বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০
বুধবার, ১৫ই আশ্বিন ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র, এক অবাস্তব কল্পনা: আবুল ফজল
প্রকাশ: ০২:৪০ pm ১৩-০১-২০২০ হালনাগাদ: ০২:৪০ pm ১৩-০১-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


ধর্মের প্রধান উদ্দেশ্য আর প্রধান এলাকা পরলোক, পারলৌকিক জীবন, সে জীবনের জন্য শিক্ষা আর প্রস্তুতির ব্যবস্থা বিধান। অন্য দিকে রাষ্ট্রের শুধু প্রধান নয়, একমাত্র এলাকা ইহলোক, রাষ্ট্রের অন্তর্গত মানুষের সুখ-সুবিধে, শান্তি আর উন্নয়নের ক্ষেত্র তৈরী করা —অর্থাৎ নাগরিকদের ইহজীবনের দায়িত্ব গ্রহণ ও পালন। যে-রাষ্ট্র এ দায়িত্ব নিষ্ঠা আর সততার সঙ্গে পালন করে, সে রাষ্ট্রই আদর্শ রাষ্ট্র।

এই প্রবন্ধটি ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত আবুল ফজলের ‘সমকালীন চিন্তা’ বই থেকে নেয়া হয়েছে। আবুল ফজল ছিলেন বিশ শতকের শুরুতে ঢাকায় গড়ে ওঠা ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ এর অন্যতম সদস্য। ব্যক্তিগত ধর্ম বিশ্বাসের মধ্যে থেকে মুক্তচিন্তার পক্ষের রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে ছিলেন তিনি। তিনি মনে করতেন রাজনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে ধর্মকে সম্পৃক্ত করা অনুচিত কাজ এবং ভুল। প্রায় অর্ধশত বছর আগে প্রকাশিত প্রবন্ধটি আমরা অনলাইনে প্রকাশ করছি। কারণ প্রবন্ধটি এখনো প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি।
 
গত বাইশ বছরেও শাসনতান্ত্রিক সংকট আমরা কাটিয়ে উঠতে পারি নি। বড় কারণ, দু’টি প্রবল অন্তরায় আজো আমাদের সামনে অনুত্তীর্ণ—তার একটি ভূগোল আর একটি ধর্ম। শেষোক্তটি অত্যন্ত কৃত্রিম ব্যাপার কারণ ধর্ম আর রাজনীতিতে প্রায় অহি-নকুল সম্পর্ক। ধর্ম যেমন একদিকে সম্পূর্ণভাবে না হলেও প্রধানত পরলোক বা পারলৌকিক জীবন-নির্ভর, তেমনি অন্য দিকে রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে ইহলৌকিক-ইহজীবন-সর্বস্ব। এ দু’য়ের সমন্বয় কিছুতেই হতে পারে না। পরলোক বা পারলৌকিক জীবনে বিশ্বাস ছাড়া ধর্ম অস্তিত্বহীন। কিন্তু ইহলোকে কোন রকম ধর্ম-বিশ্বাস বা ধর্ম-বিধান পালন ছাড়াও সৎ ও মহৎ জীবন যাপন করা যায়। তাই ধর্মহীন নাস্তিকের দলেও বহু সৎ, মহৎ আর সাধু-চরিত্রের লোকের অভাব নেই। বলা বাহুল্য, রাজনীতি আর দেশোসন ক্ষেত্রে এমন মানুষেরই প্রয়োজন আর মূল্য বেশী, রাজনৈতিক আর সামাজিক অর্থে অবিশ্বস্ত আর চরিত্রহীন (ইংরেজী অর্থে) তথাকথিত ধার্মিক বা ধর্মবিদের চেয়েও। আমি অন্য এক প্রবন্ধে বলেছি, ব্যক্তিবিশেষ মৃত্যুর পর স্বর্গে গেল কি নরকে গেল সমাজ আর রাষ্ট্রের দিক থেকে তার এক কানাকড়ি মূল্যও নেই; কিন্তু লোকটা জীবিতকালে, ইহলোকে সৎ ও বিশ্বস্ত ছিল কিনা, তার যথেষ্ট মূল্য রয়েছে, বিশেষ করে সমাজের কাছে এবং তার প্রতিবেশীদের নিকট। ধর্মের প্রধান উদ্দেশ্য আর প্রধান এলাকা পরলোক, পারলৌকিক জীবন, সে জীবনের জন্য শিক্ষা আর প্রস্তুতির ব্যবস্থা বিধান। অন্য দিকে রাষ্ট্রের শুধু প্রধান নয়, একমাত্র এলাকা ইহলোক, রাষ্ট্রের অন্তর্গত মানুষের সুখ-সুবিধে, শান্তি আর উন্নয়নের ক্ষেত্র তৈরী করা—অর্থাৎ নাগরিকদের ইহজীবনের দায়িত্ব গ্রহণ ও পালন। যে-রাষ্ট্র এ দায়িত্ব নিষ্ঠা আর সততার সঙ্গে পালন করে, সে রাষ্ট্রই আদর্শ রাষ্ট্র। তেমন রাষ্ট্রে যদি এক বিন্দুও ধর্মশিক্ষার ব্যবস্থা না থাকে তেমন রাষ্ট্রকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান কিছুতেই মন বা অযোগ্য রাষ্ট্র বলে নিন্দিত করবে না।

