বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮
বুধবার, ২৮শে অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মৃত্যু রহস্য
প্রকাশ: ০৫:৫৮ pm ১৬-১১-২০১৫ হালনাগাদ: ০৫:৫৮ pm ১৬-১১-২০১৫
 
 
 


অদিতি সরকার
“একজন মহান মানুষকে হত্যা করা সম্ভব কিন্তু তাকে ভয় দেখানো সম্ভব না”

উপরের এই অসাধারণ উক্তিটি নেপোলিয়ান বোনোপার্ট এর। তার সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা না থাকলেও ইতোপূর্বে এই নামটি বহুবার হয়তো শুনে ফেলেছেন।

ইতিহাসের কালজয়ী পুরূষ 
ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ান বোনোপার্ট ১৭৬৯ সালের ১৫ই আগস্ট ফ্রান্সের কর্সিকা দ্বীপের অ্যাজাক্সিউ অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন । কর্সিকা দ্বীপটি পূর্বে জেনোয়া প্রজাতন্ত্রের অধীনে ছিল। পরবর্তীতে দ্বীপটি ফ্রান্সের অধিনস্থ হয়। নেপোলিয়ানের পুর্বপুরুষরা ছিলো ইতালিয়ান তুসকান গোত্রের। সেই থেকে তাকে ইতালিয়ান বংশোদ্ভূত বললেও ভুল বলা হবে না।নেপোলিয়ানের বাবা কার্লো বোনোপার্ট ছিলেন পেশায় একজন উকিল।যেখানে আছে সাহসের কথা, যেখানে আছে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার কথা সেখানেই উঠে এসেছে নেপোলিয়ানের নাম।তিনি ৫’ ৪” সাইজের খুব ছোট মানুষের ছিলেন উচ্চতায় কিন্তু তার অবস্থান কত উঁচুতে সেটা টের পেয়েছেন যারাই তার সান্নিধ্যে এসেছিলেন।নেপোলিয়ন ছিলেন একজন বলদর্পী মানুষ। শৌর্যবীর্য বিবেচনায় তার সাথে শুধু তুলনা চলে মহাবীর আলেক্সান্ডারের কিংবা জুলিয়াস সিজারের।মাত্র ১৬ বছর বয়েসে নেপোলিয়ান সেকেন্ড লেফট্যানেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৭৯৩ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়েসেই নেপোলিয়ান ফরাসী বিপ্লব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। রণক্ষেত্রে দারূণ শৌর্যবীর্য প্রদর্শনের ফলে তাকে বিগ্রেডিয়ার জেনারেল পদ দেয়া হয়। অবশ্য তিনি এর যথেষ্ট যোগ্যতাও রাখতেন সেই বয়েসেই। পরবর্তীতে প্রায় দুই বছর পরে ১৭৯৫ সালে বিদ্রোহের আশঙ্কা দেখা দিলে সমগ্র সেনাবাহিনী পরিচালনার ভার তিনি একাই বহন করেন। এখানেও নেপোলিয়ান যথেষ্ট পারদর্শিতার পরিচয় দেন। তাকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক নেতা হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। ১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ান বোনোপার্ট একটি অভ্যন্তরীণ বিপ্লবের মাধ্যমে প্রথম কনসালরূপে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। এরপরই তিনি একটি সামরিক একনায়ক তন্ত্রের সূত্রপাত ঘটান। তিনি অনেকগুলো যুদ্ধ করেন কিন্তু অল্প কিছু যুদ্ধে হেরে গিয়ে তিনি সিংহাসন ত্যাগে বাধ্য হন। তাকে এলবা দ্বীপে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু তিনি কোনমতে সেখান থেকে পালিয়ে ফ্রান্সে চলে আসেন। এর মধ্যে ১৮ই মে ১৮০৪ থেকে ১১ই এপ্রিল ১৮১৪ পর্যন্ত তিনি ফরাসির সম্রাট ছিলেন  এবং ১৭ই মার্চ ১৮০৪ থেকে তিনি ইতালির অধিপতিও ছিলেন। ১৮১৫ সালের ১৫ই জুলাই তিনি ব্রিটিশদের সাথে বিখ্যাত ওয়ার্টলুর যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন এবং আত্মসমর্পনের পর সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত হন। 

এই মহান বীর ১৮২১ সালের  ৫ ই মে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও রয়েছে এক রহস্য ? আসলেই কি তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছিল ?

