বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বুধবার, ১১ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু এবং এক ছাগীর তিন নম্বর বাচ্চার গল্প
প্রকাশ: ০৮:০৭ pm ২৭-০৮-২০১৫ হালনাগাদ: ০৮:০৭ pm ২৭-০৮-২০১৫
 
 
 



পরেশ কান্তি সাহা: গল্পটা কিভাবে এবং কোত্থেকে শুরু করবো, এই নিয়েই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছি। তারপরও যখন শুরু করেছি, শেষতো করতেই হবে।এটা যখন আগষ্ট মাস, তখন আগষ্ট থেকেই শুরু করি। আগষ্টকে শোকের মাস বলা হয়। কারণ এ মাসেই আমরা হারিয়েছি বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। শুধু তিনিই নন, ৬ আগষ্ট কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে, ১২ আগষ্ট বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদকে, ১৭ আগষ্ট কবি শামসুর রাহমানকে এবং ২৭ আগষ্ট হারিয়েছি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। এঁরা আমাদের শক্তির উৎস, জোগায় সঞ্জীবনী সুধা। এঁদের শক্তির দ্বারা আমরা উদ্বুদ্ধ হই, অনুপ্রাণিত হই। যে কারণে আমি আগষ্টকে শোকের মাসই বলিনা- বলি শক্তির মাস।আমাদের অধিকাংশ নদ-নদীর উৎসস্থল যেমন হিমালয়, তেমনি বাঙালি জাতির ভাগ্যের উৎসস্থল ঊনিশশো বায়ান্ন। ছেষট্টি পেরিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে একাত্তরে। ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ, দু’লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত, এক কোটি হিন্দুদের দেশ-ত্যাগের বিনিময়ে পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বাহাত্তরে রচিত হলো সংবিধান, মূল চারটি স্তম্ভের উপর। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, এবং ধর্ম নিরপেক্ষতা। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে নৃশংশভাবে হত্যাকান্ডের পর রাষ্ট্রীয় জীবনে পট পরিবর্তন হলো। শুরু হয় সংবিধানে ব্যবচ্ছেদ। অষ্টম সংশোধনীতে আসে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ এবং পঞ্চদশ সংশোধনীতে আসে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম’। বড়ই অদ্ভুত লাগে। তারপরও সংবিধান মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে চার নম্বর স্তম্ভ ধর্ম নিরপেক্ষতার উপর।এরই মধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে চুয়াল্লিশটি বছর। দেশের যে অগ্রগতি হয়েছে বলতে গেলে তা অভাবনীয়। বাংলাদেশ এখন আর তলা বিহীন ঝুড়ি নয় - এক নামে বহির্বিশ্ব চেনে। দেশের বাইরে যেয়ে দেশের এই সুনাম শুনলে বুকের ছাতাটা দেড় হাত চওড়া হয়ে যায়। কতো খুশির কথা যে দেশটা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চলেছে। কবির ভাষায় ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা’। অথচ দেশে বাস করে যখন দেখি এর উল্টো দিকের চেহারা, তখন বুকটা হয়ে যায় চুপষে যাওয়া বেলুনের মতো। দেখলাম জ্বালাও পোড়াওয়ের রাজনীতি।

