বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বৃহঃস্পতিবার, ৫ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
বেগম জিয়ার বিলম্বিত লন্ডন সফরের নেপথ্যে
প্রকাশ: ০৯:১৯ pm ২২-০৯-২০১৫ হালনাগাদ: ০৯:১৯ pm ২২-০৯-২০১৫
 
 
 


আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী: বাংলাদেশের রাজনীতির তীর্থকেন্দ্র এখন তিনটি- লন্ডন, রিয়াদ ও সিঙ্গাপুর। অধুনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা শারীরিক চিকিৎসা কিংবা রাজনৈতিক চিকিৎসা- এই দুয়ের জন্যই এ তিনটি তীর্থস্থানের কোনো একটিতে যান। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বেশির ভাগ সময় সৌদি আরবের রিয়াদে যেতেন। এবার লন্ডনমুখী হয়েছেন। এর আগে তাঁর রিয়াদে যাওয়ার কথা ছিল, যাননি। লন্ডনে আসার কথা ছিল, আসেননি। গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকালে তিনি লন্ডনে এসেছেন। হিথরো বিমানবন্দরে দলের নেতাকর্মীরা তাঁকে সাদর সংবর্ধনা জানিয়েছে। ছেলে তারেক রহমান তাঁকে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে হোটেলে নিয়ে গেছেন।

খালেদা জিয়ার এবারের লন্ডন সফরকে কেন্দ্র করে একটা ক্যাট অ্যান্ড মাউস বা বিড়াল ও ইঁদুরের খেলাও হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের লন্ডন সফরের সময় বিএনপির যুক্তরাজ্য শাখার নেতাকর্মীরা তাঁর হোটেলের সামনে বিক্ষোভ দেখায় এবং অশোভন আচরণও করে। এখন খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরের সময় যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকরা অনুরূপ বিক্ষোভ দেখাবে- এই ভয়ে হিথরো বিমানবন্দরে একটি ভিআইপি লাউঞ্জ ভাড়া করা হয় এবং অন্যপথে তাঁকে বিমানবন্দর থেকে বের করে আনা হয়।

তা ছাড়া বিক্ষোভকারীরা যাতে তাঁর হোটেলের সামনে জমায়েত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনের সুযোগ না পায়, সে জন্য লন্ডনের একাধিক অভিজাত হোটেলে খালেদা জিয়ার নামে কক্ষ বুকিং দেওয়া হয়েছিল। যেমন- বিমানবন্দরের কাছাকাছি সফিটেল হোটেল, পূর্ব লন্ডনে ক্যানারি ওয়ার্কের র‌্যাডিসন এবং পশ্চিম লন্ডনের একটি হোটেল। ফলে তিনি কোথায় উঠেছেন, এটা জানার ব্যাপারে তাঁর দলের অনেক সমর্থকসহ বিক্ষোভকারীরাও বিভ্রান্ত হয়েছে।

লন্ডনের বাংলা কাগজগুলোতে বলা হয়েছে, তারেক রহমান নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে তাঁর মাকে একটি হোটেলে নিয়ে যান। সেখানে দুই পুত্রবধূ ও নাতনিরাসহ পরিবার ও দলের লোকদের সঙ্গে তিনি মিলিত হন। দীর্ঘকাল পর পুত্র সন্দর্শন ও পারিবারিক সম্মিলনের ফলে সবার চোখেই, বিশেষ করে মা খালেদা জিয়া ও ছেলে তারেক রহমানের চোখে অশ্রু বহমান ছিল বলে খবরে বলা হয়েছে। বিএনপি নেত্রী চোখের চিকিৎসার জন্য এসেছেন এবং ছেলে তারেকের বাসায় সপরিবারে ঈদ উদ্‌যাপন করবেন বলা হলেও এই সফরের রাজনৈতিক তাৎপর্য কেউ উড়িয়ে দেননি। দেশের বাইরে থাকা বিএনপির অনেক নেতাও লন্ডনে এসে হাজির হয়েছেন। তাতে অনেকেই মনে করছেন, এটা বিএনপি নেত্রীর শুধু পারিবারিক মিলন নয়, এর পাশাপাশি থাকবে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বৈঠকও।

