মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ৩রা আশ্বিন ১৪২৫
 
 
পিনাকী ভট্টাচার্যের ‌'বাংলাদেশের ‘হিন্দু মন’ ও তার বিবর্তন' -এর জবাব
প্রকাশ: ১০:৫২ pm ১৮-০৯-২০১৬ হালনাগাদ: ১০:৫২ pm ১৮-০৯-২০১৬
 
 
 


যদুগোপাল চৌধুরী ||

কয়েকদিন আগে পিনাকী ভট্টাচার্যের একটা লেখা পড়লাম। লেখাটির শিরোনাম  “বাংলাদেশের ‘হিন্দু মন’ ও তার বিবর্তন’”। সেখানে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন বাংলাদেশের হিন্দুরা কিভাবে ইসলামবিদ্বেষ লালনপালন করছে তাদের মনে। পিনাকী ভট্টাচার্যের এই লেখাটি সাম্প্রতিককালে লেখা তার অন্য সব লেখার মত হিন্দুবিদ্বেষ উস্কে দেওয়ার মতই। নামে  ভট্টাচার্য হলেও তিনি সে এই যুগের কালাপাহাড়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন তা সবলে দিতে হবে না। তার এই লেখাটি পড়লে ১৯৭১ সালে জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামে একের পর এক উসকানিমূলক লেখার কথা মনে পড়ে যায়। বাংলাদেশের নির্যাতিত প্রান্তিক সংখ্যালঘু হিন্দুদের প্রতি তাঁর কি পরিমাণ বিদ্বেষ লুকিয়ে আছে এই লেখায় ফুটে উঠেছে।

পিনাকী ভট্টাচার্য লিখেছেন, “দেশভাগের পরে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রতিপত্তির হারানোর মানে সাথে সাথে হিন্দুদের সব পুরান বয়ানও হারিয়ে অকেজো হয়ে যায়। তাই নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে টিকে থাকার জন্য সে নতুন বয়ান গঠনের সন্ধানে নামে। আর নিধর্মী এক সমাজের অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে সেই নতুন বয়ানটা সে হাজির করেছিল যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সে হল কমিউনিস্ট পার্টি বা এর নাম আজকের সিপিবি। বিহ্বল অবস্থা কাটানোর জন্য সে আশ্রয় করেছিল কমিউনিস্ট পার্টিকে। পুর্ব বঙ্গে থেকে যাওয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে জমিদারি হারানো পুরনো জমিদার বংশের ছেলেরা ও অভিজাত হিন্দু মধ্যবিত্তরা এই পার্টিতে দলে দলে ঢুকতে থাকে। কমিউনিস্ট রাজনীতির কয়েকজন আইকনকে দেখলেই এই কথার সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যাবে। কমরেড মনি সিংহ, বরুন রায়, ইলা মিত্র, রবি নিয়োগী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, অমল সেন, গুরুদাশ তালুকদার, ধীরেন শীল সহ আরো অসংখ্য নেতার নাম করা যায়, যারা সকলেই প্রত্যক্ষ ভাবে জমিদার এবং একজন নায়েব পরিবারের সন্তান।”

আমার জবাবঃ
পিনাকী ভট্টাচার্যের কথায় গোড়াতেই গলদ রয়েছে। কারণ তিনি উদাহরণ হিসেবে যাদের নাম এনেছেন তাঁরা অগ্নিযুগের সাক্ষী। তাঁরা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন দেশভাগের পূর্বেই।
নিচে উদাহরণ দেখুন,

ইলা মিত্রঃ ইলা সেন যখন বেথুন কলেজে বাংলা সাহিত্যে বি.এ সম্মানের ছাত্রী তখন থেকেই রাজনীতির সাথে পরিচয় ঘটে। নারী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনীতিতে প্রবেশ। সময়টা ছিল ১৯৪৩ সাল, ইলা সেন কলকাতা মহিলা সমিতির সদস্য হলেন। হিন্দু কোড বিলের বিরুদ্ধে ঐ বছরই মহিলা সমিতি আন্দোলন শুরু করে। সমিতির একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। এ সময় তিনি সনাতনপন্থীদের যুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অনেক প্রচার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি নামক সংগঠনের মাধ্যমে নারী আন্দোলনের এই কাজ করতে করতে তিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন। সময়টা ১৯৪৩, দেশভাগের চার বছর পূর্বে।

মণি সিংহঃ ১৯২১ সালে মণি সিংহ মহাত্মা গান্ধীর ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শরিক হন। ১৯২৫ সালে তিনি বামপন্থী রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ হন। এসময় তিনি ময়মনসিংহথেকে কলকাতায় আসেন। কলকাতার মেটেবুরুজে শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করেন। এজন্য ১৯৩০ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাঁচ বছর পর ছাড়া পান, তবে আরো কিছুদিন অন্তরীণ হয়ে থাকতে হয়।

