শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শুক্রবার, ৬ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
ধর্মবিশ্বাসে মানুষ এবং মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য
প্রকাশ: ০৮:১৬ pm ০৪-০৫-২০১৮ হালনাগাদ: ০৮:১৬ pm ০৪-০৫-২০১৮
 
রজত পাল
 
 
 
 


বর্তমানে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান যেরকম প্রভাব ফেলছে তেমনি ধর্ম-দর্শনও প্রভাব বিস্তার করছে মানুষের চিন্তায় ও বিশ্বাসে। আর এ কারণে আজকাল মানুষ তাদের অনেক দিনের মতবাদ, চিন্তাধারা, বিশ্বাস ভেঙে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করতে আগ্রহী হচ্ছে। কিন্তু বিপত্তিটা সেখানেই। মানুষের এ হঠাৎ পরিবর্তনকে তার আশেপাশের মানুষেরা সহজে বুঝতে পারে না। তাদের মনে সন্দেহ জাগে এবং তারা বিরূপ ধারণা পোষণ করতে থাকে। যেমন: একজন মানুষ বিভিন্ন ধর্মের অনুষ্ঠানে যোগ দিলে কিংবা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অত্যাচারিতদের পক্ষে কথা বললে তাদেরকে মুক্তমনা কিংবা নাস্তিক ট্যাগ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কেউ ধর্মীয় রীতি মেনে মানুষের উপকার করতে গেলে কিংবা নিজ ধর্ম নিয়ে কথা বললে তাদেরকে প্রতিক্রিয়াশীল কিংবা ধর্মান্ধ বলে সম্বোধন করা হচ্ছে। আসলে একজন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা কিংবা তার নিজস্ব ধারার কাজ বুঝতে পারাটা খুবই কঠিন কাজ। আর তাকে কোন শ্রেণিতে রাখা যায় এটা নির্ধারণ করাটা আরো কঠিন। কেননা, মানুষ বিভিন্ন মতবাদ ও মতাদর্শীদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এখনও জানে না। এসব বিষয়ে অনেক শিক্ষিত মানুষের ধারণাই শূণ্যের কাছাকাছি। এসব বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিভ্রান্তি ও অসম্পূর্ণ ধারণা পোষণের কারণেই সমাজে মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরী হচ্ছে এবং গোষ্ঠীগত সংঘাত বেড়েই চলেছে। ধর্ম, দর্শন, চিন্তা, বিজ্ঞান কীভাবে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক শ্রেণিবিভাগ তৈরী করেছে তার সম্পর্কে সহজবোধ্যভাবে আলোকপাত করা হলো।

যারা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না, স্রষ্টা সাকার কিংবা নিরাকার যাই হোক না কেন, সেসব মানুষকে নাস্তিক বলা হয়। তারা অনেকটা প্রকৃতিবাদ ও যুক্তিবাদে বিশ্বাস করে। পৃথিবীর সকল কিছুই প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি এবং ভৌত, এর পিছনে কোনো প্রকার সাকার বা নিরাকার স্রষ্টার অবদান তারা মানতে নারাজ। বিভিন্ন ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থকে তারা ভ্রান্ত ধারণা হিসেবেই সমালোচনা করে। অর্থাৎ এ শ্রেণির লোকেরা সম্পূর্ণ স্রষ্টা ও ধর্মের প্রতি অবিশ্বাসী।

ধর্মনিরপেক্ষ শ্রেণির লোকেরা কোনো ধর্মের রীতিই মেনে চলে না। অর্থাৎ তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন সত্তায় নিজেদের পরিচালিত করে। এ শ্রেণির লোকেরা নাস্তিকদের মতো কোনো ধর্মের সমালোচনা করে না আবার আস্তিকদের মতো নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের মতাদর্শ প্রচার করে না। সমাজকে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত ও শৃঙ্খলা আনয়নের জন্য তারা নিরপেক্ষতা ধারণ করেন এবং কোনো ধর্মের অধীনে না থেকে সাম্য বা মৈত্রী প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়ে থাকে।

