সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮
সোমবার, ৩রা পৌষ ১৪২৫
 
 
সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ
বাংলাদেশের অভিযাত্রা কোন দিকে?
প্রকাশ: ০৪:৩৫ pm ২৯-০৫-২০১৭ হালনাগাদ: ০৪:৩৫ pm ২৯-০৫-২০১৭
 
 
 


ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ||

মেঠো বাংলায় একটি প্রবচন আছে_ 'কান নিয়ে গেছে চিলে'। আকাশে ওড়ে বেড়ানো এ পাখির তীক্ষষ্ট দৃষ্টি থাকে জলে বা স্থলে শিকারের প্রতি। এমন কেউ হয়তো আছেন যারা 'চিল কান নিয়েছে' শুনেই ছুটতে থাকেন ওড়ে চলা চিলের দিকে। কিন্তু এটা ভাবেন না যে, চিল ঠিক আসলেই কান নিয়েছে কি-না।

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের রাজনীতি-সংস্কৃতি অঙ্গন তপ্ত হয়ে উঠেছে ভাস্কর্যভিত্তিক বয়ানে। এখনও আমাদের কাছে পরিষ্কার হলো না যে, মৃণাল হকের ভাস্কর্যটি কার কিংবা কিসের এবং দ্বিতীয়ত, এটা মূর্তি না ভাস্কর্য। মৃণাল হক একাধিকবার বলেছেন, ভাস্কর্যটি এক বাঙালি নারীর। কীভাবে সুপ্রিম কোর্টের সৌন্দর্য বাড়ানো যায়, সেটা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছিল। তখন কর্তৃপক্ষ এ ধরনের একটি প্রতীকী ভাস্কর্য তৈরির কথা বলেন_ একটি মেয়ে, দাঁড়িপাল্লা ধরে দাঁড়িয়ে আছে, চোখ বাঁধা। হাতে তলোয়ার। সেভাবেই এটি তৈরি করা হয়েছে। অপরদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এটি গ্রিক গডেস বা দেবী থেমিসের মূর্তি। এর অপসারণ সরকারের এখতিয়ারে নেই। এটি সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত। 

ধন্ধ তৈরি হলো এভাবে। তবে আমাদের সোজাসাপটা কথা দুটি। এটি একটি বাঙালি নারীর ভাস্কর্য, যা কোনোমতেই গ্রিক দেবীর নয়। দ্বিতীয়ত, এটি ভাস্কর্য_ কোনো মূর্তি নয়। উপাস্য মূর্তি সম্পর্কে ইসলামে কিছু নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আছে, যদিও চূড়ান্ত বিচারে তা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেই গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে, ভাস্কর্য ঐতিহ্যভিত্তিক সংস্কৃতি ও মানবিক সৃজনশীলতার প্রতীক। লেখা বাহুল্য, এমন ভাস্কর্য ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং ইরানেও আছে। ইরানে সোহরাব-রুস্তমের ভাস্কর্য আছে। ওই দেশের রাজধানী তেহরানে সর্বোচ্চ আদালতের সামনে ভাস্কর্য আছে। এতে ওই সব মুসলিম দেশে ইসলাম বিপন্ন হয়নি। বাংলাদেশে কেন এ ধরনের কথা বলা হয়, তা বিবেচ্য। 

ভাস্কর্য অপসারণের পর প্রতিবাদ হয়েছে। প্রতিবাদকারী ছাত্রছাত্রীদের ওপর পুলিশের নৃশংসতার চিত্র আমরা সংবাদপত্রে দেখেছি। টেলিভিশনেও ছিল সচিত্র প্রতিবেদন। পুলিশের ভাষ্যে জানা যায়, বিক্ষোভরতরা আদালত প্রাঙ্গণে গিয়েছিল। কিন্তু আমরা জানি তারা জনপথেই অবস্থান করছিল, আদালত প্রাঙ্গণে নয়। সুতরাং পুলিশের আচরণ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও প্ররোচনামূলক। উপরন্তু বলা হয়েছে যে, বিক্ষোভকারীদের হাতে মারাত্মক অস্ত্র্পশস্ত্র ছিল; কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শুধু তাৎক্ষণিক কর্মকাণ্ডেই পুলিশ তৃপ্ত নয়_ তারা লিটন নন্দীসহ আরও চারজনকে গ্রেফতার করেছে। আরও শ'খানেক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগে মামলা ঠুকে দিয়েছে। আদালত অবশ্য গ্রেফতারকৃতদের জামিন দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, ঘোষিতভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠান কি বেআইনি? পুলিশের মারমুখী ভূমিকারই-বা ব্যাখ্যা কী? সরকার কি স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগটি বন্ধ করে দিতে চায়? এসব প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর সরকারকেই দিতে হবে।