মৃত্যু রহস্য:
এমনটি কি ভাবা যায়, তার মতো একজন শক্তিধর মানুষ একদম গতানুগতিক নীরসভাবে দক্ষিণ আটলান্টিকের এক পরিত্যক্ত দ্বীপে পাকস্থলীর ক্যান্সারে মারা গেছেন। বরং ওয়াটারলুর যুদ্ধেই তার মৃত্যু হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক।

১৮১৫ সালের ওয়াটারলুর যুদ্ধে ডিউক অব ওয়েলিংটন পরাজিত করেন নেপোলিয়নকে। এর মধ্য দিয়েই পরিসমাপ্তি ঘটে নেপোলিয়নের সম্রাট-জীবন, সেই সাথে তার তুখোড় সামরিক জীবন। তার এ পরাজয়ের মাধ্যমে বোরবন বংশ ফিরে আসে ফ্রান্সের শাসনক্ষমতায়। তখন নেপোলিয়ন সামনে আসে কয়েকটি বিকল্প। ওয়াটারলুর যুদ্ধে হেরে নেপোলিয়নের সামনে করণীয় সীমিত হয়ে পড়ে। তিনি গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন আমেরিকায় পালিয়ে যেতে। এর আগে তার বড় ভাই জোসেফ পালিয়ে আমেরিকা চলে যান। আবার ভাবেন ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণ করে সাবেক শত্রুদেশ ইংল্যান্ডে সম্মানিত অতিথি ‘ইংলিশ কান্ট্রি স্কোয়াইর’ হিসেবে বাকি দিনগুলো কাটিয়ে দিতে। বোকার মতো তিনি দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেন। ব্রিটিশদের মাটিতে পা রাখার কোনো সুযোগ তার হয়নি। তাকে আটক রাখা হয় পোর্টসমাউথ উপকূলে। এবং সেখান থেকে বন্দী হিসেবে পাঠিয়ে দেয়া হয় সেন্ট হেলেনা দ্বীপে। সেখানে তাকে রাখা হয় লংউড হাউসে। এটি ছিল একটি পুনর্গঠিত জীর্ণ কৃষিভবন। সেখানে নির্বাসনে যাওয়ার সময় তার বয়স ৪৭। নেপোলিয়ন সাথে করে সেন্ট হেলেনায় নিয়ে যান একটা রেটিনিউ, অর্থাৎ অনুচর লোকলষ্করের একটি দল। তার রাজকীয় অনুসারীদের মধ্যে বিশেষত ছয়জন ছিলেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ছয়জনের তিনজন তার পুরো নির্বাসন সময়ে (১৮১৫-১৮২১) তার সাথেই ছিলেন। এরা ছিলেন : তার অনুগত ভৃত্য লুই মার্চান্ড, তার গ্র্যান্ড মার্শাল হেনরি বার্ট্রান্ড এবং তার প্রিন্সিপাল অ্যাডভাইজার কাউন্ট চার্লস ডিমনথলন। বার্ট্রান্ড ও ডিমনথলনের স্ত্রীরাও তাদের সাথে ছিলেন।



মার্চান্ড,বার্ট্রান্ড ও ডিমনথলনের ছবি দেখে বোঝা যায় এরা ছিলেন সুদেহী। বার্ট্রান্ড ও ডিমনথলন ছিলেন অসাধারণ সুন্দর। বাকি তিন উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ চাকর ছিলেন ফ্র্যানসিস্কি চিপরিয়ানি, নেপোলিয়নের সব কাজের কাজী ইমানুয়েল ল্যাসক্যাসেস এবং তার লিটারারি অ্যাডভাইজার গ্যাসপার্ড গোরগার্ড। নির্বাসনের সময়ে সাথে গিয়েছিলেন বেশ ক’জন ডাক্তারও। এর মধ্যে গুরুত্বক্রমে কয়জন হলেন : ব্যারি ওমিয়ারা, ফ্রানসিস্কো অ্যান্টোমার্কি ও আলেক্সান্ডার আর্নট। এসব চরিত্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের কাছে নেপোলিয়নের নির্বাসন ও মৃত্যু সম্পর্কিত রেকর্ড আছে। এদের চারজন মার্চান্ড, বার্ট্রান্ড, ওমিয়ারা ও ডি মনথলন লিখে গেছেন তাদের বিস্তারিত স্মৃতিকথা। অন্যদের কাছ থেকে আমরা পেয়েছি নানা দলিলপত্র, চিঠিপত্র, রিপোর্ট ও নানা পর্যবেক্ষণ। আমরা যদি ধরে নিই নেপোলিয়নের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি, তবে এদের মধ্য থেকেই আমাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে কে নেপোলিয়নের খুনি। আর তাদের পাশে তো নাম আসবেই সেন্ট হেলেনার গভর্নর ও নেপোলিয়নের জেলর স্যার হাডসন লাউই’র।