তিনি সুসংয়ে টঙ্ক প্রথার বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন সংগঠিত করেন। আবারো তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, তবে গণদাবীর মুখে ১৯৩৭ সালে মুক্তি পান। ১৯৩৮ সালে (দেশভাগের ৯ বছর পূর্বে)  মণি সিংহ আরো কয়েকজনের সহযোগিতায় ময়মনসিংহ জেলায় কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। পার্টির সাংগঠনিক তৎপরতার ফলে সামন্তবাদবিরোধী আন্দোলনে কৃষকেরা ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হয়। কৃষকদের এই আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৪৬ সালে তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত হয়।

রবি নিয়োগীঃ ১৯৩০ সালে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ময়মনসিংহে সংঘটিত সত্যাগ্রহ আন্দোলনে রবি নিয়োগী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ঐ আন্দোলনের সময় রবি নিয়োগীসহ ১৭ জন রাজনৈতিক কর্মী গ্রেফতার হন। ১৯৩০ সালে মাস্টার’দা সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার  লুণ্ঠনের অব্যবহিত পরে ময়মনসিংহে যুগান্তর দলের যে-কয়জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয় রবি নিয়োগী ছিলেন তাঁদের একজন। ১৯৩১ সালে শেরপুরের ঝিনাইগাতি এলাকায় সালদার জমিদার বাড়িতে যুগান্তর দলের হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে রবি নিয়োগীর সাত বছর কারাদন্ড হয়। তাঁকে প্রথম রাজশাহী জেলে আটক রাখা হয়, এবং পরে একজন বিপজ্জনক বন্দী হিসেবে আন্দামান সেলুলার জেলে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তিনি সাড়ে পাঁচ বছর বন্দীজীবন যাপন করেন। আন্দামান জেলে আটক থাকা অবস্থায়ই রবি নিয়োগী কয়েকজন বিপ্লবীর সাথে সাম্যবাদে দীক্ষিত হন। ১৯৩৭ সালে (দেশভাগের ১০ বছর পূর্বে)  গঠিত অবিভক্ত বাংলার প্রথম সংসদীয় সরকারের আমলে মুক্তি পেয়ে ময়মনসিংহে ফিরে এসে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন।

বরুণ রায়ঃ ২০ বছর বয়সে ১৯৪২ সালে (দেশভাগের ৫ বছর পূর্বে)  ভারতীয় কমিউনিষ্ট পার্টির পূর্ণ সদস্য পদ লাভ করেন।। ১৯৪২ সালে স্বাধীনতা দিবস পালন করার সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়।

হেমাঙ্গ বিশ্বাসঃ হেমাঙ্গ বিশ্বাস বর্তমান বাংলাদেশের সিলেটের মিরাশির বাসিন্দা ছিলেন । হবিগঞ্জ হাইস্কুল থেকে পাশ করার পর তিনি শ্রীহট্ট মুরারিচাঁদ কলেজে ভর্তি হন । সেখানে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন । তিনি ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে (দেশভাগের ১৫বছর পূর্বে)  কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন । ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে কারাবন্দী থাকাকালে তিনি যক্ষারোগে আক্রান্ত হন। তারপর যাদবপুর হাসপাতালে কিছুকাল চিকিৎসাধীন থাকেন এবং সেই কারণে তিনি মুক্তি পান । ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে তেলেঙ্গানা আন্দোলনের সময়ে তিনি গ্রেফতার হন এবং তিন বছর বন্দী থাকেন । পিনাকী গোড়াতেই গলদ করলেন। হেমাং বিশ্বাস তো পূর্ব পাকিস্তানে থাকেন নাই। তিনি ভারতে চলে যান দেশ ভাগের পর।

অমল সেনঃ অমল সেন ১৯১৩ সালের ১৯শে জুলাই নড়াইলের আফরা গ্রামে এক জোতদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩৩ সালে (দেশভাগের ১৪ বছর পূর্বে)   খুলনার বিএল কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হন। ১৯৩৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন।

গুরুদাশ তালুকদারঃ তার সম্পর্কে কিছু খুঁজে পেলাম না। তবে ‘চির প্রেরণার উৎস কমরেড গুরুদাশ তালুকদার’ শীর্ষক লেখায় জানা যায় তিনি ভারত ছাড় আন্দোলনের সময় বাম রাজনীতিতে যোগ দেন। তাও দেশভাগের পূর্বে।