বেগম জিয়ার বিলম্বিত লন্ডন সফরের নেপথ্যে

দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির বর্তমানে যে দশা, তাতে শক্ত হাতে এই দলের পুনর্গঠন ছাড়া দলটির অস্তিত্ব রক্ষার দ্বিতীয় উপায় নেই। এই পুনর্গঠনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা তারেক রহমানের সঙ্গে দলের বেশির ভাগ সাবেক ও বর্তমান নেতার মতানৈক্য। অবস্থা এমন স্থানে পৌঁছেছে যে ড. এমাজউদ্দীনের মতো বিএনপিপন্থী প্রবীণ বুদ্ধিজীবীও নেত্রীকে পুরনো নেতাদের দলে ফিরিয়ে এনে দলকে শক্তিশালী করার পরামর্শ দিচ্ছেন। দলের আরেক খয়ের খাঁ ডা. জাফরুল্লাহ প্রকাশ্যে বলেছেন, 'লন্ডনে বসে তারেক রহমানের নেতৃত্ব দেওয়া চলবে না।' এটা এখন বিএনপির নেতাকর্মীদের একটা বড় অংশের অভিমত বলে জানা যায়। তারেক সম্পর্কে দলের ভেতরের এই ক্রমবর্ধিষ্ণু অসন্তোষের সামনে খালেদা জিয়া ক্রমেই অসহায় বোধ করছেন এবং দলকে সক্রিয় করে তুলতে পারছেন না।

তারেক রহমানের পরামর্শে জামায়াতের সঙ্গে সন্ত্রাসী আন্দোলনে গিয়ে এবং নির্বাচন বর্জন করে যে বড় রকমের ভুল করা হয়েছে, এটা খালেদা জিয়া এখন উপলব্ধি করেছেন। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দ্বারা হাসিনা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বিএনপি দাবি আদায় করবে। সে আশাও তিনি ত্যাগ করেছেন। জামায়াতের সঙ্গে সহযোগিতা এখন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর চোখে বিএনপির সন্ত্রাসের সঙ্গে সহযোগিতা। অন্যদিকে এই সন্ত্রাস দমনে সাফল্য দ্বারা হাসিনা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের ওবামা এবং ভারতের মোদি- দুই সরকার দ্বারাই প্রশংসিত। সৌদি আরবের নতুন বাদশাহও হাসিনা সরকারকে উৎখাতের কাজে সাহায্য জোগাতে অতি উৎসাহী নন। একমাত্র পাকিস্তান ছাড়া বিএনপির অভিন্ন বন্ধু আর কেউ নেই। কিন্তু সেই পাকিস্তানও এখন নিজের ঘর সামলাতে ব্যস্ত।

এই আন্তর্জাতিক পটপরিবর্তনটা বুঝতে বিএনপির দীর্ঘ সময় লেগেছে। খালেদা জিয়া দীর্ঘকাল এই পরিবর্তনটা হয় বুঝতে পারেননি, নয় তাঁকে বুঝতে দেওয়া হয়নি। অনেকে বলেন, তারেক রহমানই তাঁর মাকে বেশি বিভ্রান্ত করেছেন। খালেদা জিয়া অন্ধ পুত্রস্নেহে তাঁকে ত্যাগ করতে পারেন না। তাঁকে বুঝিয়েসুজিয়ে পথে আনতে চান। বিএনপির একটি সূত্রই সাংবাদিকদের জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার এবারের লন্ডন সফরের একটি উদ্দেশ্য ব্রিটেনসহ ইউরোপের নেতাদের বোঝানো যে বিএনপি সন্ত্রাসের সমর্থক দল নয়, একটি প্রগতিশীল দল। ক্ষমতায় গেলে কোনো প্রতিহিংসার রাজনীতি তারা করবে না এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেবে না- এই প্রতিশ্রুতিও তিনি ইউরোপীয় নেতাদের কাছে পৌঁছাবেন।

সম্ভবত তারেক রহমানও এখন এ কথা বুঝতে পেরেছেন, লন্ডনে বসে তাঁর সব সন্ত্রাসী পরিকল্পনা এবং 'ঐতিহাসিক গবেষণা' সত্ত্বেও তাঁর দল দেশে ও বিদেশে যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, তাতে দূর অথবা অদূর ভবিষ্যতে তাঁর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া দূরের কথা, তাঁর দেশে ফেরাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। এ অবস্থায় তাঁর পক্ষে নমনীয় অবস্থান গ্রহণ ছাড়া উপায় নেই। সাপের ছুঁচো গেলার মতো ডা. বদরুদ্দোজা, অলি আহমদ প্রমুখ প্রবীণ নেতাকে দলে ফিরিয়ে এনে দলকে পুনর্গঠিত করা এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া সম্পর্কে মায়ের অনুকূল অভিমত তারেক মেনে নিতে পারেন। এটা যদি হয়, তাহলে জামায়াতের সঙ্গে প্রকাশ্য অথবা অপ্রকাশ্য আঁতাত রক্ষা করা সম্পর্কেও তারেককে তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে।