পেট্রোল বোমায় ঝলসানো মানুষের মাংসের কাবাব, স্বজন হারানোর আর্তনাদ। এখন দেখছি নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ, শিশু নির্যাতন। তাই প্রশ্ন জাগে, এরই মধ্যে কেমন আছে দেশের সংখ্যালঘুরা? সম্প্রতি ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হলো হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভা। সভায় দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে (সমকালে প্রকাশিত ৮ আগষ্ট ২০১৫)। মন্ত্রী, এম.পি এবং নেতাদের দৌরাত্ম্য,     জবর-দখলের চিত্র, কিছুটা ফুটে উঠেছে। কেউ আবার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এখানে সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকে, তাহলে উচিৎ হবে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত সত্য উদ্্ঘাটন করা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া। যেটা পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ পাবে সকল গণমাধ্যমে। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর শত্রু সম্পত্তি আইন বলবত হয়। আশ্চর্যের বিষয় যুদ্ধ হলো দু’টো দেশের মধ্যে আর শত্রু হলো পূর্ব পকিস্তানে বসবাসকারি সংখ্যালঘু হিন্দুরা। স্বদেশে অর্থাৎ জন্মস্থানে বসবাস করেও অনেকের সম্পত্তিই শত্রুসম্পত্তিতে পরিণত হল। কাঠ পেন্সিলের একটি খোঁচা যে কতো ভয়াবহ, তা একমাত্র ভূক্তভোগীরাই জানে। পাকিস্তান গেল, এলো বাংলাদেশ। মদের বোতলে মদ ঠিকই থাকলো বোতলটা পাল্টানো হলো। নাম দেয়া হলো পরিত্যক্ত সম্পত্তি। এই সম্পত্তি কারা দখল করছেন, তার একটা গবেষণা মূলক রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপকদ্বয় ডঃ আব্দুল বারাকাত এবং ডঃ শফিক উজ্ জামান। তাঁদের গবেষণায় উঠে এসেছে - এই আইনে ‘ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের আনুমানিক সংখ্যা ১০,৪৮,৩৯০ এবং মোট জমির পরিমান আনুমানিক ১০ লাখ একর।’... ‘বর্তমানে এই সুবিধাভোগী শ্রেণীর শতকরা ৭২ ভাগই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলের সমর্থক (২৪ আগষ্ট ২০১৫ তারিখে সমকালে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায় দেশে মোট অর্পিত সম্পত্তির পরিমাণ ৬,৬০,২২১ একর)। এখন চলছে ধারা উপ ধারায় যুদ্ধ। সেই সঙ্গে পকেট ভারী হচ্ছে নেতাকর্মী এবং আইন ব্যবসায়ীদের। এই আইনটি কি বাতিল করে যার জমি তাকে অথবা তাদের ওয়ারেশদের সরাসরি ফিরিয়ে দেয়া যেতো না? তবে শেষটা যে কি হবে, তা বুঝতে কিন্তু কারও কোন অসুবিধা নেই। সেটা হলো তালগাছের শালিশের মতো অর্থাৎ শালিশ আমি মানি কিন্তু তালগাছটা আমার। উপরোন্ত সংখ্যালঘুদের উপর সরবে কিংবা নীরবে যে নির্যাতন চলে, তার কতটুকুইবা গণমাধ্যমে আসে। পরিস্থিতি দিনে দিনে ঘোলাটেই হচ্ছে। একটু সমস্যা হলেই সংখ্যালঘু হিন্দুরা চলে যায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু সেখানে অবস্থানকারী সংখ্যালঘুরা বাংলাদেশে আসেনা। কারণ সেখানে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে তারা যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা পায়। আবার যে সমস্ত হিন্দুরা বাংলাদেশে আছে, তারা তাদের ছেলে মেয়েদেরকে ওখানে পাঠিয়ে লেখাপড়া করাচ্ছে। উদ্দেশ্য, ভবিষ্যতে ওখানেই নাগরিকত্ব নেবে। এভাবে যুব শক্তি ও মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতেই মেধাহীন অনুর্বরে পরিণত হবে এই সংখ্যালঘুরা। সেই সঙ্গে দেশ হারাচ্ছে অমূল্য সম্পদ। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এদের দেশ ত্যাগের প্রবণতা ঠেকানো অর্থাৎ শূন্যের কোঠায় আনা খুব একটা কঠিন নয়। ২০০৬ সাল থেকে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট সরকারের কাছে ৭টি দাবি আদায়ের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম দাবি হলো - জাতীয় সংসদে ৬০টি সংরক্ষিত আসন, সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন এবং চাকরিতে ২০% কোটা সংরক্ষণ।

