মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ২৭শে অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
নারীর শ্লীলতাহানি : বইছে সমালোচনা প্রতিবাদের ঝড়
প্রকাশ: ১১:৫৭ am ১৮-০৪-২০১৫ হালনাগাদ: ১১:৫৭ am ১৮-০৪-২০১৫
 
 
 


পহেলা বৈশাখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রবেশ পথে নারীদের শ্লীলতাহানির ঘটনায় নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় বইছে সর্বত্র। পুলিশের উপস্থিতিতে হাজার হাজার মানুষের সামনে এ ঘটনায় সর্বত্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। ন্যক্কারজনক এই ঘটনার দুই দিন অতিবাহিত হলেও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে না পারায় নিন্দার ঝড় বইছে সারা দেশে। প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন সংগঠন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন অনেকে। 
এ ঘটনায় অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখী করা এবং দায়িত্ব অবহেলার জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন নারী নেত্রী ফরিদা আকতার। তিনি  বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় এ ধরনের ঘটনায় সারাদেশ মর্মাহত। পুলিশের উপস্থিতিতে এ ঘটনায় ঘটায় তাদের মনে ধারণা যে তারা জানে কারা এসব অপকর্ম করছে। তাই উভয়ের বিরুদ্ধে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঘটনার পর বুধবার রাতে পুলিশ বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা সিসি ক্যামেরাগুলোর ফুটেজ দেখে বখাটেদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। যে কোনোভাবে এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। 
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া। পুলিশের উপস্থিতিতে এমন ঘটনায় বৈঠকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে পুলিশের অবহেলার বিষয়, কাউকে আটকের পর ছেড়ে দিয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে ও তদন্তে সহযোগিতার জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলামকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। 
প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখে এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মানবাধিকার নেত্রী সিগমা হুদা।  তিনি  বলেন, ঘটনা ঠেকাতে পুলিশ ব্যবস্থা নেয়নি, অপরদিকে সাধারণ মানুষ যাদের আটক করেছে, তাদের তারা ছেড়ে দিয়েছে। এখন ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ দেখেও তাদের চিহ্নিত করতে পারছে না। এটা হতাশাজনক।
 টিএসসিতে নারীদের যৌন নির্যাতনের সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও। শুক্রবার দুপুরে রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, নিপীড়নকারীদের হাতে ধরিয়ে দিল আর আপনারা ছেড়ে দিলেন। পুলিশ মিডিয়াতে বলল নির্দেশনা নেই। এ অজুহাত সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও ভিত্তিহীন। এ ঘটনা যারা ঘটিয়েছে সে যেই হোক, যারাই হোক তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। 
এদিকে, বাংলা বর্ষবরণে দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাকায় কয়েকজন নারীকে যৌন হয়রানির ঘটনায় কেনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। 
বিচারপতি কাজী রেজা -উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল দেন। রুলে স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার ও রমনা বিভাগের উপকমিশনার, শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
শাহবাগে মামলা:
বর্ষবরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তরুণীকে বিবস্ত্র ও নারীদের যৌন নিপীড়নের ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে একটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ।
বুধবার রাতে রাজধানীর শাহবাগ থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের এডিসি মোহাম্মদ ইব্রাহিম তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, ওই ঘটনায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে পুলিশ বাদী হয়ে মামলাটি করেছে।

