শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শুক্রবার, ৬ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
ভাস্কর্য সরিয়েছে, নারী ক্রীড়াও কি বন্ধ হবে?
প্রকাশ: ১০:২৫ am ২৮-০৫-২০১৭ হালনাগাদ: ১০:২৫ am ২৮-০৫-২০১৭
 
 
 


`আমার সোনার বাংলা...` জাতীয় সঙ্গীতের সুরে আড়াআড়িভাবে বাঁধা বাংলাদেশের পতাকা একটু করে ওপরে উঠছে আর বিজয়মঞ্চে স্যালুটের ভঙ্গিতে কপাল ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভারত্তোলক মাবিয়া অঝোরে কেঁদে যাচ্ছেন।

১২তম এসএ গেমসে বাংলাদেশকে প্রথম স্বর্ণ এনে দিয়েছিলেন মাবিয়া। টেলিভিশনে যে দৃশ্য দেখে নড়ে উঠেছিল পুরো দেশ, কারণ তখন একজন নারীর পাশাপাশি বাংলাদেশও জিতেছিল।

যখন সালমা-জাহানারারা ব্যাট হাতে রানের বৃষ্টি ঝড়ান তখনো পুড়ো দেশ এক হয়ে তাদের সমর্থন করে। আবার যখন মিরোনা-সাবিনা খাতুনরা গোল করেন তখনো উল্লাসে ফেটে পড়ে গ্যালারি।

কিন্তু পুরুষশাসিত সেই রক্ষনশীল সমাজ এখনো সুযোগ পেলেই বাধা সৃষ্টি করে নারীর সাফল্যে। কখনো সেটা সমাজের দোহাই দিয়ে, কখনোবা ধর্মের যাতাকলে পিষ্ট করে। যে নারীর সাফল্যে দেশ এগুচ্ছে,সে নারীর উন্নতির পথ আঁটকে ধরছে এক শ্রেনীর ধর্মান্ধরা। ২০১৩র ৫ মে’তে হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফার দাবি করেন। সেখানে নারীদের কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছে।  তখন বলা হয় নারীরা থাকবে ঘরে, চার দেওয়ালের ভিতরে, পর্দার নিচে, মানতে হবে ধর্মের নামে রক্ষণশীল চিন্তাকে।

এসব মানলে ক্রীড়াজ্ঞনে খেলবে কীভাবে নারী?

বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে নারী ক্রীড়াবিদদের সাফল্য অনেক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা পুরুষদের থেকে অনেকাংশে বেশি।

প্রথম ক্রীড়াবিদ হিসেবে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে নাম লিখিয়েছিলেন টেবিল টেনিস খেলোয়াড় জোবেরা রহমান লিনু। শুটিংয়ে বাংলাদেশকে একাধিক স্বর্ণপদক এনে দিয়েছেন সাবরিনা সুলতানা, শারমিন আক্তার রত্না এবং সাদিয়া সুলতানা। ২০১৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে (এসএ গেমস) বাংলাদেশ দল চারটি স্বর্ণ পদক জিতেছে। এই চার স্বর্ণের তিনটিই জয় করেছেন ভারোত্তোলক মাবিয়া আকতার সীমান্ত এবং সাঁতারু মাহফুজা খাতুন শিলা।

বাংলাদেশের নারী ফুটবলার গোলরক্ষক সাবিনা আক্তার, মিডফিল্ডার মিরোনা ও ফরোয়ার্ড সাবিনা খাতুন গত বছর মালদ্বীপে খেলে এসেছেন। এবার দুবাইয়ে খেলার প্রস্তাব পেয়েছেন সাবিনা। ফুটবলে বাংলাদেশের মেয়েরা এখন আর পিছিয়ে নেই। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মেয়েরা যে আশার আলো দেখাচ্ছে তাতে মুগ্ধ ফুটবলানুরাগীরা। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ মেয়েদের চ্যাম্পিয়নশিপে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।