বৃটিশ শ্রমিক দলের অন্যতম নেতা বিভান ছিলেন নিরীশ্বরবাদী, কিন্তু বিশ্বাস করতেন মানবতায়—অর্থাৎ তিনি ছিলেন পুরোপুরি হিউম্যানিস্ট। রাজনৈতিক নেতা আর মন্ত্রী হিসেবে তিনি ছিলেন সৎ, আদর্শবাদী আর একনিষ্ঠ। মৃত্যুর পর এমন মানুষের জন্য ধর্মীয় প্রার্থনার কোন মূল্য নেই। সামাজিক রীতি রক্ষার জন্য আয়োজিত সার্ভিস ভাষণে তার বন্ধু বিশপ ডক্টর মেরভিন স্টকউড বলেছিলেন-

বিভান নিরীশ্বরবাদী ছিলেন, বিশ্বাস করতেন না ঈশ্বর কিংবা পরকালে, স্রেফ বিশ্বাস করতেন মানবতায়। এমন মানুষের জন্য বাইবেল পাঠ শ্রেফ পরিহাস আর পাঠকের জন্য আত্মপ্রবঞ্চনারই সামিল। বিভান বাগাড়ম্বর আর আত্মপ্রতারণাকে অত্যন্ত ঘৃণা করতেন। তিনি যা ছিলেন আমি যদি আজ তাকে তা প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করি তাতে তিনি মোটেও খুশী হতেন না।

গোঁড়া ধার্মিক খ্রীস্টান না হয়ে বিভান-যে মানবতাবাদী ছিলেন, তাতে বৃটিশ শ্রমিক দল, বৃটিশ গভর্নমেন্ট আর বৃটিশ জনগণের কিছুমাত্র ক্ষতি হয় নি। যে-মানুষ মানবতা আর মনুষ্যত্বে বিশ্বাসী সে মানুষ ঈশ্বর আর পরকালে বিশ্বাস না করলেও, বাক্যবাগীশ হয়ে জনগণকে প্রতারিত করতে যায় না। তাই নিরীশ্বরবাদী বিভান ইংলণ্ডের জনগণের কাছে শ্রদ্ধেয় ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মী আর নেতার কাছে মানুষ সুস্থ আর সৎ-রাজনীতিই কামনা করে, চায় না ধর্মবচন শুনতে। একমাত্র আমাদের দেশেই দেখা যায় নিজেদের রাজনৈতিক অজ্ঞতা ঢাকার জন্য আমাদের নেতারা অকারণেও ধর্মের বুলি আউড়িয়ে থাকেন। এখানে বলে রাখা ভালো: ধর্মের প্রতি আমার কোন বিদ্বেষ বা অনীহা নেই। ইসলামের মধ্যেই আমার জন্ম-ইসলামকে আমি-যে শুধু উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি তাই নয়, আমার শিক্ষাজীবনের সূচনা থেকে ইসলামী শিক্ষা বলতে যা বোঝায় তাও আমাকে নিতে হয়েছে। কাজেই ধর্মের বিরুদ্ধে আমার কোন আপত্তি থাকার কথা নয়, নেইও। আমার আপত্তি যারা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বা শাসনতন্ত্র-রচনার দাবী করেন তাঁদের বিরুদ্ধে, তাদের বিরুদ্ধেও নয়, তাঁদের ঐ অবাস্তব দাবীর বিরুদ্ধেই। ধর্ম এবং রাষ্ট্র উভয়ের আয়ু সুদীর্ঘ—এ সুদীর্ঘকালে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র কোথাও, কোন দেশে, কোন কালেই প্রতিষ্ঠিত হয় নি। এমনকি ইসলামের জন্মস্থান আরব দেশেও ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় নি। আজকের দিনের সৌদী আরবও ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র নয় মিসর, সিরিয়া, ইরাক, জর্ডান, লেবানন তো নয়ই।

