বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বুধবার, ১১ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
বাংলার বিপ্লববাদ ও গীতা - ১ম পর্ব
প্রকাশ: ১০:২৭ pm ১১-০৮-২০১৬ হালনাগাদ: ০৯:০৫ pm ১৫-০৮-২০১৬
 
 
 


ভূপেন্দ্রকিশোর রক্ষিত রায় ||

স্বাধীনতা লাভের পূর্বে ভারতীয় বৈপ্লবিক-যুগ দীর্ঘ পঞ্চাশ বৎসর ধরে ব্যাপ্ত ছিল। তার কাল ১৮৯৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল। এই দীর্ঘদিন ব্যাপী বিপ্লবীদের জীবনে গীতার প্রভাব ছিল অনন্য। বর্ণমালা না পড়ে যেমন ভাষার মন্দিরে ঢোকা যায় না; গীতা না পড়েও তেমনি বিপ্লবীর রাজ্যে সে যুগে প্রবেশ করা যেত না। বিপ্লব-দলে তখন বালক-বয়সে বা প্রথম-কৈশোরেই বিপ্লবীর প্রথম প্রবেশ ঘটত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিজের অজ্ঞাতে সেই বালক কোন প্রিয় সঙ্গীর টানে ধীরে ধীরে এসব দলে ঢুকে যেত। সেখানে শুনত সে নানা আলোচনা। সে সব থাকত সাধারণত ব্রহ্মচর্য পালন, দৈহিক শক্তিসঞ্চয়, দেশ ও জাতিকে ভালবাসা এবং মহৎ আদর্শের প্রতীক মহান ব্যক্তিদের জীবনী ইত্যাদি পাঠ সম্পর্কে। অন্তত চার-পাঁচ বৎসর থাকত এই শিক্ষার কাল। তৎপর শুরু হত সরাসরিভাবে বৈপ্লবিক শিক্ষার অনুশীলন। রাজনীতি-চর্চায় এবং দেশকে ব্রিটিশ-শাসন-মুক্ত করার চেষ্টায় কৃতিত্ব দেখাবার সময় তার এখান থেকেই শুরু। কিন্তু ঐ যে প্রথম দিন হতে যে বালক গীতাপাঠ শুরু করেছে, তাকেই চার-পাঁচ বৎসরের শিক্ষালাভের পর বিপ্লবী গুপ্ত-সমিতিতে ঢুকতে হত গীতা স্পর্শ করে শপথ নিয়ে। দেশের প্রতি এবং দলের প্রতি আনুগত্যের শপথ বিপ্লবীকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাখতে হত। ‘গীতা’ ছিল তাঁর জীবনের অন্তিমকাল পর্যন্ত অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী।

বালক বিপ্লবীর কাছে যে গীতা ছিল একটি অবশ্য পঠনীয় পুস্তক মাত্র, সে গীতাই তরুণ বিপ্লবীর হাতে হয়ে উঠত একটি জ্বলন্ত তরবারি। অর্জুনের ‘গাণ্ডীব’ হয়ে গীতা বিপ্লবীর কাছে আসত। দুর্গম পথের যাত্রায় তাঁকে শক্তি দিত গীতার বাণী; বিশেষ করে গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রত্যেকটি সূত্র, প্রত্যেকটি অক্ষর।

১৮৯৮ সাল। বিচার-প্রহসন সমাপ্ত হল। দামোদর চাপেকারের বিচার। দামোদরের বিরুদ্ধে হত্যাপরাধের চার্জ। র‌্যান্ডসাহেব পুণার প্লেগ-অফিসার। তাঁকে হত্যা করেছেন এই মহারাষ্ট্রীয় বিপ্লবী।

বিদ্রোহী দামোদর চাপেকারের মৃত্যুদণ্ড উচ্চারিত হল কোর্টে। সহাস্যে দামোদর বললেন- “এই মাত্র! আর কিছু নয়?...”

