শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৭ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
মানবতাবাদী ভগিনী নিবেদিতা
প্রকাশ: ১১:৩১ pm ০৬-০২-২০১৭ হালনাগাদ: ১১:৩২ pm ০৬-০২-২০১৭
 
 
 


তারাপদ আচার্য্য ||

 ভগিনী নিবেদিতা এক বিস্ময়। কখনও তিনি লোক-শিক্ষয়িত্রী, কখনও স্নেহবিগলিতা জননী, কখনও কর্তব্যনিষ্ঠ মায়া-মমতাবর্জিত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কর্মী, কখনও বিনীতা ছাত্রী, অথবা সেবিকা, আবার কখনও ভগবদ্ভাবে বিভোরা। বিভিন্ন ভাবের সমাবেশ ঘটেছিল একই চরিত্রে, আর সবগুলো ভাবই যেন তাঁর জীবনে মূর্ত হয়ে উঠেছিল।

যে যুগসন্ধিক্ষণে শ্রীরামকৃষ্ণ এবং আধ্যাত্মিক শক্তিরূপিনী শ্রীসারদাদেবীর জ্যোতির্ময় আবির্ভাব; ভারতাত্মার পূর্ণ প্রতীক রূপে স্বামী বিবেকানন্দের আলোকিত উপস্থিতি, পরাধীন ভারতের পুনর্জাগরণের সেই গৌরবময় শুভ মুহূর্তে ভগিনী নিবেদিতার অভ্যুদয় পরম করুণাময় মহান স্রষ্টার সুপরিকল্পিত।

ভারতীয় ইতিহাসের একটি প্রাণচঞ্চল অধ্যায়ে তাঁর অবদান অতুলনীয়। ভারতের তথা সমগ্র বিশ্বের কল্যাণসাধনে শ্রীরামকৃষ্ণদেব যে মহাশক্তির উদ্বোধন ঘটালেন, তার অপূর্ব প্রকাশ ভগিনী নিবেদিতার জীবনে দৃশ্যমান।

যুগপ্রয়োজনে শ্রীরামকৃষ্ণের সমগ্র শিক্ষাকে স্বামী বিবেকানন্দ মাত্র দু’টি শব্দে বিশ্বের সামনে তুলে ধরলেন। শব্দ দু’টি হচ্ছে ’ত্যাগ ও সেবা’। আর ভগিনী নিবেদিতার জীবনে সেই ত্যাগ ও সেবা বাস্তবরূপ নিয়েছিল।

ভগিনী নিবেদিতার মধ্য দিয়ে যে দৈবশক্তির এক বিশেষ প্রকাশ ঘটেছিল, অবিভক্ত ভারতের জাতীয় জীবনের নবজাগরণের প্রতি পদক্ষেপে তার পরিচয় পাওয়া যায়। আধ্যাত্মিকতা ছাড়াও শিক্ষায়, সেবায়. সাহিত্যে, বিজ্ঞানে, শিল্পে, রাজনীতিতে তাঁর অবদান ভারত-ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।

ভগিনী নিবেদিতার পূর্বনাম মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল। উত্তর আয়ারল্যান্ডের টাইরন প্রদেশের ছোট্ট শহর ড্যানগ্যাননে তাঁর জন্ম। তাঁর ঠাকুরদাদা রেভারেন্ড জন নোবল ছিলেন এক প্রটেষ্ট্যান গীর্জার যাজক।

তাঁর চতুর্থসন্তান স্যামুয়েল রিচমন্ড হচ্ছেন  মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল তথা ভগিনী নিবেদিতার বাবা। ভগিনী নিবেদিতার মায়ের নাম মেরী ইজাবেল হ্যামিল্টন। ঠাকুরদাদা আর বাবা উভয়ে ছিলেন যাজক। ফলে এক শুদ্ধ ধর্মীয় পারিবারিক পরিবেশে মার্গারেট বেড়ে উঠেন । তাঁর জন্ম ১৮৬৭ খ্রীষ্টাব্দের ২৮ অক্টোবর।

স্বামী বিবেকানন্দ যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্বধর্মমহাসভায় আলোড়ন সৃষ্টিকারী বক্তব্য রাখেন ১৮৯৩ সালে। মধ্যগগনের সূর্যের মত তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর পরিভ্রমন করে তিনি মূলত: বেদান্তভিত্তিক বক্তব্য রাখেন।

তাঁর মুখনিসৃত সমন্বয়ের বার্তা মার্কিন মননকে প্রচন্ডভাবে আলোড়িত করেছিল। প্রায় দু’বছর যুক্তরাষ্ট্রে কাটানোর পর স্বামীজী ইউরোপ সফরে প্রথমে প্যারিস এবং পরে লন্ডন যান। লন্ডনেই মার্গারেট এলিজাবেথ তথা ভবিষ্যতের নিবেদিতার সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ।

মার্গারেট তখন প্রচন্ড অস্থিরতায় ভুগছেন। গীর্জা কেন্দ্রিক ধর্মচর্চার একধরনের একঘেয়েমীর সঙ্গে তাঁর যুক্তিবাদী মনের দ্বন্দ্ব তাঁকে বিচলিত করে তোলে।

