রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮
রবিবার, ৮ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
মসনদ-ই-আলা ঈশা খাঁ
প্রকাশ: ১২:০৭ pm ০৩-০৪-২০১৫ হালনাগাদ: ১২:০৭ pm ০৩-০৪-২০১৫
 
 
 


ঈশা খাঁ ভাটির (পূর্ব বাংলা) একজন ঈমানদার, সৎ, যোগ্য, বলিষ্ঠ নেতৃত্ববান সুশাসক এবং বাংলার বার ভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন স্থানীয় প্রধান যিনি মোঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।
বৃত্তান্ত- ও ইতিহাসঃ ঈশা খাঁ ১৮ই আগস্ট ১৫২৯ খৃস্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সোলায়মান খাঁ। তিনি ছিলেন আফগানিস্তানের সোলায়মান পার্বত্য অঞ্চলের এক আফগান দলপতির বংশধর। নুসরত শাহ এর রাজত্বকালে তিনি বাংলায় বসতি স্থাপন করেন এবং স্বীয় প্রচেষ্টায় ভাটি এলাকার বৃহত্তর ঢাকার ও ময়মনসিংহ জেলার উত্তর-পূর্ব অংশ নিয়ে এক স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সোলায়মান খাঁ অন্ততপক্ষে দুবার ইসলাম শাহ শুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং ১৫৪৮ সালে নিহত হন। ঈশা খাঁর বয়স তখন ১৯ বছর। পিতার মৃত্যুর পর ঈশা খাঁর পিতৃব্য কুতুবউদ্দীন তাহাকে লালন পালন করেন। তখন বাংলার জমিদারগণ মোঘল ও ইংরেজদের কবল হতে বাংলাকে রক্ষা করার জন্য তাদের গোয়েন্দাদের মাধ্যমে ঈশা খাঁকে আফগানিস্তানে সংবাদ দিয়েছিলেন।
তখন ঈশা খাঁ তাহাদের কথায় সাড়া দিয়ে আফগানিস্থান হইতে ১৪০০ (চৌদ্দশত) অশ্বারোহী, ২১টি নৌবিহার ও গোলা বারুদ নিয়ে ১৪ দিন ১৪ রাত পাহাড়, জঙ্গল, সাগর, নদী অতিক্রম করে ত্রিপুরা রাজ্যে এসে পৌঁছায়। ত্রিপুরা রাজ্য থেকে কিশোরগঞ্জ জঙ্গলবাড়ী দুর্গ দখল করে পরবর্তীতে সোনারগাঁও দূর্গ দখল করে। তিনি তার যৌবন ভাটিতে কাটিয়েছিলেন। সোনারগাঁওয়ের প্রাচীন নাম ছিল সুবর্ণ গ্রাম। ঈশা খাঁ ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা চাঁদরায়ের কন্যা যিনি কেদার রাজার বোন স্বর্ণময়ীকে বিবাহ করেন। স্বর্ণময়ী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ঈশা খাঁ তাহার নাম রাখেন সোনা বিবি। সেই নাম অনুসারে বাংলার রাজধানী সোনারগাঁও নামকরণ করা হয়। সেই সোনারগাঁওয়ের রাজধানী সুশাসন ঈশা খাঁ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
কররাণী আফগান শাসক তাজ খানের অনুগ্রহে ৩৫ বছর বয়সে ঈশা খাঁ বাংলার কররাণী শাসকের সামন- হিসাবে সোনারগাঁও ও মহেশ্বরদী পরগানায় ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে ভিনদেশী হিসেবে তিনগুণ মোহর দিয়ে জমিদারী লাভ করেন। তিনি ১৫৭১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এত শক্তিশালী হয়ে উঠেন যে, আবুল ফজল তাকে ভাটির শাসকরূপে আখ্যায়িত করেন। ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি সোনারগাঁওয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে মোঘল নৌবহরকে বিতাড়িত করতে দাউদ খানের সেনাপতিকে সাহায্য করেছিলেন। দাউদ খানের প্রতি কর্তব্য পালনের প্রতিদানে তিনি মসনদ-ই-আলা উপাধি লাভ করেন।
ষোড়শ শতাব্দীতে মোঘলদের হাত হতে বাংলাকে রক্ষা করার জন্য বার ভূঁইয়াদের নেতা ঢাকা সোনারগাঁওয়ের বিচক্ষণ ও দূরদর্শী রাজনীতিবিদ সু-শাসক ঈশা খাঁ (মসনদ-ই-আলা) মোঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহকে পরাজিত করে ১৫৯৭ সালে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করেছিলেন। তখন থেকে সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। ভারতীয় উপমহাদেশে বাংলার স্বাধীনতার বীজ একমাত্র ঈশা খাঁ বপন করেছিলেন। তার সাহস, বীরত্ব, দেশপ্রেমিকতা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ প্রানে- মোঘল সাম্রাজ্যবাদ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার্থে ঈশা খাঁর সফল সংগ্রাম তাকে বাংলার প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। বাংলার ইতিহাস এক ক্রানি-কালে বাংলার আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তিনি যে বীরত্ব দেখিয়েছিলেন তার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে একজন জাতীয় বীর হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। তিনি তার সোনারগাঁও ও মহেশ্বরদীর জমিদারীকে সাফল্যের সঙ্গে এক স্বাধীন রাজ্যে পরিণত করেন।
