শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক  হীরালাল সেনের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ০৩:১১ pm ২৯-১০-২০১৬ হালনাগাদ: ০৩:১১ pm ২৯-১০-২০১৬
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

হীরালাল সেন ছাত্র অবস্থাই চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৯০০ সালে ফরাসি কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশের রাজাদের রাজ্যের হাতি, ঘোড়া, উট, ইত্যাদি সহ শোভাযাত্রা, সাপের খেলাসহ বিভিন্ন ধরনের খেলার ছবি তুলে ইউরোপ, আমেরিকায় দেখাত। আর এর জন্য তারা এদেশে কিছু ক্যামেরাম্যান নিয়ে আসেন ছবি তোলার জন্য। তিনি তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক করেন এবং তাদের কাছ থেকে ক্যামেরা চালানো শেখেন।

হীরালাল সেনের কর্ম জীবন শুরু হয় চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। আই, এস, সি পড়ার সময় তিনি পড়ালেখা বাদ দিয়েই চলচ্চিত্র পেশায় যোগদেন। ১৮৯৮ সালে হীরালাল সেন ও তার ভাই মতিলাল সেন রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পনি তৈরি করেন। এরপর শুরু করে দেন বিভিন্ন ধরনের প্রদর্শনী। ১৮৯৯ সালে মিনারভা রঙ্গমঞ্চ ভাড়া করে একটি প্রদর্শনী করে যা অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এই সব প্রদর্শনীতে সাফল্য অর্জন করার পর তিনি চিত্র নির্মাণের চিন্তা শুরু করেন। কিন্তু তাঁর নিজের কোন ক্যামেরা ছিলনা। প্যাথে ফ্রেবিজা ও আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্যামেরা ভাড়া নিয়ে অনেক ধরনের ছবি তোলা শুরু করেন। কিছু দিন পর নিজেই ক্যামেরা কেনার চিন্তা করেন। ১৯০০ সালে রয়েল বায়স্কোপ কোম্পানি লন্ডন ওয়ারউইক ট্রেডিং কোম্পানি থেকে ক্যামেরা প্রজেক্টিং মেশিন ও বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্রের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি করে। হীরালাল সেন এরপর থেকে শুরু করেন নিজের ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা ও চলচ্চিত্র নির্মাণ। হীরালাল সেনের সুনাম দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। নিজের ক্যামেরা দিয়ে তোলা ছবির প্রদর্শনীতে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেন।

১৯০১ সালে ৯ ই ফেব্রুয়ারি ক্লাসিক থিয়েটার চিত্রায়িত করেন কিছু বাংলা নাটকের বিশেষ বিশেষ দৃশ্য। এর মধ্য ছিল আলী বাবা, সীতারাম, হরিপদ,ভ্রমর, সরলা, দোলযাত্রা, বন্ধু ইত্যাদি। ১৯০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর তিনি ব্যবসায়িকভাবে চিত্র প্রদর্শনী শুরু করে। তাঁর প্রদর্শনী দেখার জন্য আসেন প্রধান বিচারপতি স্যার উইলিয়াম ম্যাকমিলান। হীরালাল সেন তাঁর নিজ গ্রাম বগজুরিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। তিনি তাঁর বাড়ির নাট মন্দিরে ১৯০২ থেকে ১৯০৫ সালে পর্যন্ত তিনি প্রদর্শনী চালু রাখেন। ১৯০০ সালে ২ ফেব্রুয়ারি তার প্রতিষ্টিত রয়েল বায়স্কোপ কোম্পানি কলকাতার বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তির বাসভবনে প্রদর্শনী করেন। তিনি একই সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামে গঞ্জে এবং উড়িষ্যা উত্তর প্রদেশে ও বিহারে বিভিন্ন স্থানে বায়স্কোপ প্রদর্শন করেন। ১৮৯০ সালে ৪ এপ্রিল হীরালাল সেন তার ছোট ভাই মতিলাল সেন ও দোকিলাল সেন এবং তাঁর বোনের ছেলে ডোলনাথ সেন কে নিয়ে দি রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি ব্যানারে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। ১৮৯০ সালে তিনি তার নিজ গ্রামে বগজুরিতে প্রতিষ্টা করেন ফটোগ্রাফি প্রতিষ্ঠান, অমরাবতী ফাইন আর্টস এসোসিয়েশন এবং এইচ,এল সেন এ্যান্ড ব্রাদার্স। বাংলা ১৩০৯ সালে ২৬-২৭ ফাল্গুন ১৯০২ সালে তিনি শরীয়তপুর জেলার পালং থানায় বয়স্কোপ প্রদর্শনী করেন। তিনি যখন ঢাকার কলেজিয়েট স্কুলে পড়তেন তখনই তিনি ফটোগ্রাফির প্রতি আকৃষ্ট হন।

