মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ২৯শে কার্তিক ১৪২৫
 
 
বাংলাদেশের প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর সুরক্ষা
প্রকাশ: ০৩:২৪ am ১৪-০৪-২০১৭ হালনাগাদ: ০৩:২৪ am ১৪-০৪-২০১৭
 
 
 


ড. এম.এ সোবহান ||

 

বাংলাদেশ এক বৈচিত্র্যময় দেশ। দেশটি প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এখানে রয়েছে অনেক ঐশ্বর্য। দেশটিতে রয়েছে বৃহত্ গোষ্ঠীর পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও  প্রান্তিক জাতি গোষ্ঠী।  প্রত্যেক গোষ্ঠীই তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সত্তা নিয়ে বেঁচে আছে। সমাজের উচিত তাদের সংস্কৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেয়া এবং এর সুরক্ষা করা। এটা সর্বজনীন স্বীকৃত যে, প্রত্যেক জাতি ও গোষ্ঠীর রয়েছে ভিন্নতর কিছু জ্ঞান, ভাষা, তথ্য ও বৈশিষ্ট্য। যা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতা প্রভূত উপকৃত হতে পারে। কোনো গোষ্ঠী ধ্বংস হলে, বর্তমান সভ্যতা বঞ্চিত হবে তাদের অর্জিত জ্ঞান থেকে।  প্রত্যেক জাতি গোষ্ঠীকে সুরক্ষা করার মানসে এ বছর প্রায় অনেক গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার বই প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।  যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এরপরও দেখা গেছে কোনো কোনো জাতি গোষ্ঠীর নিজস্ব বর্ণমালা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে নতুন বর্ণমালা দিয়েও তাদের সহায়তা করা যায়।

 

মালয়েশিয়ায় লেখাপড়া করার সুবাদে জানতে পেরেছি যে, মালয় বর্ণমালার পরিবর্তে মালয়েশিয়ার প্রায় অধিকাংশ স্টেটে  ইংরেজি বর্ণমালা দিয়ে  মালয় ভাষা নতুন রূপ পেয়েছে। এবং প্রায় প্রত্যেকে কমবেশি ইংরেজিতে কথা বলতে পারে। আমাদের ব্যাচে দুইজন উপজাতীয় কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, তাদেরকে আমার কাছে ভিন্নতর ও বুদ্ধিদীপ্ত মনে হয়েছে। আমাদের বর্তমান ইউনিটে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কিছু সদস্য আছে। তাদের সততা, সত্যবাদিতা, বুদ্ধিমত্তা, আনুগত্য ও কর্মের প্রতি অনুরাগ অসামান্য। বর্তমানে অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমান স্যার ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার থাকাকালীন সাভার থানার বেদে পল্লির বেদেদের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে কাজ করেছেন। তাদেরকে  গার্মেন্টসে ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কাজ দিয়েছেন। বিশেষ করে বেদে মেয়েদের জন্য “উত্তরণ” নামীয় একটি বুটিক হাউজ তৈরি করেছেন। যেখানে বেদে মেয়েদের সঙ্গে অন্য গোষ্ঠীর মেয়েরাও কাজ করছেন। ঐ  বুটিক হাউজ থেকে পাঞ্জাবি, বিছানার চাদর, বালিশের কভার এবং বিভিন্ন ব্লক দিয়ে নানারকম দ্রব্যাদি তৈরি হয়। যেগুলো গুণে-মানে অতুলনীয়। আবার দরিদ্র বেদে পিতার কন্যাকে বিয়ের ব্যাপারে সাহায্য করেছেন। এখনো বেদেদের একটা বড় অংশ তাদের পূর্ব পুরুষের পেশা নিয়েই থাকতে চায়। এভাবে  প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং সকল কমিউনিটির সঙ্গে মিশতে হবে। সর্বপ্রথমে প্রয়োজন তাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিত্সা পৌঁছে দেয়া। এরপর বাড়ি  পর্যন্ত পাকা বা কাঁচা রাস্তা তৈরি করা। তাদেরকে  প্রতিরক্ষা দিতে হবে,  নিরাপত্তা দিতে হবে।  ২০১০ সালের ২৩ নং আইন মোতাবেক বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও শে্রিণর সংখ্যা ২৭টি। তাদের নাম হলো: চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মগ, বম  প্রভৃতি।  এছাড়াও আছে অনেক প্রান্তিক গোষ্ঠী, তাদের নিয়েও কাজ করা যেতে পারে।

 

চারটি আদিবাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে মালয়েশিয়া দেখার ও জানার সুযোগ হয়েছিল। একটি গোষ্ঠীর গানও শুনেছিলাম। জঙ্গলে তাদের রাজা আছে, আছে নিজস্ব জগত্ এবং তীরের মতো এক ধরনের অস্ত্র দেখেছিলাম যা দ্বারা তারা শত্রুকে আক্রমণ করে থাকে। তাদের কেউ কেউ আবার সভ্য জগতে মিশতে চায় না। মালয়েশিয়ার সরকার তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি পাঠায়। অপর গোষ্ঠীটির ৩০/৪০টি ঘর মানুষ।  প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার নদীর তীরে তারা বাস করে। তাদের জন্য মালয়েশিয়ান সরকার তাদের থাকার জায়গাতে একটি কমিউনিটি সেন্টার ও একটি মসজিদ তৈরি করে দিয়েছে। এছাড়া একটি টিভি দিয়েছে যা দ্বারা তাদেরকে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে পরিচয় করাচ্ছেন। অন্য একটি গোষ্ঠীর জন্য শহরের উপকূলে  রাজপথের পার্শ্বে গুচ্ছগ্রামের মতো গ্রাম তৈরি করে তাদেরকে সেখানে আনার চেষ্টা করছেন। সর্বশেষ গোষ্ঠীটির গ্রামে যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। যারা তাদের জন্য তৈরি করা ঘরে ভালোভাবে বসবাস করছে।

 

অনেক গুণীজন বলেন, ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠী তাদের পশুপাখি, গাছ-পালা, লতা-পাতা, বৃক্ষরাজি ধ্বংস করলে বা বিলীন হলে অনেক প্রয়োজনীয় ওষুধের কাঁচামাল থেকে সভ্যতা বঞ্চিত হবে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর মতো সকল গোষ্ঠীকে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা যেতে পারে এবং পুনর্বাসন করা যেতে পারে। তারপর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে, তাদের সমস্যা জেনে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা প্রদান করতে হবে।

 

আবার আসা যাক সাভারের বেদে পল্লির কথায়, বেদে পল্লিটি ছিল মাদক ব্যবসা ও চোরাকারবারীদের আড্ডাখানা ও ব্যবসার জায়গা এবং অপরাধপ্রবণ এলাকা। আর বর্তমানে সেখানে কোনো মাদক ব্যবসায়ী নেই। নেই কোনো অপরাধ ও অপরাধী; ঐ এলাকার আইন-শৃঙ্খলার অকল্পনীয় উন্নয়ন হয়েছে। এরূপ আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন করতে হলে সকল গোষ্ঠী বা কমিউনিটির সঙ্গে মিশতে হবে এবং সমস্যার সমাধান করতে হবে। তাহলেই আইন-শৃঙ্খলার টেকসই উন্নয়ন সম্ভবপর।

 

 লেখক :অতিরিক্ত পুলিশ সুপার

স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, বাংলাদেশ পুলিশ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71