এসময় বুদ্ধের জীবনীগ্রন্থ ’লাইট অফ এশিয়া’ তাঁর হাতে আসে। তিনি বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে আগ্রহী হন। কিন্তু আধ্যাত্মিকতার চূড়ান্ত মীমাংসা তাঁর কাছে অধরা থেকে 
যায়। এই পটভূমিতে লন্ডনে স্বামী বিবেকানন্দের আগমন। স্বামীজীর বিভিন্ন বক্তৃতা সম্পর্কে লন্ডনের প্রধান প্রধান দৈনিক সংবাদপত্রে ফলাও আলোচনার ফলে অচিরেই তাঁর নাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মার্গারেটও তাঁর সম্পর্কে আগ্রহী হন। 
১৮৯৫ খ্রীষ্টাব্দের নভেম্বর মাসের এক রবিবার। আপরাহ্ন বেলায় ওয়েস্ট এন্ডের এক ড্রইংরূম। একটি ঘরোয়া ক্লাস। উপস্থিতির সংখ্যা পনেরো ষোলো জন। তাদের মধ্যে মার্গারেটও ছিলেন। বক্তা স্বামী বিবেকানন্দ। স্বামিজী বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। মাঝে মাঝে সুর করে সংস্কৃত শ্লোক আবৃত্তি করে ইংরেজী ভাষায় তার অর্থ বলে দিচ্ছিলেন। এক অপার্থিব পরিবেশ সৃষ্টি হল। এর পর মার্গারেট লন্ডনে স্বামিজীর আরও দু’টি বক্তৃতায় উপস্থিত ছিলেন। স্বামিজী পাঁচ মাসের জন্য আমেরিকায় ফিরে যান। এর মধ্যে মার্গারেটের চিন্তা চেতনা স্বামিজীর ভাবধারায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে মানুষের মন আর শরীর আত্মা দ্বারা পরিচালিত- এই বক্তব্য তাঁকে আলোড়িত করে। দ্বিতীয়বার স্বামিজী ইংল্যান্ড সফরে আসলে তাঁর প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে মার্গারেট উপস্থিত থাকতেন। তিনি প্রায়ই স্বামিজীকে কঠিন সব প্রশ্ন করতেন এবং স্বামিজীর সাবলীল উত্তরে মুগ্ধ হতেন। স্বামিজী দেশে ফিরলেন; ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলছে। বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রস্তুতি চলছে। স্বামিজীর সঙ্গে মার্গারেটের নিয়মিত পত্রবিনিময় হয়। অবশেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়লেন তিনি। 
ইউরোপ থেকে যাত্রা করে ‘মম্বাসা’ জাহাজ যখন মার্গারেটকে নিয়ে ২৮ জানুয়ারী ১৮৯৮ সালে কলকাতা এসে পৌছল, তার প্রায় একশ’ বছর আগে থেকে ভারতে আধুনিক যুগের সূচনা। 
এই প্রেক্ষিতকে মাথায় রেখেই স্বামী বিবেকানন্দ আলমোড়া থেকে ২৯ জুলাই ১৮৯৭ তে লেখা চিঠিতে ‘কল্যাণীয়া মিস্ নোবল’ কে আহ্বান জানিয়েছিলেন, “তোমাকে খোলাখুলি বলছি, এখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে, ভারতের কাজে তোমার এক বিরাট ভবিষ্যৎ রয়েছে। ভারতের  জন্য, বিশেষত ভারতের নারী সমাজের জন্য, একজন প্রকৃত সিংহীর প্রয়োজন। ভারতবর্ষ এখন মহিয়সী নারীর জন্ম দিতে পারছে না। তাই অন্য জাতি থেকে তাকে ধার করতে হবে। তোমার শিক্ষা, ঐকান্তিকতা, পবিত্রতা, অসীম ভালবাসা, দৃঢ়তা, সর্বোপরি তোমার ধমনীতে প্রবাহিত কেল্টিক রক্তের জন্য তুমি ঠিক সেই নারী, যাকে আজ প্রয়োজন।”
ভারতে আসার পর দীক্ষান্তে গুরু কর্তৃক মার্গারেটের নামকরণ হল ‘নিবেদিতা’। সার্থক সে নাম। ভারতবর্ষের জন্য আক্ষরিক অর্থেই তিনি নিবেদিতা। সে কথা বাকি জীবন দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গিয়েছেন। হিমালয়ের ক্রোড়ে, দার্জিলিংয়ের নির্জন প্রান্তরে নিবেদিতার যে-অনাড়ম্বর স্মৃতিস্তম্ভ, সেটির ভাষায় বলা যেতে পারে, ‘যিড় মধাব যবৎ ধষষ ঃড় ওহফরধ’ ।