খালেদা জিয়ার এবারের লন্ডন সফর তাই গুরুত্বপূর্ণ। যতই বলা হোক এটা তাঁর ব্যক্তিগত সফর বা চোখের চিকিৎসার সফর, কিন্তু এটা যে বিএনপির রাজনৈতিক চিকিৎসারও সফর, এটা এখন আর গোপন নেই। বাজারে এই গুজবটি এখনো চালু যে বিএনপির এখন যতই রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটে থাকুক, তার ভোট বাক্সটি এখনো অটুট আছে। বিএনপির অনেক শুভানুধ্যায়ীই বলছেন, গত নির্বাচনে যোগ দিলে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা ছিল, আগামী দিনেও রয়েছে।

বিএনপির বেশির ভাগ নেতা এটা বিশ্বাস করেন। তাঁদের চাপেই খালেদা জিয়া তাঁর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যোগ দিতে নিমরাজি হয়েছেন। এমনকি এই নির্বাচনের প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে সংলাপ চাইছেন। তাঁদের লক্ষ্য অবিলম্বে একটি মধ্যবর্তী সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচন হলে তাঁরা ক্ষমতায় যেতে পারবেন ভাবছেন। আর ক্ষমতার বাইরে আরো বেশিদিন থাকলে বিএনপির অস্তিত্ব যে থাকবে না, এ কথাটিও তাঁরা জানেন। ক্ষমতাই বিএনপির অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র ভিত্তি।

লন্ডনে খালেদা জিয়ার চোখের চিকিৎসা যদি ভালোভাবে হয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো পরিষ্কারভাবে তাঁর চোখে দৃশ্যমান হবে বলে আমার আশা। যদি লন্ডনে বসে তারেকসহ পরিবারের সব সদস্য ও কয়েকজন শীর্ষ নেতাকর্মীর সঙ্গে আলোচনাক্রমে খালেদা জিয়া বিএনপিকে সন্ত্রাসমুক্ত পুরনো রাজনৈতিক চরিত্রে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং সন্ত্রাসের পথে সরকার উচ্ছেদের পরিকল্পনা ত্যাগ করে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন এবং পরবর্তী নির্বাচনে শক্তি পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করেন, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তা হবে এক বড় ইতিবাচক ঘটনা।

বিএনপি যদি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে পুনর্গঠিত হয়, তাহলে তাতে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগও উপকৃত হবে। দেশে কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে আত্মতুষ্টি ও অহমিকার যে ভাব দেখা দিয়েছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর। জবাবদিহিবিহীন সরকারের আমলে দেশে দুর্নীতি বাড়ে, প্রশাসন দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যথেষ্ট সতর্কতা সত্ত্বেও তাঁর দলে এবং প্রশাসনে এটা ঘটছে। চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের জন্যও দেশে শক্তিশালী বিরোধী দল দরকার।

বিএনপি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে পুনর্গঠিত হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মৌলবাদী সন্ত্রাসের দাপট কমবে। দেশটির রাজনীতিতে জামায়াত এখন একটি পরগাছা। বিএনপিকে অবলম্বন ও আশ্রয় করেই তার উত্থান। এই অবলম্বন ছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্তভাবে অস্তিত্ব রক্ষা করা জামায়াতের পক্ষে কঠিন হবে। জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত রক্ষা করে বিএনপির পক্ষে এখন আর লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা নেই। জামায়াতের নামটি এখন বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত। এই জামায়াতের সঙ্গে সংস্রব রক্ষা করে বিএনপি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজেকে সন্ত্রাসবিরোধী গণতান্ত্রিক দল হিসেবে প্রমাণ করতে পারবে না এবং তাদের সমর্থনও পাবে না। পাকিস্তানের সমর্থন যে বিএনপির জন্য এখন কতটা অকার্যকর, তার প্রমাণ বিএনপির সাম্প্রতিক ভারতমুখী হওয়ার চেষ্টা থেকে পাওয়া যায়।

খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরের দিকে তাই অনেকেই ঔৎসুক্যের সঙ্গে তাকিয়ে আছেন। লন্ডনে বসে বিএনপির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে খালেদা জিয়া যে সিদ্ধান্ত নেবেন তা শুধু তাঁর দলের নয়, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকেও প্রভাবিত করবে। দেখা যাক, তিনি দেশে ফিরে যাওয়ার পর হাওয়া কোন দিকে মোড় নেয়।
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71