ধীরেন শীলঃ কামাল আজাদের লেখায় পেলাম, “১৯৪০ সালের দিকে চট্টগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টি, নিখিল বঙ্গ ছাত্র ফেডারেশন, কৃষক সভা এবং প্রগতি লেখক সংঘের সংগঠন গড়ে ওঠে। সুখেন্দু দস্তিদার, সুরেণ দে, শচীন নন্দী, পুর্ণেন্দু দস্তিদার, সুধাংশ বিমল দত্ত, শরদিন্দু দস্তিদারের বদৌলতে কক্সবাজার মহকুমায় পার্টির সাথে যোগাযোগ ঘটে। কিন্তু শিক্ষা দীক্ষায় কক্সবাজার অনুন্নত থাকায় জমিদারি জোতদারদের শোষণে তীব্র নির্যাতিত ও শোষিত হতো এই অঞ্চলের জনগণ। তাই কক্সবাজারে ছাত্র ফেড়ারেশনের তেমন একটা ব্যাপ্তিও হতে পারি নি। তবে কুতুবদিয়ার স্বভাব কবি ধীরেন শীল, শহীদ সাবের, চট্টগ্রাম থেকে এসে রামু ও কুতুবদিয়ায় ছাত্র ফেডারেশনের কাজ করতেন। কুতুবদিয়া, চকোরিয়া, রামুতে পার্টির যোগাযোগ ছিলো। তবে কুতুবদিয়া ও চকরিয়ায় কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ফেডারেশন, কৃষক সভার সংগঠন ছিলো বেশ জোরালো। কুতুবদিয়ায় পার্টির সংগঠক ছিলেন অবিভক্ত বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সদস্য স্বভাব কবি ধীরেন শীল।” পিনাকী এবারও ভুল করলেন।

হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে জমিদার বংশের ছেলেরা ও অভিজাত হিন্দু মধ্যবিত্তদের একাংশ বহু আগে থেকে বাম রাজনীতি করত। পিনাকীর এই মিথ্যাচার খণ্ডন করা জরুরী কারণ তিনি পরবর্তীতে লেখার হিন্দু বিদ্বেষের চূড়ান্ত আস্ফালন করেছেন এই প্যারার উপর লিংক রেখে।

জনাব পিনাকী, আপনি আপনার আসল ভাবাদর্শ প্রকাশ করেছেন। তা হল পাকিস্তানী শাসকদের চিন্তাধারা। পাকিস্তানি শাসকরা যেহেতু বিশ্বাস ও আদর্শগতভাবে সামপ্রদায়িক ছিলেন, হিন্দু বিদ্বেষী ছিলেন, তাই মুক্তিযুদ্ধের সময় সমগ্র বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা, ধর্ষণ, আগুন দেয়া লুটপাটের মতো নির্যাতন চালালেও বিশেষ আক্রোশের দৃষ্টিতে তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছে হিন্দুদের। তাদের দৃষ্টিতে হিন্দু, কমিউনিস্ট, আওয়ামী লীগার সমান অপরাধে অপরাধী ছিল। আপনার কাছে হিন্দু আর কমিউনিস্ট মানে এক।

অথচ আপনি ভুলে গিয়েছেন (বা জেনেও ইচ্ছা করে লেখেন নাই) পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টিতে মুসলিমদের ভূমিকাও ছিল।
১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত কলকাতায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুসারে কংগ্রেসে আগত পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা স্বতন্ত্রভাবে এক বৈঠকে মিলিত হয়ে ৯ সদস্যবিশিষ্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করেন। এই কমিটিতে ছিলেন সাজ্জাদ জহির, খোকা রায়, নেপাল নাগ, জামাল উদ্দিন বুখারি, আতা মোহাম্মদ, মণি সিংহ, কৃষ্ণবিনোদ রায় ও মনসুর হাবিবউল্ল্যা। সাজ্জাদ জহির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই ৯ জনের ভিতর ৫ জন মুসলিম, ৪ জন হিন্দু।

 

পিনাকী ভট্টাচার্য লিখেছেন, “ পরবর্তিতে ১৯৫১ সাল থেকে পাকিস্তানে ঘটা ব্যর্থ সামরিক ক্যু এর পরিকল্পনার কারণে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও হিন্দু মধ্যবিত্তের এক বড় প্রভাব ছেয়ে বসতে থাকে কমিউনিস্ট পার্টিতে। সে সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যাপক ভাবে সিপিবি করার পিছনের মনস্তাত্ত্বিক কারণ এটাই।”

আমার কথাঃ ১৯৫৬ সালের আগস্ট মাসে কলকাতায় গোপনে পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির  প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। কংগ্রেস চলেছিলো মোট তিন দিন। এই কংগ্রেসে ১৩ জনের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচন করা হয়। কমিটিতে নির্বাচিত হয়েছিলেন নেপাল নাগ, মণি সিংহ, সুখেন্দু দস্তিদার, আমজাদ হোসেন, মোহাম্মদ তোয়াহা, শহীদুল্লাহ কায়সার, অনিল মুখার্জী, মোজাফফর আহমদ, খোকা রায়, হারুণ অর-রশিদ, বারীন দত্ত, আলতাব আলী এবং সরদার ফজলুল করিম। এখানেও ৬ জন হিন্দু, ৭ জন মুসলিম। আপনার রূপকথা মতে, হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যাপক ভাবে সিপিবি করার কথা থাকলে এখানে হিন্দু সদস্যের সংখ্যা বেশি হত।