নেপোলিয়নের দেহে যদি আর্সেনিক প্রয়োগ করা হয়েই থাকে, তবে কে এই বিষ প্রয়োগ করেছিল? আর তার উদ্দেশ্যই বা কী ছিল? একটা বিষয় স্পষ্ট। খুনি যেই হোন, তিনি নেপোলিয়নের পুরো বন্দীত্বের সময়ে সেন্ট হেলেনাতেই ছিলেন। তাহলে খুনির তালিকা থেকে বাদ পড়েন ইমানুয়েল লেসক্যাসেস, তিনি সেন্ট হেলেনা ছাড়েন ১৮১৮ সালে। এর পরের বছর চলে যান জেনারেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্র্যাঙ্কি গোরগার্ড। অতএব তার নামটিও একই কারণে বাদ পড়ে। যেহেতু নেপোলিয়নকে দেখাশোনার জন্য এক ডাক্তার আসতেন আরেকজন যেতেন, অতএব তাদের কোনো একজনকে খুনি বিবেচনা করা যায় না।

এর পর অবশেষে থাকে দু’টি সম্ভাবনা : হাডসন কিংবা নেপোলিয়নের ঘরের কেউ। প্রথম সম্ভাবনা বাস্তব নয়। হাডসন লাউই জেলরের দায়িত্ব বহন করছিলেন। তিনি বার বার চেষ্টা করেছেন ইংরেজদের ঘাড়ে এমন বদনাম যেন না আসে যে, ইংরেজেরা এই বিখ্যাত বন্দিব্যক্তিত্বের প্রতি খারাপ আচরণ করছে। তা ছাড়া ইংরেজেরা ও ইউরোপীয়রা চায়নি নেপোলিয়নের খুনি হিসেবে পরিচিত হতে। তা ছাড়া নেপোলিয়নের কাছে পৌঁছাও ছিল কঠিন। ১৯১৬ সালের পর স্বল্পবাক হাডসন কখনোই নেপোলিয়নের সাথে দেখা পর্যন্ত করেননি। যে ইংলিশ গ্যারিসন নেপোলিয়নের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিল, তারাও খুব কমই তার সাক্ষাতে আসত।

তা হলে নেপোলিয়নের ঘরের কেউ তাকে খুন করার প্রশ্ন আসে। শেষ দিন পর্যন্ত তার সাথে ছিলেন চার ব্যক্তি। প্রথমত, তার অনুগত বিশ্বস্ত ভৃত্য মার্চান্ডকে খুনি ভাবা কঠিন। এরপর সেখানে ছিল বার্ট্রান্ড, গ্র্যান্ড মার্শাল ও তার স্ত্রী। তার স্ত্রী থাকতেন লংউড থেকে এক মাইল দূরে। তখন অবশেষ সম্ভাবনা থাকে কাউন্টেস ডি মনথলন খুনি হওয়ার। ১৮১৯ সালে কাউন্টেস ডি মনথলন তার নবজাতক কন্যা নেপোলিয়ানাকে নিয়ে সেন্ট হেলেনা ছেড়ে যান। কেউ কেউ মনে করেন নেপোলিয়নই নেপোলিয়ানার বাবা।

একটা ধারণা আছে, নেপোলিয়ন ১৮২১ সালের ৫ এপ্রিল মারা যাননি। তিনি সেন্ট হেলেনা থেকে পালিয়ে গেছেন। ধারণাটা অদ্ভুত শোনায়। যেমনটি অদ্ভুত শোনায় হিটলার বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন আর্জেন্টিনার পর্বতাঞ্চলে বললে। বেশ কিছু লেখক, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য থমাস হুইলার অভিমত দিয়েছেন, সেন্ট হেলেনায় বন্দী থাকার প্রথম দিকের বছরগুলোতে নেপোলিয়নের জায়গায় আনা হয় আরেকটি দ্বৈতচরিত্র। হুইলারের বিশ্লেষণ মতে, সার্জেন্ট পিয়েরে রোবিয়াউডকে আনা হয় নেপোলিয়নের জায়গায়। অন্যত্র তিনি পরিচিত ফ্রাঙ্কো ইউজেনি রোনিয়াউডভ নামে। তিনিই সেন্ট হেলেনায় ক্যান্সারে মারা যান। তার লাশই এখন সমাহিত আছে নেপোলিয়নের টম্বে।

