বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮
বৃহঃস্পতিবার, ১লা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
প্রাজ্ঞের নির্মল হাসি
প্রকাশ: ১২:৫৫ pm ০১-১০-২০১৭ হালনাগাদ: ১২:৫৫ pm ০১-১০-২০১৭
 
শামীম বানু
 
 
 
 


আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া বাংলার আকাশের এক বহুমাত্রিক প্রতিভাবান নক্ষত্র, যার দীপ্তি কখনও সাহিত্য, কখনও পুঁথিসাহিত্যবিশারদ হয়ে বিচ্ছুরিত হয়েছে। আবার কখনও প্রত্মম্নতত্ত্ববিদ, ইতিহাস চিন্তাবিদ, ইতিহাস-সাহিত্য অনুবাদক হয়ে ঝিলমিল করে উঠেছে।

আজ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার শততম জন্মদিন। ১৯১৮ সালের ১ অক্টোবর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পেশাগত জীবনে উচ্চপদের সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি একজন নিষ্ঠাবান গবেষক ছিলেন। আমি দেখেছি, শেষ দিনগুলোতে হাসপাতালের শয্যায় অর্ধ-চেতনাবস্থায় আঙুল দিয়ে শূন্যে কী যেন লেখার চেষ্টা করতেন। যেন কোনো অসমাপ্ত গবেষণাকর্ম সমাপ্ত করতে চাচ্ছেন। ইরানি পন্ডিত আবু রায়হান আল বিরুনি জীবনের শেষ মুহূর্তে জ্ঞানবিষয়ক একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েছিলেন। উত্তরটি পেয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। যাকারিয়া স্যারের মধ্যে যেন বাংলার আল বিরুনিকে খুঁজে পাওয়া যায়।

২০১২ সালের জুন মাসে ঢাকার স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির এক পত্রে আমাকে তাদের সভায় যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সভাস্থলে ফারসি ভাষা বিষয়ক অনেক পরিচিত পন্ডিতের মধ্যে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে দেখলাম। চেহারায় পান্ডিত্য ও আভিজাত্যের ছাপ। পরিচয় হলো বাংলার অপেশাদার ও শ্রেষ্ঠ এক প্রত্মম্নতাত্ত্বিক গবেষক ও ফারসি ইতিহাস সাহিত্যের অনুবাদক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার সঙ্গে। ৯০-ঊর্ধ্ব ব্যক্তি আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানালেন। তুর্কি কায়দায় সালাম ও কুশল বিনিময় করলেন। শিষ্টাচার ও বিনয়ের এক বিরল উদাহরণের দৃষ্টান্ত পেলাম। এর পর দুই সপ্তাহ অন্তর সভায় তার সঙ্গে দেখা হতো।
তিনি ক্লাসিক ফারসির অনুরাগী ছিলেন। পারিবারিক সূত্রে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে ফারসিকে রেখেছিলেন। বাংলা মাতৃভাষা, ইংরেজি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভাষা, ফারসি ভালোবাসার ভাষা- এই তিনে সোনায় সোহাগা হয়ে তার কর্মজীবনে জ্যোতি ছড়ায়। 

আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার প্রকাশিত উত্তম কর্মগুলো হলো ফারসি ভাষায় রচিত বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাস গ্রন্থ বাংলা ভাষায় অনুবাদ। তিনি মূল ফারসি গ্রন্থ ও এর ইংরেজি অনুবাদ সামনে রেখে বাংলা ভাষায় এগুলো অনুবাদ করেছেন। বিভিম্ন গ্রন্থের টীকায় এগুলোর ইংরেজি অনুবাদকের ভাষা, ভাব ও অর্থের ভুল-ত্রুটি যেসব নির্দেশ করেছেন, তা বিস্ট্ময়কর এবং ক্লাসিক ফারসি ভাষায় তার পান্ডিত্যের প্রমাণ। 
ফারসি থেকে আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া অনুবাদ করেন মীনহাজ-ই-সিরাজ রচিত 'তবকাত-ই-নাসিরী'। উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের প্রথম দিকের প্রামাণ্য ইতিহাস গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম। ২৩ খন্ডের গ্রন্থে বাংলার ইতিহাস রয়েছে ২০, ২১ ও ২২ তবকতে (স্তর-অধ্যায়) এবং এই ৩টি তবকত-এর বাংলা অনুবাদ করেন তিনি। বাংলার নবাবি আমলের ইতিহাসভিত্তিক দুটি ফারসি গ্রন্থ করম আলী খান রচিত 'মোজাফ্‌ফরনামা' ও ১৭২৯ সালে আজাদ-আল-হোসায়নি রচিত 'নওবাহার-ই-মুর্শিদকুলীখানি' অনুবাদ করেন। ইউসুফ আলী খান রচিত 'তারিখ-ই-বাঙ্গালা-ই-মহাবতজঙ্গী'র বাংলা অনুবাদ তার গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ইতিহাস অনুবাদক হিসেবে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্ম হলো ১৭৮০-৮১ সালে সৈয়দ গোলাম হোসেন খান রচিত 'সিয়ার-উল্‌-মুতাখ্‌খিরিন'-এর অনুবাদ।

আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তার জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত কর্মব্যস্ততায় কাটান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির প্রধান চাবিকাঠি ছিলেন তিনি। এখানে ঢাকার ফারসি, আরবি, উর্দু, সংস্কৃৃত, লাতিন, পর্তুগিজ, আর্মেনীয়সহ বিভিম্ন ভাষার শিলালিপি আবিস্কারের পর পাঠোদ্ধার ও অনুবাদ তত্ত্বাবধান তিনি করতেন। সভায় উপস্থাপিত শিলালিপি ব্যতীত অন্যান্য সাহিত্যিক রসাল কথোপকথন, ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাসভিত্তিক আলোচনা নিয়ে আড্ডা জমত। তার মুখে সর্বদা নির্মল হাসি লেগে থাকত। ২০১৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তার জীবনাবসান ঘটে।

অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71