ঢাবিও ব্যবস্থা নেবে :
পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় যৌন নিপীড়নের অভিযোগে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে৷ তবে সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে আসামি করা হয়নি৷ পুলিশ বলছে, তারা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ধরে অপরাধীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন৷ ' এর আগে-পরে সেখানে আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটে বলে জানান তিনি৷ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আমজাদ আলী বৃহস্পতিবার  বলেন, ‘‘বেশ কয়েকজনকে শ্লীলতাহানির কথা শুনেছি৷ পুলিশকে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে৷ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশকে পহেলা বৈশাখ বিকেল ৪টার মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেট বন্ধ করার কথা বলা হলেও সেটা করা হয়নি৷''তিনি বলেন, ‘‘পুলিশের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও ঘটনাটির তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তারা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ হন তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে৷ আর পুলিশের ফৌজদারী ব্যবস্থা তো আছেই৷''
তবে এর আগে মঙ্গলবার রাতে তিনি বিষয়টি আমলে নেননি বলে ছাত্র ইউনিয়ন নেতাদের অভিযোগ৷ আর তখন পুলিশ জানিয়েছিল তারা যৌন হয়রানির কোন অভিযোগ পাননি৷
ব্যাপক সমালোচনার পর বুধবার রাতে শাহবাগ থানা পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে৷ নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে দায়ের করা ওই মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে৷
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম সরকার  বলেন, ‘‘দু'একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার খবর আমাদের কাছে এসেছে৷ সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে জড়িতদের শনাক্ত করতে রমনা বিভাগের পুলিশকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে৷'' তিনি জানান, ‘‘যেহেতু সরাসরি অভিযোগকারী কাউকে এখনো পাওয়া যায়নি তাই পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করেছে৷''
‘সন্ধ্যা ৬টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত একদল যুবক কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে নারীদের লাঞ্ছিত করে’
নিপীড়নের শিকার নারীদের বাঁচাতে গিয়ে আহত ঢাবি শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লিটন নন্দী  বলেন, ‘‘ঘটনার পর রাতেই আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেছি৷ কিন্তু প্রক্টর বিষয়টিকে কোন গুরুত্বই দেয়নি৷ আর পুলিশ ঘটনাস্থলে থাকার পরও সক্রিয় হয়নি৷ হলে অপরাধীরা ধরা পড়ত এবং নারীরা নিপীড়নের হাত থেকেও বাঁচত৷''
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক  বলেন, ‘‘‘যা ঘটেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক৷ আমাদের কোন ছাত্র বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ যদি এই ঘটনায় চিহ্নিত হয়, দায়ী হয় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে৷''

 হাইকোর্টের রুল :

