মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯
মঙ্গলবার, ১লা শ্রাবণ ১৪২৬
 
 
মিশ্র সংস্কৃতি আনে সম্প্রীতি
প্রকাশ: ১০:৪৮ pm ৩১-০৮-২০১৫ হালনাগাদ: ১০:৪৮ pm ৩১-০৮-২০১৫
 
 
 



উম্মে মুসলিমা : সেই বেদনা এখনো বহমান।

আমাদের বাড়ির পেছনেই ছিল লক্ষ্মীনারায়ণ বাবুর দোতলা। ওবাড়ির তিন মেয়ে আর আমরা তিন বোন। গলায় গলায় ভাব। তখন চারদিকে যুদ্ধের দামামা। তার মধ্যেও ওদের বাড়িতে পূজার ঢোলের বাদ্যি। সকালেই কাকিমা মায়ের হাতে হরেকপদের নাড়ু-মণ্ডা দিয়ে গেছেন বড় কাঁসার থালায় করে। আমরা তুলে রাখা জামা পরে একদৌড়ে ওবাড়ি। ছোট বোনের সই ওবাড়ির দুলালী দুপুর বেলায় পুতুল খেলতে এসে বলত, ‘তুই আদ্ধেকটা জল খেয়ে আমাকে গেলাসটা দে। এঁটো না খেলে সই হওয়া যায় না।’

বড় বোন ওদের বড় মেয়ে শানুর সঙ্গে এক বিছানায় শুয়ে সারা দুপুর পুটুর পুটুর গল্প। বিকেলে আমার বন্ধু মুক্তি এসে বলল, ওদের বাগানে আর খেলার উপায় নেই। ওখানে লুকিয়ে থাকার জন্য গর্ত খোঁড়া হয়েছে। ছুটে গিয়ে দেখলাম, লক্ষ্মীনারায়ণ বাবু আর আব্বা ওটার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। ওটার নাম নাকি ‘ট্রেঞ্চ’। ‘দ’-এর আকৃতিতে কাটা। বোমা পড়া শুরু হলে ওখানে সবাই গিয়ে লুকাতে হবে। দুলালী বলল, ‘তুই আর আমি ওই কোনাটায় লুকাব।’

আমাদের সে কী আনন্দ! কিন্তু পরদিন সকালে উঠে দেখা গেল, আব্বা-মা বারান্দায় চুপচাপ মন ভারী করে বসে আছেন। আমরা ছুটে গেলাম ওবাড়ি। বড় ফটক বন্ধ। ঠাকুরঘরের পাশের ছোট খিড়কি দরজা দিয়ে ঢুকে দেখলাম, প্রতিটি ঘরের দরজায় ঝুলছে তালা। ওদের কাশির পেয়ারাগাছের তলে ছড়িয়ে আছে শুকনো পাতা। উঠোনের তারে জড়ো হয়ে ঝুলছে কাকিমার পুরোনো শাড়ি। ওদের আদরের কুকুর লালু সিঁড়ির ওপর দুই পায়ে মাথা দিয়ে শুয়ে কোন দিকে যেন তাকিয়ে আছে। ওদের গোয়ালা গহর বলল, ‘বাবুরা তো রাতেই ওপারে চলে গেছেন।’

আমাদের বুকের ভেতর খাঁ খাঁ করে উঠল। আমাদের ছোট্ট বুকে সেই প্রথম প্রিয়জন হারানোর ব্যথা এখনো মাঝেমধ্যে উঁকি দেয়। এখন ফেসবুকে আমরা শানু, মুক্তি, দুলালী লিখে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাই। কোনো উত্তর আসে না।

আমার বাবা বলতেন, ‘আমি যে বাড়িতে বসবাস করব, তার প্রতিবেশী যেন হয় একঘর হিন্দু।’ সত্যিই তিনি তাঁর বাড়িসংলগ্ন ছোট বাসা এক হিন্দু পরিবারকে ভাড়া দিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর ১৫ বছর পরও এখনো সেই পরিবারটিই বসবাস করছে। আমার একাকী মাকে অনেকেই বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়েছেন ভাড়াটে পরিবর্তনের। তিনি তাঁর স্বামীর ইচ্ছেকে সম্মান দেখাতে কোনো পরামর্শের তোয়াক্কা করেননি। এমনকি আমার বাবা মজা করে বলতেন, তিনি বাড়িটি দোতলা করবেন এবং তাঁর কোনো নাতি বিদেশে পড়াশোনা শেষে এক বিদেশিনীকে বিয়ে করে যখন তার মায়ের বিরাগভাজন হবে, তখন তিনি ওই দোতলাটা তাদের ছেড়ে দেবেন। কেন তাঁর এ উদ্ভট শখ? জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছিলেন, ‘মিশ্র সংস্কৃতি ছাড়া কেউ উদার হতে পারে না।’