জন্ম 
বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার হীরালাল সেন তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার বগজুরি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তাঁর জন্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তাঁর বাবার নাম ছিল চন্দ্রমোহন সেন ও মায়ের নাম বিধুমুখী। হীরালাল সেন এর পারিবারিক বংশ ছিল মুনশী।

শিক্ষা জীবন
হীরালাল সেনের শিক্ষা জীবন শুরু হয় মানিকগঞ্জের বগজুরি গ্রাম থেকেই। তিনি প্রথম অবস্থাতে তিনি পরিবার থেকেই শিক্ষা গ্রহন করেন। হীরালাল সেন ও ডঃ দীনেশ চন্দ্র সেন ছিলেন সমবয়সী। ধারনা করা হয়, হীরালাল সেন মানিকগঞ্জের মাইনর স্কুলে পড়ালেখা করেছেন। এরপর ১৮৯৫-১৮৯৬ সালের দিকে হীরালাল সেন ভর্তি হন কলেজিয়েট স্কুলে। তাঁর বাবাসহ পরিবারের সকলেই কলকাতায় চলে যাওয়ার ফলে তিনি সেখানে একটি কলেজে আই, এস, সি তে ভর্তি হন। পড়ালেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল কম। কলেজে পড়া অবস্থাতেই তিনি চলচ্চিত্রের সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং সেখানেই তিনি পড়ালেখার ইতি টানেন।

শেষ জীবন 
হীরালাল সেন এর শেষ জীবন কেটেছে খুব কষ্টে। জীবনের শেষ সময়ে তাকে অনেক কঠিন পরিস্তিতির মোকাবেলা করতে হয়েছে। ১৯০৫ সালের পর থেকেতাঁর চলচ্চিত্র জীবনের পতন শুরু হয়। আস্তে আস্তে দেশে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান হতে থাকে। এতে চলচ্চিত্রের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এছাড়াও সে সময় দেশ বিদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের নামকরা চলচ্চিত্র আমদানি শুরু হয়। এতে সাধারন জনগণ দেশিয় খণ্ড খণ্ড চিত্রের প্রতি আগ্রহ হঁড়িয়ে ফেলে। বিদেশী চলচ্চিত্রের আমদানির ফলে তাঁর জীবনের সব সাধনা ধীরে ধীরে ভেস্তে যায়।