বাংলা বর্ষবরণ উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তরুণীদের যৌন হয়রানির ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী ১৭ মের মধ্যে এই ঘটনা তদন্ত করে সর্বোচ্চ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে পুলিশের মহাপরিদর্শক ও ঢাবি ভিসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ বৃহস্পতিবার এ রুল দেন।
এ প্রসঙ্গে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাপস কুমার বিশ্বাস  বলেন, নববর্ষের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে যৌন হয়রানির শিকার হন কয়েকজন নারী। আজ কয়েকটি দৈনিকে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনেন দুজন নারী আইনজীবী। পরে আদালত রুলে জানতে চান, এ ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার, পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার, শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ঘটনা তদন্ত করে ১৭ মে তারিখের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আইজিপি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
 ছবি সিসি ক্যামেরায় :
একদল তরুণ বারবার মেয়েদের ঘিরে ধরছে। ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি করছে তারা। পলা বৈশাখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) উল্টো দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটকের সামনের রাস্তার দৃশ্য এটি। পুলিশের বসানো ৫ নম্বর সিসি ক্যামেরায় সন্ধ্যা ৬টা ২২ মিনিট থেকে ৭টা ২২ মিনিট পর্যন্ত ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে এ রকম অন্তত ১০টি দৃশ্য ধরা পড়েছে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অন্তত চারজনকে শনাক্ত করা গেছে, যারা ওই জায়গার মধ্যেই ঘুরছে-ফিরছে, ঠেলাঠেলি করে জটলা তৈরি করছে, মেয়েদের ঘিরে ধরছে। এই চার তরুণের প্রত্যেকের মুখে একই ধরনের চাপদাড়ি রয়েছে। এদের হামলা থেকে রক্ষা পায়নি বয়স্ক নারী ও শিশুরাও। ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী ফুটেজ দেখে বলেন, তাঁর মনে হয়েছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে।
ফুটেজে দেখা যায়, ওই তরুণরা মেয়েদের ঘিরে ধরছিল। ভিড়ের কারণে যে এ রকমটা হয়নি, তা ফুটেজে স্পষ্ট। বৃত্তের মাঝে কী হচ্ছিল, তা ফুটেজে বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু বের হয়ে ওই নারীদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে তাঁরা নিগৃহীত হয়েছেন। ওই সব ফুটেজে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি লিটন নন্দীকে ওই তরুণদের সঙ্গে মারামারি করতে দেখা যায়। সন্ধ্যা ৭টার পরে দৃশ্যপটে পুলিশ আসে। লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এর পরই ওই এলাকায় ভিড় হালকা হয়ে আসে। যানবাহনও চলাচল শুরু করে। লাঠিপেটার পর ওই তরুণদের একজনকে ঘটনাস্থলে ঘুরতে দেখা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দুপুরের পর থেকেই টিএসসি হয়ে যান চলাচল শুরু করে। ভিড়ের মধ্যে রিকশা, গাড়ি, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা বাড়তি চাপ তৈরি করে। ফুটেজেও এসব যানবাহন চলতে দেখা গেছে। ফুটেজ বিশ্লেষণ: সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট থেকে ৬টা ৩৩ মিনিট পর্যন্ত এ রকম ভিড়ের মধ্যে ওই তরুণদের অন্তত তিনজন নারীকে ঘিরে ধরে ধাক্কাধাক্কি করতে দেখা যায়। ৬টা ৩৮ মিনিটে ধাক্কাধাক্কির মাত্রা বেড়ে যায়। পথচলতি পাঁচটি মোটরসাইকেল আরোহীও ভিড়ে পড়েন। ৬টা ৪৩ মিনিটের দিকে একাকী একটি মেয়েকে রাজু ভাস্কর্যের দিকে যেতে দেখা যায়। কিন্তু তাঁকে চারদিক থেকে কয়েকজন ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে মেয়েটি ঘুরে দাঁড়িয়ে তরুণদের সঙ্গে হাত নাড়িয়ে কথা বলতে শুরু করেন। দেখে মনে হয়েছে তিনি এর প্রতিবাদ করছিলেন।
সন্ধ্যা ৬টা ৫১ মিনিটে ওই তরুণদের পর পর দুটি মেয়েকে ঘিরে ধরতে দেখা যায়। এ সময় ছাত্র ইউনিয়ন নেতা লিটন নন্দীসহ কয়েকজনকে হামলাকারীদের সঙ্গে মারামারি করতে দেখা যায়। সেখানেও কয়েকজন তরুণ ছিল। পরে কয়েকজন দুই তরুণীর একজনকে উদ্ধার করে নিয়ে যান। জানতে চাইলে লিটন নন্দী বলেন, তিনি ওই ফুটেজটি দেখেছেন। ওই ক্যামেরার আওতার বাইরে দক্ষিণ পাশে কিছুক্ষণ আগে আরও একটি ঘটনা ঘটে। সেখানে এক তরুণীকে প্রায় বিবস্ত্র করা হয়। ওই তরুণীকে লিটন তাঁর পাঞ্জাবি দিয়ে ঢেকে রিকশায় করে তরুণীর সঙ্গীসহ রোকেয়া হল পর্যন্ত এগিয়ে দেন। পরে পাঞ্জাবি ফিরিয়ে নেন। তিনি বলেন, শুরু থেকেই বলছি, একটা সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে এ কাজ করছে। ওই তরুণদের বিষয়ে জানতে চাইলে লিটন বলেন, অনেকের সঙ্গে সেখানে তাদেরও দেখেছেন তিনি। সন্ধ্যা ৬টা ৫৬ মিনিট থেকে ৬টা ৫৮ মিনিট পর্যন্ত এ রকম আরও কয়েকটি প্রচণ্ড ঠেলাঠেলির দৃশ্য দেখা যায়। ওই তরুণদের একটি মোটরসাইকেল আটকাতে দেখা যায়। যেখানে চালকের পেছনে একজন নারী আরোহীও ছিলেন।
সন্ধ্যা ৭টা ৫ মিনিটে দেখা যায়, শাড়ি পরা দুজন নারী ভিড়ের মধ্যে হাঁটছেন। একজন চশমা পরিহিত মধ্য বয়স, আরেকজন কম বয়স্ক। হঠাৎ সাত-আটজনের একটি দল তাঁদের ঘিরে ধরল। দুই নারীর মাথা যেন তরুণদের বৃত্তের মধ্যে ডুবে গেল। কিছু সময় পরে দেখা গেল, কম বয়সের মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে আছেন বয়স্ক নারীটি। পোশাক ঠিক করে দিচ্ছেন। সন্ধ্যা ৭টা ৭ মিনিটে দেখা গেল, হামলাকারীরা চারটি মেয়েকে একসঙ্গে ঘিরে ধরে। যাদের দুজন একেবারেই শিশু। ফুটেজে দেখা যায়, ওই নারীদের তরুণরা ঘিরে ধরে প্রায় পিষে ফেলার উপক্রম করেছিল। ওই সময়ই একদল পুলিশ এসে লাঠিপেটা করে ওই নারীদের উদ্ধার করে। একজনকে পুলিশের কয়েকজন মিলে ঘিরে ধরে বেদম পিটুনি দেয়। দুই যুবক ওই চার নারীকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।বখাটেদের ছবি ছাপা হবে পত্রিকায় ।

