বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৩০শে কার্তিক ১৪২৫
 
 
নারী তারুণ্য ও সংস্কৃতি
মানুষই সত্য
প্রকাশ: ১০:৪৮ am ০১-০৬-২০১৭ হালনাগাদ: ১০:৪৮ am ০১-০৬-২০১৭
 
 
 


সেলিনা হোসেন ||

মানুষই সত্য- এই ধারণাটি অনবরত উচ্চারণ করে যাওয়া আজকের দিনে এক অনিবার্য বিষয়। মানুষ মানুষের প্রতি যে অন্যায় আচরণ করে, যে সহিংসতা মানুষকে বিপন্ন করে, নারী-শিশুদের প্রতি নির্যাতন যে হারে সংঘটিত হয়, তার নিদারুণ বাস্তবতা মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সে জন্য মানুষের শুভবোধ জাগ্রত করার নিরন্তর প্রচেষ্টা মানুষেরই ধর্ম। অসংখ্য মানুষ এই প্রচেষ্টাকে সামনে রেখে নিজেদের কর্মযজ্ঞ অব্যাহত রাখেন। মনুষ্যত্বের পরিচর্যা মানবিক দর্শনের বিশাল জায়গা।

 

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, 'এই যে বাংলাদেশ ইহার মৃত্তিকা, ইহার জল, ইহার বায়ু, ইহার আকাশ, ইহার বন, ইহার শস্যক্ষেত্র লইয়া আমাদিগকে সর্বতোভাবে বেষ্টন করিয়া আছে- আমরা যেন ভালোবাসিয়া তাহার মৃত্তিকাকে উর্বর করি, তাহার জলকে নির্মল করি, তাহার বায়ুকে নিরাময় করি, তাহার বনস্থলীকে ফলপুষ্পবতী করিয়া তুলি, তাহার নর-নারীকে মনুষ্যত্ব লাভে সাহায্য করি।'

একশ' বছরেরও বেশি সময় আগে রবীন্দ্রনাথ নর-নারীকে মনুষ্যত্ব লাভের কথা বলেছিলেন। আজকের দিনে এই অনিবার্য সত্য কথাটি বর্তমান বাংলাদেশে প্রবলভাবে জরুরি। মনুষ্যত্ববোধের ধারণা বিনষ্ট হলে ধ্বংস হবে মানব জাতি- এ কথা সবাই বোঝেন। তার পরও ধর্মের নামে যে আধিপত্য, তা মানুষের বেঁচে থাকাকে নির্মল করে তোলে। সে কারণে 'সমকাল' পত্রিকার এবারের আয়োজন 'সবার উপরে মানুষ সত্য'।

এ কথা সবাই জানে যে, ধর্ম জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উপাদান। ধর্ম একটি জনগোষ্ঠীর জীবন আচরণের অনেক উপাদানের একটি। সুতরাং ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে জীবনের স্বাভাবিক অন্বেষাকে বিনষ্ট করা হয় এবং ধর্মের শাশ্বত শুভ বোধকে খাটো করা হয়। ইসলামে আছে যে 'লাকুম দীনকুম ওয়ালিয়াদিন', অর্থাৎ আমার ধর্ম আমার, তোমার ধর্ম তোমার। কিন্তু ধর্মের প্রকৃত সত্য উপেক্ষা করে মানুষ যখন ধর্মান্ধ হয়, তখনই সমূহ বিপদ ঘটে। নিজের ধর্মকে একতরফাভাবে বড় করে দেখতে গিয়ে

মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্যের ওপর। ধর্মের নামে এ দেশে রক্তপাত ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ধর্মের উসুল আদায় করতে চেয়েছিল। কিন্তু সফল হয়নি। ধর্মান্ধতা সামাজিক ব্যাধি। যে ধর্মান্ধতাকে ধর্ম অন্ধ করে। সে যুক্তিহীন হয়ে পড়ে। সে অমানবিক। তার হৃদয়ে প্রেম থাকে না। তার মস্তিষ্ক ঈশ্বরশূন্য। যে ঈশ্বরের দোহাই দেয়, কিন্তু প্রকৃত ঈশ্বরকে উপলব্ধি করে না।

যে ধার্মিক সে ধর্মের প্রকৃত অর্থ বোঝে। ধর্ম তাকে যুক্তিহীন করে না। সে মানবিক। মানবতা তার কাছে ধর্মতুল্য। ধর্মের মৌল বিষয় তাকে আলোকিত করে। সে প্রেমিক। ঈশ্বর তার হৃদয়ে থাকে। মানুষ তার কাছে ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।

