বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৪ঠা আশ্বিন ১৪২৫
 
 
নীলিমা রায় চৌধুরী থেকে নীলিমা ইব্রাহিম
প্রকাশ: ০১:৫১ pm ১২-১০-২০১৬ হালনাগাদ: ০১:৫১ pm ১২-১০-২০১৬
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

 কে এই্  নীলিমা ইব্রাহিম ? কি তার পরিচয় আসুন জেনে নেই!

অধ্যাপিকা নীলিমা ইব্রাহিমের "আমি বীরাঙ্গনা বলছি" - এমন একটা প্রামান্য গ্রন্থ যেটা একাধারে কয়েক পৃষ্ঠার বেশী পড়ে যেতে পারাটা সবার জন্য বেদনাদায়ক ও কষ্টকর হয়ে ওঠে। '৭১ এ বাঙালী জাতির সেই গৌরবের মুক্তিযুদ্ধকালে রচিত হয় আমাদের নারীদের উপর হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের এই দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামধারী খুনীদের বর্বর নির্যাতনের ইতিহাস। এইসব নরপশুদের হাতে নির্যাতিত ও শাহাদাত বরনকারী প্রতিটি নারীই জাতি ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে আমার মা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়কালে এই নারীরা অনেকেই আমাদের রক্ষনশীল সমাজের কাছে নিগৃহীত হয়েছেন নানাভাবে। তবে 'সৌভাগ্যবতী' কেউ কেউ আবার নতুন করে ঘর সংসার করতে পেরেছেন। এঁদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ড: নীলিমা ইব্রাহিম পরম মমতায় রচনা করেছিলেন তাঁর কালজয়ী প্রামান্য গ্রন্থ "আমি বীরাঙ্গনা বলছি"। যেখানে ফুটে উঠেছে বীরাঙ্গনাদের উপর ঘটে যাওয়া নারকীয় বর্বরতার বাস্তব কাহিনী। বইটির ভূমিকাতে তিনি লিখেছিলেন - "চরিত্রগুলি ও তাঁদের মন-মানসিকতা, নিপীড়ন, নির্যাতন সবই বস্তুনিষ্ঠ" ।

প্রাতঃস্মরণীয় বেগম রোকেয়ার আলোকিত পথের যাত্রী নীলিমা ইব্রাহিম শিক্ষার আলো জ্বেলেছেন নারী-পুরুষ সবার জন্য। বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া নারীদের শিক্ষিত ও স্বনির্ভর করে গড়ে তুলতে বিশেষ অবদান রেখেছেন।
কর্মজীবনের শুরুতে নীলিমা ইব্রাহিম কলকাতার লরেটো হাউসে লেকচারার (১৯৪৩-৪৪) হিসেবে চাকরি করেন। তারপর দু’বছর (১৯৪৪-৪৫) তিনি ভিক্টোরিয়া ইন্সটিটিউশনের লেকচারার ছিলেন। ১৯৫৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৭২ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। ১৯৭৪-৭৫ সালে তিনি বাংলা একাডেমির অবৈতনিক মহাপরিচালক ছিলেন। তিনি বিধ্বস্ত বাংলা বিভাগকে পুনরুজ্জীবিত করেন। সেই সঙ্গে রোকেয়া হলের প্রভোস্ট এবং বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন। আরো দুটি স্পর্শকাতর বিষয় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তিনি পালন করেন। তাহলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সৈন্য এবং তাদের দালাল রাজাকার, আলবদর, আলশামস, শান্তি কমিটি কর্তৃক অপহৃত, লাঞ্ছিত, নির্যাতিতা হতভাগা অসংখ্য বাঙালি মা-বোন এবং ‘ওয়ার বেবিদের’ পুনর্বাসনের জটিল কাজে হাত দেন।
নীলিমা লেখক হিসেবেও প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তার লেখা, ভাষ্য এবং চিন্তা ঘিরে অনেক সময় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কিন্তু কখনই তিনি তার চিন্তার সঙ্গে আপস করেননি, প্রয়োজনে আদালতে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। আইনি লড়াইয়ে জিতে মাথা উঁচু করে আবারও বেরিয়ে এসেছেন খোলা আলো-হাওয়ায়।