বর্ষবরণে যৌন নিপীড়ন  ।


নববর্ষের উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নারীদের ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনায় চিহ্নিত বখাটেদের ধরতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অচিরেই তাদের নোংরা ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হবে। এই ঘটনা তদন্তে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ইব্রাহিম ফাতেমীকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পুলিশ। পুরো বিষয়টি নিয়ে গতকাল শুক্রবার ডিএমপি সদর দপ্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ও প্রক্টর এএম আমজাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া।
এ ব্যাপারে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া সমকালকে বলেন, ঢাবি ক্যাম্পাসের ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তদন্ত হচ্ছে। কারা, কী কারণে এই ঘটনায় সম্পৃক্ত তা বের করা হবে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে অভিযুক্তদের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হবে। এরই মধ্যে সিসিটিভির ফুটেজ পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে একজন যে মাত্রায় অভিযোগ করেছেন, ফুটেজে সে ধরনের কিছু পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনা হালকাভাবে নেওয়া হয়নি। এ ব্যাপারে পুলিশ বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি থাকলে তদন্ত কমিটি খুঁজে বের করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এএম আমজাদ  বলেন, এরই মধ্যে সিসিটিভির ফুটেজ দেখে কয়েকজন বখাটেকে শনাক্ত করা গেছে। তাদের মধ্যে একজনকে মূল হোতা বলে মনে হচ্ছে। শ্মশ্রুমণ্ডিত ওই যুবকের চোখে চশমা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে চিহ্নিতদের ছবি সাঁটানো হবে।
দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সিসিটিভির ফুটেজে এক যুবককে দেখা গেছে, যিনি খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে নারীদের আশপাশে ঘোরাঘুরি করছিলেন। একাধিকবার স্পটে ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিতে তাকে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। নববর্ষের ভিড়ে টিএসসি এলাকায় যেখানে বেশি সংখ্যক নারী ছিলেন সেখানেই তিনি এলোমেলো ঘুরতে থাকেন। নারী দর্শনার্থীদের সঙ্গে আসা কয়েকজন পুরুষ সহকর্মীকে ওই যুবক ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা মারতে থাকেন। সিসিটিভির ফুটেজ থেকে ওই যুবকসহ কয়েকজন বখাটের স্থির ছবি নেওয়া হয়েছে। ১৩ এপ্রিল থেকে ঢাবি ক্যাম্পাসে স্টিকারযুক্ত যানবাহন ছাড়া অন্যান্য গাড়ি ঢুকতে নিষেধ ছিল। ক্যাম্পাস এলাকায় ভ্রাম্যমাণ দোকানপাটের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করতেও বলা হয়। এসব বিষয় সঠিকভাবে পালন করা হয়েছে কি-না তা খতিয়ে দেখা হবে। এমনকি কোনো গ্রুপ বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলভাবে অতিরঞ্জিত করেছে কি-না তাও তদন্ত কমিটিকে খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়।পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ঢাবি ক্যাম্পাসের ঘটনা খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত কমিশনার ইব্রাহিম ফাতেমীকে প্রধান করে গঠিত তিন সদস্যের কমিটির অন্য দু'জন হলেন_ জয়েন্ট কমিশনার ওয়াই এম বেলালুর রহমান ও ডিবির ডিসি (পূর্ব) জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, গণমাধ্যমে ছবি প্রকাশ পেলে হয়তো অনেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ধরিয়ে দিতে সহায়তা করবে। প্রয়োজনে তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হবে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লিটন নন্দী জানান, মঙ্গলবার টিএসসি এলাকায় সন্ধ্যা ৬টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত একদল যুবক কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে নারীদের লাঞ্ছিত করে। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ জানার পরও আমলে নেয়নি। ক্যাম্পাসে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। ঘটনা তদন্ত করে ১৭ মের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশ মহাপরিদর্শক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