১৯৮৮ সালের এপ্রিলে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা বিতর্ক হয়েছিল। নারী সংগঠন আন্দোলন করে প্রতিবাদ করে। তাদের স্লোগান ছিল 'যার ধর্ম তার কাছে, রাষ্ট্রের কী বলার আছে'। অবশ্য নানা প্রতিবাদ সত্ত্বেও সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বাতিল হয়নি এবং একই সঙ্গে বলা যায়, শান্তিপূর্ণভাবে ধর্ম পালনও অন্য ধর্মাবলম্বীরা করতে পারছে না। ধর্মীয় উৎসব এলেই তারা নানা ধরনের ভয় এবং আতঙ্কে দিন কাটায়। হামলার আশঙ্কা করে এবং হামলা যে হয় না তাও অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে এই আতঙ্ক হিন্দু সম্প্রদায়কে বেশি আতঙ্কিত করে। কারণ দুর্গাপূজার সময় প্রতিমা ভাঙার ঘটনা তাদের একটি নির্মম অভিজ্ঞতার সঞ্চয়। রাষ্ট্রের যে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জীবনে এই সঞ্চয় বেশি হওয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার ব্যর্থতা। তাকে কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন জাতির সম্মিলিত প্রয়াস। শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে একে মোকাবেলা করলে সমাজ এই ব্যর্থতা বিভিন্ন সময়ে মানবসভ্যতার ধারাবাহিকতায় কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করে। সময়ের সাদা হাত সে কলঙ্ককে মুছে ফেলতে পারে না।

যেখানে সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস, ঘৃণা এবং স্বার্থসম্পর্কিত বিভেদের সৃষ্টি হয়, সেখানেই নষ্ট হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এ সম্প্রীতি ভাঙা যেমন সহজ, তেমনি রক্ষা করাও কঠিন। মানুষের ঘৃণ্য স্বার্থবুদ্ধি বিভিন্ন সংযোগে এমনভাবে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে যে, মানুষের হাতে শুরু হয় মানুষের নিধন। এখানেই আমার আপত্তি। আমার অধিকার নিয়ে আমি বসবাস করব। কারও হাতের ক্রীড়নক হতে চাই না। সেটা ধর্মের নামে হোক বা অন্য কোনো অজুহাতে। তার পরও মানুষের বিকৃত উল্লাস কলঙ্কিত করেছে ইতিহাসের পৃষ্ঠা।

'সংখ্যালঘু' শব্দটিই অপমানজনক। মানুষ হিসেবেই তো সবার স্বীকৃতি। এ অধিকার নিয়েই তো সে সমাজের মানুষ। তাহলে তাকে কেন একটি শব্দ দিয়ে বস্তাবন্দি করা? এটা মানবিক অধিকার লঙ্ঘন। কোনো দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের এ শব্দ ব্যবহারের অধিকার থাকা উচিত নয়। এটি ন্যায়সঙ্গতও নয়। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি 'সুবিচার নিশ্চিত' করা হবে। এটি একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। এটিও অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ বলে আমরা বিশ্বাস করি। মাকে 'মা' বলেই ডাকতে হয়। নইলে মায়েরই অপমান। তেমনি ডাকার একটি ব্যাপার আছে। ডাক যথার্থ না হলে তার অবমাননা হয়, এটি সামাজিক সত্য। মূল্যবোধের সত্য। সে জন্য 'সংখ্যালঘু' শব্দটি ব্যবহৃত না হলে মানুষের দৃস্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে। মানবিক বোধে উদ্বুদ্ধ হবে মানুষ।

মানুষের প্রতিশব্দ যখন সংখ্যালঘু শব্দে রূপান্তরিত হয়, তখন বুঝতে হবে সামাজিক সুস্থতা নষ্ট হয়েছে, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে ফাটল ধরেছে এবং অচিরেই তা বিস্ফোরিত হবে। এর জন্য আমাদের রুখে দাঁড়ানো প্রয়োজন।

২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সংবাদের শিরোনাম ছিল 'তিন দিন পর রাঙামাটি শান্ত'। শান্তি শোভাযাত্রার ছবি ছাপা হয়েছে প্রথম পৃষ্ঠায়। বিপুল সংখ্যক পাহাড়ি-বাঙালি এই শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। দেখা যাচ্ছে, তিন দিন আগে পাহাড়ি-বাঙালির যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয় তার বিপরীতে এই চিত্র। পাহাড়ি-বাঙালির পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ভীতি দূর করতে এবং শান্তি-সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে এ শোভাযাত্রা ও গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন।