পিনাকী ভট্টাচার্য লিখেছেন,  “সারকথায় বললে, সেই থেকে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় ভেবে এসেছে যে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে তার পোষা বিদ্বেষ বিরাগ সেটার একটা ফয়সালা হতে পারে এভাবে যে, “আমরাও দরকার হলে নাস্তিক হয়ে যাই তবুও যদি কমিউনিস্ট হওয়ার বদৌলতে মুসলমান সম্প্রদায় নাস্তিক হয়েও তার ধর্ম থেকে দূরে সরে তাহলে তো লাভই”। পুর্ববঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টিতে নাস্তিকতার ব্যাপক চর্চার এটাও একটা সম্ভাব্য কারণ।”

আমার কথাঃ এটা তো আপনার কথা। রেফারেন্স কই? কমিউনিস্ট পার্টি মাত্রই ধর্মহীন। সোভিয়েত ইউনিয়িওন ছিল নিরীশ্বরবাদী রাষ্ট্র। মুসলিম প্রধান আলবেনিয়া ছিল পৃথিবীর প্রথম এবং একমাত্র নাস্তিক দেশ। 

পৃথিবীর প্রথম নাস্তিক দেশটির আয়ুস্কাল ছিল ১৯৬৭সাল থেকে ১৯৯১সাল পর্যন্ত। সকল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয় আনোয়ার হোজ্জা, আলবেনিয়াকে পৃথিবীর প্রথম নাস্তিক দেশ (এথ্যায়িস্ট স্ট্যাট) সরকারি ভাবে হিসাবে ঘোষনা দেন। এই কাজের পিছনে মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারীরা দায়ী ছিল।

পশ্চিম বাংলার মুসলিম সম্প্রদায় এক সময় সিপিএমের ভোট ব্যাংক ছিল।  তাহলে কি আপনার কথামতে আমি ধরে নিব পশ্চিম বাংলার মুসলিমরা ভেবেছে “আমরাও দরকার হলে নাস্তিক হয়ে যাই তবুও যদি কমিউনিস্ট হওয়ার বদৌলতে হিন্দু সম্প্রদায় নাস্তিক হয়েও তার ধর্ম থেকে দূরে সরে তাহলে তো লাভই” আপনার এই মনগড়া মিথ্যাচার হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়ার জন্য। অথচ পূর্ব বাংলার হিন্দুরা তখন থেকেই আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিল এবং পাকিস্তানীদের দৃষ্টিতে হিন্দু, কমিউনিস্ট, আওয়ামী লীগার সমান অপরাধে অপরাধী ছিল।


পিনাকী ভট্টাচার্য লিখেছেন,  “এই ধারা চলে ১৯৯২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার সময় পর্যন্ত। ষাটের দশকে কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক ভাঙ্গনে ও ১৯৯২ সালের সোভিয়েত রাষ্ট্রের পতনের পরে দুবারই বাংলাদেশের হিন্দুদের বড় অংশই পুনর্গঠিত সিপিবি ঘরানার পক্ষেই থেকে যায়। যদিও পরেরটার ক্ষেত্রে সক্রিয়তার দিক থেকে ব্যাপক হিন্দু হতাশ হয়ে দূরে চলে যায়। তাই এরপরের সময়, ১৯৯২-২০০১ সাল পর্যন্ত এই কয়েকটা বছর ছিল সিপিবির ক্রমাগত ক্ষয়ের যুগ। আর হিন্দু সম্প্রদায় ঐতিহাসিকভাবে এতদিন যেভাবে সিপিবির মাধ্যমে বামপন্থী আন্দোলনে যুক্ত থাকত সেটা থেকে হতাশা ও ক্রম প্রস্থানের যুগ। যদিও অসাম্প্রদায়িকতার নামে তার ইসলাম –বিদ্বেষী অবস্থান সব খানেই ছিল। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়াতে গ্লোবাল কমিউনিজমের আড়ালে ধর্মবিদ্বেষ বা ইসলামবিদ্বেষ চালানোর সুযোগ আর থাকেনা।”