ভাস্কর্য অপসারিত এবং পুনঃস্থাপিত হয়েছে। দুটি কাজই হয়েছে রাতারাতি। অপসারিত হওয়ার ফলে বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যে জোয়ার শুরু হয়েছে। দেখা গেল, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এ প্রসঙ্গে অভিন্ন অবস্থানে রয়েছেন। ভালো লাগল, যে দেশের রাজনৈতিক বিভাজন সব সময় তুঙ্গে থাকে, সে দেশে একটি রাজনৈতিক ঐকমত্য তো হলো! অবশ্য, ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জে হেফাজতে ইসলাম নামের সংগঠনটি বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নেতা জাতীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বীর বিরুদ্ধে ঐকমত্যভিত্তিক অবস্থান গ্রহণ করেছে। কিছু দিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা এবং গাইবান্ধা জেলায় যে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল সেখানে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী একাট্টা। অর্থাৎ ইতিহাসের শিক্ষা হলো, বাংলাদেশে নেতিবাচক প্রেক্ষাপটে ঐকমত্য হয়। যেমন_ ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী ঐকমত্য হয়েছিল তিন জোটের অন্তর্ভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর। ওবায়দুল কাদের ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার সিদ্ধান্তে ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাহলে তো প্রধান বিচারপতির নন্দিত কিংবা নিন্দিত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখছি, হেফাজতে ইসলাম ও খেলাফত আন্দোলন সভা করে, মিছিল বের করে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। কাজেই কার নির্দেশে কিংবা অঙ্গুলি হেলনে ভাস্কর্য অপসারিত হলো, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেল। ভাস্কর মৃণাল হক বলেছেন, ওপরের চাপে তাকে এ কাজটি করতে হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন, এই 'ওপর' কত ওপর এবং কে সেই ওপর? আমরা জানি যে, গত ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হেফাজতে ইসলামের নেতাদের কাছে নিজস্ব মন্তব্য করেছিলেন। সেই থেকে সূচনা ভাস্কর্যকেন্দ্রিক বিতর্ক। তারপর হেফাজতে ইসলামসহ সমমনাদের দাবি ছিল, রমজানের আগেই সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য সরাতে হবে। তাই করা হলো। সবার সঙ্গে আলোচনা করে প্রধান বিচারপতি অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য ভাস্কর্য সরানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু আমরা জানি যে, গত বছরের শেষ দিকে এই ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রধান বিচারপতির আগ্রহেই। তাহলে কি প্রধানমন্ত্রীর অনাগ্রহই প্রধান বিচারপতিকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করল? আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধে চেতনাসম্পৃক্ত কোনো ভাস্কর্য এভাবে আক্রান্ত হবে না। কিন্তু ধর্ম-মাতালদের কাছে মূর্তি ও ভাস্কর্যে কোনো পার্থক্য নেই। তারা তো ইতিমধ্যেই সব মূর্তি ভাঙার দাবি তুলেছে। কাজেই ওবায়দুল কাদেরের ওপর আমরা কতটুকু ভরসা রাখতে পারি? 

উল্লেখ্য, হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা ক্রমেই বর্তমান সরকার বাস্তবায়ন করছে। কাজেই তাদের বর্তমান দাবি মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে সরকার কতটা দৃঢ় হতে পারবে?

ভাস্কর্য অপসারণ ও প্রতিস্থাপনের বিতর্কের বাইরে সবচেয়ে বড় প্রসঙ্গটি হলো, বাংলাদেশ কোন দিকে চলেছে? ১৯৭১ সালে আমাদের একটি বিজয় হয়েছিল। আর ২০১৭ সালে সেই বিজয়ের সর্বনাশ আমরা দেখেছি। সংখ্যা ৭১ উল্টে লেখলে কিন্তু ১৭ হয়! কাকতালীয় বটে! বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সূচনা করেছিলেন জিয়াউর রহমান। সেই থেকে শুরু, শেষ আর হলো না। এখন ধর্মনিরপেক্ষ দল আওয়ামী লীগও ধর্মের নামে রাজনীতি করছে ভোটের রাজনীতির কারণে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো সম্পর্কে বলেছিলেন, 'এরা ধর্ম-মাতাল। এরা সত্যের আলো পান করেনি, পান করেছে শাস্ত্রের অ্যালকোহল।' দুর্ভাগ্যজনক হলো, অ্যালকোহলের যে মাদকতা তা থেকে প্রগতিশীল রাজনীতির ধ্বজাধারীরা মুক্ত থাকতে পারছে না, যা দেশের জন্য অশনিসংকেত। এই ধর্ম-মাতালদের তোষণ করে তুরস্কের মোস্তফা কামাল পাশা এবং মিসরের আনোয়ার সাদাত যে কী ভুল করেছিলেন তার এন্তার তথ্য ইতিহাসে আছে। আমাদের ক্ষমতাসীন দলের কাছে সবিনয় প্রশ্ন_ আপনারা কি সেই ইতিহাস একটু উল্টেপাল্টে দেখবেন, না সস্তা ভোটের রাজনীতি করবেন? তবে বাংলাদেশে এটা বলে দেওয়া যায় যে, ধর্ম-মাতাল গোষ্ঠী কোনো সময় আওয়ামী লীগের বাক্সে ভোট দেবে না; কিন্তু আওয়ামী লীগ থেকে সুবিধা আদায় করবে। তাদের ইতিহাসই বলে দেয়, যে কোনো ক্ষমতাসীন দল থেকে সুবিধা আদায়ে তারা সিদ্ধহস্ত। 

সুতরাং ভাস্কর্য বড় কথা নয়, বড় কথা বাংলাদেশের অভিযাত্রা কোন দিকে?

সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71