এই সংহত, সত্য বার্তাকেই বিস্তারিত ব্যাখ্যায় রবীন্দ্রনাথ ভারতবাসীর কাছে স্পষ্ট করেছেন, “ভগিনী নিবেদিতা আমাদিগকে যে জীবন দিয়া গিয়াছেন তাহা অতি মহৎ জীবন, তাঁহার দিক হইতে তিনি কিছুমাত্র ফাঁকি দেন নাই- প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তেই আপনার যাহা সকলের শ্রেষ্ঠ, আপনার যাহা মহত্তম, তাহাই তিনি দান 
পাতা : ২
করিয়াছেন, সেজন্য মানুষ যতপ্রকার কৃচ্ছ্রসাধন করিতে পারে, সমস্তই তিনি স্বীকার করিয়াছেন। 
“এই যে এতবড় আত্মবিসর্জন আমরা ঘরে বসিয়া পাইয়াছি ইহাকে আমরা যে অংশে লঘু করিয়া দেখিব সেই অংশেই বঞ্চিত হইব, পাইয়াও আমাদের পাওয়া ঘটিবে না। 
“...ইহার পশ্চাতে কত বড়ো একটা শক্তি, ইহার সঙ্গে কী বুদ্ধি, কী হৃদয়, কী ত্যাগ, প্রতিভার কী জ্যোতির্ময় অন্তর্দৃষ্টি আছে তাহা আমাদিগতে উপলব্ধি করিতে হ্ইবে।”
সত্যিই সর্বার্থে নিজের জীবন দিয়ে নিবেদিতা আধুনিক ভারতবর্ষের নানা স্তরে পৌছে দিয়েছেন তাঁর বহুমুখী প্রতিভার বর্ণালী। সার্থক করে গিয়েছেন তাঁর আচার্যের আশীর্বাণী- ‘অতীতের কল্পনায় ভাসে নাই যারা/অনাগত ভারতের যে-মহামানব,সেবিকা, বান্ধবী, মাতা; তুমি তার সব।’
নিবেদিতা যখন এদেশে এলেন, ব্রিটিশ সরকারের নানাবিধ অবদমন সত্ত্বেও শিক্ষিত ভারতবাসী তখন ক্রমোন্নতির এক-একটি শিখর স্পর্শ করছে। বিজ্ঞান-সাহিত্য-শিল্প-রাজনীতি-ধর্মচেতনা সব দিকেই তখন আন্তর্জাতিক মানের ভারতীয় প্রতিভা- কেউ তখনই প্রস্ফুটিত, কেউ কেউ আবার আঙ্কুরোদগমের পথে। তাঁরা তাঁদের একাগ্র যাত্রাপথে সঙ্গী হিসেবে পেলেন এক ভরসাযোগ্য ভগিনীকে-ভগিনী নিবেদিতা। তাঁর প্রভাবে ভারতবর্ষের নবজাগৃতি সম্মুখপানে কতটা ধাক্কা পেয়েছিল, তা বুঝতে আপাতত এমন কিছু মানুষের সঙ্গে নিবেদিতার যোগাযোগের কথা আলোচনা করা যেতে পারে। 
প্রথমে বলা যাক আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর কথা। কারণ, শ্রীরামকৃষ্ণ-ভাবান্দোলনের শরিকদের বাইরে তাঁর সঙ্গে নিবেদিতার প্রথম ঘনিষ্ঠতা। বিদ্যুৎতরঙ্গ এবং বেতারতরঙ্গ সংক্রান্ত তাঁর গবেষণা তখনই ইউরোপে সসম্মানে স্বীকৃতি পেয়েছে।
কলকাতার প্র্রেসিডেন্সি কলেজের এই  প্রথিতযশা তরুণ বিজ্ঞানীর সঙ্গে আলাপ করতে, স্বামীজির ‘ধীরামাতা’ সারা চ্যাপম্যান বুলকে সঙ্গে নিয়ে নিবেদিতা উপস্থিত হলেন অধ্যাপক বসুর গবেষণাগারে। তাঁরা ভেবেছিলেন, বিনা তারে যান্ত্রিক কাজ করানোর যেসব চমকপ্রদ পরীক্ষা জগদীশচন্দ্র পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীমহল তথা সাংবাদিককুলকে দেখিয়ে এসেছিলেন, তারই কিছু নিদর্শন হয়তো তাঁরা দেখার সুযাগ পাবেন। কিন্তু তাঁরা  দেখলেন, বিজ্ঞানী এখন জড় ও জীবের ঐক্যসন্ধানী সম্পূর্ণ অন্য এক ভাবনায় বিভোর হয়ে আছেন। তিনি দেখেছেন বৈদ্যুতিক উদ্দীপনায় জড়, উদ্ভিদতন্তু ও প্রাণিপেশি নাকি প্রায় একইভাবে সাড়া দেয়, বারংবার উদ্দীপনায় নাকি ক্লান্তও হয়ে পড়ে। 
নিবেদিতা চমকে ওঠেন। উত্তেজনায় সাড়া দেওয়া, ক্লান্তিবোধ করা, এসব তো প্রাণের অনিবার্য লক্ষণ! জড়পদার্থেও সেই লক্ষণ ধরা পড়ছে অধ্যাপক বসুর যন্ত্রে! স্বামীজির কাছ থেকে যে-সুপ্রাচীন অদ্বৈত দর্শনের কথা তিনি শিখেছেন তাতে বলা হয়েছে, সর্বভূতে একই চৈতন্যের প্রকাশ। তবে কি জগদীশচন্দ্র সেটিই তাঁর গবেষণাগারে প্রমাণ করতে চলেছেন? আবেগ-বিহ্বল নিবেদিতা একদিন বসুকে বললেন,‘আমায় যা বলছ তা   