আমার কথাঃ
আবারও মিথ্যাচার।
পিনাকী ভট্টাচার্য প্রমাণ করতে চাইছেন, বাংলাদেশের হিন্দুরাই সিপিবির ধারক বাহক। কিন্তু তিনি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বাংলাদেশের হিন্দুরাই সিপিবির ভোট ব্যাংক হলে তারা নির্বাচনে একটি আসনও জিততে পারে না কেন, অন্তত হিন্দুপ্রধান অঞ্চলগুলোতে? বরং বাংলাদেশের হিন্দুরা ঐতিহাসিকভাবেই আওয়ামী লীগের সমর্থক। সাথে সাথে কিছু অংশ বিএনপি আর জাতীয় পার্টি সমর্থন করে।

কিছু বাংলাদেশী হিন্দু রাজনিতিকদের নাম দিলাম যাদের উত্থান স্বাধীনতার পরেই,
 

  • সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত(সাংসদ,আওয়ামী লীগ)

  • নারায়ণ চন্দ্র চন্দ (সাংসদ ও মন্ত্রী, আওয়ামী লীগ)

  • সুধাংশু শেখর হালদার (প্রয়াত) (আওয়ামী লীগ)

  • সতীশ চন্দ্র রায় (প্রাক্তন সাংসদ, আওয়ামী লীগ)

  • পঞ্চানন বিশ্বাস (প্রাক্তন সাংসদ, আওয়ামী লীগ)

  • গয়েশ্বর চন্দ্র রায় (বিএনপি)

  • গৌতম চক্রবর্তী (বিএনপি)

  • গৌতম কুমার মিত্র (বিএনপি)

  • নিতাই রায় (বিএনপি, পূর্বে জাতীয় পার্টি)

  • বিপ্লব পোদ্দার (বিএনপি)

  • গৌরব কুমার কুন্ডু (বিএনপি)

  • মনোরঞ্জন শীল গোপাল (জাতীয় পার্টি)

  • বিমল বিশ্বাস (ওয়ার্কার্স পার্টি)

  • পঙ্কজ নাথ (আওয়ামী লীগ)

  • সুজিত রায়নন্দী (আওয়ামী লীগ)

  • ননী গোপাল মণ্ডল (সাংসদ , আওয়ামী লীগ)

  • বীরেন শিকদার (সাংসদ , আওয়ামী লীগ)

  • মুকুল বসু (আওয়ামী লীগ, প্রাক্তন সচিব)

  • অসীম কুমার উকিল (আওয়ামী লীগ)

  • নেপাল কৃষ্ণ দাস (বিকল্প ধারা, পূর্বে হিন্দু লীগ)

  • রঞ্জিত কুমার ঘোষ (সাংসদ , আওয়ামী লীগ)

  • ধীরেন্দ্র নাথ সাহা (বিএনপি, পূর্বে আওয়ামী লীগ)

 



পিনাকী লিখেছেন, “যদিও অসাম্প্রদায়িকতার নামে তার ইসলাম –বিদ্বেষী অবস্থান সব খানেই ছিল।” 
স্বাধীনতার পর ১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ বাংলাদেশী হিন্দুদের উপর নির্যাতনের ভয়াল সুনামি বয়ে গিয়েছিল। তখন জাতীয় পর্যায়ে  হিন্দু–বিদ্বেষী অবস্থান প্রকাশ পেয়েছিল।

এরশাদ আমলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে হিন্দু সম্প্রদায়ের একাউন্ট হোল্ডারদের বেশী পরিমাণ নগদ অর্থ ব্যাংক থেকে তোলার ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে এবং হিন্দু সম্প্রদায়কে ব্যবসার জন্য ঋণ দেওয়া বন্ধ রাখতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে (সামাদ, ১৯৯৮)। সেই সময় বাংলাদেশে এটা একটা অলিখিত বিধান যে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরকে রাষ্ট্রপ্রধান, সশস্ত্র বাহিনীসমূহের প্রধান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর, বিদেশে বাংলাদেশী মিশনে রাষ্ট্রদূত, অথবা প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মত সপর্শকাতর পদগুলোতে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। বেসামরিক ও সামরিক চাকুরীতে নিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক ঋণ ও বাকী দেওয়ার ব্যাপারে সংখ্যালঘুদের প্রতি ইচ্ছাকৃতভাবে বৈষম্য করা হয়। (সাহা, ১৯৯৮, পৃঃ ৫]।

বাংলাদেশ সরকার প্রণোদনা দিয়ে ইসলাম ধর্মে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণকে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসাহিত করে। বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ১৯৯১ সালের ২৮ নভেম্বর জারি করা ২/এ-৭/৯১-৯২ সার্কুলার মোতাবেক নও-মুসলিমদেরকে তথাকথিত পুনর্বাসনের নামে রাষ্ট্রীয় বাজেট বরাদ্দ থেকে নগদ অর্থ সাহায্য দেওয়া হয়।