২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত এএফসি অনুর্ধ-১৪ মহিলা ফুটবলের চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ স্বাগতিক নেপালকে হারিয়ে অর্জন করে নিয়েছে আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়শীপের শিরোপা। এটি ছিল বাংলাদেশের অনুর্ধ্ব-১৪ কোন নারী দলের সবচেয়ে বড় অর্জন।

সাম্প্রতিক সময়ে পুরুষদের চেয়ে বাংলাদেশের মহিলা দলই কাবাডিতে সাফল্য পাচ্ছে বেশি। গত দুটি এশিয়ান গেমসে দুটি ব্রোঞ্জ, সর্বশেষ তিনটি দক্ষিণ এশিয়ান গেমস থেকে দুটি রুপা, একটি ব্রোঞ্জ ও তিনটি এশিয়ান বিচ গেমসে তিনটি ব্রোঞ্জ জিতেছেন বাংলাদেশের মেয়েরা। জাতীয় খেলা কাবাডির মর্যাদা এখন মেয়েদের হাতে।

বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দল দাপটের সঙ্গে বিশ্ব ক্রিকেট মাতিয়ে বেড়াচ্ছে। এ দেশের মেয়েরা ক্রিকেটের ২২ গজে লাল-সবুজের পতাকা ওড়াবে, তা শুধু স্বপ্নই ছিল। কিন্তু এখন তা বাস্তব। দিনে দিনে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, সে কারণেই ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশের মেয়েরা এখন আলোচিত।

বুদ্ধির খেলা দাবা। এ খেলা মেধা বিকাশে অন্যতম সহযোগী। মেয়েদের দাবায় ক্রমেই প্রতিযোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আগের চেয়ে বাংলাদেশের মেয়েরা দাবা খেলায় বেশি আগ্রহী হচ্ছে। দাবা’তে রানী হামিদ এবং শামীমা আক্তার লিজা দেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছেন। আটবার জাতীয় ও তিনবার ব্রিটিশ মহিলা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন রানী হামিদ।

তিনিই এ উপমহাদেশে একমাত্র নারী, যিনি তিনবার ব্রিটিশ শিরোপা অর্জনের গৌরব লাভ করেন। দাবা অঙ্গনে দ্বিতীয় নারী আন্তর্জাতিক গ্রান্ডমাস্টার শামীমা আক্তার লিজা। ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বলার মতো সাফল্যও লাভ করেছেন।

সার্ফিং মানে, ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ। প্রতি মুহূর্তে আচমকা আসা ঢেউগুলোকে পাড়ি দিয়ে যেতে হবে বহুদূর। জীবনের সঙ্গে মেলবন্ধন খেলাটির।  বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের নারী সার্ফাররাও সাফল্যের মাপকাঠিতে পিছিয়ে নেই।

প্রথম বাংলাদেশি ক্রীড়াবিদ হিসেবে গিনেস বুকেনাম লেখান জোবেরা রহমান লিনুর। ১৯৭৭ থেকে ২০০১-এর মধ্যে ১৬ বার জাতীয় টেবিল টেনিসে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় তিনি এ কৃতিত্ব অর্জন করেন। সামাজিক কর্মকাণ্ডে বিশেষ অবদান রাখার জন্য তিনি ইউনিসেফের বিশেষ দূত নির্বাচিত হয়েছেন।

এ পর্যন্ত শুটিংয়ে বাংলাদেশের মেয়েরা বরাবরই ভালো ফলাফল করে থাকে। ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমসে স্বর্ণ জিতেন সাবরিনা সুলতানা। ২০১০ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে সবাইকে পেছনে ফেলে স্বর্ণ জয় করেন শারমিন আক্তার রত্না এবং সাদিয়া সুলতানা।