পাতা : ৩
তোমার লিখে ফেলা উচিত।’ নিবেদিতার জীবনীকার লিজেল রেঁম পরিবেশন করেছেন সেই ঐতিহাসিক কথোপকথন- “অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে বসু বললেন, ‘যা বিদ্যুচ্চমকে আমার মনে খেলে যাচ্ছে, সে কল্পনাকে রূপ দেব কী করে? ওতো আমার কাছে মরীচিকা!’
“নিবেদিতা উত্তর দিলেন, ‘আমি তো আছি। আমার কলম অনুগত ভৃত্যের মতো তোমার কাজ করবে। মনে করো এ লেখা তোমারই’।”
কথা রেখেছিলেন নিবেদিতা। জগদীশচন্দ্রের এই পর্যায়ের গবেষণাগ্রন্থগুলি - খরারহম ধহফ ঘড়হ-খরারহম’, দচষধহঃ জবংঢ়ড়হংব’, দঈড়সঢ়ধৎধঃরাব ঊষবপঃৎড়-ঢ়যুংরড়ষড়মু, দওৎৎরঃধনরষরঃু ড়ভ চষধহঃং’, নিবেদিতা-জীবনীকার প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণার ভাষায় “ সমস্তই নিবেদিতা কর্তৃক শুধু সম্পাদিত বলিলে যথার্থ বলা হয় না। ভাষার ওপর নিবেদিতার অসাধারণ দখল থাকায় ঐ সকল পুস্তক প্রণয়নে তাহা যথেষ্ট কাজে লাগিয়াছিল।”
শুধু গ্রন্থরচনা নয়, জগদীশচন্দ্রের গবেষণায় প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান, শারীরিক অসুস্থতায় শুশ্রুষা, বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠায় সহায়তা, সব ক্ষেত্রেই নিবেদিতা আজীবন বসু-দম্পতির পাশে। 
ঠাকুর পরিবারের অপেক্ষাকৃত বয়োকনিষ্ঠ সদস্যা রবীন্দ্রনাথের ভাগনি, ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদিকা সরলা ঘোষালের সঙ্গে নিবেদিতার ভাল ঘনিষ্ঠতা জন্মায়। 
লিজেল রেমঁ লিখেছেন “সরলা ঘোষাল ঠাকুরবাড়ির এক মহিলা, এর মধ্যে অনেকবার বাগবাজারে এসেছেন।  নিবেদিতার নতুন বিদ্যালয়ের পরিকল্পনা বাস্তবে কী রূপ ধরছে তাই দেখতে আসতেন। ফিরে গিয়ে শতমুখে নিবেদিতার প্রশংসা করতেন। শুনে ব্রাহ্ম বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষেরা ‘স্ত্রী এডুকেশন’ সম্বন্ধে নিবেদিতার মতামত শোনবার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানালেন।”
জোড়াসাঁকোয় গিয়ে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গেও নিবেদিতা আলাপ করে আসেন, পরে বিবেকানন্দকেও একবার নিয়ে যান। তাঁর মনে হয়, ব্রাহ্মসমাজ ও শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবান্দোলনকে এক স্্েরাতে নিয়ে আসতে পারলে তা আধুনিক ভারতবর্ষের পক্ষে মঙ্গলজনক হবে। এই পরিকল্পনা অবশ্য সফল হয়নি। 
যদিও সেই ব্যর্থতা আদি ব্রাহ্মসমাজের জ্যেষ্ঠ সম্পাদক রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বন্ধুতায় কোনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। নিবেদিতা প্রথম রবীন্দ্র-গল্পের ইংরেজি অনুবাদ করেন। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের প্রথম আন্তর্জাতিক সংকলন ‘ ঐঁহমৎু ংঃড়হবং ধহফ ঙঃযবৎ ঝঃড়ৎরবং’ এ সংকলিত তেরোটি গল্পের মধ্যে একটি নিবেদিতার- ‘ ঞযব ঈধনঁষরধিষধ’
ভারতবর্ষের শেকড় সন্ধানী নিবেদিতার কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় দীনেশ চন্দ্র সেনের কথা। ইংরেজিতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস রচনায় তিনি পথিকৃত। নিবেদিতা বুঝেছিলেন পাশ্চাত্য পাঠকের কাছে এই বিষয়বস্তুটি তুলে ধরার গুরুত্ব। তাই বিপুল ব্যস্ততার মধ্যেও ১৯০৯-১০ সালে প্রায় এক বছর সময় নিয়ে তিনি সম্পাদনা করেছিলেন এই বৃহৎ গ্রন্থটির পান্ডুলিপি। দীনেশ চন্দ্রের স্মৃতিচারণ থেকে জানা 
পাতা : ৪
যায়, ভারতীয় লোকশিল্প এবং সঙ্গীতের প্রতি নিবেদিতার সুগভীর মমতার কথা। তাঁর সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে নিবেদিতা একদিন বলেছিলেন, “বড় বড় লম্বা শব্দ লাগাইয়া যাঁহারা মহাকবির নাম কিনিয়াছেন, পল্লীগাথার অমার্জিত ভাষার মধ্যে অনেক সময় তাঁহাদের অপেক্ষা ঢের গভীর ও প্রকৃত কবিত্ব আছে। ”
এই বিশ্বাস থেকেই নিবেদিতা ভারতীয় সাহিত্যের গভীরে পৌঁছতে চেয়েছিলেন। তিনি প্রবেশ করেছেন ভারতের মহাকাব্য, পুরাণ, লোকগাথা এবং সর্বোপরি বেদে। নিবেদিতা এসবের কাহিনীতে বুঁদ হয়ে যান। স্বামীজি ও তাঁর গুরুভাইদের কাছ থেকে, সারদা মায়ের সহচর যোগীন মা-র কাছ থেকে তিনি গল্প সংগ্রহ করেন। সেগুলো বিশ্লেষণ করে পাশ্চাত্য মূল্যবোধের পাশে দাঁড় করান। তিনি বিশ্বাস করেন, যে জাতি সীতা চরিত্র সৃষ্টি করেছে, নারীর প্রতি সে জাতির যেরূপ শ্রদ্ধা, জগতে তার তুলনা নেই। 
শুধু নিজের ভাষায় গল্প পরিবেশন নয়, তার সঙ্গে নিজের এই ভাবনা ও বিশ্বাসকে মিশিয়েই তাঁর সাড়া জাগানো গ্রন্থ ‘ঈৎধফষব ঞধষবং ড়ভ ঐরহফঁরংস’। এই শেকড় খোঁজার আকুতিতেই তাঁর আরেক বিখ্যাত বই ‘ঞযব ডবন ড়ভ ওহফরধহ খরভব’। এই বইয়ে কোনও মতামত বা বিচার করার প্রবৃত্তি নেই। ভারতীয় জন-জীবনের কাছাকাছি থেকে নিবেদিতা তার বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর স্বাদু গদ্যে। এভাবেই এদেশের শেকড়ের সঙ্গে তাঁর একাত্ম হয়ে যাওয়া। 
তাঁর নিজের ভাষায় “আমি বিশ্বাস করি,-ভারতের বর্তমান তাহার অতীতের সহিত দৃঢ় সংবদ্ধ, আর তাহার সামনে জ্বলজ্বল করিতেছে এক গৌরবময় ভবিষ্যৎ।” এই বিশ্বাস থেকেই তাঁর কালী-চর্চা; কালীসাধক হিসেবে শ্রীরামকৃষ্ণ এবং রামপ্রসাদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা। এবং এই বিশ্বাস থেকেই স্বামী বিবেকানন্দের প্রত্যক্ষ সাহায্যে তাঁর রামপ্রসাদী গানের অনুবাদ। রবীন্দ্র-গল্পের মতো পাশ্চাত্য পাঠকের কাছে প্রথম রামপ্রসাদীর ইংরেজী তর্জমা পরিবেশনের কৃতিত্বও নিবেদিতার।
তাঁর কালী-চর্চার বিষয়ে আর একটু বিশদে যাই। ১৮৯৯ সালের গোড়ায় বিবেকানন্দের উদ্যোগে প্রচার করা হল, নিবেদিতা এ্যালবার্ট হলে কালী সম্পর্কে বক্তৃতা দেবেন। পাদ্রি, মিশনারি এবং ব্রাহ্মনেতারা গত কয়েক দশক ধরে লাগাতার প্রচারে  ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন যে, মূর্তিপূজা, বিশেষত কালীপূজা নাকি অশিক্ষিত হিন্দুর এক অশালীন উল্লাস। বিবেকানন্দ তাই খুব ভেবেচিন্তে বিষয়টি বাছলেন। কালীকে অগ্রাহ্য করা যে দেশীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে এক ধরনের অন্যায় হীনমন্যতা, তাকেই কৌশলে আঘাত করতে চাইলেন তিনি। শঙ্করীপ্রসাদ বসুর ভাষায়, ”ইংরাজ মহিলা কালীর পক্ষে বক্তৃতা করবে, এইটাই বিবেকানন্দের সহাস্য ও সুগভীর প্রতিঘাত।’’
সেই ১৩ই ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯-এ অনুষ্ঠিত বক্তৃতাসভায় বহু গণমান্য মানুষ এ্যালবার্ট হলে ভিড় করলেন। ভাষণের প্রাথমিক মুগ্ধতা কাটিয়ে ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার নিবেদিতাকে বললেন,”আমরা এই সকল কুসংস্কার দেশ থেকে তাড়াবার চেষ্টা করছি, আর আপনারা বিদেশিরা আবার সেইসব বিষয় প্রচার করতে উঠেপড়ে 

