবার, ৯ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
ধন্যবাদ, মোশাররফ করিম
প্রকাশ: ১২:১৯ pm ২৯-০৩-২০১৮ হালনাগাদ: ১২:১৯ pm ২৯-০৩-২০১৮
 
ইকরাম কবীর
 
 
 
 


মোশাররফ করিমের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। দেখাও হয়নি কখনও। ব্যক্তি মোশাররফ করিমকে আমি চিনি না। অনেক দিন ধরে টেলিভিশনে অভিনয় করছেন, সে সুবাদে তাকে চেনা। তার অভিনীত বেশ কিছু নাটক দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। এই সেদিনও– বাসে চড়ে কুষ্টিয়া যাচ্ছিলাম। বাসের টেলিভিশনে তারই অভিনীত তিনটি নাটক দেখালো। ইচ্ছে না থাকলেও নাকের ডগায় নাটক চলতে থাকলে কিছুটাতো দেখতেই হয়। মোশাররফ করিমের নাটক দেখার ইচ্ছে আমার খুব একটা হয় না। তার অভিনয় আমার পছন্দ নয়। বাড়িতে তাকে দেখলে আমি টিভি বন্ধ করে দেই। তার সঙ্গে আমার কোনও শত্রুতা নেই, তবে কেন যেন মনে হয় তার শারীরিক ভাষা অভিনয়ের সঙ্গে মিলছে না। সামনে যে চরিত্রই পাই, তা-ই অভিনয় করে ফেলি– মোশাররফ করিমকে দেখলে আমার তাই মনে হয়।

যাই হোক; আজকের প্রসঙ্গ তার অভিনয় নয়। সম্প্রতি এই অভিনেতা ‘জাগো বাংলাদেশ’ নামে একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনার সময় তার একটি বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিতর্কিত হয়েছেন বলে জানতে পেরেছি। অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়েছে সমাজের নানা ধরনের সমস্যা নিয়ে। প্রথম পর্বের বিষয় ছিল ধর্ষণ। তিনি পুরুষের মানসিকতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘একটা মেয়ে তার পছন্দ মতো পোশাক পরবে না? পোশাক পরলেই যদি সমস্যা হয়, তাহলে ওই সাত বছরের মেয়েটির ক্ষেত্রে কী যুক্তি দেবো আমরা? যিনি বোরকা পরে ছিলেন তার ক্ষেত্রেইবা কী যুক্তি দেব?’

বলে রাখা উচিত যে অনুষ্ঠানটি আমি দেখিনি। অনুষ্ঠান প্রচারিত হওয়ার পর খবরের কাগজে জানতে পেরেছি মোশাররফ করিমের ওপর অনেকে ক্ষেপে গেছেন। তারপর আবার খবরে পড়লাম তিনি তার বক্তব্যের জন্য সবার কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন। আমি ওই অনুষ্ঠান না দেখলেও পরিষ্কার বুঝতে পারছি সেখানে ধর্ষণ এবং মেয়েদের পোশাকের শালীনতা নিয়ে কথা হচ্ছিল। নিশ্চয়ই কেউ মেয়েদের পোশাক প্রসঙ্গ তুলেছিলেন; মেয়েদের পোশাককে ধর্ষিত হওয়ার কারণ হিসেবে দেখিয়েছিলেন। এবং এই পোশাকের প্রসঙ্গ ধরেই মোশাররফ এ প্রশ্ন করেছিলেন। পোশাকের কারণেই যদি মেয়েদের যৌন-হেনস্থার শিকার হতে হয়, তাহলে সাত বছরের শিশুরা কী দোষ করেছিল? তারা তো কেউ অশালীন কাপড় পরে না! যে সকল নারীরা হিজাব কিংবা বোরকা পরেন, তারাও তো ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। তাহলে কথা দাঁড়াচ্ছে, আসলে পোশাকে নয়, সমস্যা অন্য জায়গায়। পুরুষদের মানসিকতায়।

মোশাররফ করিম ভুল কী বলেছেন আমি ভেবে পাচ্ছি না। আর তিনি সবার কাছে এ প্রশ্ন করার জন্য কেন ক্ষমা চাইলেন তাও ভেবে পাচ্ছি না। সত্য কথা বলাতে যদি তার কোনও দোষ হয়ে থাকে, তাহলে এই দোষ তার বারবার করা উচিত বলে আমি মনে করি।