এ রাজ্য বৃহত্তর ঢাকা বেশ কিছু অংশ, প্রায় সমগ্র বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা এবং ত্রিপুরা জেলার এক ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে গঠিত হয়। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের খিজিরপুর এবং কিশোরগঞ্জ জেলার জঙ্গলবাড়ী ও এগারসিন্দু ছিল তার শক্তিশালী ঘাঁটি।
ঈশা খাঁর মাজারঈশা খাঁর বিদায় পর্ব
ঈশা খাঁ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন দূর্গে যাতায়াত করতেন। ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে মহেশ্বরী পরগনার অন্তর্গত বক্তারপুর দূর্গে যান এবং তিনি অসুস’ হয়ে পড়েন এবং ১৭ই সেপ্টেম্বর ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে প্রায় ৭০ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন। গাজীপুর জেলার কালিগঞ্জ থানায় বক্তারপুর গ্রামে ঈশা খাঁ সমাহিত আছেন।
কোথায় উত্তরাধিকার স্থিত হলেনঃ 
ঈশা খাঁ এর মৃত্যুর পর তাহার পুত্র প্রথম বংশধর মুসা খাঁ বাংলার ভাটি অঞ্চলের (পূর্ব বঙ্গ ব-দ্বীপ) অধিপতি হন। ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে পিতার মৃত্যুর পর তিনি এক বিশাল রাজ্যের উত্তরাধিকারী হন। এ রাজ্য বৃহত্তর ঢাকা ও কুমিল্লা জেলার প্রায় অর্ধেক, প্রায় সমগ্র বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা এবং সম্ভবত বৃহত্তর রংপুর, বগুড়া ও পাবনা জেলার কিছু অংশে বিস্তৃত ছিল। মুসা খাঁ এক শক্তিশালী নৌ-বাহিনীর অধিকারী ছিলেন। রাজধানী সোনারগাঁও ছাড়াও খিজিরপুর, কাত্রাবো, কদম রসুল, যাত্রাপুর, ডাকচর, শ্রীপুর ও বিক্রমপুর তার দুর্ভেদ্য সামরিক ঘাঁটি ছিল। অপরাপর ভূইয়াদের সহায়তায় পূর্ব বঙ্গের স্বীয় আধিপত্য অক্ষুণ্ন রাখার জন্য তিনি ১০ বছর কাল মোঘল বাহিনীর বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। কিন’ বারবার পরাজয় এবং সোনারগাঁওসহ তার ঘাঁটিগুলো পতনের ফলে শেষ পর্যন্ত ১৬১১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মোঘলদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য হন। মুসা খাঁ ১৬২৩ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা মুসা খাঁ মসজিদের সন্নিকটে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শহীদুল্লাহ হল প্রাঙ্গণে) তিনি সমাহিত আছেন।
মুসা খাঁ এর মৃত্যুর পর তার পুত্র ফিরোজ খাঁ দ্বিতীয় বংশধর পরগনার অধিপতি হন এবং তাহার মৃত্যুর পর মনোয়ার খাঁ (৩য় বংশধর) পরগনার অধিপতি হন। পরবর্তীতে তাহাদের বংশধর হত্তুখাঁ, নত্তুখাঁ, পাহাড়খাঁ (৪র্থ বংশধর) এবং পাহাড় খাঁ এর পুত্র চামরু খাঁ (৫ম বংশধর) এবং অন্যান্য বংশধররা সোনারগাঁওয়ে অবস্থানকালীন ১৭৭০ইং সালের দিকে তৎকালীন শাসক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী সেই ঐতিহাসিক সোনারগাঁও দখল করে এবং সোনারগাঁও থেকে ঈশা খাঁ ৪র্থ ও ৫ম বংশধরদের বিতাড়িত করেন। ৪র্থ ও ৫ম বংশধররা প্রাণের ভয়ে ঘোড়া ও বড় বড় নৌকাযোগে বাংলাদেশের সুদূর দক্ষিণে সুন্দরবনের ধারে সাতক্ষীরা জেলা কালিগঞ্জ থানার মহৎপুর গ্রামে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং ঐ স্থানে যাওয়ার পর বংশধররা তাহাদের নিয়ে যাওয়া মোহর দিয়ে অনেক ভূমি খরিদ করেন এবং নতুনভাবে ইমরাত তৈরি করেন। সেই সময় হইতে খাঁ বাড়ী বলে পরিচিত। ঐ সময় হতে তাহার বংশধররা সেখানে স্কুল, কলেজ, ঈদগাহ, মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান ইত্যাদি তৈরি করেন। চামরু খাঁ এর পুত্র তালেব খাঁ (৬ষ্ঠ বংশধর), তালেব খাঁ এর পুত্র আজিজাত খাঁ, চন্দন খাঁ, শাহাদৎ খাঁ, আমানতউল্লাহ খাঁ (৭ম বংশধর), শাহাদৎ খাঁ এর পুত্র ছবিলার রহমান খাঁ (৮ম বংশধর),  ছবিলার রহমান খাঁ এর পুত্র নজিবর রহমান খাঁ, কন্যা স্বপ্না নাসরিন ও নাছিমা সুলতানা রত্না (১০ম বংশধর)। নাসিমা সুলতানা রত্না ঈশা খাঁ ফাউন্ডেশন এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। তিনি কবি, ইতিহাসবিদ ও সমাজ সেবক। হায়বাত খাঁ নামক একটি পরিবার বাণিজ্য সূত্রে বাগেরহাট জেলার খাঁর আবাদ নামক স্থানে বসতি স্থাপন করেন। তাহাদের খাঁ এর নামানুসারে খাঁর আবাদ নামকরণ করেন। সেখানেও তাহারা ইমারত তৈরি করেছিলেন। সুত্রঃ ঈশা খাঁ ফাউন্ডেশন
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71