সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮
সোমবার, ২৬শে অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
বিস্মৃত ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’
প্রকাশ: ১০:২৭ pm ১৪-০২-২০১৬ হালনাগাদ: ১০:৪২ pm ১৪-০২-২০১৬
 
 
 


বীরেন্দ্রনাথ অধিকারী: ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩। এ দিন সামরিক স্বৈরাচারের শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খান প্রণীত গণবিরোধী শিক্ষানীতি বাতিল, ছাত্রবন্দীদের মুক্তি ও দমননীতি বন্ধ এবং গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর গগনবিদারী শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠে রাজপথ। তখনকার ১১টি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এই আন্দোলনের ডাক দেয়।

তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত বটতলায় ওই দিন বেলা ১০টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, ঢাকা শহর এবং আশেপাশের এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ছাত্ররা জমায়েত হতে থাকে। ছাত্রনেতাদের বক্তৃতাপর্ব শেষে শুরু হয় মিছিল, লক্ষ্যস্থল সচিবালয়। মিছিল পরিচালনার জন্য ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ ছাত্র সংগঠনের প্রতিটি থেকে বাছাইকৃত ১০ জন করে ছাত্রনেতা– মোট ১১০ জনের একটি স্বেচ্ছাসেবী টিম গঠন করা হয়। কারণ আন্দোলনকারীদের কাছে আগে থেকেই খবর ছিল, মিছিলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং নাশকতার মাধ্যমে আন্দোলন ভণ্ডুল করার জন্য সামরিক শাসক তার বিভিন্ন বাহিনী ও এজেন্ট নিয়োগ করেছে।

তাই স্বেচ্ছাসেবীদের দায়িত্ব ছিল, চারদিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টি রাখা, যাতে করে মিছিলে কোনো দুষ্কৃতিকারী ঢুকে পড়তে না পারে এবং মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের কেউ যেন কোনো প্রকার উস্কানিমূলক ও হঠকারী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না হতে পারে। এভাবে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই বাঁধভাঙা স্রোতের বেগে মিছিল দুর্বার গতিতে টিএসসি, পরমাণু শক্তি কমিশন, বাংলা একাডেমী, তিন নেতার মাজার এবং দোয়েল চত্বর পেরিয়ে কার্জন হল ও শিশু একাডেমির মাঝামাঝি রাস্তা দিয়ে শিক্ষা ভবনের অনেকটা কাছাকাছি চলে যায়।

দুপুর গড়িয়ে তখন সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে। প্রদীপ্ত যৌবনে প্রগতির ঝাণ্ডা হাতে উদ্দীপ্ত আন্দোলনকারীদের তেজস্বীতা ক্রমে বেড়েই চলেছে। যৌবনের উত্তাপ ছিল বটে, ছিল না বিন্দুমাত্র বিশৃঙ্খলা। মিছিলের স্রোত হাইকোর্টের প্রধান ফটক থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে। সামনেই শিক্ষা ভবনের গোটা এলাকাজুড়ে শত শত সাঁজোয়া বাহিনীর সদস্য। বিনা উস্কানিতে অতর্কিতে তারা মিছিলকারীদের উপর টিয়ার শেল নিক্ষেপ শুরু করে।

তরুণরা নিরস্ত্র বটে, চেতনায় উজ্জীবিত যৌবন যাদের, তারা নিজেরাই তখন একেকটা উদগীরিত বারুদ। তাই সঙ্গিন কামান তুচ্ছজ্ঞানে সম্মুখপানে তাদের যাত্রা অবিরত রাখে। একটু সামনেই কাঁটাতারের বেষ্টনী তারা মুহূর্তের মধ্যেই উৎপাটন করে ফেলে। উর্দিওয়ালারা ক্ষিপ্ত হয়ে মুহুর্মুহু গুলি চালানো শুরু করে। নিরস্ত্র আন্দোলনকারীরা রাস্তায় পড়ে থাকা ইট ও পাথরখণ্ড ছুঁড়ে গুলির জবাব দেবার দেষ্টা চালায়। কিন্তু বন্দুকের গুলির মুখে তা কতক্ষণ এবং কী করে সম্ভব?

