বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮
বৃহঃস্পতিবার, ২৯শে অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
বাংলায় পাপেটের জনক শিল্পী শৈল চক্রবর্তীকে জন্মদিন আজ
প্রকাশ: ১০:৪৯ pm ০৬-০২-২০১৭ হালনাগাদ: ১০:৪৯ pm ০৬-০২-২০১৭
 
 
 


পাপিয়া মিত্র : কয়েক বছর আগেও শহরে দেখা যেত পুতুল নাচ। সুতোয় টানা সেই পুতুল এ-দিক ও-দিক তাকায় আর বাজনার সঙ্গে নাচে। ভিড় উপচে পড়া মেলার সে এক ছিল মজার অনুষঙ্গ।

আমাদের দেশে বাজনার সঙ্গে পুতুলনাচ শুরু করেছিলেন শৈল চক্রবর্তী। তবে তিনি একা নন, সঙ্গে ছিলেন আর এক শিল্পী রঘুনাথ গোস্বামীও।

তবে শুধু পুতুলনাচ নয়, কার্টুনশিল্পী, চিত্রশিল্পী, পুতুলশিল্পী ও গ্রন্থকার শৈল চক্রবর্তী প্রায় সারা জীবন ফ্রিল্যান্সিং করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। মাঝে মাঝে আসত কঠিন সময়। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পরিবারকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়তেন। ফিরে আসতেন অফুরন্ত মানসিক উৎসাহ নিয়ে। শুরু করতেন নতুন উদ্যমে কাজ।

শৈল চক্রবর্তী জন্মগ্রহণ করেন হাওড়ার আন্দুল-মৌরিগ্রামে, ১৯০৯-এ। পিতা আন্দুল হাইস্কুলের শিক্ষক উদয়নারায়ণ চক্রবর্তী ও মা রানি চক্রবর্তী। শৈল চক্রবর্তীর পুরো নাম শৈলনারায়ণ চক্রবর্তী। তবে তিনি ‘শ্রীশৈল’ নামেই পরিচিত। আন্দুল হাইস্কুলের ছাত্র হাওড়া নরসিংহ দত্ত কলেজ থেকে অঙ্কে অনার্স নিয়ে পাশ করেন। কলেজে পড়ার সময় থেকেই কলকাতার বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও লেখক-শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ। বন্ধু হিসেবে পাশে পেয়েছিলেন সমর দে, প্রমথ সমাদ্দার ও পরিমল গোস্বামীদের।

শৈল চক্রবর্তী মানেই শিবরাম চক্রবর্তী। সৃষ্টিশীল জগতে অনবদ্য এই জুটি ছিলেন একে অন্যের পরিপূরক। গত শতাব্দীর চারের দশকে আনন্দবাজার পত্রিকায় শারদীয়া সংখ্যায় প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের ‘ল্যাবরেটরি’ ও ‘প্রগতিসংহার’ ছোটগল্পের ইলাস্ট্রেশন করেন শৈলবাবু। ১৯৪০-’৪১ সালে শান্তিনিকেতনের পরিমণ্ডলের বাইরে তিনিই প্রথম রবীন্দ্রসাহিত্যে অলংকরণ করেছিলেন। বাংলায় প্রকাশিত সত্যজিৎ রায়ের প্রথম গল্প ‘বর্ণান্ধ’-র ইলাস্ট্রেশন করেছিলেন শৈল চক্রবর্তী। তা অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ২২ মার্চ, ১৯৪২। এখানেই আরও দু’টি গল্পের ছবি এঁকেছিলেন, ‘Abstractions’ ও ‘Shades of grey’। প্রায় ৩৫ বছর যুক্ত ছিলেন অমৃতবাজার পত্রিকায়। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ভাবনায় তিনি এঁকেছিলেন কলকাতা পুরসভার লোগো। কার্টুন আঁকার শেষে সই করতেন ‘Alias’। এই ছদ্মনামের মধ্যে লুকিয়ে থাকত শৈল। ইংরেজি শব্দটি উল্টে নিলেই হল।

শতবর্ষ পেরিয়েও আজ বাঙালির মনে যে চিত্রশিল্পী জীবন্ত, সেই ‘শ্রীশৈল’ ১৮-১৯ বছর বয়সে হাওড়া থেকে এসে কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের কাছে একটি মেসে ওঠেন। পরে শ্যামবাজারের শ্যামপার্কের কাছে একটি বাড়িতে সংসার-জীবন শুরু করেন। সেখানে বছর আটেক থাকার পরে ১৯৪৫-এ কালীঘাটের সদানন্দ রোডের বাড়িতে বসবাস। ঢাকুরিয়াতে বাড়ি করেন ১৯৫৬-’৫৭ নাগাদ।

