সোমবার, ২৭ মে ২০১৯
সোমবার, ১৩ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬
 
 
বৈশাখের প্রতিরোধ : বাঙালি মাথা নোয়ানোর জাতি নয়
প্রকাশ: ০৫:৩৭ pm ১৮-০৪-২০১৭ হালনাগাদ: ০৫:৩৭ pm ১৮-০৪-২০১৭
 
 
 


আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ||

বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘এক মনীষী বলেছেন, মানুষের ওপর বিশ্বাস হারিয়ো না। বিশ্বাস হারানো পাপ। আমি বলি, বাঙালির ওপর বিশ্বাস হারিয়ো না। বাঙালির ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ। বাঙালি অপরাজেয়। ’ ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মনে হয়েছিল, বাঙালির ওপর অতিরিক্ত বিশ্বাস স্থাপন করে তিনি ভুল করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর ৪২ বছর পর মনে হয়েছে, তিনি ভুল করেননি। স্বজাতিকে চিনতে আমরা ভুল করেছি। এই বিশ্বাসটা মনে আরো দৃঢ় হয়েছে এবারের বাংলা নববর্ষে ঢাকা শহরসহ সারা দেশে নববর্ষের উত্সব উদ্যাপনের প্লাবন দেখে। মনে মনে বলেছি, এ জাতি পরাজিত হওয়ার জাতি নয়। মাথা নোয়ানোর জাতি নয়।

স্বাধীনতার পর দেশের ও স্বাধীনতার শত্রুরা সহসা বিভ্রান্তির কুয়াশাজাল সৃষ্টিপূর্বক বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় নেতাদের হত্যা করে ক্ষমতা দখলে সক্ষম হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা, স্বাধীনতার আদর্শ তারা মুছে ফেলতে চেয়েছিল। একসময় মনে হয়েছিল, তাদের চক্রান্ত বুঝি সফল। বাংলার মানুষ বুঝি চিরদিনের জন্য সাম্প্রদায়িকতা আর হিংস্র মৌলবাদের খপ্পরে চলে গেল। না, তা হয়নি। বাংলার মানুষ সংবিৎ ফিরে পেতেই গর্জে উঠেছে। ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে মুখরিত আবার সারা বাংলা। একাত্তরের পরাজিত শত্রু আবারও পরাজিত হয়েছে; যদিও  চূড়ান্তভাবে এখনো নয়।

 

 

সম্প্রতি দেশের প্রগতিশীল গণমানুষের মনে আবারও একটা বড় শঙ্কা দেখা দিয়েছিল এবং আমার মনেও। ঢাকার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ন্যায়বিচারের প্রতীক একটি সুদৃশ্য ভাস্কর্য এবং বাংলা নববর্ষে বৈশাখী মেলা ও মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরুদ্ধে উগ্র মৌলবাদী শকুনিরা আবার হিংস্র নখর বের করেছিল। বলেছিল, মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধ করতে হবে। ন্যায়বিচারের প্রতীক ভাস্কর্য ভেঙে ফেলতে হবে। তারা এমন দাবিও তুলেছিল যে দেশের সব ভাস্কর্য (অপরাজেয় বাংলা এবং একাত্তরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের ভাস্কর্যসহ) ভেঙে ফেলতে হবে। এসব নাকি ইসলামবিরোধী।

লন্ডনে বসে বাংলাদেশের টেলিভিশনে ঢাকায় খেলাফত মজলিশ নামের একটি দলের সভায় এক নেতার এই ভাস্কর্য ভাঙা এবং বৈশাখী উত্সব বন্ধ করার দাবিতে ভয়ানক জঙ্গিমূর্তি দেখে মনে ভয়ই জেগেছিল যে এত দিনে তাঁদের স্লোগানই বুঝি সফল হতে চলেছে। বাংলাদেশে তাঁরা একসময় স্লোগান তুলেছিলেন, ‘বাংলা হবে আফগান, আমরা সবাই তালেবান’। সেই স্লোগান কি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলা, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সেক্যুলার শাশ্বত বাংলা গড়ার সব স্বপ্ন ভাসিয়ে নেবে? সরকার কি সত্যি পিছু হটবে? আর অসাম্প্রদায়িক বাংলা গড়ার জন্য যে ৩০ লাখ নর-নারী আত্মাহুতি দিয়েছে, দেশের ১৬ কোটি মানুষ কি বিনা যুদ্ধে তালেবানি হুমকির কাছে মাথা নত করবে?

