মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ২৯শে কার্তিক ১৪২৫
 
 
বিশিষ্ট নাট্যকার উৎপলরঞ্জন দত্তের ৮৮তম জন্ম বার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ০৪:৫২ pm ২৯-০৩-২০১৭ হালনাগাদ: ০৪:৫২ pm ২৯-০৩-২০১৭
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

অভিনেতা, লেখক এবং বিশিষ্ট নাট্যকার উৎপলরঞ্জন দত্ত ( জন্মঃ- ২৯ মার্চ, ১৯২৯ - মৃত্যুঃ- ১৯ আগস্ট, ১৯৯৩ )

কলেজ জীবনেই অভিনয় শুরু করে দেন উৎপল। ১৯৪৭ সালে নিকোলাই গোগোলের 'ডায়মণ্ড কাট্‌স্‌ ডায়মণ্ড' এবং মলিয়েরের 'দ্য রোগারিজ অফ স্ক্যাপাঁ' দিয়েই তাঁর কলেজ জীবনের অভিনয় শুরু। নাটক দুটি প্রযোজনা করেছিল কলেজের ইংরেজি অ্যাকাডেমি এবং পরিচালনায় অধ্যাপক ফাদার উইভার। ক্রমশ উৎপল ও কলেজের কয়েকজন সহপাঠী মিলে গড়ে তোলেন একটি নাট্যদল - 'দি অ্যামেচার শেক্‌স্‌পিয়ারিয়ান্‌স্‌'। তাদের প্রথম উপস্থাপনা 'রোমিও অ্যাণ্ড জুলিয়েট' এবং ম্যাকবেথ নাটকের নির্বাচিত অংশ। সেই সময়েই, ১৯৪৭-এর অক্টোবরে, ইংলণ্ডের বিখ্যাত পরিচালক ও অভিনেতা জেফ্রি কেণ্ডাল তাঁর 'শেক্‌স্‌পিয়ারিয়ানা' নাট্যদল নিয়ে ভারত সফরে আসেন। কেণ্ডালের আহ্বানে উৎপল যোগ দেন সফররত সেই নাট্যদলে। ১৯৪৭-এর অক্টোবর থেকে জানুয়ারি ১৯৪৮ পর্যন্ত শেক্‌স্‌পিয়ারিয়ানা নাট্যদল কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে তাদের প্রযোজনা মঞ্চস্থ করে। নাট্যমোদীরা অভিভূত হয়। জেফ্রি কেণ্ডালের দলে তখন উৎপল নিয়মিত অভিনয় করেছেন। ইউরোপীয় থিয়েটার দলের শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা উৎপলের নাট্যজীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। কেণ্ডালের কাছেই শিখেছিলেন - There is no art without discipline and no discipline without sacrifice. তাঁর কাছেই উৎপল পেয়েছেন শেক্‌স্‌পীয়রের নাটক অভিনয় করবার বিশেষ শিক্ষা।

এই সময়েই কেণ্ডাল-কন্যা জেনিফারের সঙ্গে উৎপলের পরিচয়। অচিরেই যার উত্তরণ ঘটে প্রণয়ে। পরবর্তীতে জেনিফারের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটলে তীব্র কষ্ট উৎপলের। সে দহনের রেশ ছিল আজীবন। জেনিফারের সম্পর্ক মনে রেখে একাধিক কবিতাও লিখেছেন নাট্যকার। কবিতা, সহধর্মিণী শোভা সেনের কথন অনুযায়ী, উৎপলের কাছে ছিল ব্যক্তিগত আবেগ অনুভূতি অথবা কোনও তাৎক্ষণিক বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যম।

