সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯
সোমবার, ৭ই শ্রাবণ ১৪২৬
 
 
মধ্যযুগীয় নৃশংসতা: দশ টুকরো করা নারীর লাশ যেভাবে শনাক্ত হল
প্রকাশ: ০৩:৪৫ am ২৪-০৩-২০১৫ হালনাগাদ: ০৩:৪৫ am ২৪-০৩-২০১৫
 
 
 


ঢাকা, ঢাকায় এক নারীকে হত্যার পর কেটে টুকরো টুকরো করে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল অপরাধীরা। তাকে হত্যার পর লাশ ১০ টুকরো করে শুধু বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়েই রাখা হয়নি। যাতে শনাক্ত করা না যায় সেজন্য তা আগুনে পুড়িয়ে বিকৃত করে দেয়া হয়েছিল। তারপরও আধুনিক বিজ্ঞান আর আর তদন্তকারীদের আন্তরিকায় সেই হতভাগ্য নারী কে তা জানাগেছে। নৃসংশ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরাও ধরা পড়েছে।
হতভাগ্য এই নারীর নাম শিমু (২০) । গ্রামের বাড়ি শরিয়তপুর। স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় ফকিরাপুল এলকায় থাকত। আর হত্যাকান্ডের আগে থেকেই তার স্বামী নাসির জেলে আছেন।
যেভাবে শুরু: 
গত ১০ মার্চ দুপুর সোয়া ১টার দিকে পুলিশ মতিঝিল থানার কালভার্ট রোড এলাকায় হোটেল উপবনের পাশে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন একটি হাত ও একটি পায়ের কাট অংশ উদ্ধার করে। এরপর পুলিশ অনুসন্ধানে নেমে একই দিন ফকিরাপুল ওয়াসা ভবনের দেয়ালের পাশ থেকে একটি বিচ্ছিন্ন পা উদ্ধার করে। আর সেখান থেকে একটু দূরে ময়লা আবর্জনার ভিতর থেকে একটি হাত ও একটি বাহু উদ্ধার করে। শরীরে এই সব বিচ্ছিন্ন অংশ ছিল বিকৃত-পোড়া।
মতিঝিল জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার জুয়েল রানা প্রিয়.কমকে জানান, তখানো তারা বুঝতে পারছিলিলেন না যে শরীরের এই অংশগুলো নারী না পুরুষের। আর একই ব্যক্তির কিনা। তবে তারা হাল ছাড়েন না।
এর পর তারা খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে ফকিরাপুল পানির ট্যাংকির পূর্ব পাশে ওয়াসার স্টোর রুমের টিনের চালায় বিছানার চাদর দিয়ে বাধা কিছু ঝুলতে দেখেন। আর সেই টিনের চালায় উঠে দড়ি দিয়ে বাধা বিছানার চাদর খুলে আংশিক মাথা এবং হাত-পা বিহীন একটি দেহ উদ্ধার করেন। সহকারী কমিশনার জুয়েল রানা জানান, ‘এসব এমনভাবে বিকৃত করা ছিল যে চেনার উপায় ছিল না। পুড়িয়ে বিকৃত করার কারণে মাথার চুল ছিল না।


পুলিশ তখনো শরীরের সব অংশ পায়নি। তাই আরো অনুসন্ধান চালিয়ে বিকেল পৌনে ৪টার দিকে ১৯৩/২ ফকিরাপুলের সাত তলা আহসান মঞ্জিলের সাত তলার সিড়ির শেষ প্রান্তে আগুনে পোড়ান মাথার আংশিক খুলি উদ্ধার করে। আর তা ছিল ছাই-কালি মাখানো।


যেভাবে হতভাগ্য নারীর লাশ সনাক্ত করা হল:
সেই দিনই পুলিশ শরীরের বিছিন্ন বিকৃত অংশগুলো এক করে মানুষের অবয়ব পায়। এরপর তা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক ল্যাবে পাঠান হয়। সেখানে ময়না তদন্ত এবং ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায় যে উদ্ধার করা শরীরের অঙ্গ গুলো একই ব্যক্তির এবং তিনি একজন নারী। তার বয়সও জানা যায় আনুমানিক ২০ বছর। তবে তখনো তাঁর নাম পরিচয় জানা যায়নি।