১৮৪০ সালের অক্টোবরের দিকে নেপোলিয়নবাদীরা রাজা লুই ফিলিপকে চাপ দেয় সেন্ট হেলেনা থেকে তাদের বীরদের দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য। বিক্ষোভকারীদের চাপে পড়ে লুই ফিলিপ নেপোলিয়নের নির্বাসনের সাথীদের একটি প্রতিনিধিদল পাঠায় সেন্ট হেলেনা থেকে লাশ ফেরত আনার জন্য। এদের মধ্যে যারা জীবিত ও চলনক্ষম ছিলেন তারা এ প্রতিনিধিদলের সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। একমাত্র কাউন্ট ডি মনথলন এ প্রতিনিধিদলের সদস্য হতে পারেননি। ৬৭ বছর বয়সী বার্ট্রান্ডও সে সফরে ছিলেন। তার স্ত্রী ফ্যানি মারা যান ১৮৩৬ সালে। লেসক্যাসেস তখন বৃদ্ধ ও অন্ধ। তার প্রতিনিধিত্ব করেন তার পুত্র ইমানুয়েল, যিনি বালক বয়সে বাবার সাথে লংউডে ছিলেন। চিকিৎসক ব্যারি ওমিয়ারা ও ফ্রানসিসকো অ্যানটোমার্কি কয়েক বছর আগে মারা যাওয়ায় যেতে পারেননি। মধ্যবয়সী বিশ্বস্ত লুই এ প্রতিনিধিদলে ছিলেন। কাউন্ট ডি মনথলরন সে সময়ে জেলে থাকায় যেতে পারেননি।

নেপোলিয়নবিষয়ক শীর্ষস্থানীয় ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞ ড. ডেভিড চ্যান্ডলার জোর দিয়ে বলেছেন, ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নকে খুন করেছেন তার স্বদেশী কাউন্ট ডি মনথলন। তিনি এ ব্যাপারে ৯৯.৯৯ শতাংশ নিশ্চিত বলে ঘোষণা দেন। তার মতে, সেন্ট হেলেনায় নেপোলিয়নের নির্বাসনে যাওয়া আর মৃত্যুর মধ্যবর্তী ছয় বছর সময়ে ধারাবাহিকভাবে তার ওপর আর্সেনিক প্রয়োগ করেছেন কাউন্ট চার্লস ডি মনথলন। তাকে এ নির্বাসন দ্বীপে মনে করা হতো নেপোলিয়নের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু আসলে তিনি কাজ করছিলেন ফরাসি রয়েলিস্টদের আদেশ-নির্দেশে। ফরাসি রাজতন্ত্রীদের ভয় ছিল নেপোলিয়ন আবার ফ্রান্সে ফিরে এসে আরেক বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবে। তার যোগাযোগ ছিল ফরাসি রাজা দশম চার্লসের সাথে। ফরশুফভুদ ও উইডারের মতে, মনথলন তার কাছ থেকেই নেপোলিয়নকে খুন করার আদেশ পেয়েছিলেন। কিন্তু তার এ গোপন যোগাযোগ কোনো কাজে আসেনি। কারণ এই প্রতারক রাজা ১৮৩০ সালে ক্ষমতাচ্যুত হন।

১৮৪০ সালের প্রথম দিকে রাজা লুই ফিলিপ নেপোলিয়নের লাশ প্যারিসে ফিরিয়ে আনবেন কী আনবেন না সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা ভাবছিলেন। ডি মনথলন তখন সংযুক্ত ছিলেন লুই বোনাপার্টের সাথে। লই বোনাপার্টেরই তৃতীয় নেপোলিয়ন হওয়ার কথা। তখন ডি মনথলন তার ইংল্যান্ডের ঘাঁটি থেকে ফ্রান্স আক্রমণের উদ্যোগ নেন। ডি মনথলনের বেশির ভাগ উদ্যোগের মতো এটিও ব্যর্থ হয়। ফ্রান্সের রাজকীয় বাহিনীর হাতে তিনি বন্দী হন। রাজা লুই সরকার তাকে ২০ বছরের শাস্তি দিয়ে কারাগারে পাঠায়। সেন্ট হেলেনায় নির্বাসিতেরা যখন পুনর্মিলনী উৎসবে যোগ দেন, তখন ডি মনথলন তার সাজার মেয়াদ শুরু করেন।