পাতা : ৫
লেগেছেন।” প্রকাশ্য তুমুল বাগ্বিতন্ডায় এক কালীভক্ত মহেন্দ্রলালকে ’বুড়ো শয়তান’ বলে গালি দিলেন। পরের কয়েক সপ্তাহ জুড়ে নিবেদিতার বক্তব্য নিয়ে পত্র-পত্রিকা আর বৈঠকখানায় চলল বাদানুবাদ। কালীঘাট মন্দির কর্তৃপক্ষের আহ্বানে তাঁদের প্রাঙ্গনে নিবেদিতা আবার এ বিষয়ে বক্তৃতা দিলেন।
এই ভাষণের লিখিত রূপ ও সেইসঙ্গে প্রাসঙ্গিক আরও কিছু নিবন্ধ যোগ করে প্রকাশিত হল নিবেদিতার প্রথম গ্রন্থ ’শধষর ঃযব গড়ঃযবৎ’ (১৯০০), শোরগোল ফেলে দিল পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবী মহলেও। স্বামীজির পরিকল্পনা সফল হল। নিবেদিতার মাধ্যমে ভারতের এক সুপ্রাচিন ঐতিহ্য শিক্ষিত মননে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হল।
নিবেদিতা তাঁর সাধনার জগতে কোন্ উচ্চস্তরে উন্নীত হয়েছিলেন তা মা কালী বিষয়ক রচনাগুলি পাঠ করলেই বোঝা যায়। যুক্তিবাদী নিবেদিতার জীবনে স্বামীজীর সঙ্গে হিমালয় ভ্রমণ একটি বিশেষ অধ্যায়। এই পর্বে ক্ষীরভবানী দেবীর মন্দির ও অমরনাথে তুষারলিঙ্গ শিবের দর্শন খুবই উল্লেখযোগ্য। এই ভ্রমণের ফলেই নিবেদিতা শিব ও তাঁর শক্তি বা কালীর মাহাত্ম্য যেন প্রত্যক্ষ ভাবে অনুভব করেন।  
তিনি তাঁর সব কাজেই সমাজের সকল স্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়েছেন, পাশে পেয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে প্রথম প্লেগ মহামারির সময় নিবেদিতার সেবাকাজের কথা উল্লেখ করি। তাঁর ভারতে পদার্পনের বছরখানেক পরেই ১৮৯৯ সালে কলকাতায় প্রবলভাবে প্লেগের সংক্রমণ শুরু হল। রামকৃষ্ণ মিশন প্লেগ নিয়ন্ত্রণে এক কমিটি তৈরি করল, নিবেদিতা যার সম্পাদিকা, স্বামী সদানন্দ প্রধান কার্যাধ্যক্ষ। নিবেদিতা বিভিন্ন স্তরে কাজ শুরু করলেন। সংবাদপত্রে জনসাধারণের কাছে সাহায্যের আবেদন করলেন। ক্লাসিক থিয়েটারে ’প্লেগ ও ছাত্রদের কর্তব্য’ শীর্ষক এক বক্তৃতা দিয়ে উৎসাহী স্বেচ্ছাসেবী সংগ্রহ করলেন। পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে প্লেগ প্রতিরোধের নির্দেশ সংম্বলিত হ্যান্ডবিল বিলি করতেন, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের কাজ তদারকি করতেন। কখনও নিজেই ঝাটা হাতে রাস্তার ময়লা পরিষ্কার করতে গিয়ে, পাড়ার যুবকদের লজ্জায় ফেলতেন। সংকটাপন্ন রোগীদের ব্যাপারে স্থানীয় সুখ্যাত চিকিৎসক রাধাগোবিন্দ (আর.জি) করের কাছে পরামর্শ চাইতেন। ডা. কর এই সংক্রামক মারণরোগ সম্পর্কে নিবেদিতাকে সাবধান করতেন। কিন্তু নিবেদিতা ভ্রুক্ষেপহীন।
এক বিকেলে ডা. কর একটি বস্তি পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন স্যাঁতসেঁতে নোংরা এক কুঁড়েঘরে প্লেগ আক্রান্ত এক মা-মরা শিশুকে কোলে নেন স্বয়ং নিবেদিতা। বাচ্চাটিকে বাঁচানো যাবে না জেনেও নিজের জীবন বিপন্ন করে তিনি তার সেবা করছেন, ঘর শোধন করার জন্য নিজে মইয়ে উঠে দেওয়াল চুনকাম করছেন। মৃত্যুর আগে বাচ্চাটি ‘মা মা’ বলতে বলতে নিবেদিতাকেই জড়িয়ে ধরল।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ’’ভগিনী নিবেদিতাকে দেখিয়াছি তিনি লোকসাধারণকে দেখিতেন, স্পর্শ করিতেন, শুদ্ধমাত্র তাহাকে মনে মনে ভাবিতেন না। তিনি গন্ডগ্রামের কুটিরবাসীনী একজন মুসলমান-রমণীকে যেরূপ অকৃতিম শ্রদ্ধার সহিত সম্ভাষণ করিয়াছেন দেখিয়াছি, সামান্য লোকের পক্ষে তাহা সম্ভবপর নহে-কারণ ক্ষুদ্র মানুষের মধ্যে বৃহৎ মানুষকে প্রত্যক্ষ করিবার সেই দৃষ্টি, সে অতি অসাধারণ।”