১৯৮৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী প্রতিবেশী গ্রামগুলোর প্রায় ৪০০ মুসলমান কুমিল্লার দাউদকান্দিতে সোবাহান গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা চালায়। মুসলমানরা তাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সরকার ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম ঘোষণা করেছে। সুতরাং তোমাদের হয় মুসলমান হয়ে যেতে হবে নতুবা দেশত্যাগ করতে হবে।তারা লুটপাটের পর প্রতিটি হিন্দু বাড়ীতে আগুন লাগিয়ে দেয়। মন্দিরগুলো ধ্বংস করে এবং মহিলাদের উপর গণধর্ষণ চালায়। (সূত্র, বৈষম্যের শিকার বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়, মতিউর রহমান ও আজিজুল হক সম্পাদিত, ১৯৯০, উদ্ধৃতি দত্ত, ২০০৫)।

 

পিনাকী ভট্টাচার্য লিখেছেন,  “তারপর আসলো ২০০১ সালের নাইন ইলেভেন। শুরু হল বুশ ব্লেয়ারের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ’ এর কাল। এইবার হিন্দু সম্প্রদায় যেন ফেটে পড়ার সুযোগ নিল। ইসলাম সম্পর্কে তার মনের গহীনে পুষে রাখা বয়ানের সাথে তারা বুশের বক্তব্যের মিল খুঁজে পেল। বাংলাদেশের হিন্দুরা ব্যাপারটাকে দেখলো এভাবে যে; সে যাদের হাতে মার খেয়েছে এতদিন, এইবার আমেরিকার মত পরাশক্তি নেতৃত্বে সেই ইসলামের বিরুদ্ধে এক বৈশ্বিক লড়াই শুরু হয়েছে। সে আকাঙ্খা করলো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের ছাপ বা আঁচ নিশ্চয় এদেশেও এসে পড়বে। সে আমেরিকাকে বুঝাতে চাইল যে; এই কস্ট তো আমারও, এই আমরাই তো এই সম্প্রদায়ের হাতে সেই ৪৭ সাল থেকে মার খেয়ে আসছি। বৈশ্বিক ভাবে এরা যদি শায়েস্তা হয়ে যায় তাহলে তো ভালোই হয়, ফলে বুশের পক্ষে তার ঝাপিয়ে পড়ে সমর্থন দেয়া উচিত। হিন্দুরা হয়ে উঠলো “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের” প্রজেক্টের একনিষ্ঠ সমর্থক। এজন্য এই পর্যায়টাকে বলা যেতে পারে আমেরিকার কোলে চড়ে হিন্দুদের সিপিবি থেকেও দূরে চলে যাওয়া, বা অনাস্থার প্রস্থান।”

আমার জবাবঃ  
জনাব, আপনার এই কথার স্বপক্ষে রেফারেন্স আছে?
আপনি লিখেছিলেন “এজন্য এই পর্যায়টাকে বলা যেতে পারে আমেরিকার কোলে চড়ে হিন্দুদের সিপিবি থেকেও দূরে চলে যাওয়া, বা অনাস্থার প্রস্থান।”  অথচ ২০০১ সালের নাইন ইলেভেনের মাত্র বিশ দিন পর বাংলাদেশের পহেলা অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি জামায়াত জোট আশার পর বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর কি নির্যাতনের বন্যা বয়ে গিয়েছিল তা অবগত আছেন নিশ্চয় (নাকি এবার অস্বীকার করবেন)? কেন সেই হামলা হয়েছিল। সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িকভাবে হামলা হলেও বিএনপি জামায়াত দাবি করেছিল বাংলাদেশের হিন্দুরা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল, তাই এই হামলা রাজনৈতিক হামলা। অতএব বাংলাদেশের হিন্দুরা সিপিবির সমর্থক এই কথা ভুয়া এবং আপনার সাম্প্রদায়িক মনের পরিচালক। বরং পশ্চিম বাংলার মুসলিম সম্প্রদায় এই সময় সিপিএমের সমর্থক ছিল এটা আপনি অবগত। তাই বলে আপনি কি বলবেন  পশ্চিম বাংলার মুসলিম সম্প্রদায় (যাদের একাংশ প্রকাশ্যে পাকিস্তান আর জামায়াতের সমর্থক) তাদের হিন্দু বিদ্বেষের জন্য কমিউনিস্ট পার্টি করেছে? আব্দুর রেজ্জাক মোল্লার ডিগবাজী খাওয়ার কাহিনী ভুলে যান নাই। একটি দেশে সংখ্যালঘুরা সব সময় প্রগ্রেসিভ পার্টিকে সমর্থন করে। চরম সাম্প্রদায়িক মুসলিম মার্কিন মুল্লুকে গিয়ে ডেমোক্রেটদের সমর্থন দিবে। তাই বলে মার্কিনীদের উসকানি দিয়ে বাংলাদেশের হিন্দুরা সাম্প্রদায়িক করেছে তা আপনি কিভাবে বলছেন কোন প্রমাণ ছাড়া। ঐ সময় বাংলাদেশের হিন্দুরা কি ভয়াল নির্যাতনের ভিতর দিয়ে গিয়েছে তা বিন্দুমাত্র ফুটে উঠেনি আপনার লেখায়। আপনি কৌশলে সেই নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার কাহিনী লুকিয়ে বাংলাদেশের হিন্দুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন। 

