মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯
মঙ্গলবার, ৮ই শ্রাবণ ১৪২৬
 
 
ধর্ষকদের পৃথিবীতে বেঁচে যে আছি, এই তো অনেক
প্রকাশ: ১০:২৩ am ১৩-০৫-২০১৭ হালনাগাদ: ১০:২৩ am ১৩-০৫-২০১৭
 
 
 


তসলিমা নাসরিন: ঢাকার একটি বিলাসবহুল হোটেলে জন্মদিনের পার্টিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে পাঁচজন যুবক।

ওই পাঁচ ধর্ষকের দুজন মেয়ে দুটোর বন্ধু, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। বন্ধুকে বিশ্বাস করে বন্ধুর আমন্ত্রণে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়েছিল মেয়ে দুটো। ঘটনা শুনে আমার মনে পড়েছে ৯১ সালে লেখা আমার নিমন্ত্রণ নামের ছোট উপন্যাসটির কথা। উপন্যাসে মনসুর নামের এক যুবকের প্রেমে পড়ে শীলা, এক কৌতূহলী কিশোরী। একদিন মনসুর তাকে নিমন্ত্রণ করে তার বাড়িতে। সেজেগুজে উপহার নিয়ে শীলা নিমন্ত্রণ খেতে যায় প্রেমিকের বাড়ি।

সেই বাড়িতে মনসুর তার সাত বন্ধু নিয়ে সারা রাত ধর্ষণ করে শীলাকে। বইটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। অনেক মা-ই তাদের কিশোরী-কন্যাকে নিমন্ত্রণ বইটি কিনে দিয়েছেন পড়ার জন্য। পুরুষদের যেন ওরা সহজে বিশ্বাস না করে। আমার ওই বই পড়ে কজন মেয়ে সচেতন হয়েছে জানি না। পুরুষেরাও ওই বইটি পড়েছে। আদৌ কোনও পুরুষ শুদ্ধ হয়েছে কি?

বইটি জনপ্রিয় হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু বইটি লিখেছি বলে অনেক গালিও খেয়েছি। লোকেরা আমাকে লাঞ্ছিত কম করেনি। ধর্ষণের নৃশংসতা আর বর্বরতার বর্ণনা দিয়েছি বলে আমি ‘নষ্ট মেয়ে’, আমি ‘সেক্স’-এর মতো নিষিদ্ধ বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখেছি, সমাজটাকে নষ্ট করছি, মেয়েদের বিপথে নিচ্ছি। মানুষকে নারী পুরুষের সমান অধিকার সম্পর্কে সচেতন করবো, নষ্ট সমাজকে বদলাবো— এই পণ করেছিলাম। এই পথ বড় কঠিন পথ। কত যে লাঞ্ছনা আমাকে সইতে হয়েছে, কত যে নির্বাসন! তারপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়েও লিখে গেছি। আজও লিখছি।

আজও প্রতিবাদ করছি ধর্ষণ, নির্যাতন, নারী পুরুষের বৈষম্য ইত্যাদির বিরুদ্ধে। মানুষ আমার বই পড়ে সচেতন হলে ভালো লাগে, সার্থক মনে হয় লেখালেখি। আজ চব্বিশ বছর আমি দেশে নেই। আমার বইগুলো মানুষের হাতের নাগালে নেই, প্রকাশকেরা আমার বই ছাপাতে ভয় পান। জানি না, নতুন প্রজন্মের কেউ ‘নিমন্ত্রণ’ পড়েছে কি না।

সমাজের একটি গোষ্ঠী চায় না মেয়েরা সচেতন হোক, ধর্ষণ-বাল্যবিবাহ-নারী নির্যাতনের শিকার না হোক। তাদের মন রক্ষার্থে বিভিন্ন সময়ে যে সরকার এসেছে, আমার বই নিষিদ্ধ করেছে, ওই গোষ্ঠীটির বাহবা পেয়েছে, বিনিময়ে ভোট চেয়েছে। না লিখলে বা প্রতিবাদ না করলে, কেবল নিজের কথা ভাবলে একটি নিরাপদ জীবন আমি পেতাম। আমার বই নিষিদ্ধ করে, আমার কণ্ঠ চেপে ধরে আমার ক্ষতি করছে না ওরা, বরং মানুষের ক্ষতি করছে, সমাজকে পিছিয়ে দিচ্ছে। যে সমাজে নারীবাদী লেখকদের ভুগতে হয়, সেই সমাজে নারীদেরও ভুগতে হয়।

এটা সম্ভবত বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরাও বুঝতে পারেননি। তাই যখন সরকার মৌলবাদীদের সাথে হাত মিলিয়ে আমার বই নিষিদ্ধ করেছে, আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে, নির্বাসন দণ্ড দিয়েছে, তখন বুদ্ধিজীবীরা এটাকে ‘তসলিমার ব্যক্তিগত ব্যাপার’ বলে এড়িয়ে গেছে।

নারীবাদী, প্রতিবাদী লেখক হিসেবে জীবনের এতটা বছর পার করেও আমাকে শুনতে হয়, মেয়েরা নির্যাতিত হচ্ছে, যৌন হেনস্তার শিকার হচ্ছে, ধর্ষিতা হচ্ছে, আত্মহত্যা করছে, আইনের মারপ্যাঁচে বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে দুঃসহ জীবন কাটাচ্ছে। মেয়েরা যেন শিক্ষা এবং স্বনির্ভরতা অর্জন করার জন্য সচেতন হয়, নিজের স্বাধীনতা এবং অধিকারের জন্য সংগ্রাম করার সাহস অর্জন করে— আমি এই উৎসাহই মেয়েদের দিচ্ছি আমার কিশোরী বয়স থেকে।

 

 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক : সুকৃতি কুমার মন্ডল 

 খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

+8801711-98 15 52

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2019 Eibela.Com
Developed by: coder71