এক জন গতিশীল মানুষ বলতে যা বোঝায় শৈল চক্রবর্তী ছিলেন তাই। বহু বছর ব্যঙ্গচিত্র আঁকার পরে কাহিনি সচিত্রকরণের কাজ শুরু করেন। পুস্তক অলংকরণেও পারদর্শী ছিলেন। তিনি নিজের আঁকা কার্টুনকে শিল্প মনে করতেন। মানব-শরীর চিত্রায়নে যে কোনও ভঙ্গিমার অবস্থানে তাঁর রেখা ছিল অনায়াস। তবে শুধু মানব-শরীর নয়, পশুপাখি, ঘরদোর কোনো কিছু বাদ যেত না। এ ক্ষেত্রে ‘রাজযোটক’ ছিলেন শিবরাম-শৈল জুটি। হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন-বিনিদের নাজেহাল অবস্থা, তাদের ছটফটানি, তাদের দুরন্ত গতি যেন বেরিয়ে পড়তে চায় বইয়ের পাতা থেকে। পাশাপাশি তারাশঙ্করের ‘হাঁসুলিবাঁকের উপকথা’, প্রবোধকুমার স্যানালের ‘বনহংসী’-র অলংকরণ দেখলে বোঝাই যায় না এই সবের সৃষ্টিকর্তা সেই-ই শৈল চক্রবর্তী।

srisoilo

বাড়িতে আসতেন শিবরাম চক্রবর্তী। গল্প লেখা হলে পাণ্ডুলিপি হাতে চলে আসতেন। লেখায়-রেখায় জমে উঠত আসর। যোগ দিতেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, মনোজ বসু, সুনির্মল বসু, দীনেশ দাস, আশাপূর্ণা দেবী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, দীপ্তেন্দ্রকুমার সান্যাল, বিজন ভট্টাচার্য, বিমলচন্দ্র ঘোষ সহ আরও অনেকে। বাড়িতে এই আসরের শেষে থাকত পুতুলনাচের আসর। নিজের বাড়িতে তিনি গড়ে তুলেছিলেন একটি সংস্থা,‘পুতুলরঙ্গম’। নিজে পুতুল গড়তেন। সুতোয় টানা ও পুতুলের ভিতরে আঙুল ঢুকিয়ে দু’রকম ভাবে খেলা দেখাতেন তিনি। আত্মীয়স্বজন ও নানা মানুষের সমাগমে শৈল চক্রবর্তীকে ‘পাপেট শো’ করতেই হত। শেষ বয়সে পেন্টিং-এর দিকে ঝুঁকেছিলেন। জল ও তেল এই ছিল মাধ্যম।

পুত্র চিরঞ্জিতের (অভিনেতা) কথায়, “বাবা আমাদের রঙের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে আঁকতে শিখিয়েছেন। ওই আঁকার মধ্যে ইউরোপীয়, চৈনিক, জাপানি আঙ্গিকের মধ্যে মিশে গিয়েছিল যামিনী রায়ও।

নানা খাবার বানানোর হাত ছিল পাকা, সেখানেও থাকত শিল্পের ছোঁয়া। বিজয়া দশমীর জিবেগজা বানাতেন ছেলেদের নিয়ে। লেচি কেটে বেলে তাতে ছুরি দিয়ে নানা কাটিং করে তেলে ভেজে রসে ডুবে যখন উঠত তখন দেখার মতো পশুপাখি প্লেটে আসত।

তাঁর সৃষ্টি ‘বেজায় হাসি’, ‘চিন্তাশীল বাঘ’, ‘ঘটোৎকচ বিজয়’, ‘স্বর্গের সন্ধানে মানুষ’, ‘কার্টুন’, ‘কৌতুক’, ‘যাদের বিয়ে হল’, ‘যাদের বিয়ে হবে’, ‘আজব বিজ্ঞান’, ‘চিত্রে বুদ্ধজীবন কথা’, ‘বেলুন রাজার দেশে’, ‘কালোপাখি’, ‘টুলটুলির দেশে’, ‘কৃপণের পরিণাম’ সহ প্রায় ২৫টি রচিত গ্রন্থ। প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘বেজায় হাসি’। ‘কালোপাখি’, ‘মানুষ এল কোথা থেকে’, ‘গাড়িঘোড়ার গল্প’ ও ‘ছোটদের ক্রাফট’‑ এর জন্য রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছেন চার বার। সুনির্মল বসুর লেখা নিউ থিয়েটার প্রডাকশনের ‘মিচকে পটাশ’ অ্যানিমেশন তাঁরই সৃষ্টি।

আজ সোমবার, ১০৯তম জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানাই অবিস্মরণীয় সেই শিল্পী ও আধুনিক পাপেটের জনককে।

এইবেলাডটকম/এএস

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71