এ প্রশ্নের জবাব পেয়েছি এবার দেশজোড়া বৈশাখী উত্সব এবং মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যে। ঢাকার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরাও এ শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছেন। দেশের আনাচকানাচে এবার বাংলা নববর্ষ উত্সব উদ্যাপিত হয়েছে। এটা বর্বর ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে বাংলার গণমানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ। তাদের প্রতিবাদ প্রকৃত ধর্মের বিরুদ্ধে নয়; ধর্মের মুখোশ পরা একদল ধর্মব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ। এবার বাংলাদেশে বৈশাখ এসেছে শুধু উত্সব হিসেবে নয়, এসেছে গণপ্রতিরোধের কালবৈশাখী রূপে। সেই ঝড় ধর্মের মুখোশ পরা ফ্যাসিবাদের দম্ভ স্তব্ধ করে দিয়েছে। প্রমাণ করেছে, এ জাতি বর্বরতার কাছে মাথা নোয়ানোর জাতি নয়। আমার এবং আমাদের মনের শঙ্কা দূর হয়েছে।

বিশ্বে যত মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ আছে, তার বেশির ভাগের নিজস্ব নববর্ষ উত্সব আছে; যেমন— পারসিকদের নওরোজ উত্সব। সৌদি আরবে নববর্ষ উত্সব হয় না, তার কারণ আরবদের নতুন বছর শুরু হয় মহররম মাসে। এই মাসে কারবালার যুদ্ধ হয়েছিল এবং নবীবংশের অনেক সদস্য শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু অন্যান্য মাসে সৌদি আরবে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে, পুরুষ আরবরা অসি হাতে নেচেকুঁদে তাদের জাতীয় উত্সব উদ্যাপন করে। ঈদ কথাটার অর্থই উত্সব। ইসলামে ধর্মীয় দিবস পালনকেও ঈদ বা উত্সব বলা হয়ে থাকে। কোনো কোনো উত্সবের সময় ঘোড়দৌড়ও প্রচলিত। একে কেউ ধর্মবিরোধী আখ্যা দেয়নি। বাংলাদেশে উগ্র মৌলবাদীদের ধর্মই আলাদা। তা প্রকৃত ইসলাম নয়, রাজনৈতিক ইসলাম ও ব্যবসায়ী ইসলাম। প্রকৃত  ইসলামের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

ইসলামের নবী (সা.) বারবার বলেছেন, ‘ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কোরো না। তোমাদের আগে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। ’ মহানবী (সা.)-এর কথায় কান দেয় কে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মৌলবাদীরা তো মোটেই কান দেয় না। তারা তাদের রাজনীতি ও ব্যবসার স্বার্থে যে পলিটিক্যাল বা রাজনৈতিক ইসলাম খাড়া করেছে, তার চেহারা বর্বর সন্ত্রাসের। সেই চেহারা শান্তির ধর্ম ইসলামের নয়। প্রকৃত ইসলাম বলে, ‘যে মুসলমানের হাত অন্য মুসলমানকে নিগ্রহ করে না, বরং অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে, সে-ই প্রকৃত মুসলমান। ’ আর মধ্যপ্রাচ্যসহ বাংলাদেশের তথাকথিত ইসলামিস্টরা যাদের প্রত্যহ হত্যা করে চলেছে, তারা বেশির ভাগই নিরীহ মুসলমান নারী-পুরুষ।

ভাস্কর্য সম্পর্কেও বাংলাদেশের উগ্র মৌলবাদীরা অসত্য প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্যের সঙ্গে আফগানিস্তানের বর্বর তালেবানের উদ্দেশ্যের কোনো পার্থক্য নেই। আফগানিস্তান এককালে ছিল বৌদ্ধ ধর্মের দেশ। সেখানে হাজার বছরের পুরনো বুদ্ধমূর্তি আছে। মুসলমান আমলে সেগুলো পূজা করার জন্য রাখা হয়নি; রাখা হয়েছে হাজার বছরের আফগান সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে। বর্বর তালেবান ধর্মের দোহাই পেড়ে হাজার বছরের সভ্যতা ও ঐতিহ্যের নিদর্শনগুলোও  ভেঙেছে। কিছুকাল আগে সিরিয়ায়ও চার হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রতীক সব স্থাপত্য ভেঙেছে তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের সন্ত্রাসীরা। তারা ইসলামের শত্রু, সভ্যতার শত্রু, মানবতার শত্রু।