নিবেদিতা অবিভক্ত ভারতবর্ষে প্রচুর ভ্রমণ করেছেন। হিমালয়ে গেছেন, বিভিন্ন ছোট-বড় শহর. 
পাতা : ৬
তীর্থক্ষেত্র, প্রত্যন্ত গ্রাম-সর্বত্রই নিবেদিতার যাতায়াত। এবং এইসব জায়গায় স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আন্তরিক কথাবার্তা ও ভাববিনিময়ে দ্রুত তিনি মন জয় করে নিতে পারতেন। ভারতবর্ষের মাটির সঙ্গে সেইভাবে তাঁর একাত্ম হয়ে উঠা। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য ওই মন্তব্য করেছেন বিশেষভাবে তাঁর শিলাইদহের স্মৃতির পরিপ্রেক্ষিতে।
সিস্টার ক্রিস্টিনের সঙ্গে নিবেদিতা ১৯০৪ সালের শেষ সপ্তাহে কবির আতিথ্যে কয়েকদিন শিলাইদহে কাটিয়ে আসেন। সেখানকার এস্টেটের কর্মচারী দক্ষিণারঞ্জন চৌধুরীর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় নিবেদিতা কেমন ‘ক্ষুদ্র মানুষের’ সঙ্গে নিমেষে আত্মীয়তা স্থাপন করতে পারেন। গ্রাম্য বাড়ির মেয়েদের ধান ভানা, চিঁড়ে কোটা ইত্যাদি গেরস্থালির নানা খুঁটিনাটি তিনি মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখলেন। ডাব আর চিঁড়ার মোয়া খেলেন। আশপাশের বাড়ির মেয়েরা ভিড় করে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে এল। এমনকী প্রণামও করল। ফেরার পথে মেয়েদের সুখ্যাতি করতে করতে দক্ষিণারঞ্জনকে বললেন, ”এরা ঋষির মেয়ে, আমরাই এদের সুখি করতে পারিনি।” স্মর্তব্য তাঁর আচার্যের উক্তি, ’ভারতবাসীমাত্রই ঋষির সন্তান’। কাঁদাবাড়ির বিশাল বটগাছ দেখে বললেন,‘ঐড়ি উরারহব - ঐড়ি গধলবংঃরপ’ ! রাজবংশী পাড়ার দরিদ্র গ্রামবাসী কত বাউল-ফকির, বুনো পাড়ার ’অষ্ট সখী’ নাচিয়ে ছেলেরা- অল্প কয়েকদিনের মধ্যে তাদের সবার সঙ্গেই গড়ে উঠেছিল নিবেদিতার হৃদ্যতা।
পূর্ববঙ্গে নিবেদিতা আর-একবার গেছেন বড় কঠিন সময়ে। ১৯০৬ সালে প্রবল বন্যায় সেখানকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়, দেখা দেয় এক ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। অসুস্থ, অশক্ত শরীরেও নিবেদিতা ছুটে গেছেন বিপর্যস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে। স্থানীয় বিশিষ্ট সমাজসেবী অশ্বিনীকুমার দত্তকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মূলত বরিশাল এলাকা চষে ফেলেন। নিরন্ন মানুষের মর্মন্তুদ কাহিনি ও পরিস্থিতির সম্যক বিশ্লেষণ করে তিনি ধারাবাহিকভাবে ’দ্য মডার্ণ রিভিউ’ পত্রিকায় লিখেন,‘এষরসঢ়ংবং ড়ভ ঋধসরহব ধহফ ঋষড়ড়ফ রহ ঊধংঃ ইবহমধষ রহ ১৯০৬’।
এরাই হল সেই সব ভারতবাসী, নিবেদিতা যাদের ’আওয়ার পিপল’ বলে সম্মান করতেন ’আওয়ার উইমেন’ বলে বুকে টেনে নিতেন। রবীন্দ্রনাথ আত্মসমালোচনার সুরে বলেছেন ”তিনি যখন বলতেন ড়ঁৎ ঢ়বড়ঢ়ষব তখন তাহার মধ্যে যে একান্ত আত্মীয়তার সুরটি লাগিত আমাদের কাহারও কন্ঠে তেমনটি তো লাগে না। ভগিনী নিবেদিতা দেশের মানুষকে যেমন সত্য করিয়া ভালবাসতেন তাহা যে দেখিয়াছে সে নিশ্চয়ই বুঝিয়াছে যে, দেশের লোককে আমরা হয়তো সময় দিই, অর্থ দিই, এমন-কি জীবনও দিই কিন্তু তাহাকে হৃদয় দিতে পারি নাই- তাহাকে তেমন অত্যন্ত সত্য করিয়া নিকটে করিয়া জানিবার শক্তি আমরা লাভ করি নাই।” 
নিবেদিতাই-বা ভারতবাসীকে এতটা আপন  করে নেওয়ার শক্তি কী করে অর্জন করলেন? এদেশে পদার্পণের পরেও ব্রিটিশ পতাকার প্রতি যাঁর আনুগত্য অটুট ছিল, তিনি কি করে এত দ্রুত নিজেকে বদলে ফেললেন? রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত মন্তব্য করেছেন,”ভগিনী নিবেদিতা যে আমাদের ভারত-বোধকে জাগ্রত 