হীরালাল সেনের তিন ভাই মিলে চলচ্চিত্র ব্যবসা করতেন। একসময় তাঁর ভাই চলচ্চিত্র ছেড়ে দিয়ে চাকরী ধরেন। সাথে থাকেন মতিলাল সেন। কিন্তু এক সময় হীরালাল সেন ও মতিলাল সেনেরমধ্যে চরম দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এরপর হীরালাল সেন তাঁর প্রতিপক্ষ রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি ত্যাগ করেন। হীরালাল সেন তাঁর ভাগ্নে কুমার সংকর গুপ্তকেও চলচ্চিত্র এনেছিলেন। কুমার সংকর গুপ্ত ও চলচ্চিত্র সম্পর্কে শিক্ষা নেন হীরালাল সেনের কাছ থেকে। কিন্তু এক সময় তাঁর ভাগ্নে ও তাকে ছেড়ে অন্য কোম্পানিতে চলে যান। এরপর হীরালাল সেন এইচ, এল সেন কোম্পানিতে কাজ করেন। পরে তিনি এই কোম্পানি ছেড়ে তাঁর ভাগ্নের প্রতিষ্টিত লন্ডন বায়োস্কোপ কোম্পানিতে যোগদান করেন।
১৯১৩ সালের কোন এক সময়ে হীরালাল সেনের জীবনে ঘটে সবচেয়ে বড় এক দুঃখজনক ঘটনা। হীরালাল সেনের নির্মিত সব চলচ্চিত্র ও নথিপত্র ছিল তাঁর ভাই মতিলাল সেনের বাসায়। হঠাৎ একদিন মতিলাল সেন এর বাসায় আগুন লেগে যায়। হীরালাল সেনের নির্মিত সব চলচ্চিত্র ও নথিপত্র আগুনে পুড়ে যায়। মতিলাল সেন এর কন্যাও আগুনে পুড়ে মারা যায়। তখন শুরু হয় হীরালাল সেনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। একদিকে পারিবারিক দ্বন্দ্ব অন্যদিকে তাঁর নির্মিত সব কিছু হারানোর বেদনা। আর্থিক অভাবের ফলে তাঁর ক্যামেরা ও সকল যন্ত্রপাতি এবং হাতের আংটি মালিকের কাছে বন্ধক রাখেন। পরবর্তীতে অনাদি বসু এগুলো মালিকের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নেন। বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান দেবী ঘোষ ক্যামেরাগুলো মেরামত করে নিজে ব্যবহার করেন।

উপমহাদেশের বিজ্ঞাপনের জনক 
হীরালাল সেনকে উপমহাদেশের বিজ্ঞাপনের জনক বলা হয়। তাঁর আগে কেউ ভারতে বিজ্ঞাপন চিত্র তৈরি করেনি। ১৯০৩ সালে তিনি বিজ্ঞাপন চিত্র তৈরি করেন। তিনি বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপনের তৈরি করেন, তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হল – বটফেষ্ট পালের ‘এডওয়ার্স টনিক’, সি কে সেনের মাথার তেল জবাকুসুম ও ডব্লিউ মেজর কোম্পানির ‘ সালমা পিলা’। এ বিজ্ঞাপনগুলো হয়েছিল রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি থেকে।

উপমহাদেশের প্রথম রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের নির্মাণ 
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। ১৯০৫ সালের ৭ ই আগষ্ট রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় বিশাল প্রতিবাদ সভার ডাক দেন। হীরালাল সেন এই সভার ভিডিও করেন। এছাড়া রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এর নেতৃত্বে কলকাতায় বিশাল প্রতিবাদ সভা ও মিছিল হয়েছিল তার ছবি ও তুলেছেন তিনি। ১৯০৫ সালে ২৫শে নভেম্বর রাত্র ৯ টায় কলকাতায় থিয়েটার হলে এই চিত্রের প্রদর্শনী করা হয়েছে। এই প্রদর্শনীতে রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন। এছাড়াও তাঁর সাথে এসেছিলেন ময়মনসিংহের মহারাজা ‘ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধরী, নাটকের রাজা জগদীন্দ্র নাথ রায়সহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রদর্শনী দেখে খুবই প্রশংসা করেছিলেন।

হীরালাল সেনের চলচ্চিত্র
হীরালাল সেন কতগুলো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়,তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র ৪০ টির মত হবে। তবে বিভিন্ন উৎস থেকে বিভিন্ন ধরনের মতবাদ রয়েছে।

মৃত্যু
হীরালাল সেন নানা প্রতিকূলতার মধ্যে ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯১৭ সালে তাঁর শরীরে ধরা পড়ে দুরারোগ্য ক্যান্সার। অবশেষে তিনি ১৯১৭ সালের ২৯ অক্টোবর ক্যান্সারের সাথে লড়ে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেই সাথে শেষ হয় চলচ্চিত্র জগতের এক উজ্জল নক্ষত্রের অধ্যায়।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71