ধর্মের অনুশাসন আর বিধি-বিধান যেখানে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালনের জন্য শাসনতান্ত্রিক আর আইন-সঙ্গত বাধ্যবাধকতা নেই তেমন দেশ বা রাষ্ট্রকে ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্র বলার কোন মানে হয় না। খোলাফায়ে রাশেদীনের দিনেও আরব দেশে এমন রাষ্ট্র চালু ছিল, সে কথা ইসলামের ইতিহাস বলে না। চালু থাকলে তিন তিনটা খলিফা দেশবাসীর হাতে নিহত হতেন না, এদের কেউ কেউ নিহত হয়েছেন মসজিদে, কেউ কেউ কোরানপাঠরত অবস্থায়। এ শুধু ইসলামের ব্যাপারে সত্য নয়; খ্রীস্টান, হিন্দু এবং অন্যান্য ধর্মের বেলায়ও এ দেখা গেছে। খ্রীস্টধর্মের নির্দেশ আর শিক্ষা-অনুযায়ী আজো কোথাও কোন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় নি। বরং প্রতিটি খ্রীস্টান রাষ্ট্রই খ্রীস্ট-ধর্মের মূর্তিমান প্রতিবাদ। রাম-রাজ্য কথাটাও অর্থহীন, স্রেফ এক স্বপ্ন কল্পনা। রামের দিনেও ভারতে রাম-রাজ্য ছিল না। থাকলে রামায়ণ অন্য ভাবে লিখিত হত;-মহাভারতও। ধর্ম-রাজ্যে কুরুক্ষেত্রের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ ঘটে না। দেখা যেতো না মন্থরা কি কৈকেয়ীর মতো চরিত্র। ঘটত না নারীহরণ (সীতাহরণ স্মরণীয়)। আসলে রাম-রাজ্য বা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র স্রেফ এক ইউটোপিয়া, অবাস্তব এক কল্পরাজ্য।

প্রাচীন কালে সব দেশেই সমাজ ছিল সরল, জটিলতামুক্ত, লোকসংখ্যাও ছিল অত্যন্ত সীমিত। বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগেরও তেমন চাপ ছিল না-তখন। যা সম্ভব হয় নি আজকের দিনে তা সম্ভব এ কল্পনা করাও স্রেফ বাতুলতা। আমাদের দেশে রাজনীতির ক্ষেত্রেও ধর্মের চেয়ে সস্তা আর লোক-ক্ষেপানো শ্লোগান আর নেই। তাই অনেকেই এ শ্লোগানের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। একমাত্র উদ্দেশ্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল। না হয় তাদেরও বুঝতে না পারার কথা নয় -আধুনিক মানুষ আর আধুনিক রাষ্ট্র এখন হাজারো সমস্যায় আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা—আর এ বন্ধন তাবৎ বিশ্ব আর বিশ্ব-সমস্যার সাথে জড়িত। একক আর বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র এখন অকল্পনীয়। যে-রাষ্ট্র অনুন্নত অবস্থায় সকলের পেছনে পড়ে থেকে, সকলের মার খেয়ে খেয়ে, সব সময় অন্য রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী হয়ে বেঁচে থাকতে চায়-তেমন রাষ্ট্র বিচ্ছিন্নভাবে কিছুকাল অস্তিত্ব রক্ষা করলেও করতে পারে। কিন্তু যে-রাষ্ট্র আধুনিক জীবন-জোয়ারে শরিক হয়ে আত্মসম্মান আর আত্মনির্ভরতার সাথে বাঁচতে চায় তার পক্ষে তা সম্ভব নয়। এমন রাষ্ট্রকে বিশ্বজ্ঞানের অংশীদার হতেই হবে-সে জ্ঞানের সঙ্গে যদি ধর্মের বিরোধও থাকে, তা হলেও সে জ্ঞান গ্রহণ না করে উপায় নেই। আধুনিক জীবনের দাবী এত অপ্রতিরোধ্য যে, তাকে অস্বীকার করা মানে কুপমণ্ডুক হয়ে থাকা। পাকিস্তান আর পাকিস্তানীদের, ভাগ্য এমন হোক এ আমরা চাই না।