যৌন সন্ত্রাসীদের খুঁজতে ১২ ঘণ্টার ভিডিও ফুটেজ :
পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণের দিন নারীদের লাঞ্ছনাকারী অপরাধী চক্রের সদস্যরা তিন দিনেও সনাক্ত হয়নি। তবে সেদিনে ঘটনাস্থলের আশপাশের সব ভিডিও ফুটেজ দেখে অপরাধীদের সনাক্ত করার চেষ্টা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
তথ্য রয়েছে, ওই ঘটনায় জড়িতরা আগে থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় কেন্দ্রিক বখাটেপনায় সক্রিয় ছিল। ইভটিজিংয়ের পাশাপাশি তারা ছিনতাই, চুরি, বোমা হামলা, মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ত। তবে ঘৃণ্য অপকর্ম করে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। এমনকি হাতের নাগালে পেয়েও তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। এর ফলে ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে পুলিশ। এখন  তাদের গ্রেপ্তারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে পুলিশ সদস্যরা।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানীর শাহবাগ, রমনা থানা এলাকা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দি উদ্যানসহ সব স্পর্শকাতর স্থান সিসি ক্যামেরার আওতায় ছিল। সিসি ক্যামেরা ছিল টিএসসি সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের গেটেও। সেখানেই একদল যুবক নারীদের যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটায়। ওই ঘটনায় শাহাবাগ থানায় মামলা হয়েছে এবং আদালত রুল জারি করেছে। তবে গত তিন দিনেও ঘটনায় জড়িতদের সনাক্ত করা যায়নি। এ নিয়ে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে সাধারণ মানুষের মনে।
এদিকে, জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রতিবাদ অন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা।
গত তিন দিনের তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে মামলার তদারককারী কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. ইব্রাহিম ফাতেমী বলেন, ‘পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক বর্ষবরণ অনুষ্টানের ১২ ঘন্টার ভিডিও ফুটেজ যাচাই বাছাই চলছে। টিএসসি কেন্দ্রিক যতগুলো ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ছিল তার সবগুলো সংগ্রহ করে নারী উত্যক্তকারীদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে।  সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজে ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড়ের মধ্যে ধাক্কা-ধাক্কির চিত্র দেখা গেলেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে সেদিন যারা নারীদের হেনেস্থা করার চেষ্টা করেছে তাদেরকে এখনও সনাক্ত করা যায়নি।’
পুলিশ সূত্র জানায়, পহেলা বৈশাখের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ এলাকা ছিল সিসিটিভির (ক্যামেরা) আওতায়। নারী নির্যাতনের ঘটনার পর সেসব সিসি ক্যামেরা সংগ্রহ করা হয়েছে।  ভিডিও ফুটেজ দেখে অনেক ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে কিছু ভিডিওতে মানুষের ভিড়ের মধ্যে নারীদের ধাক্কা দেওয়ার চিত্র মিলেছে। কিছু ভিডিওতে সন্দেহভাজন উচ্ছৃঙ্খল যুবকদের নানান অপকর্মের চিত্র ধরা পড়েছে। আবার সোহরাওয়ার্দি উদ্যান কেন্দ্রিক কিছু ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, অসংখ্য মানুষের ভিড়ের মধ্যে কিছু পাঞ্জাবি জিন্স পরা কিশোর ও যুবক পেছন থেকে সামনের লোকজনকে ধাক্কা দিচ্ছে। কিন্তু ভিডিও ফুটেজে কোনো নরীকে নাজেহাল করার চিত্র এখনও পাওয়া যায়নি। এমনকি পরিকল্পিতভাবে কোনো নারীকে নাজেহাল করার চিত্রও তারা পাননি। তবে সেদিনের ঘটনায় জড়িতদের সম্পর্কে বিভিন্ন সূত্র থেকে বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। সেসব তথ্য যাচাই বাছাই চলছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্র জানায়, ঢাবি ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে পুলিশ। টিএসসি ও বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে রয়েছে তিনটি থানা ও দুটি পুলিশ ফাঁড়ি। এর মধ্যে ক্যাম্পাসে আপরাধীরা ঘুরে বেড়ায়। অথচ পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে না। ক্যাম্পাসে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে ফেরার পথে জনসম্মুখে  চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় মুক্তমনা লেখক ড. অভিজিত রায়কে। সেই সময় ঘটনাস্থলের চারিদিকেই ছিল পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতি। অন্য সাধারণদের মতো পুলিশ বাহিনীও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। সেই ঘটনার প্রায় দুই মাস হতে চলছে। তদন্তকারীরা এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে এমনকি সনাক্ত করতেও পারেনি।

