শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৯
শুক্রবার, ৬ই বৈশাখ ১৪২৬
সর্বশেষ
 
 
মহাভারত অনুবাদ করে জীবন দিয়েছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ
প্রকাশ: ০৪:২৯ pm ২৪-০২-২০১৯ হালনাগাদ: ০৪:২৯ pm ২৪-০২-২০১৯
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন মহাভারত। বিনামূল্যে তা পৌঁছে দিয়েছিলেন বাংলার প্রত্যেকটি প্রান্তে। চেয়েছিলেন সবাই জানুক মহাভারতের মতো মহান সৃষ্টির এবং তা মানুষ পড়ুক সহজভাবে। নিজের ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন। কিন্তু সেই ইচ্ছা পূরণই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল কালীপ্রসন্ন সিংহের কাছে। ঋণের দায়ে সর্বস্বান্ত হয়ে চলে গিয়েছিল জীবনটাই।

বিখ্যাত সিংহ পরিবারের ছেলে কালীপ্রসন্নের জন্মের খবর প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা কুরিয়ার নামক পত্রিকার শিরোনামে। লেখা হয়েছিল “২৩শে ফেব্রুয়ারি ১৮৪০ জোড়াসাঁকোর নন্দলাল সিংহের পুত্রের জন্ম অনুষ্ঠান পালন”। তাঁর বয়স তখন আঠেরোর কোঠায়। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সংস্কৃত মহাভারতকে বাংলায় অনুবাদ করবেন। একাই কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু ক্রমশ বুঝতে পারছিলেন একা এই কাজ করা অসম্ভব। সাহায্যের জন্য পাণিপ্রার্থী হলেন সমাজের তৎকালীন পণ্ডিতদের।

প্রথমেই তাঁর অভিভাবক হরচন্দ্র ঘোষের কাছে যান। তিনি তাঁকে বলেন কয়েক জন সংস্কৃত পণ্ডিতের সাহায্য নিতে। সংস্কৃত পণ্ডিতের সাহায্য পেতে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাছে যান। জানা যায়, তিনি এই কাজের দায়িত্ব পুরোটা বিদ্যাসাগরের সাহায্য নিয়ে করতে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘‘আমার পক্ষে একা আর অনুবাদ সম্ভব হচ্ছে না, আপনি দায়িত্ব নিন।’’ বিদ্যাসাগরের হাতে তখন সময়ের অভাব। তবে তিনি নিজে এই কাজ না করতে পারলেও সাত জন পণ্ডিতকে কালীপ্রসন্নকে সাহায্যের জন্য সঙ্গে দেন।

কালীপ্রসন্নের তত্ত্বাবধানে তাঁর বাড়িতেই শুরু হয়েছিল অনুবাদের কাজ। কিন্ত খবর জানাজানি হতেই শুরু হইয়ে গিয়েছিল নিন্দা। যুক্তি কি? কালীপ্রসন্ন নাকি টাকা দিয়ে পণ্ডিত কিনে মহাভারত অনুবাদ করিয়ে নিজেকে মহান করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এর উত্তরে দিয়েছিলেন তিনি। লিখেছিলেন, ‘‘আমি যে দুঃসাধ্য ও চিরজীবনসেব্য কঠিন ব্রতে কৃত সঙ্কল্প হইয়াছি, তাহা যে নির্বিঘ্নে শেষ করিতে পারিব, আমার এ প্রকার ভরসা নাই। মহাভারত অনুবাদ করিয়া যে লোকের নিকট যশস্বী হইব, এমত প্রত্যাশা করিয়াও এ বিষয়ে হস্তার্পণ করি নাই। যদি জগদীশ্বর প্রসাদে পৃথিবী মধ্যে কুত্রাপি বাঙ্গালা ভাষা প্রচলিত থাকে, আর কোন কালে এই অনুবাদিত পুস্তক কোনও ব্যক্তির হস্তে পতিত হওয়ায় সে ইহার মর্ম্মানুধাবন করত হিন্দুকুলের কীর্তিস্তম্ভস্বরূপ ভারতের মহিমা অবগত হইতে সক্ষম হয়, তাহা হইলেই আমার সমস্ত পরিশ্রম সফল হইবে।” টানা আট বছর ধরে পরিশ্রমের পর ১৮৬৬ সালে শেষ হয়েছিল কালিপ্রসন্নের মহাভারতের বাংলা অনুবাদের কাজ। অনুবাদের বইও তৈরি করলেন তিনি।

এবার বই পাঠকদের কাছে পৌঁছাবে কিভাবে? সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বিনামূল্যে তিনি তাঁর কাজ পৌঁছে দেবেন বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে। বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায়। বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল, ‘‘শ্রীযুক্ত কালীপ্রসন্ন সিংহ মহোদয় কর্ত্তৃক গদ্যে অনুবাদিত বাঙ্গালা মহাভারত মহাভারতের আদীপর্ব্ব তত্ত্ববোধিনী সভার যন্ত্রে মুদ্রিত হইতেছে। অতি ত্বরায় মুদ্রিত হইয়া সাধারনে বিনামূল্যে বিতরিত হইবে। পুস্তক প্রস্তুত হইলেই পত্রলেখক মহাশয়েরদিগের নিকট প্রেরিত হইবে। ভিন্ন প্রদেশীয় মহাত্মারা পুস্তক প্রেরণ জন্য ডাক স্ট্যাম্প প্রেরণ করিবেন না। কারণ, প্রতিজ্ঞানুসারে ভিন্ন প্রদেশে পুস্তক প্রেরণের মাসুল গ্রহণ করা যাইবে না। প্রত্যেক জেলায় পুস্তক বন্টন জন্য এক এক জন এজেন্ট নিযুক্ত করা যাইবে, তাহা হইলে সর্ব্বপ্রদেশীয় মহাত্মারা বিনাব্যয়ে আনুপূর্ব্বিক সমুদায় খণ্ড সংগ্রহকরণে সক্ষম হইবেন।” এটাই তাঁর জীবনকে শেষ করে দিল।