কোনও পুরুষ যদি একজন মেয়েকে তথাকথিত ‘অশালীন’ কাপড় পরা অবস্থায় দেখে উত্তেজিত হয়ে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে, তাহলে সেই ‘অশালীন’ কাপড়ের দোহাই দিয়ে সে তার অপরাধ থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে? যদি তা-ই হয়, তাহলে আমাদের মানসিকভাবে শিক্ষিত হতে আরও অনেক বছর সময় লাগবে। এ প্রশ্ন করার জন্য মোশাররফ করিমকে যারা কটু কথা বলেছেন, তাদের আরও চিন্তা করা প্রয়োজন তাদের নিজেদের নিয়ে। আর সেই কটু কথা শুনে সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে মোশাররফ করিম সারাদেশের নারীদের প্রতি অন্যায় করেছেন বলে আমি মনে করি।

বুঝতে হবে ‘ধর্ষণ’ চিরকাল ধর্ষণই। পোশাকের দোহাই দিয়ে ধর্ষণকে অন্য কিছু বলা যায় না। একজন মানুষের ইচ্ছে বিরুদ্ধে তার সঙ্গে যৌনাচার করাই হচ্ছে ধর্ষণ। এই শালীন পোশাক এবং অশালীন পোশাকের কথা অনেক দিন ধরেই চলে আসছে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ করা গেছে যে একজন ধর্ষিতার পোশাকের ওপর দোষ চাপিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। কী অবাক করা চিন্তা! আমি ধর্ষণ করবো আর দোষ দেব নারীর পোশাককে! তাহলে তো এমন অনেক দেশ আছে যেখানে মেয়েরা সারা দিন শুধু ধর্ষিতই হতেন!

শালীন-অশালীনের পরিমাপ কে করে? একজন ধর্ষক? হ্যাঁ, আমাদের সমাজের প্রথা অনুযায়ী শালীন-অশালীনের মধ্যে পার্থক্য আমরা নির্ণয় করতে পারি। আর কোনও নারী যদি বৃত্ত থেকে বেরিয়ে তার পছন্দমত পোশাক পরেন তাহলে কী তাকে ধর্ষণ করার অধিকার আমাদের হয়ে যায়?

অনুষ্ঠানে মোশাররফ কী বলতে চেয়েছেন তা সবাই বোঝেননি। আর বুঝলেও জ্ঞানপাপীর মতো তার সঙ্গে আচরণ করা হয়েছে। একজন পুরুষ ধর্ষণের বিরুদ্ধে কথা বলে সবার কাছে ক্ষমা চাইলেন। কী আশ্চর্য মানসিকতা আমাদের!

আমি এই বলে মোশাররফ করিমকে ধন্যবাদ দিতে চাই—‘আপনি সঠিক প্রশ্নটি করেছেন। এ ধরনের প্রশ্নই সমাজের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য আপনার করা উচিত। এবং সঠিক প্রশ্ন করার জন্য ভবিষ্যতে আর ক্ষমা না চাওয়ার অনুরোধ রইলো’।

যারা এ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছেন, তাদেরও ধন্যবাদ জানাই তা প্রচার করার জন্য। অনলাইনে অনুষ্ঠানের ভিডিওটি আর পাওয়া যাচ্ছে না; ধরে নিচ্ছি আপনারা ভয়ে তা নামিয়ে ফেলেছেন। ভয়ই যদি পান তাহলে পুরো অনুষ্ঠানটিই বাতিল করে দিন। অন্যায়ের কাছে মাথানত করে ফেলছেন আপনারা। মনে রাখবেন, একজন ধর্ষক কখনও পোশাকের দোহাই দিয়ে সাদা মনের মানুষ হয়ে যায় না।

একজন নারীকে তথাকথিত ‘অশালীন’ কাপড় পরা অবস্থায় দেখে যে পুরুষ তাকে ধর্ষণের কথা ভাববে না, সে-ই আসল মানুষ।

লেখক: গল্পকার ও কলাম লেখক

 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71