অন্ধ বিশ্বাসে যারা আস্থা রাখে না বরং ধর্ম-সমাজের ঊর্দ্ধে যারা কোনোকিছুকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বাছবিচার করে তারাই মুক্তমনা। অনেককাল ধরে প্রচলিত কোনো বিশ্বাস কিংবা রীতিনীতিতে এরা ভরসা করে না। সেসব পুরনো ধ্যানধারণাকে ব্যবচ্ছেদ করে এ শ্রেণির মানুষেরা উপযুক্ত মতামত প্রদান করে থাকে। আস্তিক-নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী-ধর্মনিরপেক্ষ, মানবতাবাদী এসব শ্রেণিভুক্ত মানুষেরাও মুক্তমনা হতে পারে। অর্থাৎ একজন আস্তিক যদি তার ধর্মীয় কার্যক্রমকে চিন্তা-ভাবনার দ্বারা যাচাই-বাছাই করে তারপর পালন করতে উদ্বুদ্ধ হয় তবে সেও মুক্তমনা হিসেবে বিবেচিত হবে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যুক্তিবিদ্যা চর্চা ও উন্মুক্ত চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে যেকোনো বিষয়ের প্রচার-প্রচারণা, মতবাদ প্রচার-পালন করাই মুক্তমনা শ্রেণির মানুষের বৈশিষ্ট্য।

ধর্মীয় কোনো বিধান কিংবা প্রকৃতির কোনো ক্রিয়াকলাপ যারা বিনা বাক্যে অথবা কোনো প্রকার চিন্তা ছাড়া মেনে নেয় না তারাই সংশয়বাদী। এ শ্রেণিভুক্ত লোকেরা কোনো বিষয়কে গভীরভাবে জানার জন্য প্রশ্ন করে। যেকোনো বিষয়কেই এরা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে থাকে। ধর্মীয় বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রশ্নের কোনো সমাধানে সন্তুষ্ট হলে সংশয়বাদী শ্রেণির মানুষেরা তা পালন করে। আর কোনো বিষয়ে ধোঁয়াশা বা অমীমাংসিত থেকে গেলে এরা তা পরিত্যাগ করে।

রাষ্ট্র কিংবা সমাজের উন্নয়নকল্পে প্রগতিশীল শ্রেণির লোকেরা বেশ সচেষ্ট থাকে। প্রগতিশীলরা বিশ্বাস করে সময়ের সাথে সাথে পুরনো ধ্যানধারণা ভেঙে গতানুগতিক সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। এ শ্রেণির লোকেরা ধর্ম পালন করলেও তাদের মাঝে ধর্মীয় গোঁড়ামী থাকে না। সাম্প্রদায়িকতা ও সমাজে বিভেদ সৃষ্টিকারী উপাদানগুলো রোধ করতে এরা সচেতন থাকে। নিজ নিজ ধর্মে যেসব বিষয়গুলো হিংসাত্মক কিংবা নেতিবাচক মনে হয়, প্রগতিশীল ব্যক্তিরা সেসব ধর্মীয় বিষয়াবলী পরিত্যাগ করে এবং অন্যদেরকে পরিত্যাগের আহ্বান জানায়। যেসব ধর্মীয় কার্যকলাপ সমাজের উন্নতির অন্তরায়, ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণকারী এবং সংস্কৃতিচর্চার বিরোধী, প্রগতিশীল সমাজ এসব কার্যকলাপ প্রতিরোধ করে সমাজের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন করতে চেষ্টা করে।