বাংলাদেশেও সভ্যতা-সংস্কৃতির এই শত্রুদের অনুসারীরা হুমকি দিচ্ছে দেশের সব ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার। স্বাধীনতাসংগ্রামের স্মৃতিফলক, ভাস্কর্য ও স্থাপত্যগুলোও তারা ধর্মের নামে ভাঙার চেষ্টা চালাচ্ছ। এই চেষ্টা প্রতিহত করা না হলে বাংলাদেশের হাজার বছরের সভ্যতা-সংস্কৃতির বিলুপ্তি ঘটবে। আমি দেশের প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। তাঁর আমলে এবং তাঁরই উদ্যোগে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রাঙ্গণে ন্যায়বিচারের প্রতীক ভাস্কর্যটি স্থাপিত হয়েছে। এটি সরানো হলে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিই ভেঙে ফেলা হবে। দেশের গণশক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই ভাস্কর্য ভাঙা প্রতিরোধ করতে হবে।

দুঃখ পেয়েছি এবং মজাও পেয়েছি আমাদের এক শ্রেণির শিক্ষিত মানুষের শিল্পবোধ দেখে। পিকাসোর সব ছবির অর্থই আমরা সবাই বুঝতে না পারি, নিজেদের অজ্ঞতার প্রকাশ ঘটানো কি উচিত? এই নারী ভাস্কর্যকে শিল্পী কেন শাড়ি পরালেন—এই হাস্যকর প্রশ্ন শুনে আমার এক বিদেশি বন্ধু বলেছেন, ‘তোমাদের এই সমালোচকরা ইগনোরেন্ট পপুলিজমে ভুগছেন। এই Ignorent populisun-এর বাংলাটা সহৃদয় পাঠক নিজেরাই করে নেবেন।

বাংলাদেশের শ্রদ্ধেয় বুদ্ধিজীবী ড. অজয় রায় সুপ্রিম কোর্টের স্ট্যাচুটি সম্পর্কে বলেছেন, ‘এটা মূর্তি নয়, ভাস্কর্য। ’ অর্থাৎ এটা পূজার জন্য তৈরি মূর্তি নয়; এটা সুবিচারের প্রতীক ভাস্কর্য।

লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, যে উগ্র ধর্মব্যবসায়ীরা আজ বৈশাখী মেলা বন্ধ করার, সুপ্রিম কোর্টের ভাস্কর্য সরানোর দাবি তুলেছে, তারাই একুশের ভাষাশহীদ মিনারকে ইসলামবিরোধী এবং ভাষাশহীদ স্মরণ দিবস পালনকে হিন্দুদের পূজা আখ্যা দিয়ে শহীদ মিনার ভেঙে ফেলার দাবি তুলেছিল। একাত্তরের গণহত্যা শুরু হওয়ার রাতে জামায়াতিদের প্ররোচনায় পাকিস্তানি হানাদাররা কামান দেগে শহীদ মিনারের স্তম্ভগুলো ভেঙে ফেলে এবং পরদিনই জামায়াতিরা ভাঙা শহীদ মিনার দখল করে সেটিকে মসজিদ ঘোষণা করে। তারা শহীদ মিনারে জুমার নামাজ পড়ার আহ্বান জানালে ঢাকার একজন মানুষও সেখানে নামাজ পড়তে আসেনি। ফলে জামায়াতিদের সেই চক্রান্ত ব্যর্থ হয়।

২০১৭ সালেও জামায়াতি ও হেফাজতিদের বৈশাখী উত্সব বন্ধ করা এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য অপসারণের ষড়যন্ত্র রোখার জন্য গণ-ঐক্য ও গণপ্রতিরোধ দরকার হবে। এবারের পহেলা বৈশাখে সেই গণপ্রতিরোধের উত্তাল প্লাবন সারা দেশে আমরা দেখেছি। দেখেছি সারা বিশ্বে বাঙালিদের বৈশাখী উত্সব। এমনকি সৌদি আরবের বাঙালিরাও বৈশাখী উত্সব করেছে। মৌলবাদীদের ষড়যন্ত্র রোখার জন্য বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং সামনে এগিয়েছে। আমার আশা, সরকারও যেন পিছু না হটে।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক : সুকৃতি কুমার মন্ডল 

 খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

+8801711-98 15 52

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2019 Eibela.Com
Developed by: coder71