রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮
রবিবার, ৪ঠা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
নাসিরনগরের ময়নাতদন্ত
প্রকাশ: ০৩:১৭ pm ২৪-০১-২০১৭ হালনাগাদ: ০৩:১৭ pm ২৪-০১-২০১৭
 
 
 


ব্রাহ্মণবাড়িয়া : আড়াই মাস পরে ১৭ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের আলোচিত রসরাজ দাস জামিনে মুক্ত হলেন।

২৯ অক্টোবর রসরাজ গ্রেফতার হয়েছিলেন।পরদিন রসরাজের কথিত ফেসবুক পোস্টে পবিত্র কাবা শরিফের অবমাননাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে ১৫টি মন্দিরসহ হিন্দুদের শতাধিক বাড়িঘরে ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছিল।

এর আগে বছরখানেকের মধ্যেই একইভাবে কক্সবাজারের রামুতেও কথিত ধর্মীয় অবমাননার পোস্টকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মন্দিরে ভাংচুরের ঘটনা সংগঠিত হয়েছিল।দুঃখজনক হলেও সত্য, দুটি ঘটনাতেই অভিযুক্ত দু'জন নিরীহ গরিব মানুষ এর শিকার হয়েছেন।

ঘটনার পরপরই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে রসরাজ যে পরিস্থিতির শিকার এবং এই ঘটনার সঙ্গে তার মতো নিরীহ মানুষ সংযুক্ত থাকতে পারে না, বিষয়টি আলোচিত হওয়া সত্ত্বেও জামিন পেতে আড়াই মাস সময় লাগল! প্রকাশ্যে বাংলাদেশের বিষয়টি সারাদেশে আলোচিত। সরকারকে এক ধরনের অস্বস্তি ও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে নাসিরনগরের ঘটনা।

এর মধ্যে ঘটনা নিয়ে নানাবিধ সংবাদ পর্যালোচনাসহ বিভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণে এক ধরনের অস্বস্তি ও ধোঁয়াশে পরিবেশেরও সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পরপরই সাংবাদিকদের সঙ্গে স্থানীয় সাংসদ সায়েদুল হকের বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য বিষয়টিকে নিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দেয়।

আবার কিছুদিন পরে বিভিন্ন পত্রিকায় স্থানীয় সাংসদ সায়েদুল হক ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের মধ্যে দ্বন্দ্বের নানাবিধ সংবাদে ঘটনাটিকে অনেকে স্থানীয় কোন্দলের ফল বলেও প্রকাশ করেন। এতে সার্বিকভাবে দেশের অসাম্প্রদায়িক জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় আশাবাদী বা ভরসার জায়গা রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রতি এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি করারও প্রয়াস চালানো হয়েছে। যারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সম্পর্কে নূ্যনতম খোঁজখবর রাখেন তাদের এ কথা অজানা নয়, এ জেলা এক সময়ে আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জায়গা ছিল।

অদ্বৈত মল্ল বর্মণ, ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ, আয়েত আলী খাঁসহ অসংখ্য গুণী মানুষের জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়া। অবশ্য গত কয়েক বছর ধরে এখানে মৌলবাদীদের নানাবিধ কার্যক্রমের সংবাদে জনগণের মাঝে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রথম শাসনামলে মৌলবাদী নেতা আমিনীর নেতৃত্বে এলাকায় মৌলবাদের বিস্তার, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, পরে আমিনীর সাংসদ হওয়া এবং সর্বশেষ নাসিরনগরে ঘটনার আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে মাদ্রাসাছাত্রদের একটি মিছিল থেকে সুর সাধক আলাউদ্দীন খাঁ সঙ্গীতনিকেতনে হামলা করে আলাউদ্দীন খাঁর ব্যবহার্য ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো ধ্বংস করার ঘটনায় জনগণের মাঝে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে এক ধরনের বিরূপ মনোভাবও রয়েছে।

এর বিপরীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের প্রগতিশীল মানুষদের মৌলবাদী কার্যক্রমকে প্রতিহতের চেষ্টাও জনগণকে আশান্বিত করেছে। এ ধরনের এক বিপরীতমুখী জায়গা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ধোঁয়াশা থাকবে। তাই নাসিরনগরের ঘটনাটি সমগ্র দেশেই সব মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে ভাংচুর, অগি্নসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনার কথিত 'ইন্ধনদাতা' হরিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান আঁখিকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ। ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা মো. সুরুজ আলীকেও গ্রেফতার করেছে।

পুলিশের দাবি, হামলার ঘটনার ভিডিও ফুটেজে সুরুজ আলী জড়িত বলে প্রমাণ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রেও ওই হামলার ঘটনায় তার জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে।অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের গ্রেফতার, রিমান্ড ও আইনের কার্যক্রমকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বরং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার এই অগ্রসরতাকে জনগণের কাছে সরকারের সদিচ্ছার প্রমাণ বলে প্রতীয়মান হবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে ভাংচুর, অগি্নসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ছিল সুপরিকল্পিত। একটি চক্রান্তকারী গোষ্ঠী দেশে অরাজকতা তৈরির জন্য এ ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর দূরদর্শিতার অভাব, উদাসীনতা এবং অবহেলা এ হামলার সুযোগ করে দিয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জেঠাগ্রাম হাফিজিয়া মাদ্রাসার মাওলানা নূর ইসলাম, দাঁত মণ্ডল গ্রামের তাজউদ্দিন আহম্মেদ, ছাফরতলা গ্রামের সবুজ হাজি, গৌর মন্দির এলাকার সাবেক মেম্বার ওলি ও খরকপাড়া গ্রামের ফারুক মোল্লা, পশ্চিমপাড়ার আবেদ আলীর ছেলে রহিমসহ অনেকে চক্রান্তকারী গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে কয়েকটি প্রশ্ন স্থানীয়দের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে।

এক. কথিত অভিযুক্ত রসরাজ যখন পুলিশের কাছে গ্রেফতার; তখন কেন দুটি বিপরীতমুখী সংগঠন আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত ও খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের ব্যানারে বিক্ষোভ-সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হলো? অনুমতি না দিয়ে কি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা যেতো না?

দুই. যখন তারা মাইকিং করছে, জনবল জমায়েত করছে, উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে, তখন প্রশাসনের ভূমিকা কী ছিল? কেন তারা একদম নিষ্ক্রিয় ছিলেন? জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ এর দায় এড়াতে পারে না। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, 'হামলাকারীরা এলাকায় মাইকিং করেছে। এরপরও পর্যাপ্ত পুলিশ ফোর্স না নিয়েই স্থানীয় প্রশাসন তাদের সভা করতে দিয়েছে। ফলে সভায় উস্কানিমূলক কথা বলে মন্দিরে হামলা চালাতে উদ্বুদ্ধ করার সুযোগ হয়েছে।'

দূর বা নিকটবর্তী থেকে স্লোগানে স্লোগানে যখন মানুষ আসছে, ওদের মুখের স্লোগানের ভাষ্য কি প্রশাসন শোনেনি? ওরা যে অপরিচিত বা এই এলাকার মানুষ নয়, তাও কি প্রশাসন টের পায়নি? কেন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কি ঘটনা এত দূর গড়াত? এর দায় কি থানার ওসি এবং ইউএনও মোটেও এড়াতে পারবেন? আদৌ কি ওসি এবং ইউএনওকে বিষয়টির জন্য জবাবদিহির আওতায় আনা হবে?

তিন. কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জেঠাগ্রাম হাফিজিয়া মাদ্রাসার মাওলানা নূর ইসলাম, দাঁত মণ্ডল গ্রামের তাজউদ্দিন আহম্মেদ, ছাফরতলা গ্রামের সবুজ হাজি, গৌর মন্দির এলাকার সাবেক মেম্বার ওলি ও খরকপাড়া গ্রামের ফারুক মোল্লা, পশ্চিমপাড়ার আবেদ আলীর ছেলে রহিমসহ অনেকে চক্রান্তকারী গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। তাদের কি আইনের আওতায় আনা হবে?

সর্বোপরি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ থাকবে, ঘটনার ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে সুরুজ আলীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব ভিডিওতে আরও অনেক অপরাধীর চেহারা আছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হোক। শুধু দলীয় বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়; রাজনীতির বাইরের চোখেও বিবেচনা করা হোক নাসিরনগরের এই ঘটনা।আর তা না হলে পুরো বিষয়টি সরকারে জন্য লেজে-গোবরে পরিণত হবে। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আশা-ভরসার জায়গা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও সরকারের স্বার্থেই সার্বিকভাবে বিষয়টিকে বিবেচনা করতে হবে।

সুত্র : সমকাল

এইবেলাডটকম/এফএআর

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71