আধুনিক জ্ঞান ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্র অসম্ভব। আধুনিক জ্ঞানের দুই যুগান্তকারী আবিষ্কার বিবর্তনবাদ ও মাধ্যাকর্ষণ—যা মানুষের হাতে এখন অসাধ্য সাধনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এ সবের সঙ্গে শাস্ত্রের কোন কোন বিধানের যে-বিরোধ নেই তা নয়। বিরোধ আছে বলেই হয়তো কিছুদিন আগে আমাদের এক ধর্মীয় নাম-চিহ্নিত ছাত্র সংস্থা পাকিস্তানের স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচী থেকে ‘বিবর্তনবাদ’ বাদ দেওয়ার দাবী তুলেছিল। একেই বলে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ। ধর্মকে রাজনীতির বিষয় করে তুললে, রাষ্ট্র-জীবনের বহু ক্ষেত্রে এমন অবাঞ্ছিত প্রতিক্রিয়া দেখা দেবেই। ধর্ম বলে: প্রাণীর ছবি তোলা কিংবা আঁকা নিষেধ। রাষ্ট্র বলে: তা ছাড়া হজ করার পাসপোর্ট আমি দেব না। আর আর্ট কলেজ তুলে দিতেও আমি রাজি নই-কারণ আমার শিল্পী আর ডিজাইনারের দরকার। ধর্ম বলে: বেশরা নাচগান নিষেধ। রাষ্ট্র বলে: তাই বলে বুলবুল একাডেমী তুলে দিতে আমি রাজি নই বরং দিতে থাকবো রাষ্ট্রীয় সাহায্য ঐ একাডেমীকে। ওটা উঠে গেলে বিদেশী মেহমানদের আমি দেখাব কি? ধর্ম বলে: মদ হারাম। রাষ্ট্র বলে: আবগারী আয় ত্যাগ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয় বরং আমি আরো বেশী করে লাইসেন্স ইস্যু করবে। তা না হলে আমার উন্নয়ন কাজ বন্ধ থাকবে। ধর্ম বলে: সুদ দেওয়া-নেওয়া হারাম। রাষ্ট্র বলে: আমার আরো ব্যাঙ্ক, আরো লোন চাই। সরকারী লোনের সুদ আরো বাড়াতে চাই আমি। তা ছাড়া রাষ্ট্রীয় বাজেটের দাবী মেটানো সম্ভব নয়। শাস্ত্রীয় বিধি-বিধানের উদার ব্যাখ্যা দিয়েও কোনো কোনো সিনেমা চিত্ৰকে জায়েজ প্রমাণ করা যায় না, তেমনি নামমাত্র বস্ত্রখণ্ড-আঁটা বিদেশী নর্তকীদের নাচ-গানও, যা আমাদের বড় বড় হোটেলের হার-হামেশাই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কই ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্রের দাবীদারেরা তো এসব স্থানে কিংবা মদ-গাঁজার দোকানে অথবা যেখানে প্রতিনিয়ত সুদ দেওয়া-নেওয়া চলছে সে সব ব্যাঙ্কের দুয়ারে গিয়ে পিকেটিং করেন না, দেন না সিনেমা যাত্রীদের বাধা। এরা তো একবারও দাবী করেন নি স্টেট ব্যাঙ্ক তুলে দেওয়া হোক। আসলে এরাও মনে মনে জানেন, শাস্ত্রের চেয়ে রাষ্ট্র অনেক শক্ত। আর নকল ধার্মিকরা সব সময় শক্তের ভক্ত আর নরমের যম।