জেফ্রি কেণ্ডালকে 'গুরু' মেনে 'শেক্‌স্‌পিয়ারিয়ানা' দলে যোগ দিলেও উৎপল তাঁদের নিজস্ব নাট্যদল 'দি অ্যামেচার শেক্‌স্‌পিয়ারিয়ান্‌স্‌' তুলে দেননি। বরং মাঝে মধ্যেই শেক্‌স্‌পিয়ার, বার্নাড শ, শেরিডান, প্রিস্টলি, নোয়েল কাওয়ার্ডের নাটক মঞ্চস্থ করেছেন তারা। এবং সেই সময়েই উৎপল দত্ত অভিনেতা হিসাবে কলকাতার নাট্যসমালোচকদের স্বীকৃতি পেয়েছেন। এই পথে চলেই ১৯৪৯ সালের শেষ দিকে, কবি-গায়ক দিলীপ রায়ের প্রস্তাব মতো, উৎপলরা তাদের দলের নাম বদলে রাখেন লিটল থিয়েটার গ্রুপ - এল টি জি। ততদিনে কুড়ি বছরের সদ্যযুবা উৎপল ঠিক করে ফেলেছেন তিনি নাটক-অভিনয়ের জগতেই থাকবেন। সমাজের পরিবেশ তখন কেমন? বিশ্বের অঙ্গনে সোভিয়েত রাশিয়ার মতাদর্শের অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি। সঙ্গে যোগ দিয়েছে মাও-সে-তুঙের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্নকারী চীন। এদিকে দেশ স্বাধীন হবার সাতমাসের মাথায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত। পার্টির নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন সাংস্কৃতিক কর্মীদেরও রেহাই নেই। মার্কসবাদী দর্শনে আকৃষ্ট উৎপলের মনোভঙ্গী কলেজ পত্রিকায় প্রকাশিত - 'সময় এগিয়ে চলে, এমন কি শরৎচন্দ্রের যুগও অতিক্রান্ত হতে চলেছে। নতুন প্রজন্মের মৃত্যুর বিরুদ্ধে জেহাদ, তাদের কাব্যলক্ষ্মী হলেন শ, লরেন্স, জয়েস এবং হাক্সলি। ম্যাঞ্চেস্টার এবং স্তালিনগ্রাদ তাদের দুর্গ; ডাস ক্যাপিটাল তাদের নতুন বেদ। তাদের আনুগত্য তথ্যের প্রতি, আঙ্গিকের আতিশয্যের বিরুদ্ধে তাদের চ্যালেঞ্জ। রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটছে সাহিত্যে, শ্রেণীসংগ্রামে এবং শোষিত বঞ্চিতের মহাক্ষুধায় । '

ইংরেজি নাটক প্রযোজনার পাশাপাশি লিটল থিয়েটার গ্রুপ শুরু করে বাংলা নাটক। পঞ্চাশের দশকে এল টি জি মঞ্চে উপস্থাপিত করে রবীন্দ্রনাথের নাটক - অচলায়তন, কালের যাত্রা, গুরুবাক্য, সূক্ষবিচার, তপতী। ক্রমশ উৎসারিত হয় ঐতিহাসিক সব প্রযোজনা - অঙ্গার, ফেরারি ফৌজ, কল্লোল, অজেয় ভিয়েতনাম, তীর। পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ সংকটে এল টি জি ভেঙে যায়। প্রিয় মঞ্চ মিনার্ভা থিয়েটার ছাড়তে হয়। ১৯৭০ সালের ২২ এপ্রিল, লেনিনের জন্মদিনে, মিনার্ভায় এল টি জি'র শেষ নাট্যাভিনয় - লেনিনের ডাক। এরপরে জন্ম নেয় পিপল,স, লিটল থিয়েটার - পি এল টি। ১৯৭১ থেকে শুরু হয় তাদের নিয়মিত প্রযোজনা। আবারও মানুষজনকে অভিভূত করে সেইসব অসামান্য নাটক, অভিনয় - টিনের তলোয়ার, সত্যজিৎ রায়ের মতে, ভারতীয় থিয়েটারের সর্বোচ্চ শিখর।

একথা অনেকেরই জানা, 'কল্লোল' মঞ্চস্থ হবার পর, বিশেষত উৎপল নকশালবাড়ির সংগ্রামের সমর্থনে পশ্চিমবাংলার এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াবার কারণে, বাজারি সংবাদপত্রগুলি কল্লোলের বিজ্ঞাপন ছাপা বন্ধ করে দেয়। এমন কী সি পি এমের মুখপত্র 'দেশহিতৈষী'ও একসময় সে বিজ্ঞাপন ছাপেনি। এরপরে 'তীর' নাটক, যা নকশালবাড়ি আন্দোলনের সমর্থনে লিখিত, উপস্থাপিত হবার কালে উৎপল দত্তকে বোম্বাই থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। দিন দশেকের মধ্যে মুচলেকার বিনিময়ে ছাড়া পান নাটককার। উৎপল চলে যান রাজস্থান - একটি আন্তর্জাতিক প্রযোজক সংস্থার 'গুরু' চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে। এই ঘটনায় প্রবল বিতর্কের সূত্রপাত। নকশালপন্থীদের মতে এ উৎপলের বিশ্বাসঘাতকতা। এল টি জি উৎপল এবং তাঁর স্ত্রী শোভাকে বহিষ্কার করে। কিছুকাল পরে উৎপল-অনুরাগীরা বোঝাবার চেষ্টা করেন এ ছিল তাঁর কৌশল। পরবর্তীকালে উৎপল তাঁর 'Towards a Revolutionary Theatre' গ্রন্থে এমন ধারণা গড়বার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছেন ।