সম্প্রতি ১ ও ২ নং দাবি নিয়ে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ এবং পূজা উদযাপন পরিষদও সোচ্চার। সম্মিলিত ভাবে যদি এই দাবিগুলো নিয়ে মাঠে নামে, তাহলে দাবি আদায় করা কঠিন নয়। উল্লেখ্য, ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত পুর্বপাকিস্তানে জাতীয় সংসদে সংখ্যালঘুদের জন্য ৭২টি আসন সংরক্ষিত ছিল। পাকিস্তানে এখন পর্যন্ত সে আইন বলবত আছে।  সত্যিকার অর্থে যতদিন পর্যন্ত জাতীয় সংসদে হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব না থাকবে, ততদিন পর্যন্ত তাদের সুরক্ষা অরণ্যে রোদনই হবে। পরবর্তী দাবিগুলো স্বাভাবিক নিয়মেই চলে আসবে। অর্থাৎ কান টানলে মাথা এমনিই চলে আসে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস- নির্বাচন এলে। আওয়ামীলীগের ভোট ব্যাংক হিসাবে পরিচিত বৃহত্তম সংখ্যালঘু হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। ভোট দিলেও এবং না দিলেও ঝড়-ঝাপটা আসে এদেরই উপর। তারপরও আসে বিচ্ছিন্ন ঘটনা, যেগুলো নাইবা বললাম। এরা রাজনীতিতে অ-দূরদর্শী। না চাইলে যে মাও দুধ দেয় না, সেটাও জানে না। নব্বই থেকে একশোটি জাতীয় সংসদের আসনের ভাগ্য নির্ধারক এরা। এরা আওয়ামীলীগ করে না, অথচ ভোট দেয় নৌকায়। শুধুমাত্র স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসাবে - বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে। এরা জানে না কি ভাবে দাবি-দাওয়া আদায় করতে হয়। মায়ের রক্তক্ষরণ না হলে যে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় না, সে কথাটাও বেমালুম ভুলে গেছে। প্রতিরোধ না করতে পারে - প্রতিবাদতো করতে পারে! অধিকার এমনি এমনি আসে না, অধিকার আদায় করে নিতে হয়। এদের হতে হবে নির্ভীক। স্বামী বিবেকানন্দের জীবনের একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। তিনি ছিলেন বারানশীতে। দুর্গাপূজার সময়। রাস্তায় কয়েকটি বানর তাঁকে আক্রমণ করলো। স্বামীজীও প্রাণপণে ছুটছেন। এই দৃশ্য দেখে পাশ থেকে এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী অভয় দিয়ে হুঙ্কার দিলেন - এই বালক, তুমি দৌড়াচ্ছ কেন? ঘুরে দাঁড়াও। এই কথা শুনে স্বামীজী ঘুরে দাঁড়ালেন। অমনি বানরগুলো থম্কে দাঁড়ালো - আর সামনে এগুলো না। ঘটনাটি স্বামীজীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। অনুরূপভাবে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা যতদিন পর্যন্ত না ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, যতদিন পর্যন্ত না প্রতিবাদ করতে শিখবে, যতদিন পর্যন্ত না রাজনীতি করবে, যতদিন পর্যন্ত না ভোটের মূল্য বুঝবে, যতদিন পর্যন্ত না জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবে; ততদিন পর্যন্ত ভোটব্যাংকে ভোটই দিয়ে যাবে - ওই ভোটব্যাংকের অংশীদার হতে পারবে না - অর্থাৎ নেচে নেচে আনন্দে আত্মহারা হবে - জীবন যাপন করবে - ঠিক যেন এক ছাগীর তিন নম্বর বাচ্চার মতো।
 
লেখকঃ মক্তিযোদ্ধা, কবি ও  ‍মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

এইবেলা ডটকম/এটি 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71