তৎকালীন আড়াই লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই মহাভারত বিতরণ করেছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। উদ্দেশ্য একটাই, দেশের সাধারণ মানুষ ভারতের এই মহান মহাকাব্যকে জানুক। ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে গিয়েছিলেন। যাঁদেরকে একসময় বিশ্বাস করে নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন তারা কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেননি। কলকাতা বিখ্যাত সিংহ পরিবারের ছেলের প্রথমেই চলে যায় জমিদার তৎকালীন উড়িষ্যার জমিদারি। ক্রমে কলকাতার বেঙ্গল ক্লাব, আরও যা যা সম্পত্তি সব একে একে বিক্রি হয়ে যায়।

১৮৬৬ সালে তাঁর নামে মোট ২০টি মামলা রুজু হয়েছিল। একের পর এক সম্পত্তি আটক আর বিক্রি করে পাওনাদারদের দেনা মেটাতে শুরু করে হাইকোর্ট। এত ঋণ যে কিছুতেই তা শোধ করে শেষ করা যাচ্ছিল না। তাঁর বাকি সম্পত্তির ওপর রিসিভার বসল। পাওনাদারদের দাবিতে শেষ পর্যন্ত ওয়ারেন্ট জারি হয়ে গেল কালীপ্রসন্নের নামে। ওয়ারেন্ট এড়াতে লুকিয়ে একা থাকতে হল বরাহনগরের বাগান বড়িতে। তবু শেষরক্ষা হয়নি। আদালতে বহু গড় হাজিরার পর শেষ পর্যন্ত তাঁকে আদালতে হাজিরা দিতে হয়। আসামির কাঠগড়ায় মহাভারতের বাংলা অনুবাদক। দোষী সাব্যস্ত হলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। শুধু বিচারপতি হাজতবাসের সাজা দেননি। সর্বস্বান্ত হয়ে গিয়েছেন। শোনা যায় লজ্জায় মাথা নিচু করে বেড়িয়ে গিয়েছিলেন আদালত থেকে।

এই লজ্জার দায়ভার বেশী দিন আর বয়ে বেড়াতে পারেননি। ১৮৭০ সাল, ২৪ জুলাই। বরাহনগরের যে বাড়িতে বসে দীর্ঘ আট বছর ধরে কাজ হয়েছিল মহাভারত অনুবাদের সেই সাধের সারস্বতাশ্রমেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। বয়স, মাত্র ত্রিশ ছুঁই ছুঁই। তিনি অনুবাদ করেছিলেন শ্রীমদ্ভগবদ গীতাও, যা প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর মৃত্যুর বহু পরে।

১৮৫৩ সালে বাংলাভাষা চর্চার জন্য বিদ্যোৎসাহিনী সভা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ‘হুতোম প্যাঁচার নক্‌শা’ হল তাঁর সেই অমর সৃষ্টি যেখানে ঊনবিংশ শতকের কলকাতার বাবু সম্প্রদায়ের একটি পরিষ্কার চিত্র অঙ্কিত হয়েছিল। ১৮৫৭ সালে ‘শকুন্তলা’ নামক থিয়েটারটি মঞ্চস্থ করেছিলেন। পরে ‘বেণীসংহার’ থিয়েটারে নিজেই অভিনয় করেছিলেন। অভিনয়টি সেই সময় ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিল। ‘ভানুমতী’ নামক একটি মহিলা চরিত্রের ভূমিকায় অভিনয় করে প্রশংসা পেয়েছিলেন। ১৮৫৭ সালে, কালিপ্রসন্ন নিজেই কালিদাসের সংস্কৃত রচনার উপর ভিত্তি করে ‘বিক্রমোর্বশী’ নাটক লিখেছিলেন। ১৮৫৮ সালে ‘সাবিত্রী-সত্যবান’ এবং ১৮৫৯ সালে ‘মালতী-মাধব’ -এর মতো বেশ কিছু নাটক লিখেছিলেন। কালীপ্রসন্ন সিংহ ‘বিদ্যোৎসাহিনী পত্রিকা’, ‘পরিদর্শক’,’সারবত্ত্বা প্রকাশিকা’ ও ‘বিভিদার্থ সংগ্রহ’-এর মতো পত্রিকাগুলির কখনও সম্পাদনা কখনও প্রকাশনার কাজ করেছিলেন।

সূত্র: মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ (মন্মথনাথ ঘোষ)

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক : সুকৃতি কুমার মন্ডল 

 খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

+8801711-98 15 52

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2019 Eibela.Com
Developed by: coder71