যথানির্দিষ্ট দিনে পুণা শহরে যারদেলা জেলের ফাঁসির মঞ্চে দামোদর চাপেকার আরোহণ করলেন। হাতে তার ভগবদ্গীতা। এই গীতাখানা বন্দীকে পাঠিয়েছিলেন লোকমান্য তিলক তাঁর আশীর্বাদ ভরে দিয়ে। জেলখানায় দামোদরের নিত্য সঙ্গী ছিল এ বইখানা।

ফাঁসিমঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন মৃত্যুঞ্জয়ী বীর প্রশান্ত নয়নে। মৃত্যু আসছে তাঁর দিকে বন্ধুর বেশে, সহচরের আনুগত্যে। কণ্ঠ রোধ করল ফাঁসির নির্মম রজ্জু। ঝুলে পড়ল মৃত্যুহীনের দেহ। কিন্তু হাত থেকে তখনো গীতাখানি খসে পড়েনি।

এইভাবে একটি নয়, একই মার বুক থেকে পর পর তিনটি ভাই ঝরে গেলেন। দামোদর, বালকৃষ্ণ, বাসুদেব -এই তিনটি ভাই। তাঁরা চাপেকার পরিবারের তিনটি সন্তান। বিপ্লবের দলগত সম্পর্কে তাঁরা তিনটি ভাই এবং সতীর্থ। তবে এ ক্ষেত্রে রক্ত থেকেও আদর্শের টান অধিক। সেই আদর্শ হল দেশজননীর মুক্তিকল্পে জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দান। সেই আদর্শ অব্যাহত রাখার শক্তিমূল ঐ গীতার অক্ষরগুলোর মধ্যে।

একই গৃহ থেকে মাত্র তেরটি মাসের ব্যবধানে পর পর তিনটি ভাই আত্মনিবেদন করে গেলেন ইংরেজের যূপকাষ্ঠে। তাঁদের জ্যোতির্ময় রূপ দেশের মানুষকে বিস্মিত করল। কিন্তু শুধু বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে থাকার ব্যক্তি যাঁরা নন, তাঁরা চাইলেন আবিষ্কার করতে- চাপেকার ভ্রাতৃবৃন্দের শক্তি-উৎস কোথায়?

এই জিজ্ঞাসুদের অন্যতমা ছিলেন ভগ্নী নিবেদিতা। মহাযোগী, মহান বিপ্লবী বিবেকানন্দের মানস কন্যা, রবীন্দ্রনাথের ‘লোকমাতা’ ছুটে গেলেন শহর পুণায় শহিদত্রয়ের শক্তি-উৎস সন্ধানে। তাঁকে যে দেখতেই হবে শৌর্যবানদের গর্ভধারিণীর রূপ! চাপেকার গৃহে লোকমাতা প্রবেশ করতেই দেখলেন এক মহিয়সী নারী পূজার আসনে উপবিষ্টা। গৃহদেবতার আরাধনায় সকল সত্তা তাঁর নিমগ্ন। পূজা-অন্তে আলাপ হল দু’জনার। অনুভব করলেন নিবেদিতা যে, এই মহিলা বিরাজ করছেন এক অখণ্ড শান্তির রাজ্যে, আপন শক্তিতে। তাঁর সর্ব শোক-তাপ, দুঃখ-বেদনা ‘নারায়ণ’র পায়ে নিবেদিত। তাঁর ভাল-মন্দ, ইহকাল-পরকাল বিশ্বনিয়ন্তার ধ্যানে সমর্পিত। নিবেদিতা স্পর্শ করলেন চাপেকার-ভাইদের শক্তি-উৎস এই মহিয়সী নারীর মধ্যে। (‘ভারতে সশস্ত্র-বিপ্লব’, পৃঃ ২৮) 

যে সত্য নিবেদিতা সেদিন আবিষ্কার করেছিলেন চাপেকার-ভাইদের শক্তি-উৎস সম্পর্কে, সে সত্য মোটামুটি স্থির হয়ে আছে প্রত্যেকটি শহিদ-জীবনেরই শক্তি-উৎস রূপে। মাতৃভক্তি সে যুগের বিপ্লবীদের মধ্যে নির্ভেজাল ছিল বলেই দেশকে তাঁরা জননীরূপে গ্রহণ করতে পেরেছিলেন। সেই দেশজননীর অপমান অসহ্য হয়েছিল বলেই তাঁর দাসত্ব-শৃঙ্খল ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টায় তাঁরা প্রাণ দিতেন।