 

পিনাকী ভট্টাচার্য লিখেছেন,  “এর মাঝে ২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক রাজনীতির উত্থান ঘটলো। ততদিনে বুশের বদলে ওবামা আসে অ্যামেরিকায়, অকেজো হয়ে পরা ওয়ার অন টেররের সংশোধনও আসে র‍্যান্ড প্রজেক্টের মাধ্যমে। কিন্তু শেখ হাসিনার ওয়ার অন টেররের নীতি চলতেই থাকার কারণে বাংলাদেশের হিন্দুরাও এর মধ্যে নতুন আলো সঞ্চারিত হয়েছে দেখে সদলবলে আরো বেশি করে নব উদ্যমে আওয়ামী লীগের একনিষ্ট সমর্থক হয়ে উঠে। নতুন আশায় তারা বুক বাধে। যদিও এর ফলাফলে ইসলাম বিদ্বেষ আরও সবল হওয়া ছাড়া কোন ফল নাই। ”

আমার জবাবঃ আগেই বলেছি বাংলাদেশের হিন্দুরা অনেক আগে থেকেই আওয়ামী লীগের একনিষ্ট সমর্থক। এই লেখার মাধ্যমে আপনি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকেও ইসলাম বিদ্বেষ ট্যাগ দিচ্ছেন। কিন্তু এই সময় বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচার থেমে থাকে নাই। ২০১০ সালে চট্টগ্রামে ঈদের দিন মন্দিরে হামলা,  ২০১১ সালে সিলেটে গীতা পুড়ানো, ২০১২ সালে হাটহাজারি, ফতেহপুর, চিরিরবন্দর, রামু, পতেঙ্গা, ২০১৩ সালের সাইদির রায়ের পর জামায়াতের তাণ্ডব সব ভুলে গেছেন?
 

পিনাকী ভট্টাচার্য লিখেছেন,  "ওদিকে ২০১৪ সালে ভারতে ক্ষমতায় উত্থান ঘটলো বিজেপির। এছাড়া এবছর কলকাতাতেও প্রাদেশিক নির্বাচন হয়ে গেল। আর শুরু হল বিজেপির আগামি কলকাতা দখলের পরিকল্পনা। আগামিতে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে জিততে হবে সেই কৌশলের অংশ হিসাবে (মুসলমানের) বাংলাদেশকেও ব্যবহার করা , বা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তাই এবার বিজেপির রাজনীতির প্রত্যক্ষ অনুপ্রবেশ ঘটে গিয়েছে বাংলাদেশেও। বাংলাদেশের হিন্দু সমাজের একাংশের মধ্যে এই প্রথম প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে বিজেপি ও তার মতাদর্শ। ইসলামের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের’ সাথে এবার “হিন্দুত্তবাদ” যোগ ঘটলো বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে। একদা প্রগতিশীলতার সাথে থাকা একটি সম্প্রদায় ক্রমশই হয়ে উঠেছে চরম প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি।”

আমার জবাবঃ কিভাবে বাংলাদেশের হিন্দু চরম প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি হচ্ছে আমাকে একটু বুঝাতে পারবেন। বিজেপি বাঙালি হিন্দুর জনসমর্থন পায়নি। এটা ঐতিহাসিক তথ্য ও ঐতিহাসিক সত্য। নির্বাচনী ফলাফলই বলে দেয় তাদের জনসমর্থনের করুণ অবস্থা। এমনকি দেশভাগের ফলে পূর্ব বাংলায় ধর্মীয় কারণে নিপীড়িত হিন্দু পশ্চিম বাংলায় চলে এসেও এই দলকে ভোট দেননি। তারা কংগ্রেস বা সিপিএমকেই সমর্থন করত। বাংলাদেশের হিন্দুরা সাম্প্রদায়িক হলে ওপাড় বাংলায় পূর্ব বাংলার রিফিউজিদের ভোটেই বিজেপি ক্ষমতায় আসত। তা আসে নাই। বরং পশ্চিম বাংলার মুসলিমদের ভিতর সাম্প্রদায়িকতার চরম উন্মেষ ঘটেছে। দেগঙ্গা বা ক্যানিং এ হিন্দুদের উপর অত্যাচার, বর্ধমান বিস্ফোরণ, তসলিমাকে বিতাড়ন, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে প্রকাশ্যে মুসলিম নেতাদের সমর্থন এই সব দেখেছে বিশ্ব। বাংলাদেশে হিন্দুরা কি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করেছে। হিন্দুদের ধর্মভিত্তিক দল রয়েছে বাংলাদেশে?
 