পাতা : ৭
করিয়াছেন, স্বচ্ছ করিয়াছেন, উজ্জ¦ল করিয়াছেন- তাহা তিনি এক ভারতীয় হিসাবেই করিয়াছেন, বিদেশিনী হিসেবে করেন নাই। এক বিদেশিনী মহিলার এই ভারতীয় হইয়া যাইবার কাহিনী সভ্যতার ইতিহাসে এক রহস্যময় ঘটনা।”
সারদা মা সে সময় জয়রামবাটি থেকে এসে কোলকাতা বাগবাজারের বোসপাড়া লেনে বাস করছেন। স্বামীজি ১৭ মার্চ ১৮৯৮-এ তাঁর তিন বিদেশিনী শিষ্যাকে নিয়ে গেলেন সংঘজননীর কাছেÑ শ্রীমতী বুল, মিস ম্যাকলাউড এবং মার্গারেট। বলা যেতে পারে, স্বামীজি এক ঝুঁকি নিয়েছিলেন। মা সারদা যদি এই বিদেশিনীদের গ্রহণ করার বিষয়ে কুন্ঠা প্রকাশ করতেন তা হলে এদের, বিশেষত মার্গারেটকে রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলনের প্রথম সারিতে নিয়ে আসা বেশ শক্ত হত। স্বামীজির অনেক গুরুভাই তাঁদের আপত্তি প্রকাশ করে ফেলতেন; কিন্তু স্বামীজিকে নিশ্চিন্ত করে মা সারদা আশ্চর্য স্বতঃস্ফুর্ততায় এই তিনজনকে সাদরে বরণ করে নিলেন, মার্গারেট হলেন তাঁর আদরের খুকি। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সে এক অপূর্ব মিলন দৃশ্য। উচ্ছসিত বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণানন্দকে লিখলেন,শ্রীমা এখানে আছেন। ইউরোপীয়ান ও আমেরিকান মহিলারা সেদিন তাঁহাকে দেখিতে গিয়াছিলেন। ভাবিতে পার, মা তাঁহাদের সহিত একসঙ্গে আহার করিয়াছেন।”
মার্গারেট এইদিন ডায়েরীতে লিখলেন, ’ফধু ড়ভ ফধুং’। তাঁর মনে হল নিষ্ঠাবতী এই সাধ্বীর উষ্ণ অভ্যর্থনা যেন ভারতীয় সমাজে তাঁর প্রবেশাধিকার সূচিত করল। 
ভারতবর্ষের ঐশ্বর্য ও ঐতিহ্যের প্রতি নিবেদিতা মুগ্ধ ছিলেন, কিন্তু মোহান্ধ ছিলেন না। তিনি জানতেন ভারতের ভিত কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার ওপর মজবুত ইমারত তৈরির আশু উদ্যোগ না নিলে বড় দেরি হয়ে যবে। তিনি বিশ্বাস করতেন,’’ওহফরধ,ধষড়হব ড়ভ ধষষ ঃযব হধঃরড়হং ড়ভ ধহঃরয়ঁরঃু, রং ংঃরষষ ণড়ঁহম, ংঃরষষ মৎড়রিহম, ংঃরষষ শববঢ়রহম ধ ভরৎস যড়ষফ ঁঢ়ড়হ যবৎ ঢ়ধংঃ, ংঃরষষ ৎবাবৎবহঃষু ংঃৎরারহম ঃড় বিধাব যবৎ ভঁঃঁৎব ড়ঁঃ ড়ভ ঃযব ঢ়ধংঃ.”[ঋড়ড়ঃ-ভধষষং ড়ভ ওহফরধহ ঐরংঃড়ৎু]
এই ভাবনা থেকে তাঁর মেয়েদের বিদ্যালয়ের পাঠক্রম তৈরি। সেখানে ভারতীয় পুরাণ-মহাকাব্যের পাশাপাশি পাশ্চাত্য কিন্ডারগার্টেন পদ্ধতিতে অঙ্ক শেখানো হচ্ছে, শেখানো হচ্ছে মানচিত্র পাঠ, শিরদাড়া বাঁকিয়ে বসলে শাসন করা হচ্ছে।  
নিবেদিতা চেয়েছিলেন জাতীয়বোধ জাগরণে যে-সর্বাত্মক উদ্যোগ তিনি নিচ্ছেন, তার এক গুরুত্বপূর্ণ ধারা যেন বেগবান হয় সাধারণ ভারতবাসীর উপেক্ষীত গৃহকোণ থেকে। তাই তাঁর বিদ্যালয় শুরু হচ্ছে শ্রীরামকৃষ্ণস্তোত্র আবৃত্তির পর সমবেত ’বন্দেমাতরম’ ধ্বনির মাধ্যমে, যদিও ব্রিটিশ সরকার তখনই এই গানের বিষয়ে আপত্তি করতে শুরু করেছেন। গান্ধীজির চরকা আন্দোলন  শুরুর অনেক আগে থেকে তাঁর বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা নিয়মিত চরকা কাটে। আন্দামানের দ্বীপান্তর থেকে কয়েকজন স্বাধীনতা সংগ্রামী মুক্তি পেলে, নিবেদিতা সে ঘটনা উদযাপন করেন বিদ্যালয়ের সদর দরজায় কলাগাছ আর মঙ্গলঘট স্থাপন করে। একটু বড় ছাত্রিদের তিনি নিয়ে যান সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তৃতা শোনাতে। স্বদেশের প্রতি ভালবাসা,দরদ ও সম্মানবোধ 
পাতা : ৮