এই প্রাণদানের শিক্ষা বড় সামান্য ছিল না। সেই শিক্ষালাভ বিপ্লবীর শুরু হয়েছিল প্রথম দিন থেকে। মন্ত্রের মত অনুপ্রাণিত করত তাঁকে-

ক্লৈব্যং মাস্ম গমঃ পার্থ নৈতৎ ত্বয্যুপপদ্যতে।
ক্ষুদ্রং হৃদয়দৌর্বল্যং ত্যক্ত্বোত্তিষ্ঠ পরন্তপ।। ২/৩

হাজার বছরের বছরের অন্ধকার জাতির জীবনে ক্লীবত্ব এনেছে। এই ক্লীবত্বকে দূর করতে হবে। হৃদয়ের ক্ষুদ্রতা, হৃদয়ের দৌর্বল্য পরিহার করে জাতির প্রতিটি অংশকে জাগ্রত হতে হবে, কর্মোদ্যোগী হতে হবে। গীতার এই বাণী প্রত্যেক বিপ্লবীর কাছেই বরণীয় ছিল। রক্তের অক্ষরে সেই বাণীকে প্রতিষ্ঠিত করার সংকল্প ছিল তাঁদের প্রত্যেকটি পদক্ষেপে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় তাঁদের কামনা ছিল-

আত্ম-অবিশ্বাস তার নাশ কঠিন ঘাতে,
পুঞ্জিত অবসাদভার হান অশনিপাতে।...

বিপ্লবের কর্মীকে এক একজন ‘অর্জুন’ হতে হবে, কুরুক্ষেত্রের অর্জুন। গীতার বাণী মর্ম দিয়ে উপলব্ধি না করতে পারলে সেই অর্জুন বা ‘সব্যসাচী’ হওয়া যায় না।
বিপ্লবের কর্মী শুনলেন-

নাসতো বিদ্যতে ভাবো নাভাবো বিদ্যতে সতঃ।
উভয়োরপি দৃষ্টোঅন্তস্ত্বনয়োস্তত্ত্বদর্শিভিঃ।। ২/১৬

অর্থাৎ শুনলেন তিনি পার্থসারথির কণ্ঠে- “প্রিয়বস্তুর ‘প্রাপ্তিতে’ হর্ষ অথবা ‘অভাবে’ বিষাদ, এই দু’টি বস্তুই ত্যাগ করতে হবে। অসৎ বস্তুর স্থায়িত্ব নেই। সৎ বস্তুর বিনাশ নেই। যাঁরা তত্ত্বদর্শী, তারা সদসৎ উভয় বস্তুরই স্বরূপ উপলব্ধি করেন।” সুতরাং বিপ্লবী বুঝলেন যে, তাঁকে তত্ত্বদর্শী হতে হবে। বিপ্লব-পথের পথিক শুনলেন-

অন্তবন্ত ইমে দেহা নিত্যস্যোক্তাঃ শরীরিণঃ।
অনাশিনোঅপ্রমেয়স্য তস্মাদ্ যুধ্যস্ব ভারত।। ২/১৮

পার্থকে বলছেন পার্থসারথি- ‘আত্মা যে দেহে বাস করেন সেই দেহ নশ্বর। কিন্তু আত্মা অবিনাশী ও নিত্য এবং স্বপ্রকাশিত। অতএব হে অর্জুন, যুদ্ধ কর।’ সুতরাং বিপ্লবীকেও আত্মার অবিনাশিতা ও দেহের নশ্বরত্ব স্মরণ রেখে বীরের মত স্বধর্ম অর্থাৎ ‘বিপ্লবীর ধর্ম’ পালন করতে হবে।
বলছেন গীতার ভগবান-

য এনং বেত্তি হন্তারং যশ্চৈনং মন্যতে হতম্ ।
উভৌ তৌ ন বিজানীতো নায়ং হন্তি ন হন্যতে।। ২/১৯

অথবা

ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোঅয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।। ২/২০