মানবিক বোধশূন্য সমাজ এভাবে সংঘর্ষ ঘটতে দেয় এবং মানবিক মূল্যবোধ পায়ের নিচে দাবিয়ে রাখে। তারপর সম্প্রীতির নামে মিথ্যাচার করে। নইলে এ ধরনের পরিস্থিতি ঘটার আগেই ব্যবস্থা নিতে পারত জেলা প্রশাসন।

একই তারিখে আরেকটি খবর এমন- 'ব্যস্ত রায়েরবাজারের প্রতিমা শিল্পীরা, আসছে দুর্গাপূজা'। পঞ্চাশের দশকে আমার শৈশবে খুব কাছে দাঁড়িয়ে প্রতিমা বানানো দেখতাম। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। ঢোলের শব্দ শুনলে একছুটে চলে যেতাম পূজামণ্ডপে। ঈদের দিন কলাপাতায় মুড়ে সেমাই আর জর্দা নিয়ে যেতাম বারুয়া মাঝির জন্য। তাকে দিয়ে যখন বলতাম, কাকু তোমার জন্য, তখন দেখতাম তার চোয়াল-ভাঙা চেহারার উজ্জ্বলতা। আর বাগদী মাসি পায়ে গোদ নিয়ে বসে থাকতেন আমাদের আশায়। আমরা ঈদের উৎসবে তাকে সেমাই-জর্দা দিলে একগাল হেসে বলতেন, এসেছিস তোরা। তোদের অপেক্ষায় বসে আছি।

এভাবে ঈদ-পূজা আমাদের জীবনে এসেছিল। আমরা ধর্মীয় সংখ্যালঘু বুঝিনি। আমরা বুঝতাম মানুষের জন্য উৎসব। উৎসব শুধু ধর্মের জন্য নয়। ২০১৩ সালের দুর্গাপূজার এ আয়োজন ঠিক থাকবে তো? নাকি আবার শান্তি শোভাযাত্রার আয়োজন করতে হবে?

২০১৩ সালের দুর্গাপূজা পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয়নি। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য রায় ঘোষিত হয় একজন অপরাধীর। রায়ের সর্বোচ্চ দণ্ড ছিল মৃত্যুদণ্ড। রায়ের ঘোষণায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী। রাজপথে জ্বালাও-পোড়াও ইত্যাদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাশাপাশি দেশের গ্রামাঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ চালায় তারা। ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়। সম্পদ নষ্ট করে। মন্দির ভাংচুর করে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অপরাধ করার জন্য যারা অভিযুক্ত হয়, তাদের তো দণ্ড পেতেই হবে। এটা কালের নিয়ম। এটা ইতিহাসের বিচার। কিন্তু যারা দণ্ডপ্রাপ্ত হয়, তাদের অনুচর বাহিনী কত নির্মম হতে পারে এ ঘটনা তার প্রমাণ। নিরীহ সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণে তারা বিবেক-তাড়িত হয় না। ধর্মের শান্তির বাণী তাদের জীবন থেকে মুছে যায়। উন্মত্ততাকে তারা ধর্মের অংশ মনে করে। ন্যায়ের ভেদবুদ্ধির বাইরে চলে যায় তাদের মানবিক চেতনা। আবারও জড়ো হতে হয় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে। মানুষের হাত মানুষের দিকে প্রসারিত হয়।

আমি আবারও বলি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমি জানি না। আমি এ ধরনের বিভেদ টানা রেখা মুছে দিয়ে ধর্মীয় দলাদলির ঊধর্ে্ব থাকতে চাই।

সম্প্রদায়ের পরিচয়ের ভিত্তি কেন মানুষ হিসেবে হবে না, কেন ধর্ম কিংবা অন্য কোনো বিষয় মানুষের পরিচয় মুছে দিয়ে বড় হয়ে উঠবে? কেন স্বার্থসিদ্ধির দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে একদল তাড়া খেয়ে ছুটবে খানিকটুকু আশ্রয়ের জন্য? ভুপেন হাজারিকার একটি গানের লাইন এমন :

'সংখ্যালঘু কোনো সম্প্রদায়ের

ভয়ার্ত মানুষের না ফোটা আর্তনাদ

যখন গুমরে কাঁদে

আমি যেন তার নিরাপত্তা হই।'

এই গান শুনলে অদ্ভুত এক কালো পর্দা নেমে আসে মনের ওপর। ভয়ার্ত মানুষের আর্তনাদ নিজেদের বুকের ভেতরে গুমরে মরে। মানুষের চোখের জল স্তব্ধ করে দেয় সে সময়।