জাগিয়ে দিচ্ছেন তিনি তাঁর মেয়েদের মনে, যারা একদিন সন্তানের মা হবে, সংসারের কর্ত্রী হবে, ভবিষ্যৎপ্রজন্মের দায়িত্ব নিবে। উনিশ শতক শেষে বিশ শতকের উষালগ্নে স্বামীজী বলেছিলেন, ভারতবর্ষ আগামী ৫০ বছরের মধ্যে স্বাধীনতা লাভ করবে। গুরুর ভবিষ্যদ্বাণী সফল হয়েছে। তবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিবেদিতার অবদান এখনো অনেকের অজানা। 
তবে শুধুই কি সন্তানের মা হবে তাঁর সব মেয়েরা? তাঁর সবসময়ের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে ছিলেন নিবেদিতা। শুধু ভারতের মুক্তি সংগ্রামে নয়,আরও গভীরতর এক বিপ্লবের বীজ তিনি পুতে দিয়েছিলেন তাঁর সুনির্বাচিত কন্যার মনে একান্ত সংগোপনে, অতীব যতনে। শিক্ষার মুক্ত বাতায়নের স্বাদ পেয়ে নিবেদিতার এক ছাত্রী তার অভিভাবকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করল, অল্প বয়সে বিয়ে করতে অস্বীকার করল। এবং আটপৌরে গৃহকোণে এ বিপ্লবের আগুন জ¦ালাতে সে পাশে পেল তাদের ’সানদিদি’ নিবেদিতাকে ”...তাহার তীক্ষè বিবেক, অতি সূক্ষè অনুভূতি এবং যথেষ্ট সতেজ কান্ডজ্ঞান আছে. উচ্চভাব অতি সহজে ধরিতে পারে। বিবাহ হইতে তাহাকে রক্ষা করা উচিৎ।”
উনবিংশ শতকের ভোরবেলায় ভারতবর্ষে দাড়িয়ে শিক্ষার্থী এক অল্পবয়সিনীকে ’বিবাহ হইতে রক্ষা’ করার কথা বলা তখন অগ্রণী দেশনেতাদের মধ্যেও একমাত্র বোধহয় নিবেদিতার পক্ষে সম্ভব ছিল। কিন্তু না, সেই মেয়েটাকে বিবাহ থেকে বা তার পরিবারের কাছ থেকে তিনি রক্ষা করতে পারেননি। সফল হয়েছিলেন তাঁর অন্য এক ছাত্রীর ক্ষেত্রে। তার নাম পারুল। শ্বশুরবাড়ি যেতে সে অস্বীকার করে, সে একদিন পালিয়ে এল নিবেদিতার স্কুল বাড়িতে। নিবেদিতার প্রশ্রয়ে আর এক ভগিনী সুধীরার আশ্রয়ে সে সেখানেই বড় হল। সেখানে তার নাম হল সরলা। 
এই সরলাই শ্রীসারদা মঠ ও মিশনের প্রথম অধ্যক্ষা প্রব্রাজিকা ভারতপ্রাণা মাতাজি। স্বামীজি সেই যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সম্পূর্ণভাবে নারীদ্বারা পরিচালিত নারীদের মঠ, সারদামায়ের শতবর্ষে তা সম্ভব হল। স্থাপিত হল নারীজাগৃতির ক্ষেত্রে এক আন্তর্জাতিক মাইলফলক। আর সেই স্বপ্ন-সম্ভব মিশনের প্রথম কান্ডারি হলেন নিবেদিতার একান্ত ¯েœহের সরলা- যাঁকে তিনি পরম আন্তরিকতায় রক্ষা করেছেন, অঙ্কুরিত করেছেন, লালন করেছেন। 
নিবেদিতার কাছে সেইরকম শুধুই স্বামীজী ! স্বামীজী ! স্বামাজী ! স্বামীজী স্বপনে-জাগরণে ! স্বামীজী জীবনে-মরণে! স্বামীজীকে ভালবাসার মধ্যেই তাঁর মুক্তি ! সেই একান্ত বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যের রূপটি দেখি বেদনা-বিধুর একটি চিঠিতে। নিবেদিতার বিশ্বাস, বিবেকানন্দের মহান আত্মা সদা জাগ্রত দেহান্তের পরেও।
আমাদের নবজাগরণের বিভিন্ন স্তরে নিবেদিতার অনিবার্য উপস্থিতি, অবশ্যম্ভাবী প্রভাব। ভিন্ন গোলার্ধের এক দেশের প্রতি এমন নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদন নিবেদিতাকে বিশ্ব-ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী বিশিষ্টতা দিয়েছে।


পাতা : ৯

অন্তিম শয়নে নিবেদিতার শেষ কথা ছিল: ঞযব নড়ধঃ রং ংরহশরহম, নঁঃ ও ংযধষষ ংবব ঃযব ংঁহ. (আমার দেহতরী ডুবে যাচ্ছে। কিন্তু আমি আবার সূর্য দেখব।)  আমরা কি সেই মঙ্গল সূর্যের নিশ্চিত উপস্থিতি দেখছি না ?

 

লেখক::  সিনিয়র আয়কর উপদেষ্টা

 

এইবেলাডটকম/প্রচ/গোপাল

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71