অন্তরের নিভৃতে এই বাণীকে স্পর্শ করতে চাইলেন বিপ্লবী। তিনি বুঝলেন- ‘আত্মা কাউকে হত্যা করেন না, তাঁকে কেউ নিধন করতেও পারে না। কারণ আত্মার জন্ম নেই, মৃত্যুও নেই। আত্মা সৎরূপে নিত্য বিদ্যমান। ইনি শাশ্বত।’

বিপ্লবী তাই মৃত্যুর ভয় করবেন কেন? তাঁর আত্মা তো মৃত্যুহীন। বিপ্লবী বিশ্বাস করলেন গীতার বাণী-

বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহ্নাতি নরোঅপরাণি।
তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী।। ২/২২

মহারাষ্ট্র পেরিয়ে বিপ্লব-বহ্নি এসে অভ্রংলিহ শিখায় জ্বলে উঠল বাঙলা দেশে। ১৯০২ সাল থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত প্রস্তুতিপর্ব। অরবিন্দ বিপ্লবের ঋষি, নিবেদিতা তাঁর সহায়দাত্রী। পি. মিত্র, সরলা দেবী, সতীশ বসু প্রমুখ স্বনামধন্য ব্যক্তিগণ বাঙলার তরুণদের মধ্যে শরীরচর্চা ও দুঃসাহসিকতার শিক্ষাদান করে যাচ্ছেন। অরবিন্দ বিপ্লবী-দল সংগঠনে তৎপর। তাঁর অনুগামী হলেন বারীন ঘোষ, যতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, উল্লাসকর দত্ত, হেম কাননগো, যতীন মুখার্জি এবং আরও কত তরুণবীর।
এই তরুণদলের সম্মুখে ‘আনন্দমঠে’র সাংগঠনিক আদর্শ, কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি। ‘সন্তান’ দলের ত্যাগনিষ্ঠ কর্মযাত্রা তাঁদের উদ্বুদ্ধ করে। আনন্দ-মঠের ঋষি প্রবর্তিত আদর্শে দেশকে ‘বিশ্বজননী’র ক্রোড়ে অবস্থিতা ভারতমাতার ধ্যানে তাঁরা গ্রহণ করেছেন।

সেই ভারতমাতা হলেন তেত্রিশ কোটি ভারতবাসীর সামগ্রিক রূপ; তার মধ্যে রয়েছেন হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান-জৈন-শিখ-পার্সী সকলে; তার মধ্যে রয়েছেন ধনী-দরিদ্র, মজদুর-কিষাণ, ছোট-বড় প্রত্যেকটি নর-নারী। এহেন যে ভারতবর্ষ - তার শৃঙ্খলামুক্তি জীবনের একমাত্র পণ। এই পণ সার্থক করবেন তাঁরা সর্বস্ব দিয়ে ভক্তির অর্ঘ্যে। এক একটি বিপ্লবীকে তাই অর্জন করতে হবে সেই শক্তি, যা দুঃখ-সুখকে সমজ্ঞানে গ্রহণ করে নিঃশেষে আত্মদান করতে তাঁকে সাহায্য করবে। এই তপস্যাপালনে সর্বোত্তম সহায়ক বন্ধুরূপে বিপ্লবী-কর্মীরা গ্রহণ করলেন গীতার বাণী। বিপ্লবীদের মধ্যে যাঁরা সত্যি অবিনাশী আত্মার সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করেছিলেন, যাঁরা যথার্থই নিত্যানিত্য বিবেচক হতে পেরেছিলেন, তাঁরাই ফাঁসিতে গেছেন অথবা নিঃশেষে আত্মত্যাগ করেছেন অবিমিশ্র আনন্দে। তাঁরা বুঝেছিলেন- জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নূতন বস্ত্র পরিধান করার মতই সবার আত্মা জীর্ণ দেহ পরিহার করে নূতন দেহ পরিগ্রহণ করেন। কাজেই সে-সব বিপ্লবী ছিলেন বিগতভয়, অবিচল। [চলবে...]

আরও পড়ুন:- বাংলার বিপ্লববাদ ও গীতা - ২য় পর্ব

 

এইবেলাডটকম/এমআর

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71