আমরা সব ধর্মের উৎসব নিজেদের উৎসব মনে করে ঐক্যের পতাকাতলে দাঁড়াতে চাই। আমরা যিশুখ্রিস্টের বন্দনায় শরিক হতে চাই। আমরা গৌতম বুদ্ধের বন্দনায় শরিক হতে চাই।

রাজনীতির কারণে মানুষকে আমরা সংখ্যালঘু বানাতে চাই না- রাজনীতির কারণে মানুষের নিধনযজ্ঞ আমরা দেখতে চাই না।

মানবিকতা হোক আমাদের একমাত্র আশ্রয়। মানুষের কল্যাণই হোক আমাদের ধর্ম।

সব স্বার্থবুদ্ধির ঊধর্ে্ব আমরা এ ধর্মের জয়গান গাইব।

একটি ধর্মকে ব্যক্তির বিশ্বাস থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত করার ঘটনা কোনো গণতান্ত্রিক সুস্থ বোধসম্পন্ন দেশে ঘটতে পারে না। এটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার উপরে আঘাত। ধর্মীয় বোধের উপরে আঘাত। সুস্থ প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন রাষ্ট্রই দেশের নাগরিকের কাম্য। এর ব্যত্যয় ঘটলে মানুষ বিলুপ্ত হতে দেখে তার মর্যাদাবোধ।

পরিবর্তন স্থায়ী হয় না। তা আবার যে কোনো ধর্মান্ধ স্বার্থান্বেষী মহলের তাড়নায় মাথা তুলে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের এই ইতিহাস বিশ্লেষণ একটি নির্মম সত্য বলে প্রতীয়মান হয়। দুর্গাপূজার সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিমা বানানো প্রতিরোধ করা কিংবা প্রতিমা ভাঙার ঘটনা প্রমাণ করে যে, শান্তিপূর্ণভাবে ধর্ম পালনের পরিস্থিতি এ দেশে অনুপস্থিত, যতই তা সংবিধানে উল্লেখ থাকুক না কেন। ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনায় এ দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে হিন্দু সম্প্রদায় ভয় ও আতঙ্ক থেকে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা বর্জন করেছিল। সে বছর ঘটপূজা করেছিল তারা। প্রতিমার সামনে মাটির ঘটের ওপর আমের পাতা, পুরো নারিকেল, নতুন গামছা, ফুল, বেলপাতা ইত্যাদি রাখা হয়। পাঁচ ফোঁটা মেটেসিঁদুরের ওপর ধান-দূর্বা দিয়ে ঘট বসানো হয়। ঘটের সামনের অংশে চিত্রিত সিঁদুর থাকে। আমি মনে করি, এ ঘটপূজা শুধু ভয় বা আতঙ্ক থেকে নয়, এটি ছিল প্রতিবাদের চিহ্নস্বরূপ। দেশের সব ধর্মের শান্তিকামী জনগণকে পূজা উৎসবের এ প্রতিবাদ মর্মাহত করেছিল।

মানুষের সহমর্মিতা মানুষকে শক্তি দেয়। সহমর্মিতায় এই শক্তির জায়গাটুকু আমাদের নাগরিক সমাজে আছে। প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করে, প্রতিরোধের পথে হেঁটে আমরা মানবিক মর্যাদা সমুন্নত রাখতে চাই। ধর্মীয় সংখ্যা লঘিষ্ঠতার গরিমা এ দেশবাসীকে অমানুষ করে না। মানুষ তার দায় গ্রহণ করে না। এখানেই স্বস্তি, এখানেই শান্তি।