পহেলা বৈশাখের যৌন হয়রানীর ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর এম আমজাদ আলী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশকে পহেলা বৈশাখ বিকেল চারটার পর  সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের গেট বন্ধ করে দিতে বলা হয়েছিল। পুলিশের অবহেলার কারণেই এ ধরনের ঘটনা বার বার ঘটছে। নারী নির্যাতনের ঘটনার তদন্ত চলছে।’
প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখের সন্ধ্যায় টিএসসিতে কতিপয় দুষ্কৃতিকারী বর্ষবরণে আসা নারীদের যৌন হয়রানির চেষ্টা করে। এ ঘটনায় দুষ্কৃতিকারীদের বাধা দিতে গিয়ে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি লিটন নন্দীসহ সংগঠনটির বেশ কয়েকজন কর্মী আহত হন। ঘটনার পর শাহবাগ থানায় পুলিশ বাদি হয়ে একটি মামলা দায়ের করে। হাইকোর্ট  থেকে আগামী ১৯ এপ্রিলর মধ্যে স্বরাষ্ট্র সচিব (আইজিপি) ও রমনা জোনের ডিসিকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়ার পর মহানগর পুলিশের কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার ও যুগ্ম কমিশনাররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও রমনা  জোনে কর্তব্যরত মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।


নারীদের যৌন হয়রানীর ঘটনা ক্যাম্পাসে নতুন নয় :

 ২০০০ সালে থার্টিফার্স্ট নাইটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় একই ধরনের যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছিল। তখনও পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রথমে ঘটনা অস্বীকার করেছিল। একদিন পর সংবাদমাধ্যমে ছবিসহ খবর ছাপা হওয়ার পর মামলা হয় এবং পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঘটনার কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়। পরে সেই নারী নিজেই বাদী হয়ে মামলা করেছিলেন। শত-শত মানুষের সামনে তার শাড়ি টেনে-ছিঁড়ে খুলে ফেলা হয়েছিল।


‘শ্লীলতাহানির ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা অমার্জনীয়’  :
 