স্রষ্টায় বিশ্বাসীদের আস্তিক বলা হয়। এরা সাকার বা নিরাকার উভয়ভাবে বা যেকোনো এক উপায়ে স্রষ্টার আরাধনা করে। এই শ্রেণির লোকেরা ধর্মগ্রন্থে বিধিবদ্ধ আচার-অনুষ্ঠান পালন করে এবং ধর্মীয় আদেশ-নিষেধ মেনে চলে। পৃথিবী সৃষ্টির পিছনে নিশ্চয় কেউ আছেন, আস্তিকরা এই ধারণা বিশ্বাস করে। তবে সেই স্রষ্টা পুরুষ নাকি নারী, এ বিষয়ে তারা অবগত নয় এবং আগ্রহী নয়। তারা এক বাক্যে নিজ নিজ পূর্বপুরুষ বা পরিবারলব্ধ ধর্মকে স্বীকার করে নেয় এবং নিষ্ঠার সাথে পালন করে।

ধর্মান্ধ ও প্রতিক্রিয়াশীল প্রায় একই সূতায় গাঁথা মনে হলেও তাদের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য হলো- ধর্মান্ধ শ্রেণীর লোকেরা পর্যাপ্ত অথবা ন্যূনতম জ্ঞান আহরণ করে না, এরা পূর্বপুরুষ কিংবা ধর্মগুরুদের মুখে শোনা বাণীতে ধর্ম পালন করে থাকে। অন্যদিকে প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণীর লোকেরা জ্ঞান আহরণ করা সত্ত্বেও প্রচলিত ধ্যানধারণাকে মনের মাঝে লালিত করে। তারা তাদের পশ্চাদমুখী চিন্তা-ভাবনা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে রাখে। তারা গতানুগতিক সমাজে ব্যবস্থার পরিবর্তন চায় না। ধর্মের অজুহাত দেখিয়ে এ শ্রেণীভুক্ত মানুষজন সময়ের পরিবর্তন থেকে নিজেকে ও আশেপাশের মানুষজনকে বিরত রাখার প্রচেষ্টা চালায়। মহাকালের স্রোতে ধর্ম ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদির পরিবর্তন করতে হয়, কিন্তু সময়ের প্রয়োজন ও চিন্তার উৎকর্ষের জন্য এরা ধর্মের গণ্ডি ছেড়ে বেরুতে পারে না। তাদের বিরোধী কোনো নীতি প্রচলন করা হলে এরা বিরূপ প্রতিকূলতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে এবং নীতির বাস্তবায়নকে প্রতিহত করে দেয়।

ধর্মান্ধ শব্দটির মাঝেই এ শ্রেণিভুক্ত মানুষের পরিচয় পাওয়া যায়। অর্থাৎ অন্ধের মতো যারা ধর্মকে বিশ্বাস করে এবং ধর্মীয় বিধান মেনে চলে তারাই এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এরা যুক্তি-বিজ্ঞান কিছুই না মেনে ধর্মীয় বিধিবিধানকে সর্বস্ব মনে করে। অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত লোককথা কিংবা ধর্মগুরুদের মুখে শোনা কথায় এরা ধর্মের প্রতি অনুগত হয়। ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে এদের গভীর জ্ঞান অনেক সময় থাকে না। পারিপার্শ্বিক সংস্কৃতির সাথে তাল মিলিয়ে এরা ধর্ম পালন করে। ধর্ম সম্পর্কে কেউ প্রশ্ন করলে কিংবা যুক্তি দেখাতে গেলে এ শ্রেণির লোকজন বেশ ক্ষিপ্ত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে হিংসাত্মক কার্যকলাপে লিপ্ত হতেও এরা কুণ্ঠাবোধ করে না।

হাতের সবগুলো আঙ্গুল যেমন সমান হয় না তেমনি সমাজের প্রতিটি শ্রেণির মানুষ একই চিন্তার অধিকারী হবে তা ভাবা অনুচিত। মানুষে মানুষে চিন্তা-ভাবনা-ধর্মবিশ্বাস-দর্শনে পার্থক্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবুও নিজ নিজ অবস্থান থেকে মানুষের জন্য একটি সুন্দর সমাজব্যবস্থা নিশ্চিত করাই আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। বিভেদ নয়, সাম্যই হবে আমাদের মূলমন্ত্র।

লেখক- ‍শিক্ষার্থী, সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71