১৯৯২ সালে বাংলাদেশ গেমসের মাধ্যমে সাবরিনার বড় টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ শুরু। ১৯৯৩ সালের ঢাকা সাফ গেমসেও অব্যাহত থাকে সাবরিনার সাফল্যের ধারা। প্রোন ইভেন্টে দলগত স্বর্ণ ছিল সাবরিনার প্রথম আন্তর্জাতিক পদক। ১৯৯৬ সালের বাংলাদেশ গেমসে প্রোন ও থ্রি পজিশনে স্বর্ণ জিতলেও প্রিয় ইভেন্ট রাইফেলে রৌপ্য নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় সাবরিনাকে। ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়া কমনওয়েলথ গেমসে তিনি স্বর্ণ জয় করেন। ২০১০ সালে কমনওয়েলথ শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণ জেতেন শারমিন আক্তার রত্না এবং সাদিয়া সুলতানা।

২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ১২তম এসএ গেমসের তৃতীয় দিনে দুটি স্বর্ণ জিতেছে বাংলাদেশ। লাল-সবুজের পক্ষে প্রথম স্বর্ণ জয় করেন নারী ভারোত্তোলক মাবিয়া আকতার সীমান্ত। আর দ্বিতীয় স্বর্ণ জিতেছেন সাঁতারু মাহফুজা খাতুন।

ভার উত্তোলনকারী মাবিয়া আখতার সীমান্ত বাংলাদেশকে এনে দিয়েছে এক অনন্য সম্মাননা। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান গেমসে ৬৩-কেজি শ্রেণীতে মাবিয়া বাংলাদেশকে এনে দিয়েছেন স্বর্ণ পদক। আর মাহফুজা খাতুন শিলা ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ১২তম এসএ গেমসে ১০০-মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে সাঁতারে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম স্বর্ণপদক অর্জন করেন। 

এর আগে ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ ভারোত্তোলন প্রতিযোগিতায় ৬৩-কেজি ওজন শ্রেণীতে পদক অর্জন করেন মারিয়া আখতার। সেখানে সিনিয়র এবং জুনিয়র ক্যাটাগরিতে একটি স্বর্ণ পদক এবং দুটি রৌপ্য পদক অর্জন করেন। ২০১২ সালেই সাউথ এশিয়ান ভারোত্তলোন প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জ পদক এবং ২০১৩ সালে মালেশিয়ায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ প্রতিযোগিতায় রৌপ্য পদক অর্জন করেন তিনি।

কিন্তু যাদের হাত ধরে এত সাফল্য তাদের হাতে হাতকড়া পড়াতে চাচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। যদি তাই হয় তাহলে কী হবে আগামীর মাবিয়াদের। তাহলে কি ধীরে ধীরে পাকিস্তানের মত বিপদগামী ও উগ্র মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে এ দেশ? যেখানে মেয়েদের খেলতে নিষেধ করে হেফাজতের মত সংগঠনগুলো। আর সে নিষেধ কেউ অমান্য করলে তাকে হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করে না। 

এদিকে মৌলবাদী, ইসলামের স্বঘোষিত রক্ষাকারি তথাকথিত ও সমালোচিত হেফাজতে ইসলামের দাবীর মুখে সরাতে হয়েছে সুপ্রীম কোর্টের ভাস্কর্য। তাদের একটি করে দাবি যদি এভাবেই পূরণ হতে থাকে, তাহলে ক্রীড়াজ্ঞনে সাফল্য বয়ে আনবে কীভাবে নারী? আজ এই দাবি কাল অন্য তাহলে কি নারী পারবে উন্নতির শিখরে পৌঁছতে? নাকি ঘরে  বন্দি থাকবে তারা?

এইসব উগ্র মৌলবাদী ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানো গোষ্ঠীগুলো কি ভুলে গেছে, উহুদ যুদ্ধে অংশ নেওয়া নুসাইবা বিনতে কা’ব এর কথা। ইতিহাসে বহুল পরিচিত ইয়ারমুকের যুদ্ধে অংশ নেওয়া খাওলা বিনতে আল আযওয়ার কথা। যদি সত্যিই মনে রাখতো তাহলে নারীদের এভাবে ঘরে বন্দী করে রাখার কথা বলতো কি?

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, নারী বিদ্বেষী এই হেফাজত তাদের ১৩ দফা দাবী উত্থাপন করেছে একজন নারীর কাছেই। সত্যিই হাস্যকর বটে!

এইবেলাডটকম/এএস 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71