শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮
শনিবার, ১লা পৌষ ১৪২৫
 
 
বিদায় নিচ্ছে কাশফুল আর সাদা মেঘের ঋতু শরৎ
প্রকাশ: ১১:৪১ am ০৯-১০-২০১৭ হালনাগাদ: ১১:৪৮ am ০৯-১০-২০১৭
 
চন্দন কুমার আচার্য
 
 
 
 


শরতের শেষ সময়। যে অনিন্দিত অপরূপ সুরুপা, সুজলা-সুফলা, শষ্য-শ্যামলা, তল্লাটের সতেজ তরতাজা আলো বাতাসের আদর মাখা পরশে আমার সুঢাম দেহের মাংশপেশী সুগঠিত ও মজবুত হয়েছে, যে বঙ্গ জননীর অতুলনীয় মাতৃস্নেহে নিবিড় পরিচর্চায় অমিয় পানীয় শিশুজাত সুষম খাদ্য বুকের দুধ পান করে আমি সবল হয়েছি, সেই আকাশ বাতাস, মাটি, মাতৃভূমি। বাংলা ঋতুর হিসাব অনুযায়ী ভাদ্র-আশ্বিন এই দুই মাস শরৎকালের রাজত্ব। ঋতুচক্রের বর্ষ পরিক্রমায় শরতের আগমন ঘটে বর্ষার পরই। বর্ষার বিষন্নতা পরিহার করে শরৎ আসে। বলা হয়, শরতের রূপ শান্ত-স্নিগ্ধ-কোমল। যেখানে মলিনতা নেই, আছে নির্মল আনন্দ আর অনাবিল উচ্ছ্বাস। কবি জীবনানন্দের ভাষায়, ‘যৌবন বিকশিত হয় শরতের আকাশে’। মহাকবি কালিদাসের ভাষায়, প্রকৃতি এ সময় নববধূর সাজে সজ্জিত হয়ে উঠে। শরতের মেঘহীন নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা কেড়ে নেয় প্রকৃতি প্রেমিকদের মন। এতে মুগ্ধ হয়েছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও।  

বিলে শাপলা, গাছে গাছে শিউলির মন মাতানো সুবাস অনুভূত হয় শরতের ছোঁয়া। প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আলোড়িত করেছিল শরতের প্রকৃতি। পল্লী কবি জসীমউদ্দীন তাই শরতকে দেখেছেন ‘বিরহী নারী’হিসেবে। মধ্যযুগের কবি চন্ডীদাসের বিখ্যাত উক্তি 'এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর'। এখানে কবি ভাদ্র মাসের চিরাচরিত রূপ তুলে ধরেছেন। কবির দক্ষ হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় কবিতাটি অসাধারণত্ব লাভ করেছে। মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা নর-নারীর অব্যক্ত মনের বেদনার কথাই কবি এখানে বলেছেন। 

শরতে শেফালি, মালতী, কামিনী, জুঁই আর টগর মাথা উঁচিয়ে জানান দেয় সৌন্দর্য। মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে দেয় চার পাশে। গ্রাম-বাংলায় শরৎ আসে সাড়ম্বরে। যদিও  ইট-কাঠের নগরীতে শরৎ থেকে যায় অনেকটা অন্তরালে। আবার, এই শরতেই হয়ে থাকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। বাংলা ঋতুচক্রে শরৎ তৃতীয়। বর্ষার পরপর এই ঋতুর আগমন ঘটলেও আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস পুরোপুরি কাটিয়েও বাঙালির জীবন ও প্রকৃতি থেকে বর্ষা পালায় না; বরং সে থাকে আরো মাস দুয়েক। আশ্বিন পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। 

বসন্ত যেমন আড়ম্বর করে আসে, হইহই করে যায়। একদিকে বর্ষাকে বিদায় দিতে দিতে, অন্যদিকে শীতকে অভ্যর্থনা জানাতে জানাতে সে হারিয়ে যায় ঋতুচক্রে। প্রবল বর্ষা নিয়ে আজ শরতের আগমন। কদিন ধরেই বৃষ্টি হচ্ছে। কখনো ঝিরিঝিরি বা মুষলধারায়। এবার অতিরিক্ত জলধারা নিয়ে এল যে শরত, তা যেন ভাসিয়ে নিয়ে না যায় দেশ। ডুবে যাওয়া উত্তরাঞ্চল ভেসে উঠুক সহসা- এটাই প্রার্থনা। শরৎ প্রকৃতির  মধ্যে একটা আলো-আঁধারি ভাব লক্ষণীয়। রৌদ্র-ছায়ায় খেলা সারাক্ষণ চলতে থাকে। এর স্বরূপ প্রকৃতি বোঝা মুশকিল। এই স্বভাব প্রকৃতির সঙ্গে যেন বাঙালি চরিত্র অন্বিষ্ট হয়ে আছে। বাঙালি জাতি এমনিতেই বহুমিশ্র প্রানের সমবায়ে গড়ে উঠেছে। নানান জাতির মিশ্রন সঙ্কর সৃষ্টি হিসেবে পরিচিতি পায়। এদের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য বহুবর্ণিল অবয়ব নিয়ে গঠিত। কোমল-কঠোর ও তিক্ত মধুর স্বভাব নিয়ে আবির্ভূত হয়। কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা বুঝে ওঠা কঠিন। নির্দিষ্ট কোনো চরিত্রে এদের সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। শরৎ প্রকৃতির মধ্যেও অনুরূপ ভাব প্রবণতা লক্ষণীয়। অনেকে আবার শরৎ ঋতুর সঙ্গে শিশু প্রকৃতির অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন। মেঘ-বৃষ্টি-রোদ মিলিয়ে একটা কান্না-হাসির ভাব অভিব্যক্তি লাভ করে। নির্মল দুরন্তপনায় গভীর কোনো চিহ্ন নেই। এক প্রকার স্বর্গীয় সুষমা প্রতিভাত হয়ে ওঠে এবং সবাইকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। একপ্রকার বিরাগী সুরের হাতছানিতে কাছে ডাকে। 

রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত চমৎকারভাবে শরতের এই ভাবভঙ্গিমা প্রসঙ্গে বলেন- ‘আমাদের শরতের নীল চোখের পাতা দেউলে হওয়া যৌবনের চোখের জলে ভিজিয়ে উঠে নাই। আমার কাছে আমাদের শরৎ শিশুর মূর্তি ধরিয়া আসে। সে একেবারে নবীন। বর্ষার গর্ভ হইতে একেবারে জন্ম লইয়া ধরণী ধাত্রীর কোলে শুইয়া সে হাসিতেছে। ... বলিতেছিলাম শরতের মধ্যে শিশুর ভাব। তার এই হাসি এই কান্না। সেই হাসিকান্নার মধ্যে কার্যকারণের গভীরতা নাই। তাহা এমনি হালকাভাবে আসে এবং যায় যে কোথাও তার পায়ের দাগটুকু পড়ে না। জলের ঢেউয়ের উপরটাতে আলোছায়া ভাইবোনের মতো যেন কেবলই দুরন্তপনা করে অথচ কোনো চিহ্ন রাখে না শরৎ। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে মুগ্ধপ্রাণ প্রকৃতি কেবলই আবেশ ছড়িয়ে দেয়। এর কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। আনন্দযজ্ঞের এই লীলানিকেতন বাংলাদেশে একের পর এক ঋতুর আগমন ঘটে। এর মধ্যে শরতের আবির্ভাব সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বটে। বিভিন্ন কারণে শরৎ আমাদের জীবনে তাৎপর্য বয়ে আনে। প্রকৃতিপ্রাণতা জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। 

এ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, ধর্ম-কর্ম, শাস্ত্র-সংবেদ, শিক্ষা-দীক্ষা, জীবনযাপন- প্রায় সব কিছু জুড়েই প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য জড়িয়ে আছে। এ দেশের জাতিগত কৃষ্টি-সংস্কৃতিও অনেকাংশে এর ওপর নির্ভরশীল। ঋতুবৈচিত্রের বহুবর্ণিল আবহ সমাচ্ছন্ন হয়ে আছে। স্বচ্ছ-সুনীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়ায়। কেমন একটা হালকা চালে হালকা ভাব নিয়ে ওড়াউড়ি চলে। ভারবিহীন মুক্ত জীবনের ইশারায় প্রকৃতিপ্রাণ মুখর হয়ে ওঠে। নদীতীরে সারি সারি কাশফুলের মন মাতানো ঢেউ এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করে। শরৎ আমাদের মধ্যে একটা মুক্তির বার্তা নিয়ে আসে। ঘনঘোর বর্ষার অবরোধদশা, দুর্যোপ্রবণ বিচ্ছিন্নতা ও বিরহবিধুর অবস্থা কাটিয়ে শরৎ যেন আশ্বাসের পাখায় ডানা মেলে। এ সময় প্রকৃতির বুকে এক অন্যরকম আবহ-অবিস্মৃতি লক্ষ করা যায়। মাঠে মাঠে পক্বপ্রায় ধানক্ষেতের দিকে তাকিয়ে কৃষককুল আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়। প্রতীক্ষার প্রহর যেন শেষ হয়ে আসে। কৃষক-কৃষাণী মিলে গোলায় ধান তোলার প্রস্তুতি নেয়। এ সময় গ্রামবাংলায় হালকা শীতের বিকেল নেমে আসে। মাঠে-ঘাটে ছেলের দল ঘুড়ি ওড়াউড়ি-কাটাকাটি নিয়ে মেতে ওঠে। এপাড়া-ওপাড়া মিলে একটা উৎসবমুখর প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। তা ছাড়া শিউলিঝরা শিশিরসিক্ত খোলা রোদ মাখানো সকালবেলার কথা বিস্মৃত হওয়ার মতো নয়। সে এক স্নিগ্ধ পরিবেশ। সেখানে শিশিরস্নাত ছেলে-মেয়ের দল শিউলি ফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথতে বসে যায়। এ সময় হালকা শীতের মনোরম আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। 

প্রকৃতির মধ্যে একটা মৃদু শিহরণ লক্ষ করা যায়। গাছের পাতায় সেই কম্পনের খবর পৌঁছে যেতে থাকে।  শরতের এই ঐতিহ্যিক আগমনে এ দেশের প্রাণ বারবার জেগে ওঠে। শত প্রকার বাধাবিপত্তি বা দুঃখ-দারিদ্র্যও তাদের উৎসববিমুখ করতে পারে না। এ এক প্রকার ঐতিহ্যিক আত্মতৃপ্তি। শরতের আগমন যেন তা-ই আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়। ভিন্নতার একটা আমেজ আহ্বান আমাদের কেবলই হাতছানি দিয়ে যায়। উৎসবের নিবিড় একাত্মতা একটি বিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। সবাই আপন আপন স্বভাবের কাছে স্থিতি লাভ করবে। 

বিএম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71