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, ‘পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা অমার্জনীয়। শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর ইন্সটিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে নৌকা সমর্থক গোষ্ঠী আয়োজিত চলমান রাজনীতি বিষয়ক আলোচনা সভায় তিনি আরো বলেন, আসামী হাতে ধরিয়ে দিল আর পুলিশ তাদের ছেড়ে দিয়ে মিডিয়াতে বললেন নির্দেশনা নেই। এই অজুহাত সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও ভিত্তিহীন। এই ঘটনা যারা ঘটিয়েছে সে যেই হোক  তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। 
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে শুধু বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে বসে থাকলে হবে না, দায়িত্ব নিতে হবে। ব্যবস্থার বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দিতে হবে। তিনি বলেন,  সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কলুষিত করতে বিএনপি ষড়যন্ত্র করছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে খালেদা জিয়াকে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে বিরত রাখতে হবে। ‘আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটের নিরব বিপ্লব ঘটবে’ মর্মে সম্প্রতি বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বক্তব্যের সমালোচনা করে সুরঞ্জিত বলেন,  ভোট তো হয় প্রকাশ্যে ও উত্সবের মাধ্যমে। এটা নিরব হবে কেন? ভোট সব সময় স্বরবে ও প্রকাশ্যে হয়। তার মানে খালেদা জিয়ার এখানেও কোনো মতলব রয়েছে। এতে মানুষের মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে এটা নিরবে হবে কেন? আবার কি কোন ষড়যন্ত্র আছে? এই নিরব বিপ্লবের আহ্বানে ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, একদিকে বাবা ছেলে এক সঙ্গে নির্বাচনে দাড়িয়েছে। মিরাক্কেল ঘটনার জন্ম দিয়েছে। অপর দিকে ৮ মামলার আসামীকে নিয়ে দাড় করিয়েছেন। সে ভোট করবে নাকি আদলতে যাবেন। অদ্ভুত এক পরিবেশে ভোট হচ্ছে। খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ৩/৪ মাস পরে আবার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরে এসেছেন। তাই ধন্যবাদ। তবে ১৫৩ জন সাধারণ মানুষ পুড়িয়ে মেরেছেন। এটার বিচার হবে। বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। মনে রাখতে হবে বাঘে ধরলে ছাড়ে, শেখ হাসিনা ধরলে ছাড়ে না।
নৌকা সমর্থক গোষ্ঠীর সভাপতি ডা.এমদাদুল হক সেলিমের সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য রাখেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই কানু, সাম্যবাদি দলের নেতা হারুন চৌধুরী প্রমুখ।

জড়িতদের শনাক্তে চেষ্টা চলছে : তদন্তে দুই কমিটি :
 টিএসসিতে নারীকে বিবস্ত্র করে যৌন হয়রানিকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। শনাক্ত হওয়া মাত্রই তাদের গ্রেফতার করা হবে।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুর সোয়া একটায় ডিবি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এমন তথ্য জানান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম।
মনিরুল জানান, এ নিন্দনীয় ঘটনায় ইতোমধ্যেই পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়াও ঘটনার সময় ওই এলাকায় দায়িত্বরত পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিলো কি-না সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব তদন্তে দুইটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ঘটনা তদন্তে মূল ও সহযোগী দুই কমিটিতে রয়েছেন ৫ জন সদস্য। মূল কমিটিতে রয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) এডিশনাল কমিশনার ইব্রাহীম ফাতেমী (ক্রাইম এন্ড অপস্), যুগ্ম কমিশনার (লজিস্টিক) এবং পূর্ব বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ডিবি। তাদের তদন্তের কাজে সহায়তা করবেন রমনা জোনের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এবং সহকারী পুলিশ কমিশনার শিবলী নোমান (রমনা জোন)।

নারী লাঞ্ছনাকারীরা দেশের শত্রু :
 নারী লাঞ্ছনাকারীরা দেশের শত্রু  বলে মন্তব্য করেছেন তথ্যমন্ত্রী ও জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু। 
শনিবার (১৮ এপ্রিল) কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট অডিটরিয়ামে আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। 
বাংলা নববর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নারীদের শ্লীলতাহানি বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, নারীদের বিদ্যাজর্নে বাধা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে বাধা জঙ্গি ও তালেবানি চক্রান্ত। আমরা এই ধরনের দুষ্কর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব।
তিনি আরো বলেন, তারা সাংস্কৃতিক ধারা ধ্বংস ও বন্ধ করে দিতে এ কাজ করেছে। রাষ্ট্র এবং সরকার আইনগতভাবে এদের দমন করবে।
এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন জেলা জাসদের সভাপতি গোলাম মহসিন, সাংগঠনিক সম্পাদক অসিত সিংহ রায় প্রমুখ।