পিনাকী ভট্টাচার্য লিখেছেন,  “কিন্তু এই একাট্টা বিভেদকামী বিদ্বেষ হিন্দু সম্প্রদায় পুষে রেখে কি আদৌ সে নিজ সম্প্রদায়ের উপকার করছে? নাকি এই বিদ্বেষ আরো এক দীর্ঘমেয়াদী যন্ত্রণার উন্মেষের পথ করে দিচ্ছে ও দিবে? এই দিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের নির্মোহ দৃষ্টি আকর্ষন করছি”

আমার জবাবঃ বাংলাদেশের হিন্দুরা একাট্টা বিভেদকামী বিদ্বেষ রেখেছে এটা আপনার নিজের মনোভাব। এই সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়েছে মূলত বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় থেকে। বাংলাদেশের হিন্দুদের থেকে কয়টি জঙ্গি সংগঠন বের হয়েছে? একটিও না। পাশের দেশ ভারতের দিকে তাকান। সেখানে সংখ্যালঘুদের শত শত জঙ্গি সংগঠন রয়েছে। নির্যাতনই যদি কোন জাতির ভিতর জঙ্গিবাদের উত্থানের কারণ হত তাহলে বাংলাদেশ আর পাকিস্তানে বহু পূর্বে হিন্দু জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটত। কিন্তু তা ঘটে নি। বরং বাংলাদেশ আর পাকিস্তানে একতরফাভাবে হিন্দুদের উপর নির্যাতন চলে। এই প্রতিবাদও করে হিন্দুরা শান্তিপূর্ণভাবে। বাংলাদেশের হিন্দুদের  দীর্ঘমেয়াদী যন্ত্রণার উন্মেষের পথ করে দিচ্ছে সংখ্যাগুরু মুসলমানদের বিভেদকামী বিদ্বেষ। একটা দুর্গাপূজা দেখাতে পারবেন যেখানে প্রতিমা ভাঙচুর হয় নাই। একটা মাস দেখাতে পারবেন বছরের যেখানে মন্দিরে হামলা হয় নাই।

জনাব, সিলেটে ইসকন মন্দিরে হামলার ভিডিও দেখেছেন। ৮ বছরের শিশু থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধ পর্যন্ত হামলা করেছিল। এই সংখ্যাগুরু মুসলমানদের ভিতর জন্ম থেকে ঢুকিয়ে দেওয়া অন্যধর্মের প্রতি বিদ্বেষ কি করে আপনি এড়িয়ে যাবেন?

পরিশেষে বলতে চাই পিনাকী প্রমাণ করতে চাইছেন বাংলাদেশের হিন্দুরা ইসলাম বিদ্বেষী।  এ কথা তিনি স্বীকার করবেন না, বাংলাদেশের হিন্দুরা যত মত তত পথের অনুসারী। তাদের ভিতর সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা বিদ্যমান। এ কথাও তিনি স্বীকার করবেন না, ছোটবেলা থেকে প্রতিটি হিন্দু শিশুকে প্রচণ্ড ধর্মীয় বুলিং এর ভিতর দিয়ে যেতে হয়। এই বুলিং করে তার মুসলিম সহপাঠী, সহপাঠীদের অভিভাবক আর শিক্ষকরা। এর কারণ জন্ম থেকেই তাদের ভিতর শিখিয়ে দেওয়া পরধর্মের প্রতি বিদ্বেষ। ওয়াজ মাহফিলগুলোতে কি হিন্দু বিদ্বেষ ছড়ানো হয় তা কি পিনাকীর অজানা? তিনি কেন সংখ্যাগুরুদের একাট্টা বিভেদকামী বিদ্বেষ ত্যাগ করতে বলছেন না?

পিনাকী ভট্টাচার্যরা ‘ভট্টাচার্য’ নাম নিয়ে যে ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠেছেন তা বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের জানা একান্ত জরুরী। বাংলাদেশের হিন্দুরা নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। তাদের দুঃখলাগবের পথ খুঁজে না বের করে পিনাকীরা তাদের  বিরুদ্ধে ইসলামী উগ্রবাদীদের উসকে দিচ্ছেন। পিনাকী ভট্টাচার্য মুসলিম মেয়ে বিয়ে করে ধর্মান্তরিত হয়েছেন অথচ পিনাকী ভট্টাচার্য নাম দিয়েই বাংলাদেশের হিন্দুদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক হামলার পটভূমি ঠিক করে দিচ্ছেন।

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উচিত এই সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

 

এইবেলাডটকম/এমআর

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71