১৮৫০ সালে নেপোলিয়নের ভাইয়ের ছেলে লুই বোনাপার্ট হন তৃতীয় নেপোলিয়ন। অবশ্য বিখ্যাত নেপোলিয়নের ছেলে ছিলেন দ্বিতীয় নেপোলিয়ন। কিন্তু তিনি মাত্র ২১ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে ১৮৩২ সালে মারা যান। ডি মনথলন কখেনা ভালো কখনো খারাপ সম্পর্ক বজায় রেখে চলছিলেন বোনাপার্ট পরিবারের সাথে। তবে তার স্থান হয়নি তৃতীয় নেপোলিয়নের সরকারে। নির্ধারিত ২০ বছর সাজার ছয় বছর ভোগের পর ডি মনথলন বৈশিষ্ট্যহীনভাবে অনেকটা নীরবে মারা যান ১৮৫৩ সালে।

নেপোলিয়ন খুন হয়েছিলেন কি না, তিনি তার খুনি ছিলেন কি না, এ সম্পর্কে তিনি কিছুই বলে যাননি। তার স্মৃতিকথায় এ ব্যাপারে কোনো উল্লেখ নেই, আভাস-ইঙ্গিত নেই। তার স্ত্রীর স্মৃতিচারণে উল্লেখ আছে, তার স্বামীর এ সম্পর্কিত কোনো পরিকল্পনার কথা তিনি জানেন না। অন্য যারা এ সম্পর্কিত স্মৃতিকথা লিখে গেছেন, তারাও ডি মনথলনকে খুনি চিহ্নিত করে কিছু বলেননি। যদি ডি মনথলন নেপোলিয়নের খুনি হিসেবে কোনো লেগ্যাসি রেখে গিয়ে থাকেন, তবে তিনি হবেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত খুনি। আর কারো কারো মতে, তিনি হবেন ইউরোপীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র।

কিংবা তিনি খুন হতে পারতেন কোনো ঈর্ষাপরায়ণ বিদ্রোহীর হাতে। শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণের চেয়ে শত্রুর তলোয়ারের নিচে জীবন দেয়াই ছিল তার জন্য স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা শুনছি, কার্যত দেড় দশকের মতো সময় বীরদর্পে ইউরোপ শাসন করে যাওয়া নেপোলিয়ন একটি পুরোপুরি সিক্ত আধা-সেঁকা অন্ধকার এক ঘরে নির্বাসিত অবস্থায় ধীরে ধীরে নিস্তেজ বিবর্ণ হয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেছেন।এরপর একসময় মারা গেছেন। অন্তত নেপোলিয়নের বেলায় এমনটি অভাবনীয়, সেই সাথে অকল্পনীয়।

সেই কবে ১৮২১ সালে মৃত্যু হয়েছে তাঁর আটলান্টিক মহাসাগরের সেন্ট হেলেনা দ্বীপে।কিন্তু ফেলে আসা ১৯০ বছর  ধরে নেপোলিয়ানের মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক কম হয় নি। এ নিয়ে গল্পও  বানিয়েছেন অনেকে।

কয়েক বছর আগে নেপোলিয়ানের মাথার চুলের রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে তাতে আর্সেনিকের আধিক্য প্রমাণিত হওয়ার পরে অনেকেই নেপোলিয়ানের মৃত্যুর পিছনে এক গভীর রহস্য আছে বলে মনে করছিলেন।

 অনেক বিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিক তাই চুলে আর্সেনিকের আধিক্য প্রমাণিত হওয়ার পরে নেপোলিয়ানের মৃত্যুর পিছনে এই সব ক্ষমতাবান মানুষদের গভীর ষড়যন্ত্র ছিল বলে দাবী করেছেন।

এঁদের মতে বন্দী দশায় খাদ্য ও মদের মাধ্যমে নেপোলিয়ানকে আস্তে আস্তে আর্সেনিক বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছিল। এঁদের বিপক্ষ মতের বিজ্ঞানীরা চুলে আর্সেনিকের আধিক্য অন্য কারণেও হতে পারে বলে মনে করেন। উদাহরণ হিসাবে তাঁরা অনেক চুলের বলকারক ওষুধে কিংবা সাধারণ ওষুধে আর্সেনিকের উপস্থিতির কথা বলেছেন।   