ধর্মান্ধতার জিগিরে এ দেশে বেশ কয়েকবার দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছে। ১৯৪৬ সালে দাঙ্গা হয়েছিল কলকাতায়, একই বছর ভয়াবহ দাঙ্গা হয়েছিল নোয়াখালীতে। মহাত্মা গান্ধী শান্তির বাণী নিয়ে নোয়াখালীতে এসেছিলেন। ১৯৫০ সালে দাঙ্গা হয়েছিল ঢাকায়। ১৯৬৪ সালে দাঙ্গা বাঁধলে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 'পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও' বলে তিনি প্রচারপত্র ছেড়েছিলেন। নিজের জীবন বিপন্ন করে দাঙ্গাকারীদের মাঝে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অমুসলিমদের ওপর নির্যাতন করেছিল বেশি, সেটাও ছিল ধর্মকে কেন্দ্র করে উদ্বুদ্ধ হওয়া। ১৯৯০ ও ১৯৯২ সালে আবার দাঙ্গা বেধেছিল। কিন্তু সে সময়ের ঘটনাগুলো গণমানুষের প্রতিরোধের মুখে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। কিন্তু ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচন-পরবর্তী অমুসলিমদের ওপর যে নির্যাতন ঘটেছে, তা সময়ের দিক থেকে দীর্ঘমেয়াদি এবং নির্যাতনের দিক থেকে ব্যাপক। নির্বাচনের আগেও দেশের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর উপাসনালয়ে আক্রমণ হয়েছে। নিহত হয়েছে মানুষ। চার্চ, মন্দির, মসজিদেও মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটেছে। যেন কোনো এক লক্ষ্যে ধর্মান্ধরা এই মরণযজ্ঞ খেলায় মেতেছে। আমরা যারা নিরীহ সাধারণ মানুষ তারা আত্মগ্গ্নানিতে ভুগি আর মানবতার কাছে নিজেদের অপরাধের জন্য অনুতাপ করতে থাকি। আমরা বুঝতে চাই না সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কী। আমরা বুঝি মানুষ, মানুষের মৌল অস্তিত্ব। ইচ্ছে হয় ফিওদর দস্তয়ভস্কির, আমার প্রিয় রুশ ঔপন্যাসিক, নায়ক রাসকলনিকভের মতো প্রেমিকা সোনিয়ার সামনে নতজানু হয়ে বলা সেই অমর উক্তি শহরের রাজপথে গেয়ে বেড়াই : 'ব্যক্তিগতভাবে তোমার সামনে নয়, সোনিয়া, তোমার আদলে উৎপীড়িত মানবতার কাছে আমি নতজানু হচ্ছি।' গত কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার অমুসলিম মানুষ। বেশি নির্যাতিত হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২০০০ সালের ৩১ মে পর্যন্ত সংশোধিত কপিটি আমার কাছে আছে। প্রকাশ করেছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এই সংবিধানের সূচিপত্রের ১২ ধারায় লেখা আছে :'১২। (বিলুপ্ত)।' সংবিধানের ৪ পৃষ্ঠায় ১২ ধারার জায়গায় ৮টি তারকা চিহ্ন দিয়ে ৪ উল্লেখ করা হয়েছে। পাদটীকায় ৪-এর ধারায় লেখা আছে :The second Proclamation (Fifteenth Amendment) Order, 1978 (Second Proclamation Order No IV of 1978)- Gi 2nd Schedule বলে "১২। 'ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা' অনুচ্ছেদটি বিলুপ্ত।"

সংবিধানের একই সূচিপত্র ২ক ধারায় লেখা আছে : '২ক। রাষ্ট্রধর্ম'। সংবিধানের প্রথম ভাগ প্রজাতন্ত্র। এই ভাগে রাষ্ট্রধর্ম ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে "২(২ক। প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাইবে।)" পাদটিকায় বলা হয়েছে '২ সংবিধান (অষ্টম সংশোধন) আইন, ১৯৮৮ (১৯৮৮ সনের ৩০ নং আইন)-এর ২ ধারাবলে সনি্নবেশিত।'

ধর্মীয় স্বাধীনতা বিলুপ্ত হলে কি 'অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে' পালন করা যায়? একদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতা বিলুপ্ত হলো, অন্যদিকে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হলো- বিষয়টি খুবই পরিষ্কার। বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না। যারা সরকারের দায়িত্বে থেকে ক্ষমতা ব্যবহার করে কাজটি করেছেন, তাদের উদ্দেশ্য দেশে মৌলবাদ উত্থানে সহযোগিতা প্রদান। এর দ্বারা জঙ্গিদের সন্ত্রাসকে আইনগত অনুমোদন দেওয়ার কূটকৌশল সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায়। আর ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে ধর্মান্ধদের ফায়দা লোটার জায়গাটিও তৈরি করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে অন্য ধর্মের মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের দিকটিকে অবমাননা করা হয়। নাগরিক হিসেবে তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে তাকে অধস্তন করা হয়। সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা বিলুপ্ত করলে ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি করা হয়।

আমি মনে করি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি শব্দ দুটো এক অর্থে মানবিকতার লজ্জা ও গ্গ্নানি। মানবসভ্যতার এমন কোনো শব্দের সৃষ্টি মানবিক বোধের ব্যর্থতার ফল।

কথাশিল্পী

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71