তদন্ত চলাকালে পুলিশ আরো অনুসন্ধান চালিয়ে ফকিরাপুলের ১৯৩/২ নম্বর বাড়ির দেয়ালে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ দেখতে পায়। সাত তলা এই বাড়ির সিড়ির শেষ প্রান্ত থেকেই এর আগে আংশিক মাথা উদ্ধার করা হয়। আর সেই রক্তের দাগ ধরে বাসার ছাদে উঠে পায় রক্তমাখা ছুড়ি, কেরোসিন তেলের বোতল এবং রক্ত মাখা শার্ট প্যান্ট। পরে জানা যায় প্যান্ট শার্ট যারা হত্যা করেছে তাদের।


তবে পুলিশকে ছাদে উঠতে হয়েছে ছাদের দরজার তালা ভেঙ্গে। বাড়ির মালিক মোবারক হোসেন মন্টিকে তখন পাওয়া যায়নি। চাবি নিয়ে আগেই সে লাপাত্তা হয়ে যায়। পুলিশ বাড়ির চার তলায় বসবাসরত মাদক ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন মন্টির স্ত্রীকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করে। আর জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা। জানা যায় হতভাগ্য নারীর নাম, পরিচয় ও ঠিকানা।


আসামিরা যা বলল:
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা্ বিভাগের(ডিবি) উপ পুলিশ কমিশনার জাহাঙ্গির হোসেন মাতুব্বর প্রিয়.কমকে জানান,‘ এরইমধ্যে মাদক ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন মন্টিসহ মোট ৬ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪জন আদালতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।’


তারা জানিয়েছে গত ৯ মার্চ গভীর রাতে মন্টির বাসার ছাদে বসে শিমুকে জবাই করা হয়। এর পর তাকে কেটে মোট ১০ টুকরা করা হয়। শরীরের বিভিন্ন অংশ কোরোসিন তেল দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে বিকৃত করা হয়। আর সেই বিকৃত অংশগুলো নানা জায়গায় ফেলে দেয়া হয় যাতে তাতে আর সনাক্ত করা না যায়।


হত্যাকাণ্ডের আগে শিমুকে ইয়াবা সেবন করিয়ে মাতাল করে তারা। এরপর তাকে দড়ি দিয়ে বেধে মুখে কাগজ ঢুকিয়ে টেপ দিয়ে মুখ আটকে দেয়া হয় যাতে চিৎকার করতে না পারে। লাশ টুকরা টুকরা করা হয় খাইট্টার উপর রেখে কুপিয়ে কুপিয়ে। মন্টির বাসার ছাদ থেকে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ছুড়ি এবং লাশ টুকরো করার দাসহ আরো অনেক আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।


কেন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড:
ডিবির অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার খন্দকার নুরুন্নবী প্রিয়.কমকে জানান, শিমুর স্বামী নাসিরও একজন মাদক ব্যবসায়ী। সে এই আটক আসামিদের সঙ্গেই মাদক ব্যবসা করত। তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হলে হত্যাকাণ্ডের ৪/৫ দিন আগে তারা ইয়াবাসহ ধরিয়ে দিলে ভ্রাম্যমান আদালত তাকে এক বছরের কারাদণ্ড দেয়। আর তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিমু মাদক ব্যবসায়ী মন্টিসহ অন্যান্যদের মাদক ব্যবসার কথা পুলিশকে জানিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়।


খন্দকার নুরুন্নবী জানান, আর একারণেই শিমুর মুখ বন্ধ করতে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর চেষ্টা করা হয় হত্যাকাণ্ডের নিশানা মুছে ফেলতে। তিনি আরো জানান, শিমু তাদের পরিচিত এবং তারা শিমুকে ঘটনার রাতে ধরে নিয়ে বাসার ছাদে হত্যা করে।

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক : সুকৃতি কুমার মন্ডল 

 খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

+8801711-98 15 52

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2019 Eibela.Com
Developed by: coder71