এমন এক বৈচিত্রময় দক্ষ শাসকের মৃত্যুর বিষয় নিয়ে হৈ চৈ হওয়া তাই কোন আশ্চর্য ঘটনা নয়, আবার যখন এই মৃত্যু ছিল বেশ রহস্যে ঘেরা। সম্প্রতি জানা গেছে এই মৃত্যুর কারণ।আরও জানা গেছে কারণটি বহুল প্রচারিত আর্সেনিকের বিষক্রিয়াজনিত নয়। রহস্য উদ্‌ঘাটনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি দল। তাঁরা সাহায্য নিয়েছে সেই সময়ের নেপোলিয়ানের চিকিৎসকের কিছু লেখা, নেপোলিয়ানের পরিবারের রোগের ইতিহাস আর প্রত্যক্ষদর্শীদের কিছু বিবরণ যা সম্প্রতি বিভিন্ন সুত্রে পাওয়া গেছে।

আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় হৃৎপিণ্ডের যে রক্তক্ষরণ হয় তার কোন প্রামাণ্য তথ্য না পাওয়া যাওয়ায় নেপলিয়ানের মৃত্যু কারণ হিসাবে এটিকে বাতিল করা হয়েছে।

বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা সিদ্ধান্তে এসেছেন যে নেপোলিয়ানের মৃত্যু হয়েছিল পাকস্থলীর ক্যান্সারে। এই সিদ্ধান্তে আসার ব্যাপারে তাঁরা পাওয়া কয়েকটি তথ্যকে ভিত্তি করেছেন।

যেমন, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া এবং দানা দানা বস্তুতে ভরা পাকস্থলী যা পাকস্থলীতে রক্তক্ষরণের প্রমাণ দেয় এমনই সব প্রামান্য তথ্য । তাঁরা এইসব নথিকে মিলিয়েছেন ৫০ টি নিরীহ পাকস্থলীর ঘা এবং ৫০ টি পাকস্থলীর ক্যান্সারের বিকারতত্ত্বীয় পর্যবেক্ষণের সঙ্গে।

বর্তমানের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার বিভিন্ন তথ্যকে নেপোলিয়ানের রোগের বিবরণের সঙ্গে মিলিয়ে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাশাস্ত্রের বিজ্ঞানী রবার্ট জেন্টা নেপোলিয়ানের পাকস্থলীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক বড়সড় বস্তুর হদিস পেয়েছেন যা দৈর্ঘ্যে ১০ সেমির চেয়েও বেশী। এই প্রমাণ থেকে জেণ্টা ও তাঁর সহযোগীরা সিদ্ধান্তে এসেছেন যে নেপোলিয়ানের পাকস্থলীর ক্ষত আসলে ছিল ক্যান্সার। তাঁরা তাঁদের এই পর্যবেক্ষণ ‘নেচার ক্লিনিক্যাল প্রাক্টিস গ্যাস্ট্রোএনট্রলজি অ্যান্ড হেপাটোলজি’ নামের বিজ্ঞান গবেষণার পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন।  

বিজ্ঞানী জেন্টার মতে, ৬ বছর বন্দী থাকার সময়ে নেপোলিয়ানের স্বাস্থ্যের এতটাই অবনতি হয়েছিল যে তাঁর পক্ষে নতুন করে পালিয়ে গিয়ে ফরাসী সাম্রাজ্যের দখল নেওয়া সম্ভব ছিল না। কেননা ক্যান্সারের কারণ যাই হোক না কেন, পাকস্থলীর যে ধরণের ক্যান্সার নেপোলিয়ানের হয়েছিল তা হলে বর্তমান কালেও কারও পক্ষে এক বছরের বেশী বাঁচা অসম্ভব।

নেপোলিয়ানের শেষ ক বছরের জীবন ও তাঁর রহস্যে ঘেরা মৃত্যু নিয়ে আলোচনা ও  লেখালেখি হয়েছে বিস্তর। অবশেষে আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে ইতিহাসের এক মহানায়ক নেপোলিয়ানের মৃত্যু রহস্যের যবনিকা পতন হল। অনেক গল্পের শেষে প্রতিষ্ঠিত হল সত্যির। 

এইবেলা
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71