 যৌন হয়রানির তথ্যপ্রমাণ দেওয়ার আহ্বান :
বাংলা নববর্ষে কয়েকজন নারীকে লাঞ্চিত করার অভিযোগের ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটি তথ্য প্রমাণ দেয়ার জন্য জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মঙ্গলবার কয়েকজন নারীকে লাঞ্চিত করার এই ঘটনার বিচারের দাবিতে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ তুলে বলেছে, ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, তদন্ত শুরু হয়েছে এবং যথাযথ তদন্ত হবে। এই ঘটনায় এখনও কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একজন উপ-উপাচার্যের নেতৃত্বে একটি কমিটি রয়েছে। সেই কমিটি বলেছে, বাংলা নববর্ষে কয়েকজন নারীকে লাঞ্চিত করার অভিযোগ ওঠার তিনদিন পরও তাদের কাছে কোন অভিযোগ আসেনি।
গণমাধ্যমের খবরের ভিত্তিতে এই কমিটি তথ্য প্রমাণ দিয়ে সহায়তা করার জন্য প্রত্যক্ষদর্শীসহ সর্বসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কমিটির প্রধান অধ্যাপক নাসরিন আহমাদ বলেছেন, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা এবং তথ্যপ্রমাণ পেলে, তাদের তদন্ত এগিয়ে নিতে সুবিধা হবে। সে কারণে তারা সকলের সহযোগিতা চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন।
বাংলা নববর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সন্ধ্যার আগে দেড় ঘন্টা সময় ধরে কয়েকজন নারীকে লাঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে।
বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন প্রথমে এই অভিযোগ তুলে ঘটনার বিচারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে।
নারী অধিকার সংগঠনগুলো ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে আন্দোলন করছে :
এই সংগঠনের সভাপতি লিটন নন্দী দাবি করেন, তিনি এবং তার সংগঠনের কয়েকজন নেতা কর্মী ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকজন নারীকে উদ্ধার করেন।
শুক্রবার ঢাকায় ছাত্র ইউনিয়নের এক সমাবেশ থেকে লিটন নন্দী অভিযোগ করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে।
লিটন নন্দীর বক্তব্য হচ্ছে, “ঘটনাস্থলে পুলিশের কয়েকটি সিসিটিভি থাকলেও তারা বলছে, এ ধরণের কিছু ঘটার ছবি পাওয়া যায়নি। অথচ সংবাদ মাধ্যমে ছবি প্রকাশ হয়েছে।”
ঘটনাটি নিয়ে গণমাধ্যম এবং ফেসবুকসহ সামাজিক নেটওয়ার্কে সমালোচনা চলছে। নারী অধিকার নিয়ে কাজ করে, এমন সংগঠনগুলোও এখন ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচারের দাবিতে আন্দোলন করছে।
এদিকে পুলিশ মামলা করলেও এখনও কেউ গ্রেফতার হয়নি।
ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, তদন্ত শুরু হয়েছে এবং যথাযথ তদন্ত হবে।
বিষয়টি আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট স্বত:প্রণোদিত হয়ে স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়, পুলিশ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে।

যৌন হয়রানির সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি বি এনপির :
 পহেলা বৈশাখে শহীদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যাদের গেট ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে বিএনপি। 
শনিবার (১৮ এপ্রিল) বেলা ৩টায় নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান বিএনপির দফতরের দায়িত্বে থাকা আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন। 
তিনি বলেন, যতটুকু শুনেছি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটের সামনের ঘটনায় পুলিশ যাদের আটক করেছিলো পরে তাদের সরকার দলের সমর্থক হওয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে।  
তিনি এও বলেন, অনির্বাচিত সরকারের অধীনে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ তারাই তো গণতন্ত্রের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে জোর করে ক্ষমতায় এসেছেন। তারা তো নিজের বিচারই করতে পারে না, আবার অন্যের বিচার করবে কিভাবে। 
সরকার দলীয় এরকম জঘন্য ক্যাডারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান আসাদুজ্জামান রিপন। তিনি বলেন, বিএনপি এখন ক্ষমতায় নেই। বিএনপি যদি ক্ষমতায় থাকতো এ অপারধীদের অবিলেম্বে গ্রেফতার করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনা হতো।  এ সকল ঘটনায় তিনি দেশের নারী সমাজের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71