দেখতে দেখতে মিছিলকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে বাধ্য হয়। তারা রাস্তার এক দিকে কার্জন হল এবং অন্যদিকে হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে ঢুকে পড়ে গুলি থেকে প্রাণ বাঁচায়, চোখ-মুখে পানি দিয়ে কাঁদুনে গ্যাসের প্রকোপ দূর করে এবং যথাসম্ভব প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা চালায়। এরই মধ্যে কয়েকজন গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তাদের লাশ গেস্টাপো বাহিনী টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে গুম করে ফেলে।

১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কতজন আত্মাহুতি দেয় তার হদিস এবং তাদের সকলের নাম আজও অজানা রয়ে গেছে। কেবলমাত্র জাফর, জয়নাল, মোজাম্মেল, আইয়ুব, কাঞ্চন এবং দীপালি সাহা– এই কজন শহীদের নাম জানা গিয়েছিল। আশির দশকে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে এটাই প্রথম আত্মাহুতিদানের ঘটনা।
আন্দোলন স্তব্ধ করে দিতে সামরিক শাসক দেশজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। আন্দোলনকারীরা অনেকেই আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হয়। তবে নিরবচ্ছিন্নভাবে সেনাশাসকের বিরুদ্ধে তাদের গোপন তৎপরতা চলতে থাকে। আস্তে আস্তে মূল রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্রিত হয়ে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করতে থাকে।

১৯৮৪ সালের উপজেলা নির্বাচন কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী ২২ দল এক হয়ে সে নির্বাচন বর্জনের ডাক দেয়। ২২ দল ওই বছর ১ মার্চ নির্বাচনের বিরুদ্ধে হরতালের ডাক দেয়। সে সময় আন্দোলন-সংগ্রামের মূল শক্তি ছিল ছাত্র সংগঠনগুলো। তাই হরতালের সমর্থনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২৮ ফেব্রুয়ারি শান্তিপূর্ণ মিছিলের আয়োজন করে। স্বৈরাচারের পুলিশ বাহিনী সেই মিছিলের উপর দিয়ে ট্র্যাক চালিয়ে তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দুই নেতা ইব্রাহীম সেলিম এবং কাজী দেলোয়ার হোসেনকে হত্যা করে।

আর স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালনের প্রস্তুতিকালে ১৯৮৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি শাসকগোষ্ঠীর লেলিয়ে দেওয়া গুণ্ডাবাহিনী খুব কাছ থেকে লক্ষ্যভেদী গুলি চালিয়ে তৎকালীন জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক রাউফুন বসুনিয়াকে হত্যা করে।

পরপর দু’বছরে সেলিম, দেলোয়ার ও বসুনিয়ার আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। মূল রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনের কর্মসূচি পালন শুরু করে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বিরোধী শিবিরের একাংশ অংশগ্রহণ করে এবং অন্য অংশ অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। অল্প কিছু দিনের মধ্যে বিরোধী দল সংসদ থেকে পদত্যাগ করে এবং সকল বিরোধীদল যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি পালন করতে থাকে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর, আওয়ামী লীগকর্মী নূর হোসেন বুকে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ এবং পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ শ্লোগান লিখে রাজপথের আন্দোলনে অংশ নিলে, পুলিশের গুলিতে নিহত হন।

নূর হোসেন শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আরও সুসংহত হয়। আন্দোলনের অংশ হিসেবে সকল মূল বিরোধী দল ১৯৮৮ সালের নির্বাচন বর্জন করে। এভাবে ক্রমবেগবান আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর সরকারের লেলিয়ে দেওয়া গুণ্ডাবাহিনীর গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ডা. শাসমুল আলম খান মিলন নিহত হন।
এই হত্যাকাণ্ডের খবর মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে। কিন্তু বিভিন্ন হলের ছাত্রছাত্রীরা জরুরি আইন ভঙ্গ করে রাতে ক্যাম্পাসে মিছিল সমাবেশ করে। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সরকারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের দখলে চলে যায়। এভাবে ডা. মিলনের শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে তৎকালীন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক দফার গণআন্দোলন ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং পরিশেষে স্বৈরাচারের পতন ঘটে।

মূলত ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’-এর পথ বেয়েই ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারের পতন ঘটে, সুগম হয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ। কিন্তু মাত্র ৩৩ বছর আগের সেই রক্তস্নাত তেজোদ্দীপ্ত আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নাম-জানা ও না-জানা অসংখ্য শহীদের আত্মদান আজ বিস্মৃত বলেই মনে হচ্ছে। কারণ আজকাল ১৪ ফেব্রুয়ারি মহাধুমধামে ‘ভালোবাসা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। এ নিয়ে আমাদের মাতামাতিও দোষের কিছু নয়। তাই বলে ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে ১৪ ফেব্রুয়ারির যে মাহাত্ম্য ছিল তাকেও তো অবহেলা করা যায় না।

লেখক পরিচিত:  মুক্তিযোদ্ধা ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ।
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71