উৎপল দত্ত প্রথম দিকে বাংলা মঞ্চনাটকে অভিনয় করতেন। তিনি শেক্সপিয়ার আন্তর্জাতিক থিয়েটার কোম্পানির সাথে ভ্রমণ করেছেন বেশ কয়েকবার। তাঁকে গ্রুপ থিয়েটার অঙ্গনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের অন্যতম হিসাবে গন্য করা হয়। কৌতুক অভিনেতা হিসাবেও তাঁর খ্যাতি রয়েছে। তিনি কৌতুক চলচ্চিত্র গুড্ডি, গোলমাল ও শৌখিনে অভিনয় করেছেন। তিনি সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় হীরক রাজার দেশে, জয় বাবা ফেলুনাথ এবং আগন্তুক সিনেমায় অভিনয় করেছেন । রাজনৈতিক দর্শনের দিক থেকে তিনি ছিলেন বামপন্থী ও মার্ক্সবাদী ।

উৎপল দত্তের বিখ্যাত নাটকের মধ্যে রয়েছে টিনের তলোয়ার, মানুষের অধিকার ইত্যাদি ।

১৯৯৩ খ্রীস্টাব্দের ১৯শে আগস্ট তিনি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন ।

উৎপলরঞ্জন দত্তের জন্ম পূর্ববঙ্গের কীর্তনখোলায়। পিতা গিরিজারঞ্জন দত্ত এবং মাতা শৈলবালা দেবী। পড়াশুনা শিলঙের এডমণ্ড্‌স স্কুল হয়ে কলকাতার সেন্ট লরেন্স, সেন্ট জেভিয়ার্স। কলেজ - সেন্ট জেভিয়ার্স। ১৯৪৮-এ ইংরেজি অনার্স নিয়ে স্নাতক। কলেজের ছাত্রদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন উৎপল। সে বছর বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে ইংরেজি অনার্সে তাঁর স্থান পঞ্চম। স্কুল জীবনেই বাবা-মা'র সঙ্গে পেশাদারি থিয়েটার দেখা শুরু। এবং প্রথম দর্শনেই প্রেম - 'সেইসব মহৎ কারবার দেখে মনে হ'ল, আমার পক্ষে অভিনেতা ছাড়া আর কিছুই হবার নেই। আমার বয়স তখন তেরো'।

উৎপল দত্ত নিজের সম্পর্কে বলেছিলেন - 'আমি শিল্পী নই। নাট্যকার বা অন্য যে কোনো আখ্যা লোকে আমাকে দিতে পারে। তবে আমি মনে করি আমি প্রপাগাণ্ডিস্ট। এটাই আমার মূল পরিচয়। '

উৎপল দত্ত রচিত নাটকের তালিকা

এই তালিকাটি অসম্পূর্ণ হতে পারেঃ
দিল্লী চলো
ছায়ানট(১৯৫৮)
অঙ্গার(১৯৫৯)
ফেরারী ফৌজ(১৯৬১)
ঘুম নেই(১৯৬১)
মে দিবস(১৯৬১)
দ্বীপ(১৯৬১)
স্পেশাল ট্রেন(১৯৬১)
নীলকন্ঠ(১৯৬১)
VIP (১৯৬২)
মেঘ(১৯৬৩)
রাতের অতিথি(১৯৬৩)
সমাজতান্ত্রিক চাল(১৯৬৫)
কল্লোল(১৯৬৫)
হিম্মৎবাই(১৯৬৬)
রাইফেল(১৯৬৮)
মানুষের অধিকার(১৯৬৮)
জালিয়ানওয়ালাবাগ(১৯৬৯)
মাও সে তুং(১৯৭১)
পালা-সন্ন্যাসীর তরবারি(১৯৭২)
বৈশাখী মেঘ(১৯৭৩)
দুঃস্বপ্নের নগরী(১৯৭৪)
সীমান্ত
পুরুষোত্তম
শৃঙ্খল ঝঙ্কার
জনতার আফিম
পাণ্ডবের অজ্ঞাতবাস
মধুচক্র
প্রফেসর মামালক
শোনরে মালিক
সমাধান
অজেয় ভিয়েতনাম
তীর
ক্রুশবিদ্ধ কুবা
নীলরক্ত
লৌহমানব
যুদ্ধং দেহি
লেনিনের ডাক
চাঁদির কৌটো
রক্তাক্ত ইন্দোনেশিয়া
মৃত্যুর অতীত
ঠিকানা
টিনের তলোয়ার
ব্যারিকেড
মহাবিদ্রোহ
মুক্তিদীক্ষা
সূর্যশিকার
কাকদ্বীপের এক মা
ইতিহাসের কাঠগড়ায়
কঙ্গোর কারাগারে
সভ্যনামিক
নয়াজমানা
লেনিন কোথায়
এবার রাজার পালা
স্তালিন-১৯৩৪
তিতুমির
বাংলা ছাড়ো
দাঁড়াও পথিকবর
কৃপান
শৃঙ্খলছাড়া
মীরকাসিম
মহাচীনের পথে
আজকের শাজাহান
অগ্নিশয্যা
দৈনিক বাজার পত্রিকা
নীল সাদা লাল
একলা চলো রে
লাল দূর্গ
বণিকের মাণদন্ড
এংকোর (অনুবাদ গল্প)

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71