পৃথিবীতে সবরকম রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়—রাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ইত্যাদি আধুনিক রাজনৈতিক পরিভাষায় যত রকম রাষ্ট্রব্যবস্থার উল্লেখ আছে কোথাও না কোথাও তার নিদর্শন দেখা যায়। কিন্তু কোথাও দেখা যায় না, খুঁজে পাওয়া যায় না ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত। পৃথিবীর কোথাও যা কখনো ঘটে নি, সে অসম্ভব ঘটাতে হবে আমাদের এ পাকিস্তানে। অর্থাৎ এরা পাকিস্তানকে ঠেলে দিতে চান পেছনের দিকে, করতে চান পেছন মুখী, যার পরিণতি আর একটা মধ্য-প্রাচিক রাষ্ট্র। আশ্চর্য, এরা মাঝে মাঝে কায়েদে আজমের দোহাই দিয়ে থাকেন, নিয়ে থাকেন তারও নাম। এঁরা জানেন না যে, কায়েদে আজম প্রচলিত অর্থে ধার্মিক ছিলেন না মোটেও। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে, রাজনৈতিক ভাষণে তিনি কখনো ধর্মের নাম নেন নি। পাক-ভারতে তিনি ছিলেন সবচেয়ে প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ, কথাও বলেছেন সব সময় রাজনীতিবিদদের মতোই। তার পাকিস্তান-আন্দোলনও ছিল পুরোপুরি রাজনীতিভিত্তিক। তাই ইসলামী রাষ্ট্র কথাটা তিনি কখনো ব্যবহার করেন নি। ১৯৪০-এর সুবিখ্যাত লাহোর প্রস্তাবে কোথাও ইসলামী বা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের উল্লেখ নেই। ১৯৪২-এ সিরাজগঞ্জ সম্মেলনে তার সুস্পষ্ট ঘোষণা:

We have repeatedly declared that the cardinal principle and aim of the Muslim League is to safeguard the political rights and status of the Mussalmans of India.
কাজেই-তার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল, ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার- আর স্বার্থরক্ষা। ১৯৪৭-এর ১১ই আগস্ট পাকিস্তান সংবিধান সভায়ও কায়েদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন:

Now, if we want to make this great ‘State of Pakistan happy and prosperous we should wholly and solely concentrate on the well-being of the people, and specially of the masses and the poor.
ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের বিপদ কোথায়, তা তার ভালো করেই জানা ছিল। তাই সে ভাষণেই তিনি বলেছেন:

we should begin to work in that spirit and in course of time all these angularities of the majority and minority communities…will vanish.
তিনি জানতেন হিন্দুদের মধ্যে যেমন নানা সম্প্রদায় ও শ্ৰেণী রয়েছে, তেমনি মুসলমানদের মধ্যেও রয়েছে শিয়া-সুন্নী, আহমদী ইত্যাদি নানা সম্প্রদায় ও নানা মজহাব। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের কথা বললে পরস্পরবিরোধী এ সব অশুভ শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠবেই। তিনি নিজেও ছিলেন পশ্চিমী গণতান্ত্রিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ। তাই পশ্চিমী গণতন্ত্রের আদর্শভূমি গ্রেট বৃটেনের উল্লেখ করে তিনি উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন গ্রেট বৃটেনের মততা:

…in course of time Hindus would cease to be Hindus and Muslims would cease to be Muslims, not in the religious sense, because that is the personal faith of each individual but in the political sense as citizens of the State.
পাকিস্তান রাষ্ট্র-সম্বন্ধে যার ধারণা ও বিশ্বাস এরকম, তেমন মানুষ কি কখনো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের কথা ভাবতে কিংবা বলতে পারেন?

নি এম/ 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71