আমাদের অন্তরে আছে মিশ্র সংস্কৃতির বীজ। অথচ আমরা আমাদের জনসংখ্যার প্রায় ৩০ ভাগ সমসংস্কৃতির উত্তরাধিকারীদের হারিয়ে ১০ ভাগে পরিণত করেছি। আরও হারানোর পাঁয়তারা চলছে

আগেকার গ্রামগুলো ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। একই গ্রামে কামার, কুমার, জেলে, তাঁতির বসবাস ছিল পাশাপাশি। হয়তো পাশের গ্রামে ছিল কোনো স্যাকরা বা বেহারা। একে অন্যের পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতায় বিরোধহীন বয়ে যেত শান্তির সুবাতাস। গ্রামের এপারে মসজিদ, মাঝখানে মন্দির। একই নদীতে ‘ঠাকুর ঘাট’-এর বউ-ঝিরা ‘শেখের ঘাট’-এ ডুব দিয়ে পবিত্র হতো আবার হাজিপাড়ার ছেলেমেয়েরা বেনেপুকুরে নেমে ‘কাদাখেড়’ (পূজার সময় উঠানে পানি ঢেলে বাড়তি কাদা এনে তার ওপর নাচানাচি করা) করত। গ্রামের হিন্দু-মুসলমান সব ঘরের বিবাহিত মেয়েরা নাইওরের সময় বলতে বুঝত দুর্গাপূজার দিনগুলো। কোরবানি ঈদকে বলা হতো বকরি ঈদ। যাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মবোধ অসম্মানিত না হয়। মুসলমান বউটি পাশের বাড়ির সিঁদুর পরা বউটিকে ডেকে এনে কুমড়োর বড়ি বানানো শেখাত আবার হিন্দু বউটি সেমাই রাঁধতে গিয়ে গলিয়ে ফেলে হেসে কুটিকুটি হয়ে প্রশিক্ষণ নিতে আসত এবাড়ি।
খুবই সাধারণ উদাহরণ। কিন্তু নিজেকে সমৃদ্ধ করার এ শিক্ষা বৃহত্তর ক্ষেত্রের জন্যও প্রযোজ্য। এর থেকে লাভটা যা, তা হচ্ছে সহনশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতার উন্মেষ। যে জাতি যত বেশি আত্মব্যূহে আবর্তিত, সে জাতি তত বেশি অনুদার ও নিষ্ঠুর। হিটলার তার জ্বলন্ত প্রমাণ। যারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকায় আবদ্ধ রাখে, তারা সংস্কৃতির আদান-প্রদানে বিশ্বাসী হতে পারে না। তখনই ঘটে সংঘর্ষ। উৎখাত।

জাতি হিসেবে আমরা আশীর্বাদপ্রাপ্ত। তা যেমন আমাদের মাটির সূত্রে পাওয়া তেমনি ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতাতেও। আমাদের অন্তরে আছে মিশ্র সংস্কৃতির বীজ। অথচ আমরা আমাদের জনসংখ্যার প্রায় ৩০ ভাগ সমসংস্কৃতির উত্তরাধিকারীদের হারিয়ে ১০ ভাগে পরিণত করেছি। আরও হারানোর পাঁয়তারা চলছে। তাঁদের মধ্যে যাঁদের আপাতত চলে যাওয়ার উপায় নেই, তাঁদেরও অনেকে সন্তানদের পড়াশোনা করতে পাঠিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে রাখছেন। পাকিস্তান আমলের সেই সৌহার্দ্য যদি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র পাওয়ার পরেও এভাবে কমতে থাকে, তাহলে ‘বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্রুধারা, তার যত মূল্য, সে কি ধরার ধুলায় হবে হারা?’

উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক ও জেন্ডার সমতাবাদী লেখক।
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক : সুকৃতি কুমার মন্ডল 

 খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

+8801711-98 15 52

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2019 Eibela.Com
Developed by: coder71