সাহিত্যের অনেক শাখায় বিচরণ ছিল তার। লিখেছেন গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি। অনুবাদও করেছেন। তার একটি বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে : প্রবন্ধ- অগ্নিস্নাত বঙ্গবন্ধুর ভস্মাচ্ছাদিত কন্যা আমি, বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, অতঃপর অমানিশার অন্ধকার, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা প্রসঙ্গ, বাঙালি মানস ও বাংলা সাহিত্য; উপন্যাস- এক পথ দুই বাঁক, কেয়াবন সঞ্চারিণী, বিশ শতকের মেয়ে; গল্পগ্রন্থ- রমনা পার্কে, পারুল, বহ্নিবলয়; নাটক- দুয়ে দুয়ে চার, যে অরণ্যে আলো নেই, রোদ জ্বলা বিকেল; অনুবাদ- এলিনর রুজভেল্ট, কথাশিল্পী জেসম ফেমিনোর কুপার, বস্টনের পথে; ভ্রমণকাহিনি- শাহী এলাকার পথে পথে, আত্মজীবনী- বিন্দু বিসর্গ।

অধ্যাপিকা নীলিমা ইব্রাহিমের "আমি বীরাঙ্গনা বলছি" বইটার একটা ছোট অংশ -

''হঠাৎ অনেক লোকের আনাগোনা,চেঁচামেচি কানে এলো। একজন বাংকারের মুখে উঁকি দিয়ে চিৎকার করলো, কই হ্যায়: ইধার আও। মনে হলো আমরা সব এক সঙ্গে কেঁদে উঠলাম। ঐ ভাষাটা আমাদের নতুন করে আতঙ্কগ্রস্ত করলো। কয়েকজনের মিলিত কন্ঠ এবারে, মা, আপনারা বাইরে আসুন । বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমরা আপনাদের নিতে এসেছি। চিরকালের সাহসী আমি উঠলাম। কিন্তু এতো লোকের সামনে আমি সম্পূর্ণ বিবস্ত্র, উলঙ্গ। দৌড়ে আবার বাংকারে ঢুকতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু যে বলিষ্ঠ কন্ঠ প্রথম আওয়াজ দিয়েছিলো, কোই হ্যায়, সেই বিশাল পুরুষ আমাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে নিজের মাথার পাগড়িটা খুলে আমাকে যতটুকু সম্ভব আবৃত করলেন। . . . . . . . . . আমি ওই অধিনায়ককে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম।''

জন্ম ও শিক্ষা
বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার মূলঘর গ্রামের এক জমিদার পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা প্রফুল্লকুমার রায়চৌধুরী এবং মাতা কুসুমকুমারী দেবী। 
নীলিমা ইব্রাহিম বরাবরই একজন মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল পরীক্ষায় তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তিনি খুলনা করোনেশন বালিকা বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা (১৯৩৫), কলকাতা ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশন থেকে আইএ (১৯৩৭) এবং স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বিএবিটি (১৯৩৯) পাস করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বাংলা বিষয়ে এম.এ (১৯৪৩) পাস করেন। ১৯৪৫ সালে তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম ‘বিহারীলাল মিত্র গবেষণা’ বৃত্তি লাভ করেন। একই বছর তিনি ইন্ডিয়ান আর্মি মেডিকেল কোরের ক্যাপ্টেন ডাক্তার মোহাম্মদ ইব্রাহিমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ঢাকায় স্থায়িভাবে বসবাস করতে থাকেন। দীর্ঘকাল পরে ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমিকায় ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা নাটক’। একই বছর তিনি ঢাকার আলিয়াঁসে ফ্রাঁসেস থেকে ইন্টারমিডিয়েট ইন ফ্রেন্স-এ ডিপ্লোমা লাভ করেন।

পুরস্কার
বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৯)
জয় বাংলা পুরস্কার (১৯৭৩)
মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার (১৯৮৭)
লেখিকা সংঘ পুরস্কার (১৯৮৯)
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী স্মৃতি পদক (১৯৯০)
অনন্য সাহিত্য পদক (১৯৯৬)
বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬)
বঙ্গবন্ধু পুরস্কার (১৯৯৭)
শেরে বাংলা পুরস্কার (১৯৯৭)
থিয়েটার সম্মামনা পদক (১৯৯৮)
একুশে পদক (২০০০)

মৃত্যু
অধ্যাপিকা নীলিমা ইব্রাহিম ২০০২ সালের ১